চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দরকার এখন কার্যকর পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ
Published: 5th, April 2025 GMT
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে বিভিন্ন দেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছেন, তাতে দেশটিতে পণ্য রপ্তানিকারক সব দেশই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ যেমন এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তেমনি আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এ কারণে এককভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ে আমি খুব বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নই। তবে আমি মনে করি, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সরকারকে ত্বরিত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি আমরা যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানি করি, আমাদেরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ নিয়ে কথা বলে আসছি। কিন্তু এ দুটি বিষয় বাস্তবায়নে খুব বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখন সময় এসেছে নতুন এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন বাজার খোঁজার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যপূর্ণ পোশাক তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। সরকারের দিক থেকেও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ত্বরিত কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথমত, ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক কমাতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা, প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ ও নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন খরচ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ শিল্পের অবকাঠামো–সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে যেসব পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা পণ্যের তালিকায় এমন কিছু পণ্য রয়েছে, যেগুলো খুব বেশি আমদানি হয় না; কিন্তু এসব পণ্যের আমদানি শুল্ক অনেক বেশি। যেসব পণ্য আমরা নামমাত্র আমদানি করি, সেগুলোর উচ্চ শুল্ক পুনর্বিবেচনা করতে পারে সরকার। এরই মধ্যে তৈরি পোশাকের কাঁচামাল তুলা আমদানির ক্ষেত্রে সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউস বা শুল্কমুক্ত আমদানি–সুবিধা দিয়েছে। এটি সরকারের ভালো সিদ্ধান্ত। একই ভাবে পণ্য রপ্তানির অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির খরচও কমানো দরকার।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে দেশটির বড় ক্রেতারা এখন আমাদের দেশ থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দাম কমিয়ে দিতে পারেন। সেই ধাক্কা বা সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের কার্যকর পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সেটি করতে হলে সবার আগে কমাতে হবে উৎপাদন খরচ। এ জন্য শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে উন্নতি ঘটাতে হবে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের। উদ্যোক্তারা যাতে তাঁদের ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত নিতে পারেন, সে জন্য সরকারি নীতি ও কার্যক্রমগুলোকে সহজ করতে হবে। বর্তমানে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগে খরা চলছে। এ অবস্থায় দেশি উদ্যোক্তরা যাতে নতুন বিনিয়োগে উৎসাহী হন, সরকারকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের দিক থেকে নীতি ও অবকাঠামো–সহায়তা পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে উদ্যোক্তারা উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে পারবেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে আমাদের উচ্চ মূল্যের পণ্য তৈরির দিকে যেতেই হবে। এ জন্য ডিবিএল গ্রুপের পক্ষ থেকে আমরা সেদিকে ধাবিত হওয়ার পরিকল্পনা করছি। এরই মধ্যে বিশ্বের বড় ক্রেতাদের সঙ্গেও আমরা এ নিয়ে কথা বলছি। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদেরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেদিকে আমাদের গভীরভাবে নজর রাখতে হবে। সব মিলিয়ে আমি মনে করি, আমাদের আলাদাভাবে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আলোচনা বা সমঝোতাচেষ্টার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের প্রস্তুতিগুলো নিতে হবে।
বিশ্ববাণিজ্যে আমাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা আসবেই। তাই আমি মনে করি, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে আমাদের শক্তিশালী পেশাদার একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা দরকার। যেটি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে পেশাদারির ভিত্তিতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে গবেষণালব্ধ সহায়তা করবে।
এম এ জব্বার
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিবিএল গ্রুপ
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: র পদক ষ প ন পদক ষ প ন ত ক র যকর সরক র র আম দ র ব যবস আমদ ন
এছাড়াও পড়ুন:
শেরপুরে প্রশাসনের নজরদারি, তারপরও ১৫০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা
প্রশাসনের নজরদারি ও অভিযানের মধ্যেও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ঈদের পাঁচদিন পরও শেরপুর থেকে ময়মনসিংহের ভাড়া ১৫০ টাকা বেড়ে ৩০০ টাকা হয়েছে। এতে সাধারণ যাত্রীরা ভীষণ বেকায়দায় পড়েছেন। পাশাপাশি যাত্রীরা ভাড়া বেশি দিয়েও সেকথা বলতে পারছেন না ভয়ে। কারণ সংঘবদ্ধ একটি দালাল চক্র অটোরিকশা স্ট্যান্ডে অতিরিক্ত ভাড়ার প্রতিবাদ করলে যাত্রীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে অপমান করছেন। ফলে কেউ মান -সম্মানের ভয়ে মুখ খুলতে চাচ্ছেন না।
এ চিত্র শুধু শহরের সদর থানার সামনে ময়মনসিংহগামী স্ট্যান্ডে নয়, শেরপুরের সকল সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ডে একই চিত্র।
স্বজনদের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। শেরপুরের ওপর দিয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজীবপুর, চিলমারী ও জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও সানন্দাবাড়ির হাজারো মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন। ঈদের আগে এবং পরে প্রশাসন ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। জরিমানাসহ শাস্তিও দেওয়া হয়। এতে ভাড়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু শুক্রবার থেকে কর্মস্থলমুখী যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার সিন্ডিকেট ও চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু করে। খবর পেয়ে অভিযান চললেও এক স্ট্যান্ডের খবর অন্য স্ট্যান্ডে ফোনে জানিয়ে দেয় সিন্ডিকেট চক্র। ফলে যে স্ট্যান্ডে আধাঘণ্টা বা এক ঘণ্টার অভিযান চলে সেখানে ভাড়া সহনীয় হলেও অপরপ্রান্তে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় চলতে থাকে। আবার তদারকি দলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চলে আসার পর ফের শুরু হয়ে যায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। ফলে প্রশাসনের একার পক্ষে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, শেরপুর-ময়মনসিংহের দূরত্ব ৬৯ কিলোমিটার। এখানে ঈদের আগে ১৫০ টাকা ভাড়া ছিল। সেই ভাড়া বেড়ে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ৩০০ টাকা। স্ট্যান্ডগুলোতেও উপচে পড়া ভিড়ের সুযোগে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিন চাকার এ ভয়ঙ্কর যানে কর্মস্থলে ফিরছে যাত্রীরা।
শনিবার সকালে কথা হয়, গার্মেন্টস কর্মী মিনা বেগমের সঙ্গে। তিনি ও তাঁর আরও দুই সহকর্মী গাজীপুর যাবেন। রোববার সকালে তাঁকে কর্মস্থলে হাজির হতে হবে। ঈদে সিএনজি দিয়ে এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে শেরপুরে। বাসের টিকিট না পেয়ে ঈদের পরেও ময়মনসিংহ যাচ্ছেন। সেখান থেকে বাস অথবা অন্য কোনো যানে যাবেন কর্মস্থলে। ওই নারী জানান, তাদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হবে। আসার সময় ১৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে এসেছেন। ঈদের পাঁচ দিন পরও ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
আরেক গার্মেন্টস কর্মী সুরাইয়া জাহান বলেন, তারা স্বল্প আয়ের কর্মী। কর্মস্থলে সঠিক সময়ে না গেলে বিপদে পড়বেন। কিন্তু যেভাবে ১৫০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে তাতে তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।
আকমল হোসেন চাকরি করেন একটি বেসরকারি ফার্মে। যাবেন ভালুকায়। তিনি বলেন, আসার সময় ময়মনসিংহ থেকে শেরপুর পর্যন্ত ভাড়া দিয়েছি ১৫০ টাকা। ফেরার সময় ৩০০ টাকা চাচ্ছে। কেন ৩০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে এক চালক ও কিছু লোক অকথ্য ভাষায় কথা বলেছে এবং গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছে। লজ্জায় কাউকে বলতে পারছিন না।
এ ব্যাপারে অটোচালক আশরাফ আলীর ভাষ্য- গত কয়েকদিন যাবত লাইন দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে গ্যাস নিতে হচ্ছে। সেখানে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। আবার গ্যাসের থেকে হাওয়া বেশি দেয়। এছাড়া ময়মনসিংহ যাওয়ার পর ফেরার সময় যাত্রী পাওয়া যায় না। তাই ভাড়া বেশি না নিলে তাদের কিছুই থাকে না।
চালক হাবিবুর রহমান বলেন, সিএনজি স্টেশনে গিয়ে গ্যাস নিতে হলে জীবন যায়। মালিকরা দিনশেষে ভাড়া এক টাকাও কম নেন না। তাহলে আমরা চলব কিভাবে।
শহরের খোয়ারপাড় মোড়ে রৌমারী থেকে আসা যাত্রী আবুল হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, আগে রৌমারী থেকে ২৫০ টাকায় শেরপুর আসতাম। আজ ৩০০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। একই এলাকার শেরপুর শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়িগামী অটোচালকরা ১০-৩০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ যাত্রীদের। একই অবস্থা শহরের থানামোড়ে শেরপুর, জামালপুর ও নকলা, চন্দ্রকোনা স্ট্যান্ডে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ডে নজরদারি ও অভিযান চলছে। বাড়তি ভাড়া নেওয়ায় জরিমানা করা হচ্ছে। চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখা হচ্ছে না। এ অভিযান চলমান থাকবে বলে জানান তিনি।