বেকার বাড়ছে, কাজের সুযোগ তৈরি হবে কীভাবে
Published: 3rd, April 2025 GMT
বাংলাদেশে পরিসংখ্যানভেদে প্রায় ২০ লাখ তরুণ প্রতিবছর কর্মবাজারে প্রবেশযোগ্যতা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই কাজ পান না, অনেকে পেলেও যোগ্য কাজটি পান না কিংবা অনেকেরই আকাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিক মেলে না। বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান আর দারিদ্র্য বিমোচন যেহেতু একই সূত্রে গাঁথা, তাই এখানে ক্রমাগত বিনিয়োগও প্রণিধানযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে, বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সংকট চলছে। ডলার–সংকট ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাঁদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য হারে ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগও খুব বেশি বাড়ছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ওপর, সেভাবে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। যদিও প্রতিবছর কর্মক্ষম বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরির বাজারে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের একটি বড় অংশই কাজ না পেয়ে বেকার থাকছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, গত বছরের শুরুতে বেকার মানুষ কম থাকলেও বছরের শেষে ধারাবাহিকভাবে এ সংখ্যা বেড়েছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২৬ লাখ ৬০ হাজার বেকার আছেন। ২০২৩ সালের একই সময়ে গড় বেকারসংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার।
এদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়েছে গড়ে দেড় শতাংশ হারে। যদিও একই সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও তাঁদের বেশির ভাগই ছায়া বা প্রচ্ছন্ন বেকার বা আংশিক বেকার। অর্থাৎ তাঁদের শ্রমশক্তি পুরো কাজে আসছে না।
বর্তমানে তাই বেকারত্বও বড় ধরনের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতির জন্য। মূলত অর্থনীতির প্রতিটি খাত এভাবে চক্রাকারে একে অন্যকে প্রভাবিত করে। তাই একটা সমস্যার সমাধান ছাড়া অন্য সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়ে। বেকারত্ব দূর করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে বিনিয়োগও আবশ্যক। আর বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে প্রয়োজন এর প্রতিবন্ধকতাগুলো, যেমন জ্বালানিসংকট, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করা। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের বিষয়টি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
গত দেড় দশকে সেভাবে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়নি। এমনকি তথাকথিত উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময়েও জিডিপির অনুপাতে কর্মসংস্থান বাড়েনি। আবার শ্রমবাজারে শোভন চাকরির অভাব রয়েছে। কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সিংহভাগই রয়েছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ঋণ প্রবৃদ্ধি না হওয়া, বিনিয়োগস্বল্পতা, জ্বালানির অভাব ইত্যাদি কারণে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলেও সরকারি খাতেও খুব বেশি কর্মসংস্থান সৃজন হয়নি।
এদিকে দেশের অর্থনীতির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। কারণ, তাঁরা উৎপাদন খাত ও কারখানা পর্যায়ে কাজ করতে সেভাবে আগ্রহী নন। আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মে নিশ্চয়তা নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে এবং মজুরিও তুলনামূলক কম থাকায় এ খাতে উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা যুক্ত হতে চান না।
যদিও সরকারি চাকরিতে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় একসময় মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার বেসরকারি ও সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধাজনিত ব্যবধান বাড়ায় তরুণেরা ঝুঁকেছেন সরকারি চাকরির দিকে। যদিও বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, কেবল ৫ শতাংশ কর্মরত সরকারি চাকরিতে। যেখানে দেশে কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন সাত কোটির বেশি মানুষ, সেখানে সরকারি চাকরিতে জনবলের সংখ্যাও খুবই নগণ্য।
সারা বিশ্বে এখন অখামারি বা নন-ফার্ম কৃষি খাত আকারে-আয়তনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধিকন্তু প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং প্রক্রিয়াজাত খাতেও শিক্ষিত তরুণদের নিয়োগ বৃদ্ধি পেতে পারে। ঠিকভাবে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স বিকাশ লাভ করলে উদ্যমী নারীদেরও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে উদ্যমী নারীদের লাভজনক ব্যবসায় প্রশিক্ষিত করে তোলাও প্রয়োজনীয়। অনেকে পছন্দ করুন আর না করুন, কর্মসংস্থান নিশ্চিতে বিনিয়োগের ধারাকে অবারিত করতে আমাদের শিগগিরই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পথেও এগোতে হবে।মূলত এটি নির্দেশ করে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অভাবকে। বিবিএসের ওই জরিপ বলছে, দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত শ্রমজীবীর হার ৮৪। আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন মাত্র ১৬ শতাংশ। এ বাস্তবতায় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বেকার সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। এর জন্য শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে জনবল নিয়োগ পরিকল্পনা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদেরও মত, দেশে সরকারি চাকরিজীবীর হারও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তাই এ খাতে আরও বেশি লোকবল প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো জায়গায়ও আরও জনবল প্রয়োজন। তা ছাড়া সরকারি খাতে জনবল কম থাকার বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। বিভিন্ন খাতে সেবা প্রদান ও নীতিমালা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারি খাতে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় সেবা প্রদান বাধাগ্রস্ত হয়।
আরেকটি প্রায় নির্মম বাস্তবতা হলো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার বিচারে সবার জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই অধিকসংখ্যক উদ্যোক্তা তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে।
এ জন্য অন্যতম সম্ভাবনাময় হতে পারে বৃহত্তর কৃষি খাত—খামার ও অখামারি কৃষি খাত। একসময় জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল বেশি। দেশের শ্রমশক্তিও ছিল কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত অর্ধশতকে দেশের অর্থনীতির কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কৃষিনির্ভরতা কাটিয়ে শিল্পের দিকে এগিয়েছে দেশ। জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান কৃষিকে ছাড়িয়ে গেলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না শ্রমবাজারে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিতে আধুনিকায়ন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদনের সুযোগ থাকলে এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
সারা বিশ্বে এখন অখামারি বা নন-ফার্ম কৃষি খাত আকারে-আয়তনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধিকন্তু প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং প্রক্রিয়াজাত খাতেও শিক্ষিত তরুণদের নিয়োগ বৃদ্ধি পেতে পারে। ঠিকভাবে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স বিকাশ লাভ করলে উদ্যমী নারীদেরও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে উদ্যমী নারীদের লাভজনক ব্যবসায় প্রশিক্ষিত করে তোলাও প্রয়োজনীয়। অনেকে পছন্দ করুন আর না করুন, কর্মসংস্থান নিশ্চিতে বিনিয়োগের ধারাকে অবারিত করতে আমাদের শিগগিরই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পথেও এগোতে হবে।
● মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: শ রমশক ত প রব দ ধ পর য প ত চ কর র চ কর ত কম র স সরক র
এছাড়াও পড়ুন:
গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ
গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স নিয়োগ; চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন এবং অনিময়, দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে নাগরিক মঞ্চের আয়োজনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে গাইবান্ধা শহরের ডিবি রোডে অবস্থিত গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (গানাসাস) সামনে কর্মসূচি পালন করা হয়।
গাইবান্ধা নাগরিক মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবুর সভাপতিত্বে, অ্যাডভোকেট ফারুক কবীরের সঞ্চালনায় কর্মসূচির শুরুতে সূচনা বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাংবাদিক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এবং সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির তনু।
কর্মসূচিতে আরো বক্তব্য রাখেন, নাগরিক মঞ্চের সদস্য সচিব প্রবীর চক্রবর্তী, কুশলাশীষ চক্রবর্তী, মোহাম্মদ আলী প্রামাণিক, মানবাধিকার কর্মী শহিদুল ইসলাম, মনির সুইট, আদিবাসী নেতা বৃটিশ সরেন, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফজাল সিরাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমাইন মাহতাব, রুয়েট শিক্ষার্থী পার্থ সারথি, মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থী সন্ধান বর্মন প্রমুখ।
আরো পড়ুন:
গোপালগঞ্জে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ১২ জনের হেলথ কার্ড প্রদান
ওসমানী মেডিকেল
সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া নিয়ে ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ হামলা, আহত ৩
বক্তারা বলেন, গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতাল নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে। রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসা দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া হচ্ছে। নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালের ভিতর ও বাইরে দুর্গন্ধ। বারবার অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠলেও আজও প্রতিকার মেলেনি।
বক্তারা আরো বলেন, গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল ২৫০ শয্যার অনুমোদন পেয়েছে, কিন্তু ২৫০ শয্যার জনবল অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বর্তমানে মাত্র ১০০ শয্যার জনবল দিয়ে হাসপাতালটি চলছে। এতে অনেক পদ শূন্য রয়েছে। ফলে সেবাপ্রত্যাশী জনগণ কাঙ্খিত চিকিৎসক না পেয়ে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাসপাতালে বেড না পেয়ে রোগীদের মেঝেতে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। শয্যা সংকট নিরসনের জন্য নতুন বহুতল ভবন দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। এছাড়া হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য আইসিইউ ইউনিট চালু করতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, বরাদ্দকৃত ঔষধ রোগীদের না দিয়ে বাইরে বিক্রি করে ওষুধ সংকট দেখানো হয়। রোগীদের প্রায়শই বাইরে থেকে ওষুধ কিনে এনে চিকিৎসা নিতে হয়। চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান কম; ইসিজি, এক্সরে মেশিন অকার্যকর। ভর্তিরত রোগীদের নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুর্ভোগের যেন শেষ নেই এই হাসপাতালে।
বক্তারা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে সকল দুর্নীতি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া; পর্যাপ্ত ঔষধ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে সুষ্ঠু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এক মাসের মাঝে দাবি পূরণ করা না হলে আগামী ৩ মে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা করা হবে বলে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নেতারা জানান।
ঢাকা/মাসুম/বকুল