মাত্র চার বছর বয়স সাবিহার (ছদ্মনাম)। রক্তশূন্যতার কারণে তার দেহ কঙ্কালসার, মুখ ফ্যাকাশে। এ বয়সে দুরন্তপনায় মেতে থাকার কথা ছিল তার। অথচ সে প্রায় সময়ই চুপচাপ বসে থাকে। সে লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। দু’মাস আগে চিকিৎসক রোগটি শনাক্ত করেছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এটিএম আতিকুর রহমানের চেম্বারে দেখা হয় সাবিহার সঙ্গে। তার মা রাবেয়া জানান, তিন সন্তানের মধ্যে সাবিহা ছোট। দু’মাস আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) রক্তশূন্যতার কারণ জানতে গেলে বিভিন্ন টেস্টের পর জানতে পারেন মেয়ের লিউকেমিয়া হয়েছে। 
ওইদিন সন্ধ্যায় সাবিহার মতো ক্যান্সার আক্রান্ত আরও ৯টি শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী আসিফও লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত। এক বছর আগে শনাক্ত হয়। এর পর থেকে কয়েক দফা হাসপাতালে ভর্তি, দফায় দফায় কেমোথেরাপি দেওয়া আর বারবার গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার খরচ আর ঝক্কি সামলাতে ঢাকায় একটা বাসা ভাড়া নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে তার পরিবার। ব্যয় বাড়ছে হু হু করে। 

বিএসএমএমইউর শিশু হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগে গিয়ে কথা হয় ক্যান্সার আক্রান্ত জয়নালের মা রাহেলা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সন্তানের সুস্থতার আশায় আত্মীয়স্বজনের কাছে থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ করেছি। বাপের দেওয়া ফসলি জমি বিক্রিও করেছি। তারপরও চিকিৎসার খরচ চালিয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’ 
ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ কেনা, কেমোথেরাপির খরচ দেওয়া বাবদ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু সাবিহা, আসিফ ও জয়নালের মতো অন্যান্য শিশুর পরিবারও প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেকেই সন্তানের জীবন রক্ষায় শেষ সম্বলও বিক্রি করে দিয়েছেন।

ক্যান্সার হওয়ার কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্যান্সার হয় মূলত জেনেটিক কারণে। বংশগত কারণেও হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন যেসব শিশুর জন্ম হয়, তার মধ্যে অনেকেরই দেহে কোষগুলো ঠিকভাবে কাজ করে না। এই সমস্যার একটা বড় কারণ প্রাকৃতিক। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে রেডনের প্রভাবে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। রেডন হলো একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন তেজস্ক্রিয় গ্যাস, বিকিরণের একটি বিপজ্জনক প্রাকৃতিক উৎস। 
চীনের এক গবেষণায় জানা যায়, আবাসিক ভবন এবং কর্মক্ষেত্রে সাধারণভাবে পাওয়া রেডনের মাঝারি ঘনত্ব এই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিকের অপব্যবহার, পরিবেশ ও শব্দদূষণ শিশু ক্যান্সার আক্রান্তের একটা বড় কারণ। 

অন্যতম বড় কারণ ডিভাইস
এর বাইরে শিশু ক্যান্সার আক্রান্তের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত স্মার্টফোন বা ইলেকট্রিক ডিভাইসের ব্যবহার। শিশু কিংবা তার আশপাশে অতিরিক্ত ইলেকট্রিক ডিভাইসের ব্যবহারে সৃষ্ট রেডিয়েশন থেকে শিশুর শরীরের সেলের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এতে শিশুর ক্যান্সার হতে পারে। 
এ ছাড়া যেসব শিশুর দ্বারা জমিতে কীটনাশক বা সার দেওয়া হয় তারাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। পরোক্ষ ধূমপানেরও শিকার শিশু। আবার গর্ভবতী মা যদি ধূমপান করেন, তাহলে তাঁর গর্ভের শিশুর ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি। এ ছাড়া দু-একটা ভাইরাস আছে, যেমন– এইচআইভি, হেপাটাইটিস ‘বি’-এর কারণে লিভার ক্যান্সার হয়। আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার করার কারণেও ক্যান্সার হতে পারে। 
বিএসএমএমইউর শিশু ক্যান্সার ও রক্তরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ডা.

এটিএম আতিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে শিশুদের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ব্লাড ক্যান্সারের সংখ্যা বেশি। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের ব্লাড ক্যান্সার হয়। এ ছাড়া ব্রেইন টিউমার, নিউরোব্লাস্টোমা, চোখের টিউমার বা রেটিনোব্লাস্টোমা, যকৃতের টিউমার বা হেপাটোব্লাস্টোমা, কিডনির টিউমার বা নেফ্রোবব্লাস্টোমা, হাড়ের টিউমার বা অস্টিওসারকোমা, মাংসপেশির টিউমারসহ আরও বিভিন্ন রকম ক্যান্সার ধরা পড়ছে। 

সরকারি সেবা সীমিত
সারাদেশে ক্যান্সার আক্রান্ত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ নেই। রাজধানী ঢাকার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটউট রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার আশার জায়গা হলেও এখানেও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে রেডিওথেরাপি সেবা। ৬টি মেশিনের সবগুলোই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। অকেজো হয়ে আছে এক্স-রে ও এমআরআই মেশিনও। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। 
গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও প্রিভেন্টিভ অনকোলজি বিভাগের প্রধান হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, বিশ্বে প্রতি বছর ৪ লাখেরও বেশি শিশু ক্যান্সার আক্রান্ত হয়। নিম্ন আয় ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শিশুদের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্তের হার বেশি। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসার মাধ্যমে ৮০ ভাগ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ৩০ ভাগ শিশু সুস্থ হয়। সার্বিকভাবে ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ আয়ের মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই মাঝপথে আটকে যায়। 
তিনি বলেন, কেমোথেরাপির কোর্স সম্পন্ন করতেই লাগে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। এর বাইরে দফায় দফায় হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ কেনা বাবদ খরচ আছে। বর্তমানে ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রায় নেই। বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিতে হলে অনেক টাকা প্রয়োজন, যা সব পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। 
হাবিবুল্লাহ তালুকদার জানান, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে ওষুধের দাম আরও বেড়ে যাবে। সব মিলিয়ে ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নেওয়াও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হলে শিশুরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, ৩৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা করান না, কিংবা মাঝপথে বন্ধ করে দেন। অবস্থা পরিবর্তনে দেশের বিত্তবানদের শিশু ক্যান্সার চিকিৎসায় সহযোগিতা এবং সরকারের পক্ষ থেকে আরও বেশি চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তারা।

করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ক্যান্সার মোকাবিলায় সবার আগে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যেহেতু প্রতি বছরই ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তাই শিশুদের সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার যেমন– পালংশাক, ব্রুকলি, ডিমের কুসুম, মটরশুঁটি, কলিজা, মুরগির মাংস, কচুশাক, কলা, মিষ্টি আলু, কমলা, শালগম, দুধ, বাঁধাকপি, বরবটি, কাঠবাদামের মতো ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। 
হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, ক্যান্সার প্রতিরোধে শিশুদের হেপাটাইটিস-বিসহ সবগুলো টিকা দিতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুদের দিয়ে কীটনাশক বা সার প্রয়োগ করা যাবে না। শিশুর খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে।

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ব যবহ র পর ব র সরক র

এছাড়াও পড়ুন:

উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে পরিবার হিমশিম

মাত্র চার বছর বয়স সাবিহার (ছদ্মনাম)। রক্তশূন্যতার কারণে তার দেহ কঙ্কালসার, মুখ ফ্যাকাশে। এ বয়সে দুরন্তপনায় মেতে থাকার কথা ছিল তার। অথচ সে প্রায় সময়ই চুপচাপ বসে থাকে। সে লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। দু’মাস আগে চিকিৎসক রোগটি শনাক্ত করেছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এটিএম আতিকুর রহমানের চেম্বারে দেখা হয় সাবিহার সঙ্গে। তার মা রাবেয়া জানান, তিন সন্তানের মধ্যে সাবিহা ছোট। দু’মাস আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) রক্তশূন্যতার কারণ জানতে গেলে বিভিন্ন টেস্টের পর জানতে পারেন মেয়ের লিউকেমিয়া হয়েছে। 
ওইদিন সন্ধ্যায় সাবিহার মতো ক্যান্সার আক্রান্ত আরও ৯টি শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী আসিফও লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত। এক বছর আগে শনাক্ত হয়। এর পর থেকে কয়েক দফা হাসপাতালে ভর্তি, দফায় দফায় কেমোথেরাপি দেওয়া আর বারবার গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার খরচ আর ঝক্কি সামলাতে ঢাকায় একটা বাসা ভাড়া নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে তার পরিবার। ব্যয় বাড়ছে হু হু করে। 

বিএসএমএমইউর শিশু হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগে গিয়ে কথা হয় ক্যান্সার আক্রান্ত জয়নালের মা রাহেলা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সন্তানের সুস্থতার আশায় আত্মীয়স্বজনের কাছে থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ করেছি। বাপের দেওয়া ফসলি জমি বিক্রিও করেছি। তারপরও চিকিৎসার খরচ চালিয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’ 
ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ কেনা, কেমোথেরাপির খরচ দেওয়া বাবদ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু সাবিহা, আসিফ ও জয়নালের মতো অন্যান্য শিশুর পরিবারও প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেকেই সন্তানের জীবন রক্ষায় শেষ সম্বলও বিক্রি করে দিয়েছেন।

ক্যান্সার হওয়ার কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্যান্সার হয় মূলত জেনেটিক কারণে। বংশগত কারণেও হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন যেসব শিশুর জন্ম হয়, তার মধ্যে অনেকেরই দেহে কোষগুলো ঠিকভাবে কাজ করে না। এই সমস্যার একটা বড় কারণ প্রাকৃতিক। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে রেডনের প্রভাবে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। রেডন হলো একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন তেজস্ক্রিয় গ্যাস, বিকিরণের একটি বিপজ্জনক প্রাকৃতিক উৎস। 
চীনের এক গবেষণায় জানা যায়, আবাসিক ভবন এবং কর্মক্ষেত্রে সাধারণভাবে পাওয়া রেডনের মাঝারি ঘনত্ব এই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিকের অপব্যবহার, পরিবেশ ও শব্দদূষণ শিশু ক্যান্সার আক্রান্তের একটা বড় কারণ। 

অন্যতম বড় কারণ ডিভাইস
এর বাইরে শিশু ক্যান্সার আক্রান্তের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত স্মার্টফোন বা ইলেকট্রিক ডিভাইসের ব্যবহার। শিশু কিংবা তার আশপাশে অতিরিক্ত ইলেকট্রিক ডিভাইসের ব্যবহারে সৃষ্ট রেডিয়েশন থেকে শিশুর শরীরের সেলের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এতে শিশুর ক্যান্সার হতে পারে। 
এ ছাড়া যেসব শিশুর দ্বারা জমিতে কীটনাশক বা সার দেওয়া হয় তারাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। পরোক্ষ ধূমপানেরও শিকার শিশু। আবার গর্ভবতী মা যদি ধূমপান করেন, তাহলে তাঁর গর্ভের শিশুর ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি। এ ছাড়া দু-একটা ভাইরাস আছে, যেমন– এইচআইভি, হেপাটাইটিস ‘বি’-এর কারণে লিভার ক্যান্সার হয়। আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার করার কারণেও ক্যান্সার হতে পারে। 
বিএসএমএমইউর শিশু ক্যান্সার ও রক্তরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ডা. এটিএম আতিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে শিশুদের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ব্লাড ক্যান্সারের সংখ্যা বেশি। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের ব্লাড ক্যান্সার হয়। এ ছাড়া ব্রেইন টিউমার, নিউরোব্লাস্টোমা, চোখের টিউমার বা রেটিনোব্লাস্টোমা, যকৃতের টিউমার বা হেপাটোব্লাস্টোমা, কিডনির টিউমার বা নেফ্রোবব্লাস্টোমা, হাড়ের টিউমার বা অস্টিওসারকোমা, মাংসপেশির টিউমারসহ আরও বিভিন্ন রকম ক্যান্সার ধরা পড়ছে। 

সরকারি সেবা সীমিত
সারাদেশে ক্যান্সার আক্রান্ত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ নেই। রাজধানী ঢাকার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটউট রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার আশার জায়গা হলেও এখানেও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে রেডিওথেরাপি সেবা। ৬টি মেশিনের সবগুলোই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। অকেজো হয়ে আছে এক্স-রে ও এমআরআই মেশিনও। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। 
গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও প্রিভেন্টিভ অনকোলজি বিভাগের প্রধান হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, বিশ্বে প্রতি বছর ৪ লাখেরও বেশি শিশু ক্যান্সার আক্রান্ত হয়। নিম্ন আয় ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শিশুদের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্তের হার বেশি। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসার মাধ্যমে ৮০ ভাগ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ৩০ ভাগ শিশু সুস্থ হয়। সার্বিকভাবে ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ আয়ের মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই মাঝপথে আটকে যায়। 
তিনি বলেন, কেমোথেরাপির কোর্স সম্পন্ন করতেই লাগে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। এর বাইরে দফায় দফায় হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ কেনা বাবদ খরচ আছে। বর্তমানে ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রায় নেই। বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিতে হলে অনেক টাকা প্রয়োজন, যা সব পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। 
হাবিবুল্লাহ তালুকদার জানান, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে ওষুধের দাম আরও বেড়ে যাবে। সব মিলিয়ে ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নেওয়াও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হলে শিশুরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, ৩৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা করান না, কিংবা মাঝপথে বন্ধ করে দেন। অবস্থা পরিবর্তনে দেশের বিত্তবানদের শিশু ক্যান্সার চিকিৎসায় সহযোগিতা এবং সরকারের পক্ষ থেকে আরও বেশি চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তারা।

করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ক্যান্সার মোকাবিলায় সবার আগে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যেহেতু প্রতি বছরই ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তাই শিশুদের সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার যেমন– পালংশাক, ব্রুকলি, ডিমের কুসুম, মটরশুঁটি, কলিজা, মুরগির মাংস, কচুশাক, কলা, মিষ্টি আলু, কমলা, শালগম, দুধ, বাঁধাকপি, বরবটি, কাঠবাদামের মতো ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। 
হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, ক্যান্সার প্রতিরোধে শিশুদের হেপাটাইটিস-বিসহ সবগুলো টিকা দিতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুদের দিয়ে কীটনাশক বা সার প্রয়োগ করা যাবে না। শিশুর খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ