ভারতজুড়ে ওয়াক্ফর বিপুল সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিতেই কি সংশোধনী আনল বিজেপি সরকার
Published: 5th, April 2025 GMT
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জেইন শহরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাড়ি, দোকান ও শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদসহ প্রায় ২৫০টি সম্পত্তি ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ২ দশমিক ১ হেক্টর জমি (৫ দশমিক ২৭ একর) খালি করতে এসব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এসব সম্পত্তির মালিক মধ্যপ্রদেশ ওয়াক্ফ বোর্ড। ‘ওয়াক্ফ’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে স্থাবর–অস্থাবর সম্পত্তি—মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কবরস্থান, এতিমখানা, হাসপাতাল এমনকি খালি জায়গা—সবকিছু ধর্মীয় ও দাতব্য কাজের জন্য আল্লাহর নামে দান করা। এসব সম্পত্তি স্থানান্তর ও বিক্রয় করা যাবে না বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।
কিন্তু উজ্জেইনে ওয়াক্ফ বোর্ডের সম্পত্তি কথিত মহাকাল করিডর নির্মাণের জন্য খালি করা হয়েছে। শহরের বিখ্যাত মহাকালেশ্বর মন্দিরের আশপাশে ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের জন্য এই ভূমি খালি করা হয়েছে।
২০ কোটির বেশি মুসলিমের বসবাস ভারতে। এই দেশে বিপুল পরিমাণ ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে। এসব সম্পত্তিতে ৮ লাখ ৭২ হাজারের বেশি স্থাপনা রয়েছে, যাতে জমির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৫ হাজার হেক্টর (১০ লাখ একর)। এসব সম্পদের দাম প্রায় ১ হাজার ৪২২ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতিটি রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত ওয়াক্ফ বোর্ড এসব সম্পত্তি দেখাশোনা ও পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়া রয়েছে কেন্দ্রীয় ওয়াক্ফ বোর্ড।
শহর ও নগর এলাকায় ওয়াক্ফ বোর্ড হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বেশি জমির মালিক প্রতিষ্ঠান। আর সব মিলিয়ে হিসাব করলে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও রেলওয়ের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ ভূমির মালিক হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান।
ওয়াক্ফর সম্পত্তিতে ৮ লাখ ৭২ হাজারের বেশি স্থাপনা রয়েছে, যাতে জমির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৫ হাজার হেক্টর (১০ লাখ একর)। এসব সম্পদের দাম প্রায় ১ হাজার ৪২২ কোটি মার্কিন ডলার।ভারতের বিজেপি সরকার কয়েক দশকের পুরোনো ওয়াক্ফ আইনে সংশোধন আনতে দীর্ঘদিন ধরে তৎপরতা চালাচ্ছিল। গত বুধবার এই লক্ষ্যে লোকসভায় বিতর্কিত ওয়াক্ফ (সংশোধনী) বিল পাস করা হয়েছে। পরে গত বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায়ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিজেপি সরকার অনায়াসে বিলটি পাস করিয়ে নিয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে ওয়াক্ফ আইনে ওয়াক্ফ বোর্ড এসব সম্পত্তির সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এই সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার পুরো ক্ষমতা এই বোর্ডের। নরেন্দ্র মোদির সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রস্তাবিত বিলে ওয়াক্ফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নজিরবিহীনভাবে সরকারের হাতে চলে যেতে পারে।
নতুন প্রস্তাবিত সংশোধনী আইন মসজিদ ও দরগাহের জমি দখলের শুরু মাত্রসঞ্জয় সিং, সংসদ সদস্য, আম আদমি পার্টিমুসলিমরা অভিযোগ করছেন, মোদির প্রশাসন সংসদের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে আরও প্রান্তিক অবস্থায় নিয়ে যেতে চাইছে।
এমনকি নানা টেলিভিশন বিতর্ক, কিছু সমাজকর্মী ও আইনজীবীদের বক্তব্যে মধ্যপ্রদেশের উজ্জেইন শহরের ঘটনাকে গভীরতর সমস্যার একটি উদাহরণ বলে উঠে এসেছে। তাঁরা বলছেন, ওয়াক্ফ বোর্ডের দীর্ঘদিনের জর্জরিত সমস্যা, বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনার কারণে এসব সম্পদ বেহাত হয়ে যেতে পারে। ওয়াক্ফ আইন সংশোধনের ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কাই বেশি।
কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট সংশোধনের জন্য আনা ওয়াক্ফ বিলের বিরোধিতা করে আসছিল। সংসদের উভয় কক্ষে বিলটি পাসের বিপক্ষে ভোটও দিয়েছে তারা। তবে বিজেপি তার শরিকদের নিয়ে এই সংশোধনী পাস করিয়ে নিয়েছে।
সরাসরি লঙ্ঘন
আয়তনে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য মধ্যপ্রদেশে গত ২২ বছরের মধ্যে বেশির ভাগ সময় ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত দলটি রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল না। ওই সময় মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ক্ষমতা ছাড়তে হয় কংগ্রেসকে।
শহর ও নগর এলাকায় ওয়াক্ফ বোর্ড হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বেশি জমির মালিক প্রতিষ্ঠান। আর সব মিলিয়ে হিসাব করলে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও রেলওয়ের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ ভূমির মালিক হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান।২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন উজ্জেইনের রাজনীতিক বিজেপির নেতা মোহন যাদব। এই রাজ্যে ২০২৮ সালে অনুষ্ঠেয় কুম্ব মেলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ওই বছর শিপ্রা নদীর তীরে কুম্ব অনুষ্ঠিত হবে। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় এই উৎসব মহাকুম্ব প্রতি ১২ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়। কুম্ব তীর্থযাত্রীদের অবস্থানের জন্য মহাকালেশ্বর মন্দিরের আশপাশে ওয়াক্ফ বোর্ডের সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে সরকার দখল করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমালোচকেরা বলছেন, রাজ্য সরকার ১৯৮৫ সালের নথিপত্রকে অগ্রাহ্য করেছে। যে নথি থেকে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত যে উজ্জেইনের ওই এলাকায় মুসলিম কবরস্থান ও ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে। সেখানে প্রায় দুই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারতেন। বছরের পর বছর ধরে সেখানে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলো আবাসিক এলাকা তৈরি করতে অবৈধভাবে জমির প্লট বিক্রি করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে গত জানুয়ারিতে ২৫০টি স্থায়ী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আল–জাজিরার হাতে সরকারের ভূমি অধিগ্রহণের নথিপত্র এসেছে। তাতে দেখা যায়, উজ্জেইনের রাজস্ব বিভাগের একজন কর্মকর্তা ওয়াক্ফ সম্পত্তি অধিগ্রহণের রাজ্য প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আপত্তি জানান। তিনি তাঁর নোটে লেখেন, এখানকার বাসিন্দারা ১৯৮৫ সালের একটি গেজেট নোটিফিকেশন দেখিয়েছেন, যাতে প্রমাণিত হয় ওই সম্পত্তি ওয়াক্ফ বোর্ডের।
ওই কর্মকর্তা পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন, ওই সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে হলে ওয়াক্ফ বোর্ড থেকে ‘অনাপত্তিপত্র’ নেওয়া উচিত। অবশ্য এক মাস পর উজ্জেইন জেলা প্রশাসন একটি আদেশ জারি করে জানায়, ‘সামাজিক কাজে কোনো ভূমি অধিগ্রহণ করতে হলে অনুমতিপত্র’ লাগে না।
ওয়াক্ফর ১ হাজার ১৪টি সম্পদের মধ্যে সরকারের মালিকানায় তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৩৬৮টি, ব্যক্তিমালিকানায় ৪৫৪টি এবং ১৯২টি সম্পত্তির রেকর্ড হয় অসম্পন্ন নয়তো রেকর্ডই নেইআশার ওয়ার্সি, আইনজীবী, মধ্যপ্রদেশের হাইকোর্টআইনজীবী সোহাইল খান বলেন, ‘এই অধিগ্রহণ ওয়াক্ফ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।’ এই আইনজীবী উজ্জেইনের ওয়াক্ফ সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহণ করার বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
গত জানুয়ারিতে যাঁদের বাড়ি ও দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সরকার অবশ্য তাঁদের ৩৩ কোটি রুপি (৩৮ লাখ মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। শহরের অনেক বাসিন্দা তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, ওয়াক্ফ বোর্ড কেন তখন ওই অর্থ দাবি করেনি। কারণ, দোকানপাট ও বাড়িঘর করতে অবৈধভাবে ওই সব ব্যক্তি ওয়াক্ফ বোর্ডের জায়গা দখল করেছিলেন।
কথিত মহাকাল লোক করিডরের জন্য উজ্জেইন জেলা প্রশাসন ২০২১ সালে নিজামুদ্দিন কলোনির বাড়িঘর ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেয়.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: র জন য ফ আইন ক ষমত বছর র মসজ দ এসব স সরক র
এছাড়াও পড়ুন:
পাটুরিয়ায় কর্মস্থলমুখী মানুষের ভিড়
প্রিয়জনদের সাথে ঈদের ছুটি শেষ করে কর্মস্থলে ছুটছে মানুষ। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে চাপ কমলেও গাজীপুর ও রাজধানী ঢাকার সাভার, আশুলিয়া অঞ্চলের কর্মজীবিরা এ নৌরুটটি ব্যবহার করেন। ফলে পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় রাজধানী ঢাকামুখী যানবাহন ও যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে।
ইকবাল হোসেন সাভারের ইপিজেড এলাকায় একটি বেসরকারি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। পরিবার নিয়ে ঈদের ছুটিতে ফরিদপুর গিয়েছিলেন। ইকবাল হোসেন বলেন, “কাল থেকে অফিস খোলা। ঘাট এলাকায় যানবাহন ও যাত্রীদের অনেক ভিড়। ফেরি পার হতে তেমন সময় লাগেনি, তবে ফেরিতে উঠতে সময় লেগেছে। ফেরি পার হয়ে ঘাট এলাকায় এসেছি।”
মরিয়ম বেগম রাজবাড়ী থেকে যাচ্ছেন বলিভদ্র এলাকায়। তিনি বলেন, “লোকাল পরিবহনে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় আসছি। ভিড়ে ফেরিতে উঠতে পারিনি, লঞ্চ ঘাটেও ভিড়। পরে ভিড় ঠেলে লঞ্চে পার হয়েছি। এখন পাটুরিয়া ঘাট থেকে নবীনগর যাবো, তারপর অন্য পরিবহনে বলিভদ্র যাবো। ঘাট এলাকায় অনেক ভিড়।”
ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার নিয়ে ইস্তিয়াক আহমেদ গাজীপুর যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় পৌঁছাতে ৪০ মিনিট সময় লেগেছে। তবে দৌলতদিয়া প্রান্তে ফেরিতে উঠতে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।”
গোল্ডেন লাইন পরিবহনের বাসচালক ইসমাইল মিয়া বলেন, “পরিবহনসহ লোকাল বাসে আজ ভিড় বেশি। ঘাট এলাকায় যানবাহনের সিরিয়ালও বেশি। ফেরি সবগুলো চললেও যানবাহনের ভিড় বেশি থাকায় পারাপারে সময় বেশি লাগছে।”
পাটুরিয়া লঞ্চ ঘাটের ব্যবস্থাপক পান্না লাল নন্দী বলেন, “সকাল থেকেই দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া লঞ্চ রুটে যাত্রীদের ভিড় রয়েছে। দৌলতদিয়ায় লঞ্চগুলো যাওয়ার সাথে সাথে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে যাত্রীরা উঠে পড়ছেন। এ নৌরুটে যাত্রী পারাপারে বিশটি লঞ্চ চলাচল করছে।”
শনিবার (৫ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম ( বাণিজ্য) নাসির মোহাম্মদ চৌধুরী বলেন, “সকাল থেকেই পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের দৌলতদিয়া প্রান্তে যানবাহন ও যাত্রীদের ভিড় রয়েছে। দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় যানবাহনগুলো সিরিয়ালে রয়েছে এবং এসব যানবাহন সিরিয়াল অনুযায়ী পার করা হচ্ছে। এ নৌরুটে ১৭টি ফেরি দিয়ে যানবাহন ও যাত্রীদের পারাপার করা হচ্ছে। নৌরুটে ভিড় বাড়লেও পর্যাপ্ত ফেরি চলাচল করায় বাড়তি চাপ নেই, কোন ভোগান্তি নেই।”
ঢাকা/চন্দন/টিপু