যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষে শুল্ক আরোপের পর বৈশ্বিক বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। আর তাতেই বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ ধনী এক দিনে মোট ২০ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সম্পদ খুইয়েছেন।

ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের ১৩ বছরের ইতিহাসে এটি এক দিনে চতুর্থ বৃহৎ পতন। কোভিড–১৯ মহামারির পর এত বড় পতন আর হয়নি।

ব্লুমবার্গের সম্পদ সূচক অনুসারে, ব্লুমবার্গ যাঁদের সম্পদের হিসাব রাখে, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি ব্যবসায়ীর ভাগ্যের পতন ঘটেছে এদিন। গড়ে তাঁদের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সম্পদ হ্রাস পেয়েছে।

সবচেয়ে বেশি সম্পদ হারিয়েছেন মার্কিন ধনকুবেররা। মেটাপ্রধান মার্ক জাকারবার্গ ও অ্যামাজনপ্রধান জেফ বেজোসের সম্পদ কমেছে সবচেয়ে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যে অল্প কয়েকজন ধনকুবের ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রভাব থেকে রক্ষা পেয়েছেন, তাঁদের একজন কার্লোস স্লিম। তিনি মেক্সিকোর শীর্ষ ধনী।

গত বুধবার ট্রাম্প বেশ কয়েকটি দেশের ওপর নতুন করে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছেন, তালিকায় নেই মেক্সিকোর নাম।

ট্রাম্পের সেদিনের শুল্কের খাঁড়া থেকে বেঁচে যাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার মেক্সিকোর অন্যতম প্রধান শেয়ারবাজার মেক্সিকান বোলসার সূচক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এতে স্লিমের সম্পদ এক দিনে ৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য একমাত্র অঞ্চল, যেখানে ব্লুমবার্গের সম্পদের সূচকে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদ বৃহস্পতিবার কমেনি।

মার্ক জাকারবার্গ

ডলারের হিসাবে বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি সম্পদ হারিয়েছেন মেটার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। ওই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৯ শতাংশ কমে গেছে। এতে মেটার প্রধান নির্বাহী জাকারবার্গ ১ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার খোয়ান, যা তাঁর মোট সম্পদের ৯ শতাংশ।

জেফ বেজোস

বৃহস্পতিবার অ্যামাজনের শেয়ারের দাম ৯ শতাংশ পড়ে যায়, ২০২২ সালের এপ্রিলের পর এটা কোম্পানিটির শেয়ারের সবচেয়ে বড় পতন। এর ফলে প্রযুক্তি খাতের এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বেজোস তাঁর ব্যক্তিগত মোট সম্পদ থেকে ১ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার খোয়ান।

ইলন মাস্ক

এ বছর এখন পর্যন্ত টেসলা সিইও ইলন মাস্ক ১১ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ খুইয়েছেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার তাঁর সম্পদ কমেছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ও ট্রাম্প প্রশাসনে মাস্কের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুঁজিবাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলার শেয়ারের দাম হ্রাস পাচ্ছে।

আর্নেস্ট গার্সিয়া

ব্যবহৃত গাড়ি বিক্রির কোম্পানি কারভানা-এর সিইও আর্নেস্ট গার্সিয়া বৃহস্পতিবার ১৪০ কোটি ডলার হারিয়েছেন। এদিন কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ২০ শতাংশ কমে যায়।

টোবিয়াস লুটকা

কানাডার ই-কমার্স কোম্পানি সপিফাইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও টোবিয়াস লুটকা বৃহস্পতিবার তাঁর সম্পদ থেকে ১৫০ কোটি ডলার হারিয়েছেন, যা তাঁর মোট সম্পদের ১৭ শতাংশ। টরন্টোতে সপিফাইয়ের শেয়ারের দাম ২০ শতাংশ পড়ে গেছে।

বার্নার্ড আর্নল্ট

ট্রাম্প গত বুধবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ওপর নতুন করে সব পণ্যে ফ্ল্যাট ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এর ফলে মদ ও বিলাস পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানিতে ধাক্কা লাগবে, সে কথা জানাই ছিল। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ধাক্কায় বৃহস্পতিবার প্যারিসে আর্নল্টের এলভিএমএইচের শেয়ারের পতন হয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ ধনী আর্নল্টের নিট সম্পদ থেকে ৬০০ কোটি ডলার কমে গেছে।

ঝ্যাং সুংওয়ান

চীনা জুতা তৈরির কোম্পানি হুয়াই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ঝ্যাং সুংওয়ানের সম্পদ থেকে বৃহস্পতিবার ১২০ কোটি ডলার কমে গেছে। যা তাঁর মোট সম্পদের ১৩ শতাংশ। ট্রাম্প চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক আরও কয়েকটি জুতা প্রস্তুতকারী কোম্পানির শেয়ারের দামও বৃহস্পতিবার পড়ে গেছে।

আরও পড়ুনএবার যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ৩৪% পাল্টা শুল্ক চীনের, ডব্লিউটিওতে মামলা১৮ ঘণ্টা আগে.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: শ ল ক আর প জ ক রব র গ ব ল মব র গ এক দ ন সবচ য়

এছাড়াও পড়ুন:

পাল্টা শুল্ক কার্যকরে সময় চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দেওয়ার পরামর্শ ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্রুত আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে পাল্টা শুল্ক কার্যকরের বিষয়ে কিছু সময় চেয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন রপ্তানি খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ চিঠি পাঠাতে হবে। কারণ, ইতিমধ্যে প্রতিযোগী দেশগুলো এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।

আজ শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় এ পরামর্শ দেওয়া হয়। বৈঠকটি চার ঘণ্টাব্যাপী চলে। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনকে দেওয়ার জন্য একটি চিঠির খসড়াও তৈরি করা হয়েছে বৈঠকে। পরে সেই চিঠি উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

সভায় বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি শামীম এহসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার, গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রমুখ অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্যবিশেষজ্ঞ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

সভায় উপস্থিত একাধিক ব্যবসায়ী নেতা প্রথম আলোকে জানান, মার্কিন সরকারের নতুন পাল্টা শুল্ক আরোপ নিয়ে খুব দ্রুত দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা। সে আলোকে আজ দুপুরে দেশের বিভিন্ন রপ্তানি খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে বিডা।

এ দিকে আজ সন্ধ্যায় মার্কিন পাল্টা শুল্ক নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। বিডায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞরা যেসব সুপারিশ দিয়েছেন, সেগুলো প্রধান উপদেষ্টার সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন বিডার কর্মকর্তারা।

বিডায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা আহ্বান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্রুত আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে কিছু সময় চাওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া পাল্টা শুল্ক কার্যকরের সময় তিন মাস স্থগিত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। বাংলাদেশেরও এটি দ্রুততম সময়ে করা প্রয়োজন।

বৈঠকে তাঁরা আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের। এর ফলে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশ বেশ চাপে পড়বে। এ জন্য দ্রুত করণীয় ঠিক করতে হবে। কারণ, ইতিমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এর ফলে বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।’

বিনিয়োগ সম্মেলন ঘিরেও প্রস্তুতি

৭ থেকে ৯ এপ্রিল দেশে বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনে পাঁচ শতাধিক বিদেশি বিনিয়োগকারী যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এই সম্মেলন ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়েও বিডায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

সম্মেলন প্রসঙ্গে বৈঠক শেষে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘সম্মেলন ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা কী, আমরা কীভাবে সহায়তা করতে পারি, সেটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংগত কারণে এখানে মার্কিন নতুন শুল্কনীতির প্রভাব বিষয়েও কথাবার্তা হয়েছে। শুল্কনীতি নিয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে, আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে কী জানাতে পারি, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শ এসেছে বৈঠকে।’

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আসন্ন বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়ে যখন পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তখন মার্কিন পাল্টা শুল্কের বিষয়টি সামনে ছিল না। তবে এখন সম্মেলনে এসে বিনিয়োগকারীদের প্রথম প্রশ্ন থাকবে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কী। তাই আমরা আশা করছি, অবশ্যই ৯ তারিখের আগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটা যথাযথ উত্তর আসবে। এটি যে আসবে, সে বিষয়ে আমরা আশাবাদী। কারণ, প্রধান উপদেষ্টা নিজে বিষয়টিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।’

সম্পর্কিত নিবন্ধ