নারী শুধু গৃহকর্মে সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নন, তারা পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে নারী অভিবাসীরা প্রবাসের অচেনা পরিবেশে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য গড়ে তোলেন এবং দেশে ফিরে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তারা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এবং দেশের অর্থনীতির জন্য অবদান রাখেন।
একজন নারী যখন স্বপ্ন দেখেন, তখন সেই স্বপ্ন কেবল ব্যক্তিগত নয়, তা হয়ে ওঠে একটি পরিবারের, একটি সমাজের, এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের অংশ। বিদেশে কঠোর শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যকে দেশে কাজে লাগিয়ে যারা নতুন কিছু করার সাহস দেখান, তারাই প্রকৃত উদ্যোক্তা। এই গল্প শুধু একজন নারীর নয়, এটি হাজারও সংগ্রামী নারীর অনুপ্রেরণার গল্প।
সেই সাহসী নারীদেরই একজন সানজিদা ও সানোয়ারা, যাদের জীবন-সংগ্রাম শুধু কষ্টের নয়; এটি এক অনন্য জয়ের কাহিনি। কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে তারা জীবনের বাধাগুলো অতিক্রম করেছেন, হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া গ্রামের মেয়ে সানজিদা। শৈশব পেরোনোর আগে সংসারের বন্ধনে জড়িয়ে যান। তখনও জীবনের মানে বোঝার সময় হয়নি, তবু কপালে জুটেছিল বউ হওয়ার গুরুদায়িত্ব। স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। পরিবারের অবস্থা ছিল নড়বড়ে, তাই লেখাপড়ার অধিকারও পাওয়া হয়নি। বিয়ের কয়েক বছর পর পৃথিবীতে এলো তাঁর সন্তান। সেই আলোও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
সন্তানের বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখনই ঝড় নেমে এলো জীবনে। ছেলের বাবা তাঁকে একা ফেলে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন। এক মুহূর্তে যেন পৃথিবী শূন্য হয়ে গেল। একা এক নারী, কোলে এক বছরের শিশু–কোথায় যাবেন? কী করবেন?
স্বজনেরা মুখ ফিরিয়ে নিল, কেউ পাশে দাঁড়াল না। বেঁচে থাকার সংগ্রাম তখন যেন আরও কঠিন হয়ে উঠল। বাধ্য হয়ে জীবনের কষ্টগুলো গিলে ফেলে শহরের পথে পা বাড়ালেন। গার্মেন্টসে কাজ নিলেন। কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াই শুরু করলেন।
তবে সানজিদা শুধু হারানোর গল্প নয়, তিনি এক অদম্য লড়াকুর নাম। যে জীবনের যত কঠিন আঘাতই আসুক, সন্তানকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পথ চলতে জানেন। সমাজের চোখে তিনি হয়তো এক সাধারণ নারী, কিন্তু তাঁর ভেতরের শক্তি অসীম।
গার্মেন্টসে পাঁচ বছর ধরে পরিশ্রম করার পর সানজিদা নতুন স্বপ্ন দেখলেন বিদেশ যাওয়ার, ভাগ্য পরিবর্তনের। ২০১৫ সালের শেষের দিকে তিনি পাড়ি জমালেন জর্ডানে, হাতে মাত্র ১৮ হাজার টাকা বেতনের চাকরি। অচেনা দেশ, অজানা ভাষা, নতুন পরিবেশ– সবকিছুই চ্যালেঞ্জিং। তাঁর সংকল্প ছিল অটুট। কঠোর পরিশ্রম আর মনের জোরের ফলে মাত্র তিন মাসের মাথায় তাঁর ভাগ্য বদলাতে শুরু করেন। দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে তিনি কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে পদোন্নতি পেলেন, বেতন বেড়ে হলো ৪০ হাজার টাকা।
২০২১ সালে আবার এক কঠিন মুহূর্ত এলো তাঁর জীবনে। তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাকে একা রেখে বিদেশের মাটিতে থাকা সম্ভব ছিল না। তাই সব ছেড়ে তিনি দেশে ফিরে এলেন। দেশে ফিরে তিনি নতুন করে স্বপ্ন দেখলেন, নতুন পথ খুঁজলেন। নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে একটি বস্ত্রালয় চালু করলেন, যেখানে আজ তাঁর অধীনে কাজ করছেন ৮ জন কর্মী। শুধু তাই নয়, জায়গা কিনে গড়ে তুলেছেন নিজের বাড়ি, একটি স্থায়ী আশ্রয়, যা শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়, এটি তাঁর পরিশ্রম আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক। v
উৎস: Samakal
এছাড়াও পড়ুন:
প্রাণিসম্পদ কার্যালয় ও ছাদে বিয়ের আয়োজন, নানা আলোচনা
পাবনার ঈশ্বরদীতে সরকারি অফিস আলোকসজ্জা করে ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠানের জমকালো আয়োজন নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আয়োজন দেখে মনে হয়েছে, এটি কোনো কমিউনিটি সেন্টার।
শুক্রবার বিকেলে ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল চত্বরে ও অফিসের ছাদে প্যান্ডেল সাজিয়ে এই বিয়ের আয়োজন করা হয়। জানা গেছে, ওই কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জিল্লুর রহমানের মেয়ের গায়ে হলুদ ও বিয়ের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা এই কার্যালয় চত্বরে সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদে টানা ৯ দিনের ছুটিতে বন্ধ রয়েছে সব সরকারি অফিস। এ সুযোগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে জিল্লুর রহমান নামের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী তার মেয়ের বিয়ের জন্য আলোকসজ্জা করে সেখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের কক্ষের তালা খুলে অফিস কক্ষ ব্যবহার ও পুরো সরকারি ভবন আলোকসজ্জা করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানের কিছু ছবি প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোছা. আকলিমা খাতুনের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারি অফিসে বিয়ের আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েই এখানে অনুষ্ঠান করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জিল্লুর রহমান। এ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন তিনি।
ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোছা. আকলিমা খাতুন মুঠোফোনে বলেন, অফিসেরই একজন কর্মচারী বলে তাকে বাহিরের একটি অংশ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছি। তবে ভেতরের কোনো কক্ষ ব্যবহারের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একে এস মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকারি অফিস ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। শুধুমাত্র জনস্বার্থে এটি ব্যবহার করতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে জবাবদিহি করতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. তারেক হোসেন বলেন, সরকারি অফিসে বিয়ের অনুষ্ঠান করার কোনো সুযোগ বা নিয়ম নেই। আমি এ বিষয়টি জানলাম, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি।