কাজে আসছে না ২৪১ কোটি টাকার অক্সিজেন প্লান্ট
Published: 24th, January 2025 GMT
দেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে প্রাণঘাতী এ রোগের বিস্তার। হাসপাতালে ভিড় বাড়ে রোগীর। করোনার প্রধান উপসর্গগুলোর একটি শ্বাসকষ্ট। তাই অক্সিজেনের চাহিদা দেখা দেয় প্রচুর। সংক্রমণ বাড়ার এক পর্যায়ে অক্সিজেনের ঘাটতি তীব্র হয়। সিলিন্ডার কিনতে বিভিন্ন স্থানে ছুটতে থাকেন রোগীর স্বজন। অন্যদিকে, ভারত থেকে অক্সিজেন আসা বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়ে সরকার। বাধ্য হয়ে সরকারিভাবে ৯৯টি কেন্দ্রীয় অক্সিজেন প্লান্ট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে খরচ পড়ে ২৪১ কোটি টাকা। করোনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে অধিকাংশ প্লান্ট পড়ে আছে। ব্যবহার না করায় অনেক যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। কিছু জায়গায় স্থাপনের পর প্লান্ট চালুই হয়নি। এদিকে, অক্সিজেন সংকটে এখনও দেশে ১০০ জনে ২০ জন মারা যাচ্ছে।
খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা চলে গেলেও অন্যান্য রোগের প্রকোপ আছে। তাই অক্সিজেনের চাহিদা কমেনি। করোনা মহামারির মধ্যে ২০২১ সালের মাঝামাঝি দৈনিক অক্সিজেনের চাহিদা ছিল ৪০০ টন। এখন এটি কমে ১৪০ থেকে ১৫০ টনে নেমেছে। বিভিন্ন কোম্পানি থেকে অক্সিজেন কিনে চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তবে সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারি টাকায় বসানো অক্সিজেন প্লান্টগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ বলছে, অব্যবহৃত অক্সিজেন প্লান্ট সচলে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে অক্সিজেন রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত সরকার। করোনা মহামারি তখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বাধ্য হয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অক্সিজেন উৎপাদনের উদ্যোগ নেয় সরকার। পর্যায়ক্রমে ৯৯টি হাসপাতালে অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপনে কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে বসানো হয়েছে ৪০টি। এতে ৯২ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে কভিড-১৯ সংক্রান্ত সহায়তা তহবিল থেকে ৫১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৯টি এবং জাতিসংঘের অর্থায়নে ৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকা দিয়ে ৩০টি অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, একটি অক্সিজেন প্লান্ট প্রতি মিনিটে ৫০০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন উৎপাদন করা। পরে এই অক্সিজেন দিয়ে কমপক্ষে ৫০ রোগীকে মিনিটে ১০ লিটার নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ করা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনও আটটি প্লান্টের কাজ শেষ হয়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অক্সিজেন প্লান্টটি করোনার মধ্যে কিছুদিন ব্যবহার হলেও প্রায় দুই বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, আগের মতো অক্সিজেনের চাহিদা না থাকায় এটি ব্যবহার করা হচ্ছে না।
হাসপাতালটির উপপরিচালক ডা.
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে স্থাপিত অক্সিজেন প্লান্টটি এক দিনও ব্যবহার হয়নি। গত সোমবার বিএসএমএমইউতে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ব্লকের পাশে একটি কক্ষে অক্সিজেন প্লান্টের সব যন্ত্রপাতি আছে। কক্ষটি তালাবদ্ধ। প্লান্ট দেখভাল করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানেসথেশিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগ। এই বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘হাসপাতালে অক্সিজেনের চাহিদা অনেক। তবে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এখনও প্লান্টটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করেনি। তাই এটি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।’
একই অবস্থা ঢাকার বাইরেও
চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অক্সিজেন প্লান্ট বসানো হয় ২০২২ সালে। এখনও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এটি। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল গ্রিন অক্সিজেন লিমিটেডের। বর্তমানে কোম্পানিটি বন্ধ থাকায় অক্সিজেন প্লান্ট নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের প্লান্টও ব্যবহার হচ্ছে না।
এদিকে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্টের কপার লাইন চুরি হয়ে গেছে। প্লান্টটি হাসপাতালের চারতলায় বসানো হয়। ওই তলা ব্যবহার না হওয়ায়
তিন থেকে চারবার চুরির ঘটনা ঘটে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, স্থাপনের সময় আমি এখানে ছিলাম না। নতুন দায়িত্ব পেয়েছি, তাই আমার কাছে এ বিষয়ে তথ্য নেই।
খুলনার কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অক্সিজেন প্লান্ট দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে বসেছে। শ্বাসকষ্টের রোগী না আসায় প্লান্ট ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় প্লান্টের অক্সিজেন সংযোগ লাইনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালে শ্বাসকষ্টের রোগী কম।
একই অবস্থা রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অক্সিজেন প্লান্টের। স্থাপনের পর এটি একবারও চালু হয়নি। ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্লান্টটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। এই হাসপাতালে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কাজল বিশ্বাস বলেন, অক্সিজেন প্লান্ট ব্যবহারে ওপর থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্লান্টে প্রায় ছয় মাস লিকেজ। ফলে অকেজো বা কাজে আসছে না এটি। সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে (সদর হাসপাতাল) প্লান্ট চালু রয়েছে। তবে প্লান্ট নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিজ্ঞানী আহমদ এহসানূর রহমান। তিনি অক্সিজেনের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন।
এহসানূর রহমান বলেন, এখনও অক্সিজেন সংকটে ১০০ জনে ২০ জনের মৃত্যু হয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কেন এসব প্লান্ট ব্যবহার করতে পাচ্ছি না। উত্তর– সমন্বয়হীনতা, পৃথক পৃথক প্রযুক্তি দিয়ে প্লান্ট তৈরি। এ ছাড়া প্লান্ট পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলের অভাব। এসব প্লান্ট সচল করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতে যেসব কর্মী রয়েছেন, তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্লান্টগুলো সচল করা। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হচ্ছে, প্লান্টের মাধ্যমে অক্সিজেন উৎপাদন করে অন্য হাসপাতালে সরবরাহ করা। এতে সরকার বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে যে অক্সিজেন কিনছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হচ্ছে, গোটা সিস্টেম একভাবে সাজানো এবং যথাযথ তদারকি করা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, অক্সিজেন প্লান্টগুলো কেন ব্যবহার হচ্ছে না, তা জানা নেই। খোঁজ না নিয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না। যদি কারও গাফিলতির কারণে এসব বন্ধ থাকে, তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি)
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: স ব স থ য কমপ ল ক স শ ব সকষ ট ন ব যবহ র সরক র অবস থ উপজ ল
এছাড়াও পড়ুন:
মিয়ানমারে মৃত বেড়ে ২০৫৬, ধ্বংসস্তূপ থেকে চারজনকে জীবিত উদ্ধার
মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ২০০০ পেরিয়ে গেছে। সোমবার দেশটির সামরিক সরকার জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পে আহত হয়েছে আরও ৩ হাজার ৯০০। এখনও নিখোঁজ ২৭০ জন। দেশটিতে ভূমিকম্পের প্রায় ৬০ ঘণ্টার পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার সাগাইং অঞ্চলে ধসে পড়া একটি স্কুল ভবন থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে দেশটির ফায়ার সার্ভিস। এই বিপর্যয়ের পর দেশটিতে এক সপ্তাহের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। খবর- বিবিসি
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন তুনজানান, মান্দালয় অঞ্চলে ২৭০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেখানে ভূমিকম্পে মসজিদ, সেতু এবং বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে নিহত ও আহতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিকল হওয়ায় অনেক অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যাচ্ছে না।
গত শুক্রবার মিয়ানমারে শক্তিশালী ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে দেশটির সরকারকে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে উদ্ধারকারীরা যখন জীবিতদের সন্ধান করছেন তখন জাতিসংঘ জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে, যা ত্রাণ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।
সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের ঘটনায় মিয়ানমারের রাস্তাঘাটে লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের তহবিল সহায়তা চেয়ে আবেদন জানিয়েছে জাতিসংঘ।
ভূমিকম্পে রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর সঙ্গে সামরিক সরকার, বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সশস্ত্র যোদ্ধাদের মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধের ফলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে কাজ করা সাহায্য সংস্থাগুলোর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিরোধী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট জোর দিয়ে বলছে, যেকোনো সহায়তা যেন স্বাধীনভাবে ও স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। মিয়ানমারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মান্দালয়ের ঐতিহাসিক অনেক ভবন এই ভূমিকম্পে মাটিতে মিশে গেছে। উদ্ধারকর্মীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তুূপ ঘেঁটে দেখছেন।
২০২১ সাল থেকে মিয়ানমার শাসন করা সামরিক জান্তা দেশটির সাগাইং, মান্দালয়, মাগওয়ে, বাগো, ইস্টার শান রাজ্য এবং নেপিডো অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দেশটির দুই বড় শহর, মান্দালয় ও ইয়াংগুনের বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।