বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজিতে আবারো নাম জড়ালো সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসায়িক পার্টনার ও শেয়ার ব্যবসায়ী আবুল খায়ের হিরুর সঙ্গে কারসাজিতে জড়িয়েছেন। এবার বিমা খাতে তালিকাভুক্ত ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার কারসাজিতে সাকিবের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এ অনৈতিক কাজে সাকিবকে সহযোগিতার পাশাপাশি নেতৃত্ব দেন সমবায় অধিদপ্তরে উপ-নিবন্ধক আবুল খায়ের হিরু।

শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় সাকিব, হিরু ও তার পরিবারের সদস্য, তাদের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক পার্টনার রয়েছেন এমন ৮ ব্যক্তি এবং ৪ প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ কোটি ২১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সোনালী পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেড ও এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসিকে সতর্ক করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

২০২৩ সালের ১৬ জুলাই থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারসাজি করে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়। শেয়ার কারসাজিতে সাকিব-হিরুরা বিভিন্ন নামে একাধিক বিও হিসাব খুলে কোম্পানির শেয়ার সিরিজ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়ে মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে বিএসইসির তদন্তে উঠে এসেছে।

পুঁজিবাজারে কয়েক বছর ধরে গুঞ্জন ছিল—ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার নিয়ে কারসাজি চলছে। অবশেষে তদন্ত সাপেক্ষে কোম্পানিটির শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায়ে এনেছে বিএসইসি।

বিগত সরকারের আমলে আইন লঙ্ঘন করা শেয়ার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত বিএসইসি যেকোনো ধরনের কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজি করে আইন লঙ্ঘনের দায়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(২), সেকশন ১৭(ই)(৩), সেকশন ১৭(ই)(৫) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার অর্জন, অধিগ্রহণ ও কর্তৃত্ব গ্রহণ) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৪(১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির মাধ্যমে সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গ করায় ইশাল কমিউনিকেশন লিমিটেডকে ৮৫ লাখ টাকা, কনিকা আফরোজকে ৪৯ লাখ টাকা, মোনার্ক এক্সপ্রেসকে ২২ লাখ টাকা, মো.

আবুল খায়ের হিরুকে ৩৭ লাখ টাকা, মোনার্ক মার্টকে ১৫ লাখ টাকা, কাজী সাদিয়া হাসানকে ১৩ লাখ টাকা, সাকিব আল হাসানকে ৩ লাখ টাকা, আবুল কালাম মাতব্বরকে ৩ লাখ টাকা, লাভা ইলেকট্রোডস ইন্ডাস্ট্রিজকে ৩ লাখ টাকা, হুমায়ন কবিরকে ৩ লাখ টাকা, মো. জাহেদ কামালকে ২ লাখ টাকা, মো. আশফাকুজ্জামানকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সে হিসেবে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজির দায়ে মোট ২ কোটি ২১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

শেয়ার কারসাজিতে জড়িতদের পরিচিতি

ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজি করে সাকিব আল হাসান, আবুল খায়ের হিরু ও তার পরিবারের সদস্য এবং সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এ কাজের মূল হোতা ছিলেন আবুল খায়ের হিরু। কারসাজিতে সহযোগী হিসেবে ছিলেন হিরুর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, বাবা আবুল কালাম মাতবর, বোন কনিকা আফরোজ, ব্যবসায়িক পার্টনার সাকিব আল হাসান, মো. জাহেদ কামাল, হুমায়ন কবির এবং হিরু-সাকিবের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মোনার্ক এক্সপ্রেস, মোনার্ক মার্ট, ইশাল কমিউনিকেশন ও লাভা ইলেকট্রোডস ইন্ডাস্ট্রিজ। এর আগে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কারসাজি করার দায়ে এদের সবাইকে বড় অঙ্কের জরিমানা করে বিএসইসি।

সর্বশেষ, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলসের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করার অভিযোগে সাকিব, হিরু ও তার পরিবারের সদস্য, সাকিব-হিরুর প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক পার্টনার রয়েছে এমন ১০ ব্যক্তি এবং ৪ প্রতিষ্ঠানকে মোট ৩১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাকিব আল হাসানকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

তার আগে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির অভিযোগে সাকিব আল হাসানসহ ৪ ব্যক্তি এবং ৩ প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাকিবকে জরিমানা করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে বিএসইসির শুভেচ্ছা দূত হিসেবে যুক্ত করেন তৎকালীন সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন। ২০২০ সালেও অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত বিএসইসি শুভেচ্ছা দূত হিসেবে সাকিবকে বহাল রাখে। এ সময়ে পুঁজিবাজারে আলোচিত বিনিয়োগকারী হিসেবে সাকিবের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে, গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসি গত ২৮ আগস্ট শুভেচ্ছা দূতের পদ থেকে সাকিবকে বাদ দেয়। পুঁজিবাজারের আলোচিত কারসাজিকারী আবুল খায়ের হিরুর সঙ্গে একত্রে বড় বিনিয়োগ করেন সাকিব। অভিযোগ আছে, গত চার-পাঁচ বছরে পুঁজিবাজারে যেসব শেয়ার নিয়ে আবুল খায়ের হিরু সবচেয়ে বেশি কারসাজির ঘটনা ঘটিয়েছেন, এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ ছিল সাকিবেরও।

বিএসইসির তদন্ত কার্যক্রম

সমবায় অধিদপ্তরে উপ-নিবন্ধক ও শেয়ার ব্যবসায়ী আবুল খায়ের হিরু ও তার পরিবারের সদস্য, তাদের প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক পার্টনার সাকিবসহ অন্যরা যোগসাজস করে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার লেনদেন করেন। কারসাজিকারীরা ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটি শেয়ার কারসাজি করে দাম বাড়ায়। এ সময়ের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারের দাম ৪০.৯১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৭.৬৪ টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। আলোচ্য সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম ৩৬.৭৩ টাকা বা ৮৯.৭৮ শতাংশ বাড়ে যায়।

কারসাজির পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসির সিদ্ধান্ত

অভিযুক্তদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব থেকে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের বিপুল সংখ্যক শেয়ার লেনদেন করা হয়। এ কর্মকাণ্ডের মাধ্যেমে তারা একটি কৃত্রিম বাজার সৃষ্টি ও পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ক্রয়ের জন্য প্রভাবিত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। এর ফলে শেয়ার মূল্য অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সিকিউরিটিজ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শেয়ার কারসাজিতে জড়িতদের বক্তব্য এবং তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, উপস্থাপিত অভিযোগগুলো সঠিক ও ইচ্ছাকৃত এবং তাদের কর্মকাণ্ডের ফলে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যা পুঁজিবাজার উন্নয়নের পরিপন্থী। এক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ব্যাখ্যা কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি।

অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(৫),  সেকশন ১৭(ই)(৩) এবং সেকশন ১৭(ই)(২) লঙ্ঘন করেছে, যা সিকিউরিটিজ আইনের পরিপন্থী। সেহেতু, অভিযুক্তরা উপর্যুক্ত কর্মকাণ্ড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ২২ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফলে, কমিশনের বিবেচনায় সিকিউরিটিজ আইন ও বিধি-বিধান পরিপালনে ব্যর্থতার জন্য পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থে আলোচ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করা হলো।

ঢাকা/রফিক

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর ক র স ট ল ইন স য র ন স র শ য ও ত র পর ব র র সদস য ব যবস য় ক প র টন র স ক ব আল হ স ন শ য় র ক রস জ ত র শ য় র ক রস জ র ক রস জ র ব এসইস র র ল নদ ন র ব যবস র পর প স ক বক তদন ত

এছাড়াও পড়ুন:

একাশিতেও শর্মিলার কর্মময় জীবন

“যে টিউশনিটা আছে, সেটাও ছেড়ে দাও, তারপর আমার গরিব বর সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরে আসবে আর আমার কোনো অনুশোচনা থাকবে না।”— সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ সিনেমায় অপর্ণার এই সংলাপ আজও দর্শক হৃদয়ে গেঁথে আছে। ১৪ বছরের কিশোরী ‘অপর্ণা’ আর কেউ নন, তিনি হলেন ভারতীয় সিনেমার দাপুটে অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর।

গত ৮ ডিসেম্বর ৮০ পূর্ণ করে একাশিতে পা দেন এক সময়ের স্বপ্নের নায়িকা শর্মিলা ঠাকুর। ২০১০ সালের পর অভিনয় থেকে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে ২০২৩ সালে ‘গুলমোহর’ সিনেমা দিয়ে পর্দায় ফিরেন। গত বছরও মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত ‘আউট হাউজ’ সিনেমা। সর্বশেষ বাংলা ভাষার ‘পুরাতন’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন এই অভিনেত্রী।

এর আগে ভারতীয় বাংলা ‘অন্তহীন’ সিনেমায় অভিনয় করেন শর্মিলা ঠাকুর। এটি ২০০৯ সালে মুক্তি পায়। চৌদ্দ বছর পর ‘পুরাতন’ সিনেমার মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় অভিনয় করলেন। এ বিষয়ে শর্মিলা ঠাকুর বলেন, “একেবারেই তাই। বাংলা ভাষায় অভিনয় করে খুব আনন্দ পেয়েছি। বাংলা আমার মাতৃভাষা। নিজের ভাষায় কাজ করার আলাদা একটা আনন্দ আছে, যেটা হিন্দি বা ইংরেজি সিনেমার ক্ষেত্রে নেই। তাই আমার কাছে এই সিনেমার আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে। অনেক দিন ধরেই একটা বাংলা সিনেমায় অভিনয় করতে চাইছিলাম।”

এই বয়সেও শরীরি সৌন্দর্য, লাবণ্যতা, মাধুর্যতা কীভাবে ধরে রেখেছেন? এ প্রশ্ন রাখতেই শর্মিলা ঠাকুর বলেন, “এ নিয়ে তো আপনারাই বলেন। পরিমিত আহার, একটু শরীরচর্চা আর ইতিবাচক মনোভাব। খারাপ চিন্তাভাবনা যত কম করা যায় ততই ভালো।”

বয়স বাড়লেও সব বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখেন শর্মিলা ঠাকুর। অথচ এ বয়সে এমন কর্মময় থাকাটা বেশ কঠিন। শর্মিলা ঠাকুর বলেন, “সে তো একটু থাকতেই হয়। না হলে কথা বলার মতো কোনো বিষয় থাকে না।”

এখন কীভাবে দিন কাটান শর্মিলা ঠাকুর? তার স্পষ্ট জবাব, “আমার অনেক বন্ধুবান্ধব রয়েছে। আমার একাধিক বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। সিনেমা দেখতে ভালোবাসি। দিল্লি শহরে অনেক সেমিনার, প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান প্রায়ই কিছু না কিছু হয়। আমি এগুলো ভীষণ ভালোবাসি। এখানে ব্রিটেন, কানাডাসহ নানা দেশের দূতাবাস রয়েছে। এসব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ হয়, নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। মোটামুটি দিনগুলো ভালোই কেটে যায়।”

বৃদ্ধ বয়সে মানুষের স্মৃতিভ্রংশ দেখা দেয়। বিষয়টি কী শর্মিলা ঠাকুরকে চিন্তিত করে? জবাবে এ অভিনেত্রী বলেন, “ভেবে কোনো লাভ নেই। নিজেকে ব্যস্ত রাখা উচিত। তরুণদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা উচিত। নিজের পরিসর বাড়ানো উচিত। কোনো পছন্দের বিষয় নিয়ে একটু পড়াশোনা করা উচিত। কিন্তু স্মৃতিভ্রংশ অনেক সময় জিনগত কারণেও হয়ে থাকে। তবে এখন অনেক কিছু করা যায়। ভয়ের উদ্রেক হওয়াটা স্বাভাবিক, তারপরও বিভিন্নভাবে কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা যায় বোধহয়, আমি ঠিক জানি না।”

ক্রিকেটার নবাব মনসুর আলী খান পতৌদির সঙ্গে ঘর বাঁধেন শর্মিলা। ২০১১ সালে গত হয়েছেন মনসুর আলী। বিখ্যাত পরিবার, ছেলে, পুত্রবধূও তারকা। সবাইকে কীভাবে একসঙ্গে রেখেছেন? জবাবে শর্মিলা ঠাকুর বলেন, “ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। কারো বিষয়ে যেচে গিয়ে মতামত দিই না। সাইফকে কিছু বললে ও শুনবেই বা কেন? কারিনা আমার পরিবারের বউ। ও আমার কাছে, আমাদের পরিবারে এসেছে। সেই সম্মান দিয়েছি। আমিও আমার শাশুড়ির কাছে সেই সম্মান পেয়েছি। বাচ্চারা তাদের সময়মতো আমার কাছে আসে, সময় কাটায়। এটাই তো পাওয়া।”

১৯৪৬ সালের ৮ ডিসেম্বর কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বংশধর গীতিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইরা ঠাকুরের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন শর্মিলা। তার মা ইরা ঠাকুর ছিলেন আসামের বিখ্যাত লেখক জ্ঞানদাভিরাম বড়ুয়ার মেয়ে। শর্মিলা ঠাকুরের মায়ের পরিবারের দিক থেকেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। ইরা ঠাকুরের মা লতিকা বড়ুয়া ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি।

ঠাকুর পরিবারের বংশধর শর্মিলা ১৯৫৯ সালে বাংলা থেকে রুপালি জগতের যাত্রা করলেও কয়েক বছর পরই তৎকালীন বম্বে পাড়ি জমান। মাত্র ২০ বছর বয়সে শক্তি সামন্ত পরিচালিত ‘কাশ্মীর কি কলি’ সিনেমা দিয়ে তার মুম্বাই অভিযান শুরু হয়। প্রথম সিনেমায় তার অনবদ্য অভিনয় নজর কাড়ে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমাপ্রেমীদের। সেই সময় রুপালি পর্দায় শর্মিলা ঠাকুর মানেই সিনেমা সুপারহিট। একের পর এক মুক্তি পায় ‘ওয়াক্ত’, ‘অনুপমা’, ‘দেবর’, ‘শাওয়ান কি ঘাটা’-এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমা।

শর্মিলা ঠাকুর প্রতিবার ভিন্নভাবে পর্দায় হাজির হয়েছেন। ১৯৬৬ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমায় উত্তমকুমারের বিপরীতে ভিন্নভাবে দেখা যায় তাকে। নিজেকে ভাঙতে ভালোবাসেন শর্মিলা। তাই তো শাড়ি ছেড়ে প্রথা ভেঙে বিকিনি পরেও সাবলীল ছিলেন ক্যামেরার সামনে; যা কেউ ভাবতেও পারেননি। অথচ তা তিনি অবলীলায় করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে শক্তি সামন্তের ‘অ্যান ইভিনিং ইন প্যারিস’ সিনেমায় বিকিনি পরে তার পর্দায় আবির্ভাব রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল।

রুপালি পর্দায় বিকিনি পরার আগে অর্থাৎ ১৯৬৬ সালে ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের জন্য বিকিনি ফটোশুট করেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। মূলধারার নায়িকাদের মধ্যে বলতে গেলে তিনিই প্রথম এমনটি করেন, যা সেই সময় হইচই ফেলে দেয়। এক সাক্ষাৎকারে শর্মিলা ঠাকুর বলেছিলেন, “জীবনে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করেছি, অতীতে কখনোই ফিরে দেখিনি। এগুলো আমার কাছে রীতিবিরুদ্ধ। ফিল্মফেয়ারের বিকিনি ফটোশুটটাও তেমনি, তবে মানুষ এটি আমাকে ভুলতে দেবে না।”

শুধু পর্দায় নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও প্রথা ভাঙেন শর্মিলা ঠাকুর। ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় পতৌদি নবাব বংশের সন্তান, ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মনসুর আলী খান পতৌদির সঙ্গে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিপত্তি বাধে ধর্ম নিয়ে। তবে সব বাধা এক পাশে রেখে ১৯৬৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। এ নিয়েও অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। বিয়ের আগে শর্মিলা ধর্ম পরিবর্তন করেন। নাম বদলে রাখেন বেগম আয়েশা সুলতানা।

১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত ব্যবসাসফল সিনেমাগুলো হলো— ‘আমনে সামনে’, ‘হামসায়া’, ‘সত্যকাম’, ‘তালাশ’। তবে ১৯৬৯ সালে পূর্বের রেকর্ড ভাঙেন ‘আরাধনা’ সিনেমা দিয়ে। ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ১৯৭১ সালে ‘সীমাবদ্ধ’। দুটি সিনেমাতেই অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন এবং সাফল্য পান তিনি।

শর্মিলা অভিনীত উল্লেখযোগ্য বলিউড সিনেমাগুলো হলো— ‘সফর’, ‘অমর প্রেম’, ‘রাজারানি’, ‘দাগ’, ‘আ গালে লাগ যা’, ‘দাস্তান’ প্রভৃতি। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘মৌসুম’। এটি পরিচালনা করেন গুলজার। সিনেমাটিতে সঞ্জীব কুমারের বিপরীতে অসাধারণ অভিনয়ের কারণে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন শর্মিলা ঠাকুর। ২০০৩ সালে ‘আবার অরণ্যে’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৩ সালে লাভ করেন ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’।

ঢাকা/শান্ত

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • বিএসইসি লাভে ফিরলেও ভোগাচ্ছে বিপণন দুর্বলতা
  • একাশিতেও শর্মিলার কর্মময় জীবন