বিএনপি ও এনসিপি: কার আয়নায় কে দেখে মুখ
Published: 5th, April 2025 GMT
মাস কয়েক আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে নিয়মিত বাক্যুদ্ধ হতো। রাজনীতিতে বন্দুকযুদ্ধের চেয়ে বাক্যুদ্ধ শ্রেয়তর, যদি সেটি রুচি ও সীমার মধ্যে থাকে।
সাম্প্রতিককালে বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যেই বেশি বাক্যবাণের ঘটনা ঘটছে। প্রায় প্রতিদিনই এক দলের নেতা অপর দলের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর’ অভিযোগ আনছেন। দুই দলই একে অপরের অভিযোগ খণ্ডন না করে পাল্টা অভিযোগের তির ছুড়ছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা পরোক্ষভাবে প্রতিপক্ষের অভিযোগের ‘সত্যতা’ স্বীকার করে নিচ্ছে বলে ধারণা করি।
৩ এপ্রিল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপহারসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা ওরফে বুলু বলেছেন, ‘কিছু উপদেষ্টা আছেন, যাঁরা একসময় ছাত্ররাজনীতি করতেন, হলে-মেসে থাকতেন, টিউশনি করতেন। অথচ এখন তারা পাঁচ-ছয় কোটি টাকার গাড়িতে চড়েন, সঙ্গে আরও ৩০-৪০ কোটি টাকার গাড়ির বহর থাকে।'
উপদেষ্টারা যে গাড়িতে চড়েন, সেটা সরকারের। সে ক্ষেত্রে কোটি টাকার গাড়ির জন্য তাঁদের অভিযুক্ত করা যায় না। বিএনপির নেতা কিন্তু এমন কথা বলেননি যে তারা ক্ষমতায় এলে সস্তা দামের গাড়ি চড়বেন; বরং অতীতের অভিজ্ঞতা হলো প্রতিটি সরকার মন্ত্রী–উপদেষ্টাদের জন্য দামি মডেলের গাড়ি কেনেন। মন্ত্রীরা দামি গাড়িতে চড়লে সচিব, যুগ্ম সচিব, ডিসি–এসপিরাও চড়বেন। টাকা তো কারও পকেট থেকে যাবে না। যাবে জনগণের পকেট থেকে।
এনসিপি নেতাদের উদ্দেশ করে বুলু বলেন, ‘ওনারা প্রশাসনের ওপর ফোর্স করেন—অমুককে বদলি করতে হবে, অমুকখানে অমুককে দিতে হবে। সচিবরা বলেন, তাঁরা তাঁদের ওপর ফোর্স করেন। প্রকৌশলীদের চাপ দেওয়া হয়—অমুককে এ জায়গায় দিতে হবে, অমুককে এ কাজ দিতে হবে।’
জনাব বুলুর এই অভিযোগ অসত্য নয়। আবার এ–ও সত্য, যেখানে বিএনপির ক্ষমতা আছে, সেখানে বিএনপিও পছন্দসই লোকদের বদলি ও পদোন্নতি করাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীও একই কাজ করছে; হিসাব মেলালে দেখা যাবে, বিএনপির পাল্লাই ভারী।
বুলু সাহেব এই সুযোগে জামায়াতকেও একহাত নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যাঁরা ১৯৭১-কে অস্বীকার করেন, ৩০ লাখ শহীদের রক্তকে অগ্রাহ্য করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাশ কাটিয়ে কথা বলেন, তাঁরা জনগণের পক্ষে রাজনীতি করেন বলে আমরা মনে করি না। তাঁদের বাংলাদেশে ভোট চাওয়ার, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কিংবা রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।’
এর এক দিন আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায় সময় রাজনৈতিক কারণে হামলার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। অবাধ্য ও অপরাধী নেতা–কর্মীদের বিএনপি বহিষ্কার করলেও হিংস্র কার্যকলাপ চলছে। এই পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ঘোলাটে ও অস্থির করে তুলছে।
বিএনপির অন্তঃকোন্দলের জেরে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপি বলেছে, গত ৩০ মার্চ লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জে স্থানীয় ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সংঘর্ষে হামলার শিকার হন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলমের বাবা আজিজুর রহমান (বাচ্চু মোল্লা)। হামলায় তাঁর হাত ভেঙে যায় এবং তিনি গুরুতর আহত হন। উল্লেখ্য, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বাবা আজিজুর রহমান।
রাজনীতির মাঠের সব খেলোয়াড়ই প্রতিপক্ষের দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা আয়নায় নিজের মুখ দেখেন না। এনসিপি নেতারা বিএনপিকে নিয়ে এত বিচলিত না হয়ে নিজেরা যদি এক মাসের মধ্যে গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কাজটি শেষ করতেন, মানুষ তাদের নীতি–পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারতেন। একটি দল যাত্রা শুরুর এক মাস পরও গঠনতন্ত্র ও দলীয় স্লোগান ঠিক করতে পারল না, তাহলে মানুষ কীভাবে ভরসা রাখবে?এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতা–কর্মীরা এনসিপির কর্মী-সংগঠকদের নিয়মিত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়।
এদিকে জাতীয় নাগরিক কমিটির গবেষণায় জানা যায়, গত আট মাসে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের সংঘর্ষ ও হামলায় ৭০ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার জাতীয় নাগরিক কমিটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘নতুন বাংলাদেশ, পুরোনো বিএনপি।’
গত ৭ আগস্ট থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন খবর অনুসারে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের একটি তালিকা করা হয়েছে এবং অপরাধগুলো আর্থিক ও মৌখিক সহিংসতা (চাঁদাবাজি, হুমকি, দখল ইত্যাদি); শারীরিক সহিংসতা (ভাঙচুর, মারধর, সংঘর্ষ ইত্যাদি) এবং মৃত্যু—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এক দফার আন্দোলনে বিএনপির সম্ভবত ২২ কিংবা ২৭ জন নিহত হয়েছেন।
আরও পড়ুনসংস্কার কিংবা স্রেফ ‘ব্যালট পেপার হওয়ার’ স্বপ্ন২০ ঘণ্টা আগেঅথচ গত আট মাসে অনুকূল পরিবেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের দ্বারা ৭০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা রীতিমতো ভাবনার বিষয়। গত ২৪ মার্চ হাতিয়ায় এনসিপি নেতা হান্নান মাসউদ ও তাঁর সমর্থকদের ওপর হামলা হয়েছে। পরদিন তাঁর সমর্থকেরা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, মাসউদের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা হামলা করেছেন।
সম্প্রতি শতাধিক গাড়িবহর নিয়ে নিজের জেলায় নির্বাচনী প্রচারাভিযানে গিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। বিএনপির নেতারা তারও সমালোচনা করছেন। তবে এনসিপির মধ্যে কিছুটা হলেও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা আছে। সারজিস আলমের বিরাট গাড়িবহর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলেরই এক নেত্রী। সারজিস আলম জবাবও দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এতটুকু গণতন্ত্র চর্চা আছে বলে মনে হয় না।
ধারণা করি, জাতীয় নাগরিক কমিটির গবেষণা ও এনসিপির বিবৃতির জবাবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। দুই দলের নেতাদের এই পাল্টাপাল্টির কারণ ভোটের হিসাব–নিকাশ।
এনসিপি নেতারা বলে থাকেন, বিএনপি সংস্কার চায় না বলে নির্বাচন নিয়ে তাড়াহুড়া করছেন। কিন্তু ভেতরে–ভেতরে তাঁরাও নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। ঈদে বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা সম্ভাব্য নির্বাচনী এলাকায় গেছেন।
তবে বিএনপি নেতারাও নিজ নিজ এলাকায় জনসংযোগ করেছেন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির সামনে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে এনসিপি ও জামায়াতকে। তাদের ভয়, এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে যদি কোনো নির্বাচনী বোঝাপড়া হলে ভোটের হিসেব নিকেশ বদলে যেতে পারে।
এনসিপি নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছেন। রাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরি করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু দলের অনেক নেতার কণ্ঠে কিন্তু পুরোনো সুরই বাজছে। গত শুক্রবার কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বাগমারা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সমাবেশে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘বিগত দিনে শুনেছি, কুমিল্লা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি; কিন্তু আমরা বলতে চাই, কুমিল্লায় যেখানে আওয়ামী লীগ, সেখানেই গণধোলাই।’
রাজনীতির মাঠের সব খেলোয়াড়ই প্রতিপক্ষের দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা আয়নায় নিজের মুখ দেখেন না। এনসিপি নেতারা বিএনপিকে নিয়ে এত বিচলিত না হয়ে নিজেরা যদি এক মাসের মধ্যে গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কাজটি শেষ করতেন, মানুষ তাদের নীতি–পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারতেন। একটি দল যাত্রা শুরুর এক মাস পরও গঠনতন্ত্র ও দলীয় স্লোগান ঠিক করতে পারল না, তাহলে মানুষ কীভাবে ভরসা রাখবে?
সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক ও কবি
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: গঠনতন ত র এনস প র ব এনপ র উপদ ষ ট এক ম স র জন ত আওয় ম করত ন
এছাড়াও পড়ুন:
সংসদের আগেই গণপরিষদ নির্বাচন যে কারণে দরকার
নতুন নির্বাচিত সংসদই সংবিধানের সংশোধন করবে বলে গণপরিষদ নির্বাচনের দরকার নেই– এই কথা বলে প্রথাগত রাজনীতিবিদরা প্রকারান্তরে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। সংসদই মাতৃপ্রতিষ্ঠান; গণপরিষদ নয়– এসব বলার কারণ দেশে ’৯১ সাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থার নামে সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র চালু ছিল। সংসদীয় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র আসলে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে। কারণ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনের জোরে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করে ফেলা যায়; সেখানে গণভোটের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌমত্বের বদলে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। বিরোধটা এখানেই।
সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনে গণভোটের ব্যবস্থা না রেখে এবং জনগণের সঙ্গে সংলাপ ছাড়াই একটা রাজনৈতিক কাঠামো চাপিয়ে দিয়ে তাকেই দেশের শাসনতন্ত্র বলা অগণতান্ত্রিক। সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্বের কথা বলে জনগণকে শোষণ করার জন্যই নানা আইন পাসের সংসদীয় কাঠামো বাস্তবে জনগণের মৌলিক অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় কাজ করে না। তাই দরকার গণসার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে জনগণ প্রতিনিধি (সংসদ সদস্য) নির্বাচনের পরও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোট দিয়ে সংসদকে জবাবদিহি রাখবে। আবার এখন যেহেতু ডিজিটাল পদ্ধতি, স্মার্ট ফোন আছে, জনগণ অনলাইন ভোটের মাধ্যমেও মতামত প্রকাশ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি অংশ নিতে পারে। রাষ্ট্রপতিও নির্বাচিত হবেন জনগণের সরাসরি ভোটে। এভাবেই জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই আমূল পরিবর্তনের জন্য দরকার গণপরিষদ নির্বাচন বা সংবিধান সভা নির্বাচন। এই পরিষদ বা সভার কাজ হবে দেশের সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে জনতার মতামত নিয়ে নতুন গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করা।
এ ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি যেমন রাজনৈতিক কাঠামো কীভাবে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক হবে; আবার জনগণের মর্যাদা, অধিকার, বিকাশ ত্বরান্বিত করবে; সরকার পদ্ধতি কেমন হবে; সব ধরনের বৈষম্য কীভাবে কমিয়ে আনা যাবে; রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মাঝে ক্ষমতার বণ্টন ও ভারসাম্য; রাজনৈতিক দল গঠন ও নিবন্ধন নীতিমালা কেমন হলে সবার রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে– এসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের ভিত্তিতেই গঠনতন্ত্র বা সংবিধানের খসড়া তৈরি হবে। তারপর গণভোটে এই খসড়া পাস হলেই তাকে নতুন সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে এর ভিত্তিতে সংসদীয় নির্বাচন দিতে হবে।
কারণ সংসদের ভিত্তিতে সরকার গঠনের নির্বাচন আর গণপরিষদ নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা। সংসদ গঠিত হয় সংবিধানের ভিত্তিতে এবং সংসদ সেই গঠনতন্ত্রকে রক্ষার শপথ নিয়েই কাজ শুরু করে। সংসদ নির্বাচনের আইন, আসনের সীমানা, সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি এসবও সংবিধানের ভিত্তিতেই ঠিক হয়। গণপরিষদ নির্বাচন হয় সেই সংবিধান প্রণয়নের জন্য। ফলে সংসদ নির্বাচনের আগে দরকার গণপরিষদ নির্বাচন।
অনেকেই মনে করেন, আমাদের নতুন সংবিধান দরকার নেই। বিদ্যমান সংবিধানে কিছু ঘষামাজা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। সরাসরি সংসদ নির্বাচন দিয়ে সরকার গঠন করলেই আমাদের এখনকার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটা আসলে রাজনীতি বিজ্ঞান এবং আধুনিক বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সম্পর্কে কম বোঝাপড়ার কারণে হতে পারে। সংসদ নির্বাচন হচ্ছে সরকার গঠনের মামলা; তারও আগে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন না করে সরকার গঠন করলে লাভ নেই। পুলিশ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানের আমূল সংস্কার দরকার। সে ক্ষেত্রে নতুন সংবিধানের বিকল্প নেই। আর নতুন সংবিধানের জন্য প্রয়োজন গণপরিষদ নির্বাচন।
বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মূল কথা গণমালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তির বিকাশকে কীভাবে আইনে, সংবিধানে, প্রশাসনিক কাঠামোতে এবং রাজনীতিতে রূপান্তর করা হবেম তা এই অন্তর্বর্তী সময়েই সুরাহা করতে হবে। ঔপনিবেশিক আইনসহ নানা নিবর্তনমূলক গণঅধিকার হরণকারী আইন ও সিস্টেম চালু রেখে সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামোতে অনন্তকালীন জরুরি অবস্থা জারি রাখার যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু আছে, তা নতুন গঠনতন্ত্র ছাড়া দূর করা সম্ভব নয়। এসব আইন ও ব্যবস্থাই বারবার বাকশাল, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র, সংসদীয় ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি বলেই রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় সামন্তবাদী কাঠামোতে ভরা। বুর্জোয়া রাষ্ট্র গঠনে যে নতুন সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রয়োজন, সে জন্যই প্রথমে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে। সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে গঠিত সংসদ সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করতে পারবে না; এটা আইনি ও রাষ্ট্রনৈতিকভাবে সম্ভবও নয়। ফলে সংসদ নির্বাচন করে সংবিধান সংশোধনের আলাপ আসলে নতুন ফাঁদ।
অনেকেই বলছেন, গণপরিষদ নির্বাচন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দরকার হয় রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ অথবা বিপ্লবী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অথবা স্বাধীনতা যুদ্ধের পর। তাদের মতে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর যে সংবিধান রচিত হয়েছে তাই যথেষ্ট। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সংবিধানের জন্য তাই গণপরিষদ নির্বাচনের উপযোগিতা নেই। কিন্তু ঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ভিত্তিতে রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে তো ‘রাষ্ট্র’ বলা যায় না! এই রাষ্ট্রে গণসার্বভৌমত্ব নেই। অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দাবিই হচ্ছে জননিপীড়নমূলক কাঠামোর খোলনলচে পাল্টে ফেলে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। এই কাজ গত ৫৩ বছরে হয়নি; এখন আমাদেরই করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর গণপরিষদ নির্বাচনের বিকল্প নেই।
বিশ্বজুড়ে দেখা গেছে, যে কোনো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরে নতুন সংবিধান প্রয়োজন হয়। ইতালিতে তাই ১৯৪৬ সালে গণপরিষদ নির্বাচন হয় এবং নির্বাচিত সংবিধান সভা গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের পরই সরকার গঠনের নির্বাচন দেয়। চিলিতে ২০১৮ সালের গণআন্দোলনের সব অংশীদার একমত হন– বিদ্যমান সংবিধান সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈষম্য ও অধিকার হরণ ঠেকাতে পারছে না; তা বাতিল করে নতুন সংবিধান তৈরি করতে হবে। ফলে ২০২১ সালে সেখানে গণপরিষদ নির্বাচন হয় এবং সংবিধান সভা নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরি করে। চিলি যদি নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে পারে, আমরা পারব না কেন?
ড. যোবায়ের আল মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়