Samakal:
2025-03-30@13:39:21 GMT

ঈদ আনন্দের কুশীলব

Published: 27th, March 2025 GMT

ঈদ আনন্দের কুশীলব

বছর ঘুরে আবারও আসছে রোজার ঈদ। দর্শককে উৎসবের আমেজে রাঙাতে টিভি চ্যানেল ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো নানা ধরনের আয়োজন করছে। সেখানে তারকারা নিজের সেরা অভিনয় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা পূরণে নিরলস কাজ করে গেছেন। এ ঈদে তরুণ অভিনেত্রীদের কাজের দিকে নজর থাকবে দর্শকের।

সাবিলা নূর
মাসরিকুল আলমের রচনা ও পরিচালনায় ‘ভুল সবই ভুল’ নাটকে জিয়াউল ফারুক অপূর্বর বিপরীতে, রাগিব রায়হান পিয়ালের ‘মাকড়সা’ নাটকে শ্যামল মাওলার বিপরীতে অভিনয় করেছেন তারকা অভিনেত্রী সাবিলা নূর। ঈদের নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে এবার কম নাটকে অভিনয় করেছি। এ আয়োজনে কত বেশি নাটকে কাজ করেছি, সেটি আমার কাছে মুখ্য নয়, কয়টি ভালো নাটক প্রচার হলো, সেটিই বড় বিষয়। চেষ্টা করেছি নতুন চরিত্র নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হতে। গৎবাঁধা চরিত্র নয়, নতুন কিছু চরিত্রে আমাকে দর্শক দেখতে পাবেন।’  

তানজিম সাইয়ারা তটিনী 
রুবেল হাসান পরিচাললিত ‘আবির ছোঁয়া’ টেলিছবিতে ইয়াশ রোহানের বিপরীতে, ইমরোজ শাওনের পরিচালনায় ‘ব্রেকিং নিউজ’ নাটকে তৌসিফ মাহবুবের বিপরীতে, রাফাত মজুমদার রিংকুর পরিচালনায় ‘দাঁড়ালে দুয়ারে’ নাটকে ইয়াশ রোহানের বিপরীতে, মহিদুল মহিমের পরিচালনায় ‘হৃদয়ের এক কোনে’ নাটকে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, রাফাত মজুমদার রিংকুর পরিচালনায়  ‘কী মায়ায় জড়ালে’ নাটকে ইয়াশ রোহানের বিপরীতে, মহিদুল মহিমের ‘ফিরে দেখা’ নাটকে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, হাসিব হোসাইন রাখির রচনা ও পরিচালনায় ‘মনদিওয়ানা’ টেলিছবিতে তৌসিফ মাহবুবের বিপরীতে, রুবেল হাসানের পরিচালনায় ‘বউয়ের বিয়ে’ টেলিছবিতে ইয়াশ রোহানের বিপরীতে, সৈয়দ শাকিলের পরিচালানয় ‘শহরের যত রঙ’ নাটকে খায়রুল বাসারের বিপরীতে, মুহম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘তোমাদের গল্প’ টেলিছবিতে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, রাকেশ বসুর পরিচালনায় ‘লাস্ট নাইট’ নাটকে জিয়াউল ফারুক অপূর্বর বিপরীতে অভিনয় করেছেন তটিনী। কাজগুলো নিয়ে আশাবাদী এই অভিনেত্রী।  

নাজনীন নীহা
জাকারিয়া সৌখিন পরিচালিত ‘মেঘ বালিকা’ টেলিছবিতে জিয়াউল ফারুক অপূর্বর বিপরীতে, শিহাব শাহীনের পরিচালনায় ‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ’ টেলিছবিতে তৌসিফ মাহবুবের বিপরীতে দেখা যাবে নাজনীন নীহাকে। এই অভিনেত্রী বলেন, দর্শকের কথা মাথায় রেখেই ঈদের নাটক-টেলিছবিতে অভিনয় করছি। ভালো গল্পের বেশ কিছু কাজ করেছি। আশা করছি দর্শক প্রশংসা পাবে কাজগুলো।     

কেয়া পায়েল
রাফাত মজুমদার রিংকুর পরিচালনায় ‘ইতির ঈদি’ নাটকে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, মিফতা আনানের ‘মেড ফর ইচ আদার’ নাটকে তৌসিফ মাহবুবের বিপরীতে, মীর আরমান হোসেনের ‘জালিয়াত’ নাটকে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, সুমন ধরের পরিচালনায় ‘বজরা’ নাটকে তৌসিফ মাহবুবের বিপরীতে, তৌফিকুল ইমনের রচনা ও পরিচালনায় ‘বাজি’ নাটকে মুশফিক আর ফারহানের বিপরীতে, ‘যাকে তুমি ভালোবাসো’ নাটকে মুশফিক আর ফারহানের বিপরীতে, প্রবীর রায় চৌধুরীর ‘বান্টির বিয়ে’ টেলিছবিতে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, মিশুক মিঠুর পরিচালনায় ‘ইমারজেন্সি’ নাটকে খায়রুল বাসারের বিপরীতে, মুরসালীন শুভর ‘আপনি না তুমি’ নাটকে খায়রুল বাসারের বিপরীতে, মেহেদী হাসান হৃদয়ের ‘উভয় সংকট’ নাটকে মুশফিক আর ফারহানের বিপরীতে রয়েছেন কেয়া পায়েল।
তিনি বলেন, ‘দর্শক ঈদে নানা ধরনের গল্পের নাটক দেখতে চান। তাদের কথা মাথায় রেখেই ভিন্নধর্মী কিছু গল্পে অভিনয় করেছি। চরিত্রে বেশ নতুনত্ব রয়েছে; যা দর্শকের ভালো লাগবে।’

সামিরা খান মাহি
তারেক রেজা সরকারের পরিচালনায় ‘আপন মানুষ’ নাটকে আরশ খানের বিপরীতে, আবু হায়াত মাহমুদের পরিচালনায় ‘রহিম রূপবান’ নাটকে আবু হুরায়রা তানভীরের বিপরীতে, সকাল আহমেদের পরিচালনায় আরশ খানের বিপরীতে ‘ভেতরে আসতে দাও’, সাইফুল আজিজের পরিচালনায় ‘তবুও পাশাপাশি’ নাটকে ইয়াশ রোহানের বিপরীতে, চয়নিকা চৌধুরীর ‘কাজল ভোমরা’ টেলিছবিতে জোনায়েদ বোগদাদীর বিপরীতে, সেতু আরিফের রচনা ও পরিচালনায় ‘তোমার সঙ্গে থাকতে চাই’ নাটকে আরশ খানের বিপরীতে, রাফাত মজুমদার রিংকুর পরিচালনায় ‘হতাহতের ঘটনা’ টেলিছবিতে খায়রুল বাসারের বিপরীতে, এল আর সোহেলের পরিচালনায় ‘ইন্দ্রজাল’ নাটকে খায়রুল বাসারের বিপরীতে, অলোক হাসানের পরিচালনায় ‘অভ্যাস’ নাটকে পার্থ শেখের বিপরীতে থাকছেন সামিরা খান মাহি। 

আইশা খান
সকাল আহমেদের পরিচালনায় ‘ভালোবাসার নাম মিসিসিপি’ নাটকে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, মুরসালিন শুভর পরিচালনায় ‘আমি যা দেখি’ নাটকে ফারহান আহমেদ জোভানের বিপরীতে, ইশতিয়াক আহমেদের পরিচালনায় ‘মায়াফুল’ নাটকে ইয়াশ রোহানের বিপরীতে, তৌফিকুল ইসলামের পরিচালনায় ‘নিয়ামত’ নাটকে মুশফিক আর ফারহানের বিপরীতে রয়েছেন আইশা খান। 

নিলয়-হিমি জুটির নাটক-টেলিছবি
এ সময়ের ব্যস্ত জুটি নিলয় আলমগীর ও জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। এবারও ঈদে সর্বাধিক নাটকে জুটি হয়েছেন তারা। এস আর মজুমদারে নাটক ‘ব্রেকআপ’, আদিবাসী মিজানের পরিচালনায় নাটক ‘ডাকু’, মুসাফির রনির পরিচালনায় নাটক ‘নসিব’, মাহমুদ হাসান রানার পরিচালনায় ‘প্রাণের মানুষ’, এস আর মজুমদারের পরিচালনায় নাটক ‘মুসাফিরখানা’, মুসাফির রনির পরিচালনায় ‘রেডিমেড ঝামেলা’ নাটক ও মাহিন খান পরিচালিত টেলিছবি ‘একান্নবর্তী’সহ আরও অনেক নাটক-টেলিছবিতে অভিনয় করেছেন এই জুটি। দু’জনের নাটকের সংখ্যা ২০ ছাড়াতে পারে। এমনটিই জানিয়েছেন নিলয়। এবার হিমি ছাড়াও অন্য অভিনেত্রীর সঙ্গে বেশ কিছু কাজ করেছেন নিলয়। শামীম জামানের পরিচালনায় তাসনুভা তিশার বিপরীতে ‘ডাবল রোল’ নাটকে তাঁকে দেখা যাবে দ্বৈত চরিত্রে।

তারকা শিল্পীদের উপস্থিতি
সারা বছর ছোটপর্দায় উপস্থিতি না থাকলেও কোনো উৎসব আয়োজনে জ্যেষ্ঠ তারকাশিল্পীদের ঈদের কাজে দেখা যায়। প্রতি ঈদে অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেন নিজের পরিচালনায় ‘ছোটকাকু’ সিরিজ নিয়ে হাজির হন। এই ঈদে তিনি এটি পরিচালনা করছেন না। নাট্যনির্মাতা অনিমেষ আইচের পরিচালনায় অভিনয় করেছেন এই নন্দিত অভিনেতা। এবারের সিরিজের নাম ‘মিশন মুন্সীগঞ্জ’। পাশাপাশি তিনি অভিনয় করেছেন ‘কোনো একদিন’ নাটকে। ফারিয়া হোসেনের রচনায় নাটকটি নির্মাণ করেছেন চয়নিকা চৌধুরী। এতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন সাদিয়া ইসলাম মৌ। এই জুটি হাজির হবেন দম্পতির চরিত্রে। একই জুটিকে নিয়ে আরিফ খান নির্মাণ করেছেন টেলিছবি ‘ঘোর’। 

শাহেদ শরীফ ও তানজিকা আমিনকে নিয়ে অভিনেতা ও নির্মাতা আবুল হায়াত বানিয়েছেন নাটক ‘সামনে সমুদ্র’। সম্প্রতি এর দৃশ্যধারণ শেষ করেছেন। এতে অভিনয়েও তাঁকে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ফেরদৌস হাসানের ‘পানি’ নাটকেও অভিনয় করেছেন আবুল হায়াত। 
চ্যানেল আইয়ে এটি প্রচার হবে। অভিনেতা মোশাররফ করিম অভিনয় করেছেন ‘খুচরা পাপী’, ‘স্বামীর সুখ মনে মনে’, ‘বউ হইতে সাবধান’, ‘টোনাটুনির সংসার’, ‘বউ বেশি বোঝে’সহ ডজনখানেক নাটকে। চঞ্চল চৌধুরী অভিনয় করেছেন অনিমেষ আইচের পরিচালনায় ‘মিশন মুন্সীগঞ্জ’ নাটকে। সকাল আহমেদের পরিচালিত সাত পর্বের নাটক ‘মধুমালা’ নাটকে ব্যতিক্রমী চরিত্রে হাজির হবেন তিনি। 

ঈদের নাটকে অন্যরা .

..
তানজিন তিশা, মীর সাব্বির, সজল নূর, তানজিকা আমিন, ফারিন খান, সুনেরাহ বিনতে কামাল, মীর রাব্বী, নীলাঞ্জনা নীলা, সৈয়দ জামান শাওন, ইরফান সাজ্জাদ, জিয়াউল হক পলাশ, পাভেল, মারজুক রাসেল, জাহের আলভী, শাশ্বত দত্ত, সাফা কবির, পারসা ইভানা, নাদিয়া আহমেদ, সালহা খানম নাদিয়া, অহনা, মৌসুমী হামিদ, নাজিয়া হক অর্ষা, অহনা, স্পর্শিয়া, তানিয়া বৃষ্টি, রুকাইয়া জাহান চমক, সাদিয়া আয়মানের মতো অভিনয়শিল্পীদের থাকবে সরব উপস্থিতি। এদের মধ্যে কোনো কোনো অভিনয়শিল্পীকে ডজনের বেশি নাটকে দেখা যাবে। 
ওটিটিসহ নানা মাধ্যমের কাজে ব্যস্ততা বাড়ায় ঈদে আফরান নিশো, জাহিদ হাসান, রুনা খান, জাকিয়া বারী মম, মেহজাবীন চৌধুরী, তাসনিয়া ফারিণের মতো তারকার উপস্থিতি টিভি পর্দায় কম থাকবে।  কেউ কেউ আবার নতুন নাটকে কাজ না করলেও অনেকেরই পুরোনো কিছু কাজ প্রচার হবে বলে জানা গেছে।
 

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ন টক আহম দ র পর চ ল পর চ ল ত উপস থ ত য় ন টক র ন টক জ য় উল ক জ কর র রচন

এছাড়াও পড়ুন:

রোজা আর ঈদ: চেতনায়, স্মৃতিতে, ভালোবাসায়

বহুদিন আগের কথা। আমি তখন আমেরিকার অরেগন রাজ্যে বাস করি। সদ্য ফেলে আসা বাংলাদেশের স্মৃতি হৃদয়ে তখন বারবার জেগে ওঠে। এমন প্রবাস কষ্টের সময়ে এসেছিল চিঠিটি। প্রসঙ্গ রমজান ও ঈদ। লেখিকার অনুরোধ আমি যেন আসন্ন ঈদুল ফিতর নিয়ে একটা কবিতা লিখে পাঠাই। সত্তরের দশকের শেষে দেশ ছাড়ার আগে বিভিন্ন সাহিত্যের আসরে ছিল আমার পদচারণা, তার কারণে হয়তো এ অনুরোধ। আমাদের ব্যবহারিক জীবন চলত আধুনিক গ্রেগরিয়ান মাস– গ্রিক রোমান দেবদেবীর নামাঙ্কিত জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ইত্যাকার নামকে ঘিরে। আর ঈদ-রমজান আবর্তিত হতো চাঁদকে ঘিরে। চাঁদের আবির্ভাব, বৃদ্ধি, পূর্ণিমায় পরিণত হওয়া ও ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাওয়া। 

এমন নিশাচরী প্রাকৃতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে আমাদের ধর্মীয় ও উৎসবের দিন ও রাতগুলো। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি, ধর্মের বাইরে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক/সাহিত্যিক বলয়ে আমরা মুসলমানরা ঈদ ও রমজানকে বর্ণনা ও গ্রহণ করতে পারিনি। যেভাবে হিন্দু ধর্ম ঋতু ও প্রকৃতিকে ঘিরে পূজাকেন্দ্রিক সাহিত্যের সম্ভার রচনা করেছে, বাঙালি মুসলমান তার যাপিত জীবনের আচারসর্বস্ব ধর্মকে শিল্পের মোড়কে গ্রহণ করেনি। 

শত শত বছর পূর্ববঙ্গ ও সিলেটের মুসলমানদের যাপিত জীবন আবর্তিত হয়েছে হিজরি পঞ্জিকাকে ঘিরে। সে পঞ্জিকা ঘিরে আমরা পালন করেছি আশুরা, মহররম, শবেবরাত, ঈদ, রমজান প্রভৃতি অনুষ্ঠান। বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান প্রাকৃতিক উৎসব যেমন– চৈত্রসংক্রান্তি, বসন্ত উৎসব, নববর্ষ ইত্যাদি এসেছে বাংলা মাসগুলোকে কেন্দ্র করে। আশ্বিন, ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ প্রভৃতি মাস হয়েছে আমাদের সংস্কৃতি পরিচায়ক বাঙালিত্বের নিশানদার এবং তাদের কেন্দ্র করেই আমরা তৈরি করেছি আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের রোজনামচা। রবীন্দ্রনাথ শরতের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে লিখেছেন– ‘এসো গো শারদ লক্ষ্মী তোমার শুভ্র মেঘের রথে’– এই যে ধর্ম ও প্রকৃতিচিন্তাকে মিলিয়ে তৈরি করা এক গভীর সাংস্কৃতিক দ্যোতনা, এটা আমরা মুসলমানেরা রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে করতে পারিনি। এই মিলন ঘটানোর সময় ফুরিয়ে যায়নি।  

আমাদের চান্দ্রিক মাসগুলোর নাম আরবি। ১৩০০ বছর পরেও আমরা এ নামগুলো আত্মস্থ করতে পারিনি। আমি আমার সেই গুণমুগ্ধ পত্রলেখিকার প্রসঙ্গে ফিরে যাই। তাঁর তাগাদায় একটা ঈদকেন্দ্রিক গভীর কবিতা লিখতে সেদিন ব্রতী হয়েছিলাম। মনের গভীরে সন্ধান করছিলাম এমন এক ঈদের চিত্রকল্প, যা উৎসারিত আমাদের নদীবিধৌত গ্রামীণ আবহাওয়া থেকে। ‘চাঁদের কসম খাওয়া রাত’ কিংবা ‘সেমাই গন্ধে ভরা ভোর’ এমন চিত্রকল্প মনে এসেছিল। অঘ্রানের ধান কাটা মাঠকে নিমেষে ঈদের ময়দানে পরিণত করে ভূস্বামী আশরাফ ও কৃষক আতরাফেরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেছে প্রার্থনায়। অতএব প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক নতুন সাম্যবাদ, ঈদকে নিয়ে এমন এক প্রগতিশীল চিন্তায় শিহরিত হয়েছিলাম।

আমার দীনিয়াতের শিক্ষক ছোটবেলা হাদিস শিখিয়েছিলেন– ‘আস্ সিয়ামু, যুন্নাতুন’। রোজা হচ্ছে চাল কিংবা বর্মস্বরূপ। কেন বর্ম? কিসের বিরুদ্ধে বর্ম? যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রচুর খাওয়াদাওয়াকে মনে করেছে ভোগ এবং অনশনকে মনে করেছে উপাসনা। খ্রিষ্টধর্মে ইস্টারের সময়ে রয়েছে লেন্টের অনশন, যা এক সময় ছিল চল্লিশ দিনের। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মেও আছে ধর্মের খাতিরে অন্ন পরিহারের নিয়ম। ইসলাম এই মানবিক প্রেরণাকে জোরালো স্বীকৃতি দিয়ে একটা পুরা চান্দ্রমাসকে এ আচারের অনুগত করে এক তাৎপর্যময় সামাজিক, মানবিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে। শৈশবে এক গ্রামীণ পরিবেশে, যেখানে খেতে পাওয়া ও না-পাওয়ার নাগরদোলায় আবিষ্ট থাকত মানুষ, সেই পরিবেশে আমি রোজা রাখার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তারপর দীর্ঘদিন চলে গেছে, বহু মহাদেশে, অনেক জীবন ছেনে আবার থিতু হয়েছি শৈশবের সেই গ্রামে। এ বছর কাটিয়েছি রমজানের অনেকগুলো দিন। সিলেটি ভাষায় আমরা সাহ্‌রিকে বলি ‘ফতা খাওয়া’, ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে গভীর রাতে ফতা খাওয়ার জন্য সে যুগে সবাইকে ডাকা হতো। 

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলার মানুষ শহরমুখী হলো, রমজান ও ঈদের জন্য কিন্তু গ্রামমুখী হতে ভুলল না। শুধু তৈরি করল রমজান ও ঈদকে ঘিরে নাগরিক উৎসব, যার প্রবল পরাকাষ্ঠা এবার দেখেছি ঢাকায় ও আমাদের জেলা শহরগুলোতেও। ভাজা, ছোলা, ডালের পেঁয়াজু, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন, জিলিপি, শরবত ইফতারকে কেন্দ্র করে। গেল বছর রোজার ঠিক আগে আমি সময় কাটিয়েছিলাম মিসর ও জর্ডানে। শুনেছিলাম কায়রোর রমজান ও ঈদ উৎসবের কথা।
এবার ঢাকা ও বাংলাদেশ ঘুরে মনে হলো, আমাদের রমজান ও ঈদ উৎসব পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ। আমরা এই বিশাল ধর্ম-নিঃসৃত সাংস্কৃতিক যজ্ঞকে চিরকালীন সাহিত্যে পরিণত করব; যা আমাদের বিশ্বাস ও জীবনের যাপিত সময়ে, তা চলে আসুক আমাদের গল্পে, গানে, কবিতায়। যে নৈতিক ঢাল ও সংযম রোজার অবদান, তা ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের জীবনে। প্রতিদিনের ইফতারের আনন্দ আর মাস পেরিয়ে ঈদের আসন্ন আনন্দ যেন হয়ে ওঠে এক শোষণমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ গড়ার অঙ্গীকার।

ঈদ আসন্ন। ঘটনাক্রমে আমি আবার বিদেশে। কিন্তু আমি একটা চক্রাকার সময়গোলকে দেখতে পাচ্ছি আমার শৈশব, আমার গ্রাম। আজীবন রেমিট্যান্সযোদ্ধা আমি দেখতে পাচ্ছি আমার সমস্ত জীবনকে। এ জীবনে রূপকল্প রমজান এবং ঈদ। এ জীবন ক্ষুধা পেরিয়ে আনন্দের, এ জীবন ত্যাগ ও তিতিক্ষা পেরিয়ে পরিপূর্ণতার। ঈদ ধন্য হোক। ঈদ মোবারক।
গ্রামীণ চাঁদ নিঃসৃত রূপকল্প ছাপিয়ে ঈদ হয়ে উঠেছে নগরের। চাঁদরাতের হুল্লোড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে আমাদের নারীরা। সালোয়ার-কামিজ ও রুপালি-সোনালি কারুকাজে নতুন স্বপ্ন বস্ত্রশিল্পের। এ আয়োজনে আছে নিত্যনতুন শিল্পের ইঙ্গিত। নীল নদ, দজলা ফোরাত কিংবা বুড়িগঙ্গার পারে ঈদকে কেন্দ্র করে রচিত হচ্ছে নতুন ফ্যাশন। নগরের ঈদ। প্রবাসের ঈদ ধ্বনিত হচ্ছে জমকালোভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই পণ্যবাদী বাণিজ্যিক ঈদকে মেলাতে হবে সমাজ নির্মাণের  চেতনার সঙ্গে। প্রেরণামূলক কবিতা ও সংগীতের সঙ্গে। বহুকাল আগে নজরুল লিখেছিলেন– ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’। কৈশোর যৌবনের সন্ধিক্ষণে আমি লিখেছিলাম–
‘চাঁদের কসম খাওয়া রাত পেরিয়ে অন্তহীন সোনালী ভোরের’ কথা। আগামীর তরুণ-তরুণীরা গ্রহণ করুন ঈদকে আরও ব্যাপক মহিমায়। আবারও ঈদ মোবারক।

আবেদ চৌধুরী: জিন বিজ্ঞানী 

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদ
  • প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও চাঁদরাতে বাংলাভিশনের ‘উৎসবে আনন্দে’
  • কোন ভাষার মানুষ কীভাবে ‘ঈদের শুভেচ্ছা’ জানান
  • দক্ষিণ চট্টগ্রামের শতাধিক গ্রামে ঈদ উদযাপন
  • পটুয়াখালীতে ২২ গ্রামের ২৫ হাজার মানুষের ঈদ উদযাপন
  • ঈদ কেন পালন করা হয়
  • সবার জন্য নিয়ে আসুক সুখ ও সমৃদ্ধি
  • যেভাবে ঈদ উৎসব উদ্‌যাপন শুরু হয়েছিল
  • সর্বজনীন আনন্দের উৎসব
  • রোজা আর ঈদ: চেতনায়, স্মৃতিতে, ভালোবাসায়