‘অশান্তির পাকিস্তানে’ এত আনন্দ কোত্থেকে আসে
এই দেশে অশান্তির হাজারটা কারণ আছে। তবু মানুষগুলোকে দেখে কেন যেন মনে হয় তারা খুব শান্তিতে আছে। জীবনে কোনো টেনশন নেই। আছে শুধু আনন্দ, ফুর্তি, খাওয়াদাওয়া। এত হাসি-আনন্দ কোথায় পায় ইসলামাবাদের মানুষ?
ক্রিকেটে মাঠে তো অবস্থা যাচ্ছেতাই। ঘরের মাঠের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি থেকে গ্রুপ পর্বেই বিদায়। তাতে এ দেশের মানুষের কোনো আক্ষেপ আছে বলে মনে হচ্ছে না। অনেকে তো বরং খুশি। যাক পাকিস্তান আর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নেই! এবার কাজেকর্মে মন দেওয়া যাবে।
সাইদ খান নামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় দুবাই থেকে ইসলামাবাদ আসার ফ্লাইটে। ব্রুনেইপ্রবাসী পাকিস্তানি ব্যবসায়ী, ব্যবসা ডালপালা মেলেছে জাপান, ফিলিপাইনেও। পাকিস্তানে তো আছেই। এখানে আসার পরও নিয়মিত আমাদের খোঁজখবর নিয়েছেন। মাঝে একদিন ডিনারের নিমন্ত্রণও দিলেন। রাতের আড্ডায় গর্ব করে বলছিলেন, ‘আমাদের হাজারটা সমস্যা থাকতে পারে; কিন্তু এ দেশে গৃহহীন মানুষ নেই। এখানে ফুটপাতে কাউকে শুয়ে থাকতে দেখবেন না। অথচ বড় বড় দেশেও আমি তা দেখেছি।’
কথাটা পুরোপুরি মানতে পারিনি। এর আগে পাকিস্তানের এসে করাচি লাহোরে ভবঘুরে দেখেছি। ইসলামাবাদের সব ছবি পাকিস্তানের অন্য শহরের সঙ্গে মেলে না। তবে এটা ঠিক পাকিস্তানের রাজধানী শহরের ক্ষেত্রে সাইদ খানের কথা পুরোপুরি সত্য। তারা রাজধানীকে অন্তত রাজধানীর মতোই রেখেছে।
এক সপ্তাহ হলো ইসলামাবাদে আছি। আসলেই দেখিনি কেউ রাস্তায় ঘুমায়, ফুটপাতে কোনো উদ্বাস্তু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পরিপাটি ছিমছাম সাজানো শহর। বিশাল সড়কে যানজট বলতে কিছু নেই। ট্রাফিক আইন অমান্য করছে না কেউ। যত্রতত্র পার্কিং নেই। লক্কড়ঝক্কড় বাস নেই। রাস্তার পাশে অবৈধ দোকানপাট নেই। ফালতু আড্ডা নেই। ঝগড়াঝাঁটি নেই। নোংরা আবর্জনা নেই। পরিকল্পিত শহর ইসলামাবাদে সম্ভবত অলিগলি বলেও কিছু নেই। এখানে সবই প্রশস্ত।
সেদিন হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, যদি এই সুন্দর রাস্তাগুলোতেই কিছু সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর ব্যাটারিচালিত রিকশা ছেড়ে দেওয়া যেত, তাহলে কেমন হতো? ভাবতেই গা শিউরে উঠল। থাক, যে কদিন আছি এসব এই শহরে না আসুক। মেট্রোরেল, এমআরটি বাস আর ছোট ছোট ট্যাক্সিতে শহরের মানুষ বেশ আছে। ছোট্ট সুজুকি মেহেরান গাড়িটাকে তো পাকিস্তানের জাতীয় বাহনই বলা হয়ে থাকে। হোন্ডা ৭০ সিসির মোটরসাইকেলও প্রতি ঘরেই একটা-দুইটা থাকার কথা।
যারা ইসলামাবাদে এসেছেন, তাঁদের জন্য এগুলো নতুন কোনো তথ্য নয়। যাঁরা আসেননি তাঁদের জন্য বলি, বিশ্বের অন্য যেকোনো বড় শহরের মতোই ইসলামাবাদ আধুনিক এবং বসবাস উপযোগী চমৎকার এক শহর। পাকিস্তান কোনো দিন পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারবে কি না জানি না। কখনো যদি পারে, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার আগে পর্যটকেরা নিশ্চিত ইসলামাবাদেও কয়েকটা দিন কাটাতে চাইবেন। অবশ্য ইসলামাবাদ শহরের আশপাশেও পর্যটকদের জন্য আকর্ষণের কমতি নেই।
সাখরপারিয়ান পাহাড়ে পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক পাকিস্তান মনুমেন্টে গিয়েই তা বোঝা গেছে। ওখানে যাওয়া অনেকটা রথ দেখা ও কলা বেচার মতো। আপনি পাকিস্তানের একটা জাতীয় স্থাপত্য দেখবেন, পাশাপাশি পাখির চোখে দেখবেন পুরো ইসলামাবাদ শহরটাকেও। পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো শহরটাতেই একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যায়। সেখান থেকে দৃশ্যমান হয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা ঐতিহ্যবাহী শাহ ফয়সাল মসজিদও।
পাকিস্তান মনুমেন্ট থেকে নেমে ফয়সাল মসজিদে গিয়ে দেখলাম মসজিদ বলে সেখানে ধর্মান্ধতা নেই। দর্শনার্থীদের জন্য দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনার দরজা অনেকটাই উন্মুক্ত। দর্শনার্থীদের ভিড় এতটাই বেশি যে মসজিদটি রীতিমতো অনেকের জীবিকার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের মতো গলায় ক্যামেরা ঝোলানো অনেক পেশাদার ফটোগ্রাফার পেয়ে যাবেন মসজিদ চত্বরে। অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্যের মসজিদটিকে প্রেক্ষাপটে রেখে ছবি তুলছে মানুষ। কাউন্টারে জুতা রেখে মূল মসজিদে ঢুকতে হয়। হাজার হাজার জোড়া জুতা রাখার ব্যবস্থা এবং সেটাও কারও জীবিকা।
শহর থেকে এক–দেড় ঘণ্টা দূরত্বে পাহাড়ি পর্যটন জেলা মারি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দুনিয়াজুড়েই যার সুনাম। পাহাড়ের ওপর বলে মারিতে ঠান্ডা একটু বেশি। ইসলামাবাদে রাতের বেলায় এখন ১২-১৩ ডিগ্রিতে নেমে আসছে তাপমাত্রা, এই শীতে মারিতে সেটি হওয়ার কথা ১০ ডিগ্রির নিচে। আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেখলাম হালকা পাতলা তুষারপাতেরও সম্ভাবনা আছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৭১৬ ফুট উঁচু পাহাড়ি শহরটিতে।
আপনি যদি ভোজনরসিক হন আর কখনো ইসলামাবাদে না এসে থাকেন, তাহলে বলতে হয় আপনি এখনো অনেক কিছুই খাননি। পাকিস্তান মনুমেন্টের কাছে সাখরপারিয়ান সড়কেই তাহির খান রেস্টুরেন্ট, যেটি এখানে টিকেআর নামে পরিচিত। টিকেআরের ল্যাম্ব দম ফুক না খেলে ভোজনরসিকদের ইসলামাবাদে আসাটাই বৃথা।
গভীর রাত পেরিয়ে যায়, তবু রেস্টুরেন্টের টেবিলগুলোতে খাবারের ম ম গন্ধে সুবাসিত আড্ডা থামে না। ছেলে–বুড়ো, তরুণ–তরুণী সবাই আছে। ইউটিউবের কল্যাণে টিকেআরের খ্যাতি এখন পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে গেছে। খেতে বসে এই রেস্টুরেন্টের বেয়ারাদের যদি ছবি তুলে দিতে বলেন, তাঁরা আগে আপনাকেসহ খাবার টেবিলের নাটকীয় এক ভিডিও বানাবেন। কয়েক সেকেন্ডের শুটিংয়ের ধরনধারণ দেখে বিধান্বিত হয়ে পড়তে পারেন, এ কি হোটেলের বেয়ারা নাকি টিকটকার!
এই অবস্থা ইসলামাবাদের প্রায় সব রেস্টুরেন্টেই। জিন্নাহ সুপার মার্কেটে কাবাব খেতে গিয়েও হয়েছে একই অভিজ্ঞতা। এক বেয়ারাকে বলা হলো, ‘ভাই, একটা ছবি তুলে দিন।’ তিনি ডেকে আনলেন আরেক বেয়ারাকে। এই তরুণ নাকি সত্যি সত্যি টিকটকার। ছবি, ভিডিওতে এক্সপার্ট। তাঁর অনেক ফলোয়ার, ভিউ। ভিডিওটা তরুণ বেয়ারা যে নাটকীয়তায় বানালেন, মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না। এই কদিনে একটা জিনিস বেশ বোঝা হয়ে গেছে। ইসলামাবাদের প্রায় সবাই একেকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
খাবারের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। শহর থেকে খুব দূরে নয় দামান–ই–কোহ মারগালা হিলস। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পাহাড়ে উঠতে হবে, তারপর পাহাড়েই মিলবে আলোঝলমলে দ্য ডোম রেস্টুরেন্ট। বেশ অভিজাত ও ব্যয়বহুল। ধনীদের আড্ডাস্থল। অনেক উঁচু থেকে ঝলমলে ইসলামাবাদ দেখার আরেকটি জায়গা। রাতের মনোহর আলোকিত ইসলামাবাদ দেখে খাবারের দাম অনেকটাই পুষিয়ে যায়।
এই শহরে প্রতিটি রেস্টুরেন্টের বাতি নেভাতেই গভীর রাত পেরিয়ে যায়। ইসলামাবাদের মানুষ দেরিতে খায়, দেরিতে ঘুমায় এবং ঘুম থেকে ওঠেও দেরিতে। বেলা ১১টা–১২টার আগে কোনো দোকান খোলা পাবেন না। বেলা ১টাও তাদের কাছে অনেক সময় ‘বাহাত জলদি’। চাকরিজীবীদের কথা আলাদা। আমাদের দেশের মতো এখানেও তাদের হুলস্থুল করে সকাল নয়টা–দশটার মধ্যে অফিসে ঢুকতে হয়, বের হতে হয় অফিস টাইম পেরিয়ে যাওয়ারও অনেক পরে।
২০০৪ সালে সাফ গেমস কাভার করতে প্রথম ইসলামাবাদে আসা। ২১ বছর পর আবার এই শহরে এসে অমিল বলতে পেলাম কিছু নতুন সুদৃশ্য অট্টালিকা, কিছু অভিজাত শপিং মল আর ভোজনরসিকদের নতুন নতুন ঠিকানা। নইলে ইসলামাবাদ আগের মতোই খোলামেলা সবুজ এবং পরিকল্পিত এক শহর। নতুন যা কিছু হয়েছে, তার কিছুই ইসলামাবাদের সৌন্দর্য নষ্ট করে হয়নি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কম বলে মনে হয়নি। সেঞ্চুরাসের মতো ব্যয়বহুল অভিজাত শপিং মলেও মানুষের ভিড় লেগে থাকে। হেন কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দোকান নেই, যেটা সেঞ্চুরাসে পাবেন না।
পাকিস্তান নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা আছে, আবার দেশটার ভালোও কম নেই। এখানকার মানুষ দারুণ সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতার। কোনো সাহায্য চাইলে তো পাবেনই, না চাইলেও পাবেন। অতিথি আপ্যায়নে কোনো কার্পণ্য নেই। অনেক সময় ‘বিদেশি মেহমান’ বলে ট্যাক্সিচালকও ভাড়া নিতে চান না। এই সৌজন্য দুনিয়ার কোন দেশে পাবেন? বিদেশি যাত্রীকে ইচ্ছা করে ভুল পথে নিয়ে বেশি ভাড়া নেবে না। ভুল করে ভুল পথে গেলেও বাড়াবে না ভাড়া। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক হওয়ার কথা। তবু ইসলামাবাদের মানুষদের নিয়ে এই কথাগুলো বিশেষভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ বাইরে থেকে পাকিস্তানিদের নিয়ে নেতিবাচক কথাই শোনা যায় বেশি। এখানে এলে তাই স্বাভাবিকটাকেও বিস্ময়কর লাগে।
ইতিহাস নিয়েও এখানকার সাধারণ মানুষদের অনেকের মনোভাব বাংলাদেশের মানুষের মতো। তাঁরা স্বীকার করেন, ১৯৭১–এ পাকিস্তান ভুল ছিল, ঠিক ছিল বাংলাদেশ।
ইতিহাস নিয়েও এখানকার সাধারণ মানুষদের অনেকের মনোভাব বাংলাদেশের মানুষের মতো। তাঁরা স্বীকার করেন, ১৯৭১–এ পাকিস্তান ভুল ছিল, ঠিক ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতি অন্যায় হয়েছে, এটাও শুনেছি অনেকের মুখে। তাঁদের কথা, ‘যারা তোমাদের সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল, তাদের ওপর কেউ খুশি নয়। তারা তখনো নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি, এখনো নিতে চায় না। তারা আমাদেরও ভালো রাখেনি।’ জেনে অবাক হয়েছি, বাংলা ভাষা ইসলামাবাদের অনেকের কাছে বেশ শ্রুতিমধুর লাগে। শেখ মুজিবকে তাঁরাও বলেন মহান নেতা। রাওয়ালপিন্ডির এক ব্যবসায়ী দুঃখ করে বলছিলেন, ‘আমাদের তো এখন কোনো নেতা নেই। একজন ছিলেন, তিনি জেলে। ইমরান খান।’
রাজনৈতিক বিষয়গুলো অবশ্য সব দেশেই অমীমাংসিত, তর্কের উপজীব্য। পক্ষে–বিপক্ষে দুই রকম বক্তব্যই থাকে। তবে এত সমস্যার মধ্যেও যে পাকিস্তানের মানুষ এখন অন্যের পাশে দাঁড়াতে চায়, হাসি–আনন্দে বাঁচতে চায়, দেশটাকে বাইরের মানুষের কাছে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে চায়—এটাই বিস্ময়কর।
অশান্তির পাকিস্তানে এত আনন্দ কোত্থেকে যে আসে!