শোলাকিয়া ঈদগাহে নামাজ পড়তে এক দিন আগেই চলে আসেন অনেকে
মো. সুরুজ আলীর বয়স ৮৫ বছর। পাকিস্তান আমল থেকে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে আসেন তিনি। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা এলাকায়। প্রতিবারের মতো এবারও এক দিন আগেই তিনি শোলাকিয়ায় নামাজ পড়তে চলে এসেছেন। সুরুজ আলী জানান, বড় মাঠে বেশি সওয়াব ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় তিনি প্রায় ৬৫ বছর আগে থেকে শোলাকিয়ায় আসছেন। প্রতিবারই এক-দুই দিন আগেই তিনি কিশোরগঞ্জে এসে মাঠের আশপাশে থাকেন। এবার শোলাকিয়া বাগে জান্নাত গোরস্তান মসজিদে গতকাল রোববার থেকে অবস্থান নেন।
শুধু সুরুজ আলী নন, দেশের নানা প্রান্ত থেকে এ রকম কয়েক শ লোক শোলাকিয়ায় নামাজ পড়তে এক থেকে দুই দিন আগেই চলে আসেন। কেউ আবার দূর থেকে দুই-তিন দিন আগেও চলে আসেন। তেমনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে মফিজুর রহমান নামের আরেকজন গত শনিবার সকালেই কিশোরগঞ্জে চলে আসেন। তিনি জানান, তিনি পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক প্রবাসী। ২০-২৫ বছর থেকে তাঁর ইচ্ছা ছিল শোলাকিয়ার ঈদগাহে নামাজ পড়বেন। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় সময়–সুযোগ হয়ে ওঠে না। তাই এবার মোজাম্বিক থেকে নিয়ত করেই দেশের বাড়িতে আসেন এবং সেখান থেকে শোলাকিয়ায় চলে আসেন।
বাগেরহাট থেকে মো. ইব্রাহীম নামের একজন শিক্ষক তাঁর ভাই মোস্তফাকে নিয়ে গতকাল শোলাকিয়া বাগে জান্নাত মসজিদে এসে ওঠেন। ফজর আলী নামের আরেকজন নাটোর সদর থেকে এসেছেন। একসময় দূর থেকে আসা মুসল্লিরা সবাই শোলাকিয়া মাঠের মিম্বরেই অবস্থান করতেন। কিন্তু ২০১৬ সালে ঈদুল ফিতরের দিন শোলাকিয়া মাঠের অদূরে জঙ্গি হামলার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে এখন আর কাউকে মাঠের ভেতর থাকতে দেওয়া হয় না। যার কারণে প্রশাসন থেকে শোলাকিয়া বাগে জান্নাত গোরস্তান মসজিদ, পার্শ্ববর্তী আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়সহ কয়েকটি জায়গায় দূরের মুসল্লিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে শোলাকিয়া বাগে জান্নাত গোরস্তান মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রায় দুই থেকে তিন শ মুসল্লি মসজিদে অবস্থান করছেন। তাঁদের কেউ কেউ সারিবদ্ধভাবে ঘুমাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বসে আড্ডা দিচ্ছেন। সবারই ইচ্ছা ফজরের নামাজের পরই শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে গিয়ে প্রথম কাতারে স্থান করে নেবেন। এ সময় কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাব মিয়া, আক্কাস আলী, তাহের উদ্দিন, আবদুস সালামের সঙ্গে। তাঁদের সবারই বয়স ৭০ থেকে ৭৫ বছর। তাঁরা বলেন, ১০–১৫ বছর ধরে তাঁরা নিয়মিত শোলাকিয়ায় নামাজ পড়তে আসছেন। দূরের রাস্তা হওয়ায় প্রতিবারই এক-দুই দিন আগেই চলে আসেন। তেমনি নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুর থেকে ৭০ বছর বয়সী আবুল হোসেন, টাঙ্গাইলের নাগরপুর থেকে মো. রুবেল খানও আগের দিন রোববার চলে এসেছেন। তাঁরাও ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসেন শোলাকিয়া ঈদগাহে।
তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রম নেত্রকোনা তেলিগাতী থেকে আসা মো. হোসেন আলী (৬০) মো. আবদুল হান্নান (৬৫) ও মো. নূরুল ইসলাম (৫৫)। তাঁরা বলেন, ১৬-১৭ বছর থেকে তাঁদের ইচ্ছা ছিল শোলাকিয়ার বড় মাঠে একবার নামাজ পড়বেন। কিন্তু ২০০৮ সালের শেষের দিকে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে ঐতিহ্যবাহী এ মাঠের ইমামকে পরিবর্তন ও পরবর্তী সময় ২০১৬ সালে জঙ্গি হামলাসহ নানা কারণে অনিরাপদ মনে হতো এ মাঠকে। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের আসা হয়ে ওঠেনি। তবে এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতি আর আগের ইমামকে পুনর্বহাল করাসহ নানা কারণে মাঠকে নিরাপদ মনে করছেন তাঁরা। তাই নিয়ত করে তিনজন মিলে প্রথমবারের মতো শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে আগের দিনই চলে এসেছেন এবার। দীর্ঘদিনের মনের আশা পূরণ হওয়ায় একধরনের প্রশান্তি পাচ্ছেন বলে তাঁরা মন্তব্য করেন।
আজ সোমবার সকাল ১০টায় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় তিন লাখ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ময়দান পরিপূর্ণ হয়ে চারপাশের রাস্তা এবং আশপাশের মাঠ জনস্রোতে রূপ নেয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে নামাজ শেষে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে মোনাজাত করে যাঁর যাঁর বাড়ি ফেরেন মুসল্লিরা।