বর্ষায় ফুলেফেঁপে রাক্ষুসে রূপ ধারণ করে মৌলভীবাজারের মনু নদ। দখল আর দূষণে বিপর্যস্ত নদটিতে পলি জমে তীব্র হয়ে উঠেছে নাব্য সংকট। জেলার সদর উপজেলা অংশে একটি সেতুর অভাবে এই আধমরা মনু নদ হয়ে উঠেছে ১৫টি গ্রামের ২২ হাজার মানুষের দুর্ভোগের কারণ।
শুষ্ক মৌসুমে নদের পানি থাকে তলানিতে। যার কারণে ছোট নৌকাতেও খেয়া পারাপারের উপায় থাকে না। অন্যদিকে বর্ষায় নাব্য সংকটের কারণে অল্পতেই দু’কূল উপচে পড়ে নদের পানি। এই নদের ওপর দিয়ে নিয়মিত নানা কাজে চলাচল করেন এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। বর্ষায় খেয়া আর শুষ্ক মৌসুমে মনু পারাপারের একমাত্র অবলম্বন ঝুঁকিপূর্ণ একটি সরু বাঁশের সাঁকো।
খুদে শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার মানুষ সরু সাঁকো ধরেই আসা-যাওয়া করেন। সাঁকোটি এতটাই সরু যে একসঙ্গে বেশি মানুষ ওঠার সুযোগ নেই। দু’জনের বেশি উঠলেই নড়তে থাকে সাঁকোটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি স্থানীয়দের দুর্ভোগ লাঘবে এখানে একটি সেতুর দাবি জানানো হয়েছে বহুবার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা জনপ্রতিনিধিদের কেউই এর কোনো  সমাধান দেয়নি।
বর্ষায় খেয়া নৌকা পারাপার যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি শুকনো কালে সরু সাঁকো ধরে চলাতেও ঝুঁকি নেহাত কম নয়। এ পর্যন্ত খুদে শিক্ষার্থীসহ অনেকেই সাঁকোর ওপর থেকে পড়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। এর পরেও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।
সদর উপজেলাধীন মনু নদ ও এর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ত্রিপুরার সখানটাং পর্বতের কাহোসিব চূড়া থেকে উৎপত্তি হয়ে এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হওয়া নদটি মূলত সিলেট-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে। কাজির বাজার এলাকা দিয়ে মনুমুখ নামক স্থানে মিলিত হয়েছে কুশিয়ারা নদীতে। বর্ষায় নদটি উত্তাল থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে একেবারেই মরা থাকে।
জানা যায়, উপজেলার আখাইলকুঁড়া ইউনিয়নের কাজিরবাজার, মিরপুর, পালপুর, শেওয়াইজুড়ী, চানপুর, মনুমুখ, বেঁকামুড়াসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার মানুষের প্রাত্যহিক কাজে নদটি পারাপার হতে হয়। বর্ষায় সাধারণ মানুষসহ স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের রশিটানা খেয়া নৌকায় পারাপার হতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে এলাকাবাসীর অর্থায়ন ও সহযোগিতায় নির্মিত সাঁকো নদী পারাপারে একমাত্র অবলম্বন।
স্থানীয় পালপুর গ্রামের চিনিলাল নমশূদ্র নামে এক ব্যক্তি জানান, বাঁশের সাঁকোর মেরামত ও রশি টেনে খেয়া পারাপার করেন তিনি। বিনিময়ে আশপাশের তিন-চারটি গ্রামের প্রতি পরিবার থেকে তাঁকে বার্ষিক কিছু টাকা দেওয়া হয়। অন্যরা খেয়া পারাপারে জনপ্রতি ৫ টাকা করে দেন।
বেঁকামুড়া গ্রামের মঙ্গল কর জানান, প্রতিদিন শত শত মানুষ কৃষি ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে অন্যপারে যান। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়মিত এ পথে চলাচল করতে হয়।
অন্যদিকে, কাউয়াদিঘি হাওরপার খ্যাত ওপারের কয়েকটি গ্রামের হাটবাজার, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ প্রতিনিয়ত এই সরু সাঁকো ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে নদ পাড়ি দেন কাজিরবাজার হয়ে নদের অপর অংশের বিভিন্ন স্থানে যেতে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবাদুল হক জানান, একটি সেতুর অভাবে বিশাল এলাকার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। যে কোনো সময় সাঁকো ভেঙে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এখানে।
বেঁকামুড়া গ্রামের ব্যবসায়ী মিজানুল হক পান্না জানান, ৩০০ থেকে ৪০০ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করে। খুদে শিক্ষার্থীদের জন্য এই সেতু পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয় এই বাসিন্দা জানান, জেলা জাতীয় পার্টির নেতা বদরুল হোসেন চৌধুরী এলজিইডিসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করে এ এলাকায় একটি সেতু নির্মাণে তোড়জোড় চালিয়েছিলেন। তদবিরের অভাবে কাজ হয়নি বলেই ধারণা সবার। 
সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী শাহেদ হোসেন সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে কোনো তথ্য আমার জানা নেই। দপ্তরের বাইরে থাকায় বিস্তারিত আলাপ করতে পারিনি। এই কর্মকর্তা জানান, সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দ্রুত এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে খোঁজ নেবেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে করণীয় নির্ধারণে তৎপর হবেন।

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: নদ বর ষ য় উপজ ল

এছাড়াও পড়ুন:

খরায় মরা, বর্ষায় ভরা মনু নদে সাঁকোর ফাঁড়া

বর্ষায় ফুলেফেঁপে রাক্ষুসে রূপ ধারণ করে মৌলভীবাজারের মনু নদ। দখল আর দূষণে বিপর্যস্ত নদটিতে পলি জমে তীব্র হয়ে উঠেছে নাব্য সংকট। জেলার সদর উপজেলা অংশে একটি সেতুর অভাবে এই আধমরা মনু নদ হয়ে উঠেছে ১৫টি গ্রামের ২২ হাজার মানুষের দুর্ভোগের কারণ।
শুষ্ক মৌসুমে নদের পানি থাকে তলানিতে। যার কারণে ছোট নৌকাতেও খেয়া পারাপারের উপায় থাকে না। অন্যদিকে বর্ষায় নাব্য সংকটের কারণে অল্পতেই দু’কূল উপচে পড়ে নদের পানি। এই নদের ওপর দিয়ে নিয়মিত নানা কাজে চলাচল করেন এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। বর্ষায় খেয়া আর শুষ্ক মৌসুমে মনু পারাপারের একমাত্র অবলম্বন ঝুঁকিপূর্ণ একটি সরু বাঁশের সাঁকো।
খুদে শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার মানুষ সরু সাঁকো ধরেই আসা-যাওয়া করেন। সাঁকোটি এতটাই সরু যে একসঙ্গে বেশি মানুষ ওঠার সুযোগ নেই। দু’জনের বেশি উঠলেই নড়তে থাকে সাঁকোটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি স্থানীয়দের দুর্ভোগ লাঘবে এখানে একটি সেতুর দাবি জানানো হয়েছে বহুবার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা জনপ্রতিনিধিদের কেউই এর কোনো  সমাধান দেয়নি।
বর্ষায় খেয়া নৌকা পারাপার যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি শুকনো কালে সরু সাঁকো ধরে চলাতেও ঝুঁকি নেহাত কম নয়। এ পর্যন্ত খুদে শিক্ষার্থীসহ অনেকেই সাঁকোর ওপর থেকে পড়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। এর পরেও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।
সদর উপজেলাধীন মনু নদ ও এর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ত্রিপুরার সখানটাং পর্বতের কাহোসিব চূড়া থেকে উৎপত্তি হয়ে এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হওয়া নদটি মূলত সিলেট-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে। কাজির বাজার এলাকা দিয়ে মনুমুখ নামক স্থানে মিলিত হয়েছে কুশিয়ারা নদীতে। বর্ষায় নদটি উত্তাল থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে একেবারেই মরা থাকে।
জানা যায়, উপজেলার আখাইলকুঁড়া ইউনিয়নের কাজিরবাজার, মিরপুর, পালপুর, শেওয়াইজুড়ী, চানপুর, মনুমুখ, বেঁকামুড়াসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার মানুষের প্রাত্যহিক কাজে নদটি পারাপার হতে হয়। বর্ষায় সাধারণ মানুষসহ স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের রশিটানা খেয়া নৌকায় পারাপার হতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে এলাকাবাসীর অর্থায়ন ও সহযোগিতায় নির্মিত সাঁকো নদী পারাপারে একমাত্র অবলম্বন।
স্থানীয় পালপুর গ্রামের চিনিলাল নমশূদ্র নামে এক ব্যক্তি জানান, বাঁশের সাঁকোর মেরামত ও রশি টেনে খেয়া পারাপার করেন তিনি। বিনিময়ে আশপাশের তিন-চারটি গ্রামের প্রতি পরিবার থেকে তাঁকে বার্ষিক কিছু টাকা দেওয়া হয়। অন্যরা খেয়া পারাপারে জনপ্রতি ৫ টাকা করে দেন।
বেঁকামুড়া গ্রামের মঙ্গল কর জানান, প্রতিদিন শত শত মানুষ কৃষি ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে অন্যপারে যান। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়মিত এ পথে চলাচল করতে হয়।
অন্যদিকে, কাউয়াদিঘি হাওরপার খ্যাত ওপারের কয়েকটি গ্রামের হাটবাজার, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ প্রতিনিয়ত এই সরু সাঁকো ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে নদ পাড়ি দেন কাজিরবাজার হয়ে নদের অপর অংশের বিভিন্ন স্থানে যেতে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবাদুল হক জানান, একটি সেতুর অভাবে বিশাল এলাকার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। যে কোনো সময় সাঁকো ভেঙে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এখানে।
বেঁকামুড়া গ্রামের ব্যবসায়ী মিজানুল হক পান্না জানান, ৩০০ থেকে ৪০০ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করে। খুদে শিক্ষার্থীদের জন্য এই সেতু পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয় এই বাসিন্দা জানান, জেলা জাতীয় পার্টির নেতা বদরুল হোসেন চৌধুরী এলজিইডিসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করে এ এলাকায় একটি সেতু নির্মাণে তোড়জোড় চালিয়েছিলেন। তদবিরের অভাবে কাজ হয়নি বলেই ধারণা সবার। 
সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী শাহেদ হোসেন সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে কোনো তথ্য আমার জানা নেই। দপ্তরের বাইরে থাকায় বিস্তারিত আলাপ করতে পারিনি। এই কর্মকর্তা জানান, সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দ্রুত এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে খোঁজ নেবেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে করণীয় নির্ধারণে তৎপর হবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ