মার্কিন শুল্কের প্রভাব কাটাতে যা করতে হবে
Published: 5th, April 2025 GMT
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তাতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে উদ্বেগ দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছিল, তখনই ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘটনা ঘটল।
আগে শুল্ক ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। এখানে কিছু বিষয় আলোচনা করা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র একে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বলছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে পরিমাণ শুল্ক আরোপ করেছে, সে অনুযায়ী তারা প্রতিশোধ হিসেবে অনুরূপ শুল্ক আরোপ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। তাই বাংলাদেশের পণ্যে তার অর্ধেক অর্থাৎ ৩৭ শতাংশ শুল্ক তারা আরোপ করেছে। সে হিসেবে ভারতে আরেকটু কম শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আবার শ্রীলঙ্কার ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপ করেছে।
জানুয়ারি মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এ ধরনের ঘোষণা দেন, তখন থেকেই সারাবিশ্বে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশে সম্ভবত আমিই প্রথম এ নিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ও ইংরেজিতে দুটি উপসম্পাদকীয় লিখি, যেখানে এই শুল্কের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেছি। অনেকেই তখন ভাবছিলেন, নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হবে; হয়তো বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হবে না। কিন্তু আমি বলার চেষ্টা করেছি, যে দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ঘাটতি আছে, সেসব দেশের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হবে। শুধু তাই নয়; আমরা দেখছি এর বাইরের দেশগুলোর ওপর সমান হারে ১০ শতাংশের একটা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
আমরা জানি, ১৯৪৮ সাল থেকে শুল্ক এবং বাণিজ্য-সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি-গ্যাট কাজ করছে। এর পর ১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিওতে রূপান্তর হয়। কিন্তু এ সংস্থায় আমরা এক ধরনের স্থবিরতা দেখেছি। তার পরও ডব্লিউটিওর অনেক নিয়মনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনুসরণ করা হয়। এর মধ্যে আছে মোস্ট ফেভারড নেশন বা এমএফএন মর্যাদা। এ রকম আরও কিছু বিষয় আছে। যার কারণে কেউ অন্য কোনো দেশের ওপর ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ করতে পারে না। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে সেসব নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। এখানে ডব্লিউটিও অসহায়। এতে সংস্থাটির যে অক্ষমতা প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশসহ যেসব উন্নয়নশীল দেশ এবং উন্নত বিশ্বের যেসব দেশ আছে, তারাও নতুন করে চিন্তাভাবনা করবে– কীভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোতে সংস্কার আনা যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই শুল্কে বিশ্বের অনাস্থার বিষয়টিও আমরা দেখব।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটা বড় বাজার। এই বাজারের বড় অংশই হলো পোশাক শিল্প। নতুন করে যে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হলো, তার প্রভাব বুঝতে হবে। এটাও বিশ্লেষণ করতে হবে, বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত শুল্কে কোন দেশ অপেক্ষাকৃত বেশি সুবিধা পাবে। একটা অনিশ্চিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থা শুরু হতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে কাঠামোগত বিশাল এক রূপান্তর হচ্ছে, যা কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সহায়ক নয়। এখন যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্য যে কোনো দেশ এ ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারে। তাতে ডব্লিউটিও কিছুই করতে পারবে না। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অন্য পণ্যও যাচ্ছে। যেমন চামড়া জাতীয় দ্রব্য, ওষুধ ইত্যাদি।
এখন বাংলাদেশের করণীয় কী? অনেক দেশ ট্রাম্পের ঘোষণার পরই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এমন কিছু করেননি। আমাদের শুল্ক-সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কতটা ভেবেছেন, জানি না। আমাদের শুল্ক কাঠামোর দিকে যদি তাকাই, দেখব, অতি উচ্চ শুল্ক যেসব দেশে রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত। কাস্টম ডিউটি যেটা ডব্লিউটিওর ভাষায় প্যারা ট্যারিফ, সেগুলোও আমাদের অনেক বেশি। এ নিয়ে আমাদের বাণিজ্যিক অংশীদার বিভিন্ন দেশ অভিযোগ করেছে। এলডিসি হিসেবে আমরা ডব্লিউটিওর চাপ থেকে বিভিন্ন সময় পার পেয়ে গেছি বটে, কিন্তু এখন আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই। যে কারণে প্রথমত, আমাদের যেসব ‘প্যারা ট্যারিফ’ আছে, সেগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের বড় দায়িত্ব আছে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এসব অতিরিক্ত শুল্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে– আমরা কোথায় কোথায় কমাতে পারি। দ্বিতীয়ত, শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের আলোচনা করতে হবে। শুধু বাণিজ্যিক ক্ষেত্র নয়, কূটনৈতিক পর্যায়েও আলোচনা করতে হবে। ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ’ হিসেবে এখনও এক ধরনের ধোঁয়াশা আছে। সেগুলো পরিষ্কার হওয়া চাই। তৃতীয়ত, পোশাক শিল্পে অতি নির্ভরতা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি আমরা বলে এলেও এখানে সে অর্থে কোনো উন্নতি নেই। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি আমাদের রপ্তানির যেসব খাত আছে, সেখানে আমাদের জোর দিতে হবে। তাদের কোনো সমস্যা থাকলে তার সমাধান করতে হবে। আমাদের প্রতিযোগিতার জন্য অবকাঠামোগত ও দক্ষ শ্রমিক সমস্যার সমাধান করা দরকার। উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ পেতে সমস্যা, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ অন্যান্য সমস্যার রাতারাতি সমাধান হয়তো সম্ভব নয়। তবে এগুলোর সমাধানে একটা সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দরকার।
এতদিন প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ক্ষেত্রে আমরা নির্ভর করেছি সস্তা শ্রমের ওপর। তার ওপর শ্রম আইন না মানা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া ইত্যাদি ছিল। পাশাপাশি কর্মপরিবেশ নিয়েও অভিযোগ আছে। এই সস্তা শ্রম দিয়ে দীর্ঘদিন চালিয়ে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশ প্রতিযোগিতা করে– ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া এমনকি ভারতসহ (চীনের কথা বাদই দিলাম), তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সস্তা শ্রম নয়। তাদের আছে অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক, সহায়ক নীতি। পাশাপাশি এ দেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে। ভিয়েতনামের যেখানে ৫০টির ওপর চুক্তি আছে সেখানে বাংলাদেশের আছে মাত্র একটি। তাও খুব ছোট করে ভুটানের সঙ্গে। তার মানে, অন্যান্য দেশ অনেক এগিয়ে। এমন একটা অনিশ্চয়তাপূর্ণ বিশ্ববাজারে তারাই এগিয়ে থাকবে, যাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বেশি থাকবে। সে জন্য বাংলাদেশের সংস্কার জরুরি অবকাঠামো, নীতির ক্ষেত্র ও শুল্ক হ্রাসে। এগুলো খুব দ্রুত করতে হবে।
পরিশেষে বলব, বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে ডব্লিউটিওর সক্ষমতা যেহেতু কমে যাচ্ছে, সে জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা সেটা দ্বিপক্ষীয় হোক, বহুপক্ষীয় হোক; এর গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে। দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতার গুরুত্ব বাড়বে। সেখানে বাংলাদেশকে অংশগ্রহণ করতে হবে।
সামনে আরও কঠিন পরিবেশ আসতে পারে, যেহেতু এলডিসি থেকে উত্তরণ হতে যাচ্ছে, তার জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সে জন্য সংস্কার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের আত্মবিশ্বাসও বাড়াতে হবে।
সেলিম রায়হান: অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম
selim.
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: দ শ র ওপর এই শ ল ক আম দ র র জন য আর প র সব দ শ ধরন র সমস য
এছাড়াও পড়ুন:
ইন্ডাস্ট্রিতে ‘মেগাস্টার’ শাকিব একাই কেন, কী বললেন সিয়াম?
একসময় ঢাকাই সিনেমার রমরমা অবস্থা ছিল। নায়ক রাজরাজ্জাক, আলমগীর, জসীম ইন্ডাস্ট্রি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। পরবর্তীতে মান্না, সালমান শাহের নাম অবধারিতভাবে উঠে আসে। একসঙ্গে একাধিক মেগাস্টার ঢাকাই চলচ্চিত্রে পাওয়া গেছে। সবই এখন অতীত। দীর্ঘদিন ধরে একা ইন্ডাস্ট্রিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন ঢালিউড কিং শাকিব খান। তার ভক্ত-অনুরাগীরা তাকে ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’, ‘মেগাস্টার’ নানা নামে ডেকে থাকেন।
শাকিবের পর নতুন করে অন্তত তার সমপর্যায়েও কেউ আসতে পারেননি। ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে মেগাস্টার বলতে তাকেই বোঝায়। একসময় একাধিক মেগাস্টার নিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রি চলেছে। তাহলে এখন সমস্যাটা কোথায়? এই প্রশ্ন রাখা হয় চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদের কাছে।
সিয়াম আহমেদ বলেন, “এখন হবে না। মেগাস্টার বানানোর জন্য যেকোনো ইন্ডাস্ট্রির সিঙ্গেল স্ক্রিন থাকতে হয়। আমি মেগাস্টার নিয়ে বলছি। আমরা ভালোবেসে অনেককে ‘মেগাস্টার’ বানিয়ে ফেলি, সুপারস্টার বলে ফেলি। কিন্তু মেগাস্টারের সত্যিকারের সংজ্ঞা কী? রজনীকান্ত সাউথ ইন্ডিয়ার মেগাস্টার। বলিউডে শাহরুখ খান মেগাস্টার। অর্থাৎ যে আইকনিক ফিগার। হলিউডে মেগাস্টারের ব্যাপারটা বিভিন্ন ঘরানার উপরে নির্ভর করে। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় সিঙ্গেল স্ক্রিন হলো মেগাস্টার তৈরির কারখানা। যে ইন্ডাস্ট্রির সিঙ্গেল স্ক্রিন বন্ধ হয়ে যায়, সে ইন্ডাস্ট্রিতে মেগাস্টার তৈরি বন্ধ হয়ে যায়।”
খানিকটা ব্যাখ্যা করে সিয়াম আহমেদ বলেন, “আপনাকে ওই মানুষের ভেতরে ঢুকতে হবে, তাদের ভালোবাসা নিয়ে আসতে হবে, যারা কষ্টের টাকায় টিকিট কিনে বিনোদনের জন্য সিনেমা দেখেন। এই বিষয়টাই আমাদের এখানে একেবারে কমে গেছে। এখন মাল্টিপ্লেক্স প্রধান হয়ে উঠছে। এটার হিসাব-নিকাশ আলাদা। মাল্টিপ্লেক্স কনটেন্ট নির্ভর। কিন্তু ওই উন্মাদনা অন্য ব্যাপার।”
শাকিব খান এই সময়ে অভিনয়ের জার্নি শুরু করলে হিসাবটা আলাদা হতো। তা উল্লেখ করে সিয়াম আহমেদ বলেন, “আমি শাকিব ভাইয়াকে অনেক অ্যাপ্রিসিয়েট করি। সামনাসামনি তাকে অনেকবার বলেছি। কারণ শাকিব ভাই সিঙ্গেল স্ক্রিনে ২০ বছর পার করে এসেছেন। শাকিব ভাই যদি এখন জার্নি শুরু করতেন তবে তার হিসাব আলাদা হতো। শাকিব ভাই সবসময়ই স্টার। কিন্তু তার হিসাবটা আলাদা হতো। শাকিব ভাই যেখান থেকে তার ভক্ত-অনুরাগী পেয়েছেন, সেটা যেকোনো শিল্পীর জন্য আশীর্বাদ।”
১৫-২০ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে টিকতে পারলে মেগাস্টার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে— সঞ্চালকের এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সিয়াম আহমেদ বলেন, “টিকে থাকলেই মেগাস্টার হওয়া যাবে তা নয়। বরং পূর্বের সব কাজকে টেক্কা দিয়ে নতুনভাবে আসতে পারলে মেগাস্টার হওয়া সম্ভব। শাকিব ভাই সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করেছেন, প্রমাণ করেছেন।”
ঈদুল ফিতরে বেশ কটি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— ‘বরবাদ’ ও ‘জংলি’। ‘বরবাদ’ সিনেমায় শাকিবের বিপরীতে অভিনয় করেছেন কলকাতার ইধিকা পাল। ‘জংলি’ সিনেমায় সিয়ামের বিপরীতে রয়েছেন শবনম বুবলী। দুটো সিনেমাই দর্শকদের মাঝে সাড়া ফেলেছে।
ঢাকা/শান্ত