বিএসইসি লাভে ফিরলেও ভোগাচ্ছে বিপণন দুর্বলতা
Published: 5th, April 2025 GMT
টানা তিন বছর লোকসান দেওয়ার পর লাভে ফিরেছে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি)। বিএসইসি সূত্র বলছে, গত অর্থবছরে (২০২৩–২৪) তারা ৭৮ কোটি টাকা লাভ করেছে। তবে বিপণন দুর্বলতার কারণে করপোরেশনটির তিনটি কারখানা এখনো লোকসানে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষার ২৮ বছরের (১৯৯৬–৯৭ থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়ের শুরুর দিকে বিএসইসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৯৯–২০০০ সালে করপোরেশনটি প্রথম লাভে আসে। তারপর টানা ২১ বছর তারা লাভে ছিল। ২০২০–২১ অর্থবছরে এসে এটি লোকসানে পড়ে। টানা তিন বছরে (২০২০–২১ থেকে ২০২২–২৩ অর্থবছর) ২৬ কোটি টাকা লোকসান দেয় তারা। অবশ্য সেই লোকসান কাটিয়ে এবার লাভে ফিরল করপোরেশনটি।
বিএসইসির চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে প্রথম আলোকে জানানো হয়েছে, বিপণন ব্যবস্থাপনায় পেশাদারি আনা, কারখানার জন্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা, ক্রয়–বিক্রয়সহ অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা ও তদবির ঠেকাতে পারায় লাভে ফেরা সম্ভব হয়েছে।
বিএসইসির অধীন বর্তমানে নয়টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। মূলত এসব কারখানার লাভ–লোকসানের ওপরই বিএসইসির সাফল্য–ব্যর্থতা নির্ভর করে।যেভাবে লাভে ফিরলবিএসইসির অধীন বর্তমানে নয়টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। মূলত এসব কারখানার লাভ–লোকসানের ওপরই বিএসইসির সাফল্য–ব্যর্থতা নির্ভর করে। দীর্ঘ সময় লাভে থাকা অবস্থায় ২০২০–২১ অর্থবছরে বিএসইসি যখন লোকসানে পড়ে, তখন তাদের নয়টির মধ্যে চারটি কারখানা লোকসান দেয়। গত অর্থবছর যখন লাভে ফিরল, তখন তাদের লোকসানি কারখানার সংখ্যা কমে তিনটি হয়েছে। লোকসানে থাকা কারখানাগুলোর লোকসানের পরিমাণও কমেছে।
২০২০–২১ অর্থবছরে বিএসইসির যে পাঁচ কারখানা লাভ করেছিল, তাদের লাভের পরিমাণও ছিল সীমিত, যা টাকার অঙ্কে ছিল পাঁচ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে কারখানাগুলোর লাভও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি লাভ বেড়েছে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের, যারা গাড়ি উৎপাদন করে থাকে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের ২০২০–২১ অর্থবছরে লাভ ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা, সেখানে কারখানাটি গত অর্থবছরে লাভ করেছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। মূলত এই কারখানাই বিএসইসিকে বড় লাভে নিয়ে এসেছে।
যেকোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়তে পারে। তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে সেই লোকসান কাটিয়ে লাভে ফেরা সম্ভব। অধ্যাপক আলী আক্কাস, সাবেক চেয়ারম্যান, ব্যবসায় গবেষণা ব্যুরো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো.
২০২২–২৩ অর্থবছরে ন্যাশনাল টিউবস প্রায় ২ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল। এটি গত অর্থবছর লাভ করেছে ৮ কোটি টাকার বেশি। এই কারখানায় এমএস, জিআই, এপিআই পাইপ তৈরি করা হয়। বিএসইসি চেয়ারম্যান দপ্তর জানায়, কাঁচামালের অভাবে এই কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। যে প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানির দায়িত্ব পেয়েছিল, তারা যোগ্য ছিল না এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। একপর্যায়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দেড় কোটি টাকার বেশি জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নতুন আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। ন্যাশনাল টিউবসের মতো বিএসইসির অন্য কোনো কারখানায় কাঁচামালের অভাবে যেন উৎপাদন বন্ধ না হয় বা দেরি না হয়, সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিএসইসি কর্মকর্তারা বলছেন, লোকসান কাটিয়ে ওঠার জন্য বিএসইসি ও বাইরের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দল গঠন করা হয়। তারা লোকসানের কারণ অনুসন্ধান করেছে এবং সমাধান সুপারিশ করেছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কাজ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্রয়–বিক্রয়, কারখানায় কী পরিমাণ পণ্য আছে ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ কাজ নিজস্ব সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা গেছে। তদবিরের ভিত্তিতে নয়, কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বোর্ডের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় বিএসইসিকে লাভে ফেরাতে সহযোগিতা করেছে।
সামগ্রিকভাবে বিএসইসি লাভে ফিরলেও গত অর্থবছরে তাদের তিনটি কারখানা লোকসান দিয়েছে। সেগুলো হলো গাজী ওয়্যারস, ইস্টার্ন টিউবস ও এটলাস বাংলাদেশ।বিপণন দুর্বলতায় তিন কারখানা লোকসানেসামগ্রিকভাবে বিএসইসি লাভে ফিরলেও গত অর্থবছরে তাদের তিনটি কারখানা লোকসান দিয়েছে। সেগুলো হলো গাজী ওয়্যারস, ইস্টার্ন টিউবস ও এটলাস বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এসব কারখানা লোকসানে পড়েছে।
বিএসইসির উৎপাদনে থাকা নয়টি কারখানার বাইরে বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেড নামের আরও একটি কারখানা রয়েছে। যারা সোর্ড ব্র্যান্ডের ব্লেড উৎপাদন করে। তবে কারখানার আধুনিকায়ন কাজের জন্য ২০১৯ সাল থেকে এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু সাঈম প্রথম আলোকে বলেন, নভেম্বর নাগাদ তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনের আশা রয়েছে। উৎপাদনে গেলে তাদের লাভে ফেরা সম্ভব।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে লাভে ফেরা সম্ভববিএসইসির লোকসান থেকে লাভে ফেরার বিষয়টি ইতিবাচক উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় গবেষণা ব্যুরোর সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী আক্কাস প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়তে পারে। তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে সেই লোকসান কাটিয়ে লাভে ফেরা সম্ভব।
কোনো প্রতিষ্ঠান লাভে থাকলে কর্মসংস্থান হয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায় এবং আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমায়, যা একটি দেশের জন্য ভালো বলেও উল্লেখ করেন আলী আক্কাস।
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: প রথম আল ক ব এসইস র ল ভ কর ছ দ র বলত র জন য করপ র ব পণন
এছাড়াও পড়ুন:
ঘাটতির শঙ্কায় রাজস্ব আদায় নিয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের উদ্বেগ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজস্ব আদায়ে গতি ফিরে এলেও বছর শেষে একটি বড় ধরণের রাজস্ব ঘাটতির সম্মুখীন হতে চলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাথে একটি ঋণ চুক্তির মধ্যে রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় রাজস্ব আয়ের একটি টার্গেটও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের হার যেভাবে এগুচ্ছে তা এই টার্গেট পূরণ করা সম্ভব হবে না। ফলে ঋণের বাদবাকি কিস্তি সংস্থাটির কাছ থেকে পেতে বেশ বেগ পেতে হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এনবিআর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। তা স্বত্বেও গত আট মাসে ২ লাখ ৮০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ৫৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৮১৭ টাকা। কিন্তু আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। টার্গেট অনুযায়ী রাজস্ব ঘাটতি ২১ শতাংশ কম ছিল।
অন্যদিকে, আগের অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৯৭১ কোাটি টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায় হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে টানা তিন মাস রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুসারে, ফেব্রুয়ারি মাসে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ, যা এর আগের মাস জানুয়ারিতে ছিল প্রায় ৭ শতাংশ।
এ বিষয়ে এনবিআর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোন গবেষণা ছাড়াই প্রতিবছর একটি বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের টার্গেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বছর শেষে এসে দেখা যায়, মূল্য লক্ষ্যমাত্রা তো দূরের কথা সংশোধিত আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, “বিভিন্ন পণ্য দাম কমানোর জন্য এই সকল পণ্য’র ওপর কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে করে রাজস্ব আদায় কমে গেছে। তবে বছরের বাদবাকি সময়ে এই আদায় আরও বাড়বে বলে আমাদের ধারণা।”
এদিকে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় হোক বা না হোক, আগামী তিন অর্থবছরের জন্য মোট ১৮ লাখ ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেওয়া হবে এনবিআরকে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্বখাত থেকে আয় করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে আসবে পাঁচ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে এনবিআর থেকে আসবে পাঁচ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০২৭-২০২৮ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাত লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে আদায়ের পরিকল্পনা প্রাক্কলন করা হয়েছে ছয় লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
এদিকে, বাজেট পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিবছর বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে মূল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, সেটি অর্জন করা তো দূরের কথা, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্জন করা সম্ভব হয় না। গত আট অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এর মধ্যে এনবিআর-এর আওতাধীন রাজস্ব ঘাটতিই সবচেয়ে বেশি। আর এই ধরণের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে একধরণের ‘সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।
ঢাকা/টিপু