Samakal:
2025-04-04@23:53:35 GMT

সাকিলের ম্যাচবাক্সের জাদুঘর

Published: 5th, April 2025 GMT

সাকিলের ম্যাচবাক্সের জাদুঘর

সাকিল হকের ম্যাচবাক্স সংগ্রহ রীতিমতো অবাক করার মতো। আগ্রহটা হয়েছিল ছোটকালে তাঁর বাবার সংগ্রহ দেখে। সাকিল হকের বাবা নানা ধরনের ডাকটিকিট, মুদ্রা, ম্যাচবাক্স সংগ্রহ করতেন। এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সাকিল ম্যাচবাক্স সংগ্রহে মন দেন। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের ভাড়া বাসায় তিনি গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত ম্যাচবাক্স জাদুঘর। ম্যাচবাক্স সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি ম্যাচবাক্স নকশা করেন। দেশে তাঁর কাছেই ম্যাচবাক্সের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ রয়েছে।

ছোটবেলায় ম্যাচবাক্স সংগ্রহ করলেও সাকিল হক তা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ২০১২ সাল থেকে মূলত নতুন করে সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। অন্য দশটা সংগ্রহের মতো ম্যাচবাক্স না। একেক ধরনের ম্যাচবাক্স একেকভাবে সংরক্ষণ করেছেন সাকিল। কোনোটা প্লাস্টিক বাক্সে রেখেছেন। কোনোটা রেখেছেন প্লাস্টিক প্রোটেক্টর দিয়ে মুড়িয়ে। কারণ, তাঁর কাছে প্রতিটি ম্যাচবাক্স সন্তানের মতো। তাঁর জাদুঘরের কক্ষজুড়ে কাচের আলমারি; যার তাকে সাজানো ম্যাচবাক্স। এক নিত্যব্যবহার্য জিনিস ম্যাচবাক্স। যার নকশায় বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বা খাদ্যাভ্যাস ফুটে ওঠে। সাকিল মনে করেন বিষয়টি শিক্ষণীয়।

সে কারণে ২০১৬ সাল থেকে ম্যাচবাক্স নকশা করা শুরু করেন। সাকিল পারিবারিকভাবে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছেন। কর্মজীবনে তিনি একজন গ্রাফিক ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজে। পুরো মেধাটাই দিয়েছেন ম্যাচবাক্স নকশায়। একেক করে তিনি পাঁচ শতাধিক ম্যাচবাক্সের নকশা করেছেন দেশ-বিদেশে। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি নকশা দিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠান ম্যাচ উৎপাদন করেছে। তাঁর করা নকশায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, চে গুয়েভারা, মাইকেল জ্যাকসন, ওসামা বিন লাদেন, হিটলার, মেরিলিন মনরোর মতো ব্যক্তিরা ফুটে উঠেছেন। আবার কোনো কোনো ম্যাচবাক্সে ফুটে উঠেছে সমাজ তথা পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনা বা প্রেক্ষাপট। নিজের নকশা দিয়ে নিজ খরচেও উৎপাদন করেছেন ম্যাচবাক্স। এর কারণ পৃথিবীতে নিয়মিতভাবে দেশলাইয়ের ব্যবহার কমে যাচ্ছে, দেশলাই বিলুপ্ত হচ্ছে এবং কমে যাচ্ছে দেশলাই সংগ্রাহক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংগ্রাহকরা সাকিলের নকশা করা ম্যাচবক্স সংগ্রহ করেন। ২০১৮ সালে নিজের সংগ্রহ নিয়ে সাকিল প্রথম ম্যাচবাক্স প্রদর্শনী করেন দৃক গ্যালারিতে। এখন ১৩২ দেশের ২২ হাজারের বেশি ম্যাচবাক্স রয়েছে তাঁর সংগ্রহে।

সংগ্রহের বেলায় সাকিল একটু নাছোড়বান্দা টাইপের। কোথাও কোনো দুর্লভ সংগ্রহের খবর শুনলে তা জোগাড় একটুও দেরি করেন না। এ কারণে তাঁর সংগ্রহে আছে ছোট-বড় বিভিন্ন আকার-আকৃতির ম্যাচবাক্স; যার বেশির ভাগই এখন পাওয়া যায় না। কোনো ম্যাচবাক্সে এক হাজার কাঠিও রাখা থাকে। আবার পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ম্যাচবাক্সটিও তাঁর সংগ্রহে আছে। এটি এক ইঞ্চির চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও ছোট। এ ম্যাচবাক্সটি বিশ্বে মাত্র দুটি আছে। যার একটি সাকিলের সংগ্রহ সমৃদ্ধ করেছে। এমনটাই জানান তিনি। রাস্তা এমনকি ডাস্টবিন থেকেও দেশলাই সংগ্রহ করেছেন এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গাড়ির জ্বালানির কাজে ব্যবহৃত ম্যাচবাক্স, রানী এলিজাবেথের ৭৫তম জন্মদিনে তৈরি করা ম্যাচবাক্স, ১৮ শতকের শুরুর দিকের ম্যাচবক্স সাকিলের কাছে রয়েছে। তাঁর সংগ্রহের ম্যাচবাক্সগুলো সিলিন্ডার, তাঁবু, বইসহ বিভিন্ন আকৃতির। এ সংগ্রহে আছে চামড়ার তৈরি ম্যাচবাক্স। টিনের প্যাকেটের ম্যাচবাক্স। তাঁর কাছে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বুকম্যাচও।
কাজের সূত্রে ইংল্যান্ডে বসবাস করেছেন কিছুদিন। ইংল্যান্ডের ইতিহাস সমৃদ্ধ ম্যাচবক্স দেখে সেগুলো সংগ্রহের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় ম্যাচবাক্স সংগ্রহের জন্য গিয়েছেন তিনি।  

এই সংগ্রহের একটি কেতাবি নাম আছে। যারা ম্যাচবাক্স সংগ্রহ করেন তাদের বলা হয় ফিলুমেনিস্ট। এ শখটির নাম হলো ফিলুমেনি। এ সংগ্রাহকদের মধ্যে স্লোভেনিয়ার স্যান্ডি সাকিলের ম্যাচবাক্সের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা। সাকিল বলেন, ‘আমার সংগ্রহের একটা বড় অংশ স্যান্ডির কাছ থেকে পাওয়া। বিশ্বের বড় বড় সব ফিলুমেনিস্টরা আমার ম্যাচবাক্স সংগ্রহে ভীষণ সাহায্য করেছেন।’ একবার এমনও হয়েছে, এক দিনেই তিনটি দেশ থেকে প্রায় এক হাজার ৫০০ ম্যাচবাক্স ডাকযোগে পেয়েছেন তিনি। 

বাংলাদেশে ম্যাচবাক্স নকশাকে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। এ প্রসঙ্গে সাকিল বলেন, ‘যত্ন বা চিন্তা করে করা হয় না। জাস্ট করার জন্য করা। এটি যে শিল্পের অংশ হতে পারে, নান্দনিক হতে পারে, তা আমাদের চিন্তায় আসে না। শুধু বাণিজ্যিক চিন্তা মাথায় নিয়ে বানানো একই ধরনের ডিজাইন চলতে থাকে বছরের পর বছর।’ ২০১৬ সালে তিনি বাংলাদেশের ফিলুমেনিস্টদের নিয়ে ‘বাংলাদেশ ম্যাচবাক্স কালেক্টরস ক্লাব’ (বিএমসিসি) গড়ে তোলেন। বিশ্বের প্রথম অনলাইন ম্যাচবাক্স প্রদর্শনী এ ক্লাবই আয়োজন করে। ২০২১ সাল থেকে ‘দেশলাই’ নামে ফিলুমেনিস্টদের জন্য উপমহাদেশের প্রথম ত্রৈমাসিক জার্নাল প্রকাশ করে আসছে ক্লাবটি। সাকিল হক এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। সাকিলের একটি অনলাইন ‘ম্যাচবাক্স শপ’ আছে। ডিজাইন অনুযায়ী তাঁর ম্যাচবাক্সগুলো ২৫ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে পাওয়া যায়। তবে বিক্রির চেয়েও ম্যাচবাক্স সংগ্রহ সাকিলের কাছে প্রধান। এ কারণে কেউ সংগ্রহের আগ্রহ দেখালে তিনি উপহার হিসেবে তাঁর ঠিকানায় ম্যাচবাক্স পাঠিয়ে দেন।

কোনো পরিশ্রমই আসলে বিফলে যায় না। যদি পরিশ্রমের মধ্যে ভালোবাসা থাকে, লেগে থাকা যায়, সাকিল হকই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এক সময় ম্যাচবাক্সের নকশা বিনামূল্যে দিতে ম্যাচ কোম্পানির দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন। তাদের বোঝাতে চেষ্টা করতেন, কেন ম্যাচবাক্সের ডিজাইন গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালে জামিল গ্রুপ সাকিলের করা ‘বাংলার রঙ’ শিরোনামে ১২টি ম্যাচবাক্স ডিজাইন কিনে নেয়। বিনিময়ে সাকিল ভালো পারিশ্রমিকও পেয়েছিলেন।

নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে সংগ্রহ করা শখের ম্যাচবাক্সগুলো ভালোভাবে যুগের পর যুগ থাকুক; প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যেন তা দেখতে পারে– এমনটাই মনেপ্রাণে চান সাকিল। সে জন্য দরকার একটু স্থায়ী জায়গা। যেখানে তৈরি করা যাবে স্থায়ী ম্যাচবাক্স জাদুঘর। তিনি বলেন, ‘ম্যাচবাক্সের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক। কখনও অসুখ হলে আমি আমার ম্যাচবাক্সের সংগ্রহের পাশে গিয়ে দাঁড়াই, এগুলো আমাকে সেরে ওঠার মানসিক শক্তি দেয়।’ 

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: জ দ ঘর স ক ল হক র সবচ য় জ দ ঘর ড জ ইন কর ছ ন র নকশ র একট

এছাড়াও পড়ুন:

পশ্চিমবঙ্গে ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল

পশ্চিমবঙ্গের ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারচুপির দায়ে তাদের চাকরি বাতিল হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। খবর আনন্দবাজার অনলাইন।

২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনে (এসএসসি) শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। কলকাতা হাই কোর্ট এই সংক্রান্ত শুনানির পর ২০১৬ সালের সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়াই বাতিল করে দিয়েছিল। এর ফলে ২৫ হাজার ৭৫৩ জনের চাকরি যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ আদালতে শেষ হয়েছিল এই মামলার শুনানি। বুধবার সুপ্রিম কোর্ট যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়েছিল, বৃহস্পতিবার সকালে ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। সেইমতোই ঘোষণা হল রায়।

আদালত জানিয়েছে পুরো প্রক্রিয়ায় কারচুপি করা হয়েছে। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। 

প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খন্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ জানিয়েছে, তিন মাসের মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। যারা অন্য সরকারি চাকরি ছেড়ে ২০১৬ সালের এসএসসির মাধ্যমে স্কুলের চাকরিতে যোগদান করেছিলেন, তারা চাইলে পুরনো কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারবেন।

ঘোষিত রায়ে বলা হয়েছে, যোগ্য-অযোগ্য বাছাই করা সম্ভব হয়নি। ২০১৬ সালের এসএসসি পেয়ে যারা চাকরি করছিলেন, তারা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতা পরীক্ষার জন্য আবেদন করতে পারবেন। 

এসএসসির ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের এই মামলায় একাধিক জটিলতা ছিল। যার মধ্যে অন্যতম হল যোগ্য এবং অযোগ্যদের বাছাইয়ের সমস্যা। কীভাবে যোগ্য এবং অযোগ্যদের আলাদা করা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। শুনানির শেষ দিন পর্যবেক্ষণে শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল, এই মামলায় আসল তথ্য জানা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু আসল উত্তরপত্র বা ওএমআর শিট উদ্ধার করা যায়নি, তাই কোন ওএমআর শিটকে আসল বলে ধরে নেওয়া হবে, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। 

শীর্ষ আদালতে এই মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের বক্তব্য ছিল, এসএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। সাদা খাতা জমা দিয়েই অনেকে চাকরি পেয়ে গিয়েছেন। তাই ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের এই মামলায় হাই কোর্টের রায় বহাল থাকা উচিত। 

ঢাকা/শাহেদ

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • পশ্চিমবঙ্গে ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল