তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার তত্ত্বতালাশ
Published: 5th, April 2025 GMT
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয়।
এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ তিনটি নির্বাচনই ছিল দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং ‘একতরফা’। এর মধ্যে কোনোটি ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’, কোনোটি ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ আবার কোনোটি ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।
গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাতের পর সত্যিকারের জনরায় বা ভোটের মাধ্যমে ভবিষ্যতে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাসীন করার প্রশ্নে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এক নজিরবিহীন মতৈক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি রূপরেখা দিয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেছে। এদিকে যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছিল, এরই মধ্যে সংশোধনীর সেই অংশটুকু হাইকোর্ট বাতিল করে দিয়েছেন। পাশাপাশি ত্রয়োদশ সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করার রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এসব বাস্তবতার নিরিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার তত্ত্বতালাশ করা জরুরি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ৫৮খ-৫৮ঙ পর্যন্ত চারটা অনুচ্ছেদ যোগ করে জাতীয় নির্বাচনের সময়ে সরকার পরিচালনার জন্য ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আমরা যথাক্রমে দুই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও লতিফুর রহমান এবং ২০০৬ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন দেখেছিলাম।
১৯৯০ সালে আরেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সরকার কার্যকাল, পদ্ধতি ও সাংবিধানিকতার বিচারে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ না হলেও বাস্তবে সেটিই ছিল আমাদের প্রথম নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরবর্তী সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভিত্তিভূমি ও পথনির্দেশক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রকমফের
শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে দুই ধরনের তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের নজির মেলে। প্রথম ধরনের দেখা পাওয়া যায় কোনো দেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রান্তিকালে। কোনো দেশের স্বাধীনতা অর্জন, নতুন রাষ্ট্র গঠন, বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো শাসনব্যবস্থার অবসান, গণ-অভ্যুত্থান, সামরিক অভ্যুত্থান—এসব কারণে অর্জিত গাঠনিক ক্ষমতাবলে প্রচলিত সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, নির্বাচন বা অন্য কোনোভাবে একটা বৈধ সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের আগপর্যন্ত শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এ ধরনের সরকার গঠন করা হয়। পরে নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এগুলোর বৈধতাও দেওয়া হয়।
রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের জারকে উৎখাতের পর গঠন করা সরকার, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি ‘ডমিনিয়ন’ সৃষ্টির পর গঠিত সরকার, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল শপথ নেওয়া বাংলাদেশ সরকার কিংবা ২০০৬ সালে নেপালে দ্বিতীয় লোকতান্ত্রিক আন্দোলনের পর গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নেতৃত্বে গঠিত সরকার এ ধরনের সরকারের অন্তর্ভুক্ত।
এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারও একই ধরনের সরকারের উদাহরণ। লক্ষণীয় হলো, সেই সময় প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী এ সরকারের গঠন বৈধ ছিল না। নির্বাচনের পর গঠিত সংসদ সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই সরকারের কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য ধরনটা হচ্ছে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সংসদ ভেঙে গেলে ভোটের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার ক্ষমতাসীন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এটাকে ‘গণতান্ত্রিক’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা যেতে পারে।
এ ব্যবস্থার বাংলাদেশি সংস্করণ ছিল এ রকম যে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার ক্ষমতাসীন না হওয়া পর্যন্ত একটা নির্দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকবে। এ সরকার সর্বোচ্চ ১০ জন উপদেষ্টাসহ একজন প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে কাজ করবে। আমাদের উদ্ভাবিত ব্যবস্থাটা পুরো বিশ্বের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসেই ‘অনন্যতা’ অর্জন করছিল। কেননা সেই সময় বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশে অতীতে কখনোই এমন সরাসরিভাবে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দেখা যায়নি।
কেমন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
২০০৬ সালে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হতে অসম্মতি জানান। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক প্রকল্পের ত্রুটিবিচ্যুতি আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। সেই প্রকল্প অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার তালিকায় ছিলেন (পূর্ববর্তী ব্যক্তি রাজি না হলে পরবর্তী ব্যক্তি):
১.
২. তাঁর পূর্ববর্তী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি;
৩. আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
৪. তাঁর পূর্ববর্তী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
৫. তাঁদের কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি দ্বারা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যত দূর সম্ভব পরামর্শক্রমে একজন বিশিষ্ট নাগরিক
৬. তাঁদের কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি স্বয়ং।
এ প্রকল্পের সবচেয়ে দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ দিক ছিল, তালিকার ৬ জনের মধ্যে ৫ জনই ছিলেন ‘স্বয়ংক্রিয়’ পছন্দ। এ ক্ষেত্রে বাছাই করার কোনো অবকাশ ছিল না। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ প্রকারান্তরে হয়ে দাঁড়িয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ে প্রধান বিচারপতি কে হবেন কিংবা আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে—এ সমীকরণের খেলা। এর ফলে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকার কথা যে বিচার বিভাগের, সেটাকে এনে ফেলা হয় রাজনীতির ময়দানে।
প্রধান উপদেষ্টার পদ নিয়ে পাটিগণিতের লড়াই
আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও ২০০৪ সালে চারদলীয় জোট সরকার সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসর নেওয়ার বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করে। এ পরিবর্তনের ফলে তৎকালীন সরকারের ‘পছন্দের লোক’ সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
বিরোধীদের আপত্তির মুখে কে এম হাসান দায়িত্ব না নেওয়ার কথা জানালে বিকল্প অনুসন্ধান না করেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হন। কারও কারও মতে, এ ঘটনার সূত্র থেকে দেশে রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয়, যার পরিণতিতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে নতুন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।
যে বিষয়টা অনেকেরই জানা নেই তা হলো, ‘পছন্দের ব্যক্তি’কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে পাওয়ার পাটিগণিতের হিসাব আওয়ামী লীগ করেছিল আরও ছয় বছর আগে। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি কে এম হাসান ও বিচারপতি সৈয়দ জে আর মুদাচ্ছির হোসেনকে ডিঙিয়ে বিচারপতি এম রুহুল আমিনকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে এটি করা হয়েছিল। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রথা যদি অব্যাহত থাকত, তাহলে বিচারপতি এম রুহুল আমিনই ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতেন।
গণতন্ত্রের জন্য কি এই ব্যবস্থা অপরিহার্য
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল ক্ষমতাসীনদের যেকোনো উপায়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেতার প্রচেষ্টাকে থামানোর জন্য। এরশাদের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপক ভোট চুরি ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল। এর ফলে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের নির্বাচনের প্রশ্নে দলমত-নির্বিশেষে সবাই একমত হয়।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে সব দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মতৈক্যের ভিত্তিতে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। পরপর দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার সফলভাবে দায়িত্ব পালনের ফলে মানুষ একে স্থায়ী সমাধান ভেবে স্বস্তি পেয়েছিলেন।
২০১১ সালে এক চরম বিতর্কিত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পর বাংলাদেশে কারচুপি ও জাল-জালিয়াতির নির্বাচনের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসে। বিগত তিনটি নির্বাচন যেভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অত্যাবশ্যকতার বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে নয়া বিবেচনা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রধান দুর্বলতাগুলো ছিল প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রশ্নে স্বয়ংক্রিয় পছন্দের ব্যবস্থা, তাতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় বিকল্পের সুযোগ না রাখা, বিচার বিভাগের রাজনীতিকীকরণ, সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট না থাকা ইত্যাদি। এসবের আলোকে সংবিধান সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে তাতে রয়েছে তত্ত্বাবধায়কের বদলে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ নামকরণ, সরকারের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৯০ দিন, উপদেষ্টার সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ জন করা।
কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ এ-সংক্রান্ত যে প্রস্তাব করেছে তার সারাংশ অনেকটা এ রকম:
১. জনপ্রতিনিধিদের প্রাধান্য বজায় রেখেই রাষ্ট্রের তিন বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত একটি ৯ (নয়) সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন। এনসিসির ৯ (নয়) সদস্যের মধ্যে ন্যূনতম ৭ (সাত) সদস্যের সিদ্ধান্তে এনসিসির সদস্য ব্যতীত নাগরিকদের মধ্য থেকে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
২. উপরিউক্ত পদ্ধতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে, সব অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিবৃন্দের মধ্য থেকে একজনকে এনসিসির ৯ (নয়) সদস্যের মধ্যে ন্যূনতম ৬ (ছয়) সদস্যের সিদ্ধান্তে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
৩. উপরিউক্ত পদ্ধতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে এনসিসির সব সদস্যের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এভাবে তিন ধাপে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সম্ভব না হলে সবশেষে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিরা ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা ক্রমানুসারে ঠিক আগের মতোই বিভিন্ন ধাপে স্বয়ংক্রিয় পছন্দ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হবেন।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সাতটি ধাপের মধ্যে পাঁচটিতেই বিচার বিভাগকে জড়িয়েছে। তার ওপর শেষোক্ত চারটি ধাপে আগের মতো করেই স্বয়ংক্রিয় পছন্দ হিসেবে সাবেক বিচারপতিদের রেখেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের এই সুপারিশ বিবেচনাপ্রসূত হয়েছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
মনে রাখতে হবে, আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সাধারণভাবে বিভক্ত ও সমঝোতায় অনাগ্রহী। এ রকম পটভূমিতে ৯ সদস্যের এনসিসি কতটা কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সেটা নিয়েও ভাবতে হবে। এনসিসির গঠনে দেখা যায়, তাতে সরকার ও বিরোধী উভয় দলের কমপক্ষে তিনটি করে ভোট থাকবে। এর ফলে যেকোনো পক্ষ চাইলে প্রথম ধাপে ৭ ভোটে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ আটকে দেওয়া সম্ভব। একইভাবে অপর পক্ষও দ্বিতীয় ধাপে ৬ ভোটে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। এমনটা হলে তৃতীয় ধাপে সর্বসম্মত নিয়োগের আশা দুরাশামাত্র।
এরপর ঠিক আগের মতোই স্বয়ংক্রিয় পছন্দ হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকেই প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। ব্যাপারটা কষ্টকল্পনা মনে হতে পারে; কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎকে গণিতের সংখ্যায় দেখতে পারার ক্ষমতা ও একগুঁয়েমিকে উপেক্ষা করা করা ঠিক হবে না।
মিল্লাত হোসেন সংবিধান ও আইন বিষয়ে লেখক ও গবেষক
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: আপ ল ব ভ গ র র ব চ রপত র ষ ট রপত উপদ ষ ট র ক ষমত স ন ব যবস থ র প র ববর ত ২০০৬ স ল এম হ স ন অন ষ ঠ ত ন র দল য় র জন ত ক র তত ত ব ব ত ল কর র ক ষমত এনস স র সদস য র সরক র ক পরবর ত অন য য় ত হয় ছ র পর গ ঠ ত হয় হয় ছ ল র র জন আম দ র র জন য র গঠন ধরন র
এছাড়াও পড়ুন:
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার তত্ত্বতালাশ
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয়।
এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ তিনটি নির্বাচনই ছিল দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং ‘একতরফা’। এর মধ্যে কোনোটি ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’, কোনোটি ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ আবার কোনোটি ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।
গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাতের পর সত্যিকারের জনরায় বা ভোটের মাধ্যমে ভবিষ্যতে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাসীন করার প্রশ্নে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এক নজিরবিহীন মতৈক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি রূপরেখা দিয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেছে। এদিকে যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছিল, এরই মধ্যে সংশোধনীর সেই অংশটুকু হাইকোর্ট বাতিল করে দিয়েছেন। পাশাপাশি ত্রয়োদশ সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করার রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এসব বাস্তবতার নিরিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার তত্ত্বতালাশ করা জরুরি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ৫৮খ-৫৮ঙ পর্যন্ত চারটা অনুচ্ছেদ যোগ করে জাতীয় নির্বাচনের সময়ে সরকার পরিচালনার জন্য ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আমরা যথাক্রমে দুই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও লতিফুর রহমান এবং ২০০৬ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন দেখেছিলাম।
১৯৯০ সালে আরেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সরকার কার্যকাল, পদ্ধতি ও সাংবিধানিকতার বিচারে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ না হলেও বাস্তবে সেটিই ছিল আমাদের প্রথম নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরবর্তী সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভিত্তিভূমি ও পথনির্দেশক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রকমফের
শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে দুই ধরনের তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের নজির মেলে। প্রথম ধরনের দেখা পাওয়া যায় কোনো দেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রান্তিকালে। কোনো দেশের স্বাধীনতা অর্জন, নতুন রাষ্ট্র গঠন, বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো শাসনব্যবস্থার অবসান, গণ-অভ্যুত্থান, সামরিক অভ্যুত্থান—এসব কারণে অর্জিত গাঠনিক ক্ষমতাবলে প্রচলিত সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, নির্বাচন বা অন্য কোনোভাবে একটা বৈধ সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের আগপর্যন্ত শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এ ধরনের সরকার গঠন করা হয়। পরে নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এগুলোর বৈধতাও দেওয়া হয়।
রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের জারকে উৎখাতের পর গঠন করা সরকার, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি ‘ডমিনিয়ন’ সৃষ্টির পর গঠিত সরকার, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল শপথ নেওয়া বাংলাদেশ সরকার কিংবা ২০০৬ সালে নেপালে দ্বিতীয় লোকতান্ত্রিক আন্দোলনের পর গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নেতৃত্বে গঠিত সরকার এ ধরনের সরকারের অন্তর্ভুক্ত।
এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারও একই ধরনের সরকারের উদাহরণ। লক্ষণীয় হলো, সেই সময় প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী এ সরকারের গঠন বৈধ ছিল না। নির্বাচনের পর গঠিত সংসদ সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই সরকারের কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য ধরনটা হচ্ছে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সংসদ ভেঙে গেলে ভোটের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার ক্ষমতাসীন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এটাকে ‘গণতান্ত্রিক’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা যেতে পারে।
এ ব্যবস্থার বাংলাদেশি সংস্করণ ছিল এ রকম যে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার ক্ষমতাসীন না হওয়া পর্যন্ত একটা নির্দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকবে। এ সরকার সর্বোচ্চ ১০ জন উপদেষ্টাসহ একজন প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে কাজ করবে। আমাদের উদ্ভাবিত ব্যবস্থাটা পুরো বিশ্বের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসেই ‘অনন্যতা’ অর্জন করছিল। কেননা সেই সময় বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশে অতীতে কখনোই এমন সরাসরিভাবে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দেখা যায়নি।
কেমন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
২০০৬ সালে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হতে অসম্মতি জানান। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক প্রকল্পের ত্রুটিবিচ্যুতি আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। সেই প্রকল্প অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার তালিকায় ছিলেন (পূর্ববর্তী ব্যক্তি রাজি না হলে পরবর্তী ব্যক্তি):
১. সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি;
২. তাঁর পূর্ববর্তী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি;
৩. আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
৪. তাঁর পূর্ববর্তী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
৫. তাঁদের কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি দ্বারা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যত দূর সম্ভব পরামর্শক্রমে একজন বিশিষ্ট নাগরিক
৬. তাঁদের কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি স্বয়ং।
এ প্রকল্পের সবচেয়ে দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ দিক ছিল, তালিকার ৬ জনের মধ্যে ৫ জনই ছিলেন ‘স্বয়ংক্রিয়’ পছন্দ। এ ক্ষেত্রে বাছাই করার কোনো অবকাশ ছিল না। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ প্রকারান্তরে হয়ে দাঁড়িয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ে প্রধান বিচারপতি কে হবেন কিংবা আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে—এ সমীকরণের খেলা। এর ফলে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকার কথা যে বিচার বিভাগের, সেটাকে এনে ফেলা হয় রাজনীতির ময়দানে।
প্রধান উপদেষ্টার পদ নিয়ে পাটিগণিতের লড়াই
আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও ২০০৪ সালে চারদলীয় জোট সরকার সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসর নেওয়ার বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করে। এ পরিবর্তনের ফলে তৎকালীন সরকারের ‘পছন্দের লোক’ সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
বিরোধীদের আপত্তির মুখে কে এম হাসান দায়িত্ব না নেওয়ার কথা জানালে বিকল্প অনুসন্ধান না করেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হন। কারও কারও মতে, এ ঘটনার সূত্র থেকে দেশে রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয়, যার পরিণতিতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে নতুন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।
যে বিষয়টা অনেকেরই জানা নেই তা হলো, ‘পছন্দের ব্যক্তি’কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে পাওয়ার পাটিগণিতের হিসাব আওয়ামী লীগ করেছিল আরও ছয় বছর আগে। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি কে এম হাসান ও বিচারপতি সৈয়দ জে আর মুদাচ্ছির হোসেনকে ডিঙিয়ে বিচারপতি এম রুহুল আমিনকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে এটি করা হয়েছিল। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রথা যদি অব্যাহত থাকত, তাহলে বিচারপতি এম রুহুল আমিনই ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতেন।
গণতন্ত্রের জন্য কি এই ব্যবস্থা অপরিহার্য
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল ক্ষমতাসীনদের যেকোনো উপায়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেতার প্রচেষ্টাকে থামানোর জন্য। এরশাদের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপক ভোট চুরি ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল। এর ফলে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের নির্বাচনের প্রশ্নে দলমত-নির্বিশেষে সবাই একমত হয়।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে সব দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মতৈক্যের ভিত্তিতে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। পরপর দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার সফলভাবে দায়িত্ব পালনের ফলে মানুষ একে স্থায়ী সমাধান ভেবে স্বস্তি পেয়েছিলেন।
২০১১ সালে এক চরম বিতর্কিত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পর বাংলাদেশে কারচুপি ও জাল-জালিয়াতির নির্বাচনের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসে। বিগত তিনটি নির্বাচন যেভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অত্যাবশ্যকতার বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে নয়া বিবেচনা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রধান দুর্বলতাগুলো ছিল প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রশ্নে স্বয়ংক্রিয় পছন্দের ব্যবস্থা, তাতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় বিকল্পের সুযোগ না রাখা, বিচার বিভাগের রাজনীতিকীকরণ, সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট না থাকা ইত্যাদি। এসবের আলোকে সংবিধান সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে তাতে রয়েছে তত্ত্বাবধায়কের বদলে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ নামকরণ, সরকারের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৯০ দিন, উপদেষ্টার সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ জন করা।
কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ এ-সংক্রান্ত যে প্রস্তাব করেছে তার সারাংশ অনেকটা এ রকম:
১. জনপ্রতিনিধিদের প্রাধান্য বজায় রেখেই রাষ্ট্রের তিন বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত একটি ৯ (নয়) সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন। এনসিসির ৯ (নয়) সদস্যের মধ্যে ন্যূনতম ৭ (সাত) সদস্যের সিদ্ধান্তে এনসিসির সদস্য ব্যতীত নাগরিকদের মধ্য থেকে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
২. উপরিউক্ত পদ্ধতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে, সব অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিবৃন্দের মধ্য থেকে একজনকে এনসিসির ৯ (নয়) সদস্যের মধ্যে ন্যূনতম ৬ (ছয়) সদস্যের সিদ্ধান্তে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
৩. উপরিউক্ত পদ্ধতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে এনসিসির সব সদস্যের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এভাবে তিন ধাপে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সম্ভব না হলে সবশেষে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিরা ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা ক্রমানুসারে ঠিক আগের মতোই বিভিন্ন ধাপে স্বয়ংক্রিয় পছন্দ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হবেন।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সাতটি ধাপের মধ্যে পাঁচটিতেই বিচার বিভাগকে জড়িয়েছে। তার ওপর শেষোক্ত চারটি ধাপে আগের মতো করেই স্বয়ংক্রিয় পছন্দ হিসেবে সাবেক বিচারপতিদের রেখেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের এই সুপারিশ বিবেচনাপ্রসূত হয়েছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
মনে রাখতে হবে, আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সাধারণভাবে বিভক্ত ও সমঝোতায় অনাগ্রহী। এ রকম পটভূমিতে ৯ সদস্যের এনসিসি কতটা কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সেটা নিয়েও ভাবতে হবে। এনসিসির গঠনে দেখা যায়, তাতে সরকার ও বিরোধী উভয় দলের কমপক্ষে তিনটি করে ভোট থাকবে। এর ফলে যেকোনো পক্ষ চাইলে প্রথম ধাপে ৭ ভোটে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ আটকে দেওয়া সম্ভব। একইভাবে অপর পক্ষও দ্বিতীয় ধাপে ৬ ভোটে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। এমনটা হলে তৃতীয় ধাপে সর্বসম্মত নিয়োগের আশা দুরাশামাত্র।
এরপর ঠিক আগের মতোই স্বয়ংক্রিয় পছন্দ হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকেই প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। ব্যাপারটা কষ্টকল্পনা মনে হতে পারে; কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎকে গণিতের সংখ্যায় দেখতে পারার ক্ষমতা ও একগুঁয়েমিকে উপেক্ষা করা করা ঠিক হবে না।
মিল্লাত হোসেন সংবিধান ও আইন বিষয়ে লেখক ও গবেষক