ড. ইউনূসের চীন সফর এবং বৈশ্বিক সম্পর্কের নতুন মোড়
Published: 5th, April 2025 GMT
শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর শাসনামলে ভারতপন্থি হয়ে থাকার তকমা জোটে বাংলাদেশের কপালে। কিন্তু ২০২৪-এ ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। এখন সুযোগ এসেছে সেই ভারতপন্থি খোলস থেকে বেরিয়ে স্বকীয় পরিচয় তৈরি করার। সম্ভাবনার এই সময়ে একটি প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে– দুই অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে সামলে কীভাবে নিজের দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ?
এককালে চীন-ভারত শক্তিমত্তার তুলনাসূচক তর্কে উভয়ের সমকক্ষ হওয়ার ধারণা চালু ছিল। বর্তমানে ভারতকে যদি হাতি ধরা হয়, তবে চীনকে বলা চলে তিমি। এমনকি চীন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অগ্রগামী।
উদ্বৃত্ত অর্থ কিংবা সঞ্চয়ের পরিমাণ, অবকাঠামোগত প্রকল্পে ঋণদান, নগদ অর্থ সহায়তা, ঋণ কিংবা সুদ মওকুফ, সুদহার কমানো, সুদ ফেরতদানের কিস্তির সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ ও বিলম্বিতকরণ এসব আর্থিক সক্ষমতায় চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশের প্রয়োজন পূরণে চীনের এই সামর্থ্যকে শেখ হাসিনা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র উভয়ে বিষয়টি না দেখার ভান করে তাতে নীরবে সায় দিয়েছে। ৫ আগস্ট হাসিনার পতন হওয়া মাত্রই চীন নবগঠিত ইউনূস সরকারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। ড.
হাসিনার পতনের পর চীনা কর্তৃপক্ষ হাসিনাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করতে থাকে। গত ৭ নভেম্বর চীনের আমন্ত্রণে বিএনপির চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত পলিটিক্যাল পার্টি প্লাস কো-অপারেশন সম্মেলনে যোগ দেয়। এখন প্রশ্ন হলো, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এই ঘনিষ্ঠতাকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখবে? অর্থাৎ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কত দূর পর্যন্ত গড়াতে পারবে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করতে চলেছেন, তা চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বৈরথে চীনের উত্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে অথবা চীন পরাজিত হয়ে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আরও দীর্ঘকাল বিশ্বনেতা হিসেবে টিকে থাকবে কিনা অথবা চীন তাকে টপকে যাবে কিনা, সেই ফয়সালা চটজলদি দৃশ্যমান হবে না। এ লড়াই দীর্ঘ কয়েক দশক পর্যন্ত চলতে পারে।
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যথেষ্ট পরিমাণ না বাড়লে এ দেশে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা পণ্যের ক্রেতা তৈরি হতে পারবে না। তাই চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত ঋণ কিংবা নগদ অর্থ সহায়তা গ্রহণ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে না। এভাবে চীন-মার্কিন দ্বৈরথে ভারসাম্যমূলক নীতি বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চীনা উত্থান ঠেকানোর তৎপরতার অভিঘাত অন্যান্য দেশের মতো এ দেশেও রাজনৈতিক উত্তেজনা-অস্থিরতা তৈরি করবে। সেই চাপ মোকাবিলায় কীভাবে ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণের কৌশল অবলম্বন করা যায়, সে জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। বাংলাদেশ রয়েছে ভারতীয় আধিপত্যবাদের ঝুঁকিতে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের আতঙ্ক থেকে এ দেশের জনমত চীনের সঙ্গে সখ্য গড়তে আগ্রহী।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন মিয়ানমারকে বাধ্য করতে পারলে চীন-বাংলাদেশ আরও গভীর সম্পর্ক তৈরি হতে পারবে। অন্যদিকে চীন-মার্কিন দ্বৈরথে বাংলাদেশ শামিল না হয়ে বরং চীন-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা নিরসনে বাংলাদেশ সেতুবন্ধের ভূমিকা পালন করতে পারে। এ দেশ হতে পারে পূর্ব-পশ্চিমের বিরোধ মীমাংসার নিরপেক্ষ কেন্দ্রভূমি। ঢাকা হতে পারে শান্তি সংলাপের কেন্দ্রস্থল। এর জন্য এ দেশে প্রয়োজন উপযুক্ত নেতৃত্ব ও যথাযথ কর্মকৌশল।
এ পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চার দিনের চীন সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সফরে দুই দেশ তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা চীনের তৈরি পোশাক কারখানা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, হালকা যন্ত্রপাতি, উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস, চিপ উৎপাদন এবং সৌর প্যানেল শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর সহজ করতে বেইজিংয়ের সহায়তা চান। চীনা উপপ্রধানমন্ত্রী দিং শুয়েশিয়াং জানান, ২০২৮ সাল পর্যন্ত চীনে বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, যা বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের দুই বছর পর পর্যন্ত বহাল থাকবে। এ বছরের গ্রীষ্মকাল থেকে বাংলাদেশ থেকে চীনে আম রপ্তানি শুরু হবে। বেইজিং কাঁঠাল, পেয়ারা এবং অন্যান্য জলজ পণ্য আমদানি করতেও আগ্রহী, যাতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের বিশাল ব্যবধান কমানো যায়। চীন সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি স্কলারশিপ দেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।
সফরের অংশ হিসেবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে একটি অত্যন্ত সফল দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। শি জিনপিং বলেছেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে চীন। চীনা উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে স্থানান্তরে উৎসাহিত করবে। বাংলাদেশের উত্থাপিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চীন ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। এর মধ্যে চীনা ঋণের সুদের হার কমানো ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার বিষয় রয়েছে। সব মিলিয়ে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের বাইরে এসে বাংলাদেশ স্বকীয় অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তুলবে এমন প্রত্যাশা জনসাধারণের।
রাজু আলীম: কবি, সাংবাদিক
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ক টন ত ইউন স র সরক র
এছাড়াও পড়ুন:
ঢাকায় ফেরার পথেও স্বস্তি
ঈদযাত্রার কথা ভাবলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাস-ট্রেনে উপচে পড়া ভিড়। কখনও ট্রাকে, ট্রেনের ছাদে চড়ে গন্তব্যে ছুটছে মানুষ। ফেরার পথেও অন্তহীন ভোগান্তি। কিন্তু এবার যেন এসবের কিছুই ছিল না। সড়কে নেই যানজট। যাত্রীবাহী গাড়ি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাবলীলভাবে ফিরছে গন্তব্যে। এবারের ঈদুল ফিতরে এখন পর্যন্ত যাতায়াতে দেখা গেছে বিরল স্বস্তি। ছুটি কাটিয়ে অনেকেই ফিরতে শুরু করেছেন রাজধানীতে। ফেরার পথেও এ ধারার ব্যত্যয় ছিল না।
গতকাল শুক্রবার কমলাপুর রেলস্টেশন, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফেরা যাত্রীরা ভালো অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্ব পালনে নিরলস দেখা গেছে। কোথাও সামান্য যানজট দেখা দিলেই এগিয়ে এসে পরিস্থিতি ঠিক করার চেষ্টা করতে দেখা গেছে তাদের। সায়েদাবাদে আসা কয়েকজন বাসচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকামুখী যাত্রীতে তাদের বাসের সব আসন পূর্ণ ছিল। সড়কে বিশৃঙ্খলা বা যানজট ছিল না।
আজ শনিবার বন্ধের দিন হলেও এক দিন আগেই অনেকে কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন। কমলাপুর রেলস্টেশনে রাজধানীতে ফেরা যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। আবার অনেকে নানা গন্তব্যে ঢাকা ছাড়ছেন। দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাচ্ছেন কেউ কেউ। তবে সার্ভার জটিলতায় সকালে ঢাকার বাইরে যাওয়া কয়েকটি ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটে।
সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশনে একের পর এক ট্রেন ভিড়ছে যাত্রী নিয়ে। এ সময় কয়েকটি ট্রেন ঢাকাও ছাড়ে। প্রায় সব ট্রেনেই ছিল যাত্রীর ভিড়। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে আসা ট্রেনগুলোতে ছিল বেশি ভিড়।
হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা তন্ময় শিকদার বলেন, ‘আমি হয়তো এক দিন পরই আসতাম। কিন্তু টিকিট পেয়েছি শুক্রবারের। তাই আজই আসতে হলো। রোববার থেকে অফিস।’ এবারের ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এবারের মতো স্বস্তির ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আমি চাই প্রতিবার ঈদ যাতায়াত যেন এ রকম হয়। বাড়তি ভাড়াও গুনতে হয়নি এবার।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসনাইন আহমেদ বলেন, ‘সোমবার থেকে আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। ইচ্ছা না থাকলেও আসতেই হবে। এবার নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলেও শেষমেশ ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই নেত্রকোনা থেকে ঢাকা যাওয়া-আসা করতে পেরেছি।’
এ বিষয়ে কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন বলেন, কমলাপুর স্টেশনে যত ট্রেন এসেছে, সবগুলোতেই বিপুলসংখ্যক যাত্রী ছিল। তারা স্বাচ্ছন্দ্যেই ভ্রমণ করেছেন। আসার পথে কোনো সমস্যা হয়নি।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে রাজধানীতে ফেরা কর্মজীবী মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। সড়কপথের পাশাপাশি লঞ্চে ফিরছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বরিশাল নদীবন্দর ছিল লোকারণ্য। নির্ধারিত লঞ্চে ধারণক্ষমতার বেশি হওয়ায় হাজারের বেশি যাত্রী পন্টুনে থেকে গেছেন।
পরে তারা সড়কপথে ঢাকায় যাত্রা করেন। তবে এবার লঞ্চ টার্মিনালে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেক কম ঘটেছে।