যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এক সপ্তাহ ধরে অপরিবর্তিত আছে। তবে তিনি যেভাবে অর্থনীতি পরিচালনা করছেন ও অভিবাসন ইস্যুতে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তাতে তাঁর প্রতি অসন্তোষ ক্রমাগত বাড়ছে।

রয়টার্স/ইপসোসের করা সবশেষ জনমত জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

তিন দিনের জনমত জরিপটি গত রোববার শেষ হয়। ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৫৩ শতাংশ। এর এক সপ্তাহ আগে রয়টার্স/ইপসোস জরিপে একই ফল পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ তখনো ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা সন্তোষ এবং ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা অসন্তোষ জানিয়েছিলেন।

ট্রাম্প যে কৌশলে অর্থনীতি পরিচালনা করছেন, তার প্রতি ৩৬ শতাংশ মানুষের সমর্থন আছে। এ হার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ ও ২০১৭-২০–এর প্রথম মেয়াদের মধ্যে সবচেয়ে কম। গত সপ্তাহের জনমত জরিপের তুলনায় এ সমর্থন ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের অর্থনীতি পরিচালনার কৌশলের প্রতি অসন্তোষের হার ৫ শতাংশ বেড়ে ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

নতুন জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২২ শতাংশ বলেছেন, অর্থনীতি তাঁদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা। আগের জরিপের তুলনায় এ হারের ক্ষেত্রে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মন্দার আশঙ্কা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ট্রাম্প শুল্কহার এত বেশি বাড়িয়েছেন যে কিছু দেশ, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

মূল্যস্ফীতি এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে আছে। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হন। তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেন সরকারের সময়েই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পরও মূল্যস্ফীতির গতি খুব একটা কমেনি।

সবশেষ রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক জীবনযাত্রার খরচ কমাতে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আর সন্তোষ জানিয়েছেন ৩২ শতাংশ।

জরিপ অনুযায়ী, যেসব ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন বেশি, সেসবের একটি অভিবাসন। এই খাতে ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। আগের সপ্তাহের জরিপেও সমর্থনের হার একই ছিল। তবে এখানেও অসন্তোষ বেড়েছে। জরিপে দেখা গেছে, এ ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তুষ্টির হার ২ শতাংশ বেড়ে ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

ট্রাম্প গত ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কঠোর অভিবাসন নীতি চালু করেন। তিনি দক্ষিণ সীমান্তে সেনা পাঠান ও যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসরত লাখ লাখ অভিবাসীকে বিতাড়িত করার অঙ্গীকার করেন।

ডেমোক্র্যাট দলের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মীরা ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকার পরও বেশ কয়েকজন শিশুকে তাদের মা-বাবার সঙ্গে বিতাড়িত করার ঘটনায় সমালোচনা হয়েছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের তথ্য অনুসারে, বিতাড়িত শিশুদের একজন একটি বিরল ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত।

জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক জীবনযাত্রার খরচ কমাতে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আর সন্তোষ জানিয়েছেন ৩২ শতাংশ।

রয়টার্স/ইপসোস জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ১১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, অভিবাসন এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। জানুয়ারির শেষ দিকে হওয়া জরিপে এ হার ১৪ শতাংশ ছিল।

নতুন জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২২ শতাংশ বলেছে, অর্থনীতি তাঁদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা। আগের জরিপের তুলনায় এ হারের ক্ষেত্রে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

আরও পড়ুনক্ষমতায় বসার পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে কমে ৪৩ শতাংশে০৩ এপ্রিল ২০২৫

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২৬ শতাংশ মনে করে, গণতন্ত্রের ওপর হুমকি ও রাজনৈতিক চরমপন্থার মতো বিষয়গুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা। গত জানুয়ারিতে ২০ শতাংশ উত্তরদাতা এমন মত দিয়েছিলেন।

সবশেষ এ জরিপের জন্য মোট ১ হাজার ২৯ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মতামত নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুনট্রাম্পের ১০০ দিন: বিশ্বজুড়ে টালমাটাল অবস্থা ২৯ এপ্রিল ২০২৫আরও পড়ুনপ্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশির ভাগ মার্কিনের মনোভাব নেতিবাচক: সিএনএনের জরিপ০৩ মার্চ ২০২৫.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: অসন ত ষ সবচ য়

এছাড়াও পড়ুন:

জনমত জরিপগুলো কী বার্তা দেয়

সম্প্রতি নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল নির্বাচনের দাবিতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে দেশের নাগরিক সমাজের ‘মূলধারা’ নির্বাচনের পক্ষে ভাষ্য তৈরি করছে। যুক্তি– গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্বাচনের বিকল্প নেই। সুতরাং অচিরেই নির্বাচন লাগবে। মজার বিষয়, সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন জরিপে দেশের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ লোক সংস্কারের পর নির্বাচনের পক্ষে। জরিপগুলো পরিচালনা করেছে দৈনিক যুগান্তর, কালবেলা, খালেদ মুহিউদ্দীনের জানতে চাইসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম। 

নির্বাচন 
কালবেলা পত্রিকার একটি অনলাইন জরিপে প্রশ্ন ছিল: ‘নির্বাচন ডিসেম্বরের পরে গেলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, সতর্ক করল বিএনপি। আপনিও কি তাই মনে করেন?’ ৮০ হাজার লোক এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। ৮২ শতাংশ ‘না’ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে মাত্র ১৬ শতাংশ। ২ শতাংশের মন্তব্য নেই। 

খালেদ মুহিউদ্দীনের আরেকটি অনলাইন জরিপের প্রশ্ন ছিল: ‘ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন, এমন দাবি সামনে রেখে বিভিন্ন দলের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি। প্রিয় দর্শক, এই উদ্যোগ সমর্থন করেন কি?’ এই প্রশ্নের জবাবে ৭৭ শতাংশ ‘না’ ভোট দিয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ২৩ শতাংশ। দৈনিক যুগান্তরের একটি অনলাইন জরিপের প্রশ্ন ছিল: ‘নববর্ষে জাতির আকাঙ্ক্ষা দ্রুত ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। রুহুল রিজভীর এই বক্তব্যকে কি সমর্থন করেন?’ ৮৫ শতাংশ ভোটার এই প্রশ্নের জবাবে ‘না’ ভোট দিয়েছে। ১৩ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ২ শতাংশ ‘মন্তব্য নেই’ জানিয়েছে। 

শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শরিকদের প্রধান দাবি– শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা এবং আওয়ামী লীগের বিচার করা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করছে। কালবেলা পত্রিকার এ সংক্রান্ত একটি অনলাইন জরিপের প্রশ্ন ছিল: ‘মোদির কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছেন ড. ইউনূস। ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে বলে মনে করেন?’ ৪৪ হাজার ভোটারের মধ্যে ৮৪ শতাংশ মনে করে– ‘ফেরত দেবে না’। ১৩ শতাংশ মনে করে– ‘ফেরত দেবে’। মাত্র ৩ শতাংশ ভোটারের মন্তব্য নেই। এতে দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতার চিত্রই উঠে আসে, যেখানে হাসিনার বিচার করা দুরূহ বলেই মনে হচ্ছে। 

সরকারের মেয়াদ
বর্তমানে রাজনীতিতে নির্বাচন ও সংস্কার বিতর্কে নতুনভাবে যোগ হয়েছে ড. ইউনূসের সরকার প্রসঙ্গ। গত সপ্তাহে ‘মার্চ ফর ড. ইউনূস’ লেখা ব্যানারযোগে এক ঝাঁক তরুণ ও কয়েকজন প্রবীণকে মাঠে তৎপর দেখা গেছে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন দিয়ে জনমত যাচাই করেছে দৈনিক যুগান্তর। জরিপের প্রশ্ন ছিল: ‘সাধারণ মানুষ চাচ্ছে এই সরকার আরো পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাক। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলমের এই মন্তব্যের সাথে কি আপনি একমত?’ ৯০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট দিয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধি অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপারে এ ধরনের ফলাফল মূলত বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে জনঅসন্তোষের প্রতিফলন। 

ভোটারের মনোভাব
অনলাইন জরিপের ভোটারদের মনোভাব বোঝার জন্য যুগান্তর পত্রিকার একটি জরিপ গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভোটাররা কোনোভাবে পক্ষপাতদুষ্ট কিংবা হুজুগে কিনা, তার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। যেমন, ‘বিক্ষোভে গিয়ে যারা জুতার দোকানে লুটপাট করেছে তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন?’ ৯৪ হাজার লোক এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। মুসলিমবিশ্বে ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে তীব্র মনোভাব গড়ে উঠেছে। দেশে সম্প্রতি একটি অংশ এই সুযোগে ইসরায়েলি পণ্যের কথা বলে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে দোকান লুটপাট করেছে। সাধারণ মানুষ এ ধরনের হুজুগেপনার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, যা জরিপেও উঠে এসেছে। ৯৪ শতাংশ ভোটার জড়িতদের শাস্তি দিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। মাত্র ৪ শতাংশ ভোটারের অবস্থান ‘উচিত না’। ২ শতাংশের মন্তব্য নেই। 
সমাপনী বিশ্লেষণ প্রতিটা জরিপের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তেমনি অনলাইন জরিপেরও কিছু ঘাটতি থাকে। এখানে উপস্থাপিত জরিপগুলোর ফলাফল শেষ পর্যায়ে কমবেশি হতে পারে। তবে সম্ভাব্য ফলাফল স্পষ্ট। এ ধরনের জরিপের সঙ্গে সরাসরি স্মার্টফোন ব্যবহার ও ইন্টারনেটের সম্পর্ক রয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে ওই জনগোষ্ঠীর মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা, বয়স এবং সাম্প্রতিক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ। 

২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জরিপমতে, দেশের ৭০ শতাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবার একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করে। তবে অর্ধেক পরিবার এখনও ইন্টারনেট সেবা পাচ্ছে না। দেশের ২ হাজার ৫৬৮টি এলাকার ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবার থেকে এসব তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে এই ফলাফল জানা গেছে। দেশের একটি সাংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ফোন ও ব্রডব্যান্ড মিলিয়ে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি, যা গত জুনে ছিল ১৪ কোটি ২২ লাখ। 
সর্বোপরি, এখানে উপস্থাপিত জরিপের ভিত্তিতে বলা যায়, দেশের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক অবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে। একই সঙ্গে জরিপে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 
iftekarulbd@gmail.com 
 

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • জনমত জরিপগুলো কী বার্তা দেয়