বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত অবহেলার শিকার। দক্ষ জনশক্তি তৈরির অন্যতম ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও কারিগরি শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে, যা শুধু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নয়, দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্যও হুমকিস্বরূপ। সম্প্রতি ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের পদোন্নতিতে অনিয়ম, ২০২১ সালের বিতর্কিত নিয়োগ, উচ্চশিক্ষার সীমাবদ্ধতা ও কর্মসংস্থানের সংকট—এসব ইস্যু কারিগরি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। তবু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চুপ। প্রশ্ন হলো, আমরা কবে এ অবিচারের অবসান ঘটাব?

অবহেলার শিকড় কত গভীর

কারিগরি শিক্ষা বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে এটি যেন উপেক্ষিতই থেকে গেছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের ৬০-৭০ শতাংশ জনশক্তি কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ। অথচ বাংলাদেশে এই হার মাত্র ১৪ শতাংশ। সরকার প্রতিনিয়ত কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। পর্যাপ্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব, দক্ষ প্রশিক্ষকের সংকট, অপ্রতুল ল্যাব–সুবিধা, নিম্নমানের পরীক্ষাব্যবস্থা, অবৈধ নিয়োগ ও প্রমোশনের অনিয়ম—এসব কারণে কারিগরি শিক্ষার্থীরা আজ হতাশ, বিক্ষুব্ধ।

ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের অবৈধ প্রমোশন: মেধার অবমূল্যায়ন

সম্প্রতি কারিগরি ছাত্র আন্দোলন থেকে শিক্ষার্থীরা ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের অবৈধ প্রমোশন ও বিতর্কিত নিয়োগ বাতিলের দাবি তুলেছে। জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদে ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের অবৈধ প্রমোশন উচ্চশিক্ষিত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য অবমাননাকর। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছে, একটি অযোগ্য গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পেশাদারদের হেয় করছে, যা কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান নষ্ট করছে।

শুধু তা–ই নয়, শিক্ষার্থীদের দাবি উপেক্ষা করে ২০২১ সালে রাতের আঁধারে সংশোধিত নিয়োগবিধি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ অনিয়ম রোধে বিচার চাইলে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, পরীক্ষা বর্জন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাহলে কারিগরি শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের জন্য কোথায় যেতে হবে?

উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈষম্য: আমরা কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত। ডুয়েট ছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের জন্য তেমন কোনো আসন নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলেও ৫-৮ লাখ টাকা খরচ করতে হয়, যা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে। অথচ সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষার অসংখ্য সুযোগ আছে।

অন্যদিকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য যেখানে সরকারি চাকরির অসংখ্য পদ রয়েছে, সেখানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য পদসংখ্যা খুবই কম। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের বঞ্চিত করা হয়, কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য করা হয়, এমনকি কখনো কখনো বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের অধীন করে রাখা হয়। তাহলে কি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা শুধুই শ্রম দেবে, কিন্তু মর্যাদা পাবে না?

শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবি: ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই

বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা দাবি করেছে

১.

বিতর্কিত পদোন্নতি বাতিল করতে হবে।

২. ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টর পদবি পরিবর্তন করতে হবে।

৩. ২০২১ সালের বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করতে হবে।

৪. অবৈধ নিয়োগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. কারিগরি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।

৬. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়াতে হবে।

শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে। কারণ, তাদের স্বপ্ন, পরিশ্রম ও ভবিষ্যৎকে বারবার নষ্ট করা হচ্ছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা পরীক্ষা বর্জন ও প্রতিটি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

কর্তৃপক্ষের করণীয়: ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক

সরকারের উচিত অবিলম্বে এ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

বিতর্কিত নিয়োগ ও প্রমোশন বাতিল করে স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সরকারি চাকরিতে আলাদা কোটা রাখতে হবে।

অধিকসংখ্যক কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।

কারিগরি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই করতে হলে কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলা করা যাবে না। আজ যারা কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলা করছে, ভবিষ্যতে তারাই দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে ভুগবে। তাই আর নয় অবহেলা, শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এখনই!

তানভীর হাসান মন্ডল

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: দ র জন য সরক র অবহ ল

এছাড়াও পড়ুন:

শীর্ষ তিন পোশাকের রপ্তানি কমছে 

চার দশকের বেশি সময় ধরে কম দামের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আসছে বাংলাদেশ। তার মধ্যে পাঁচটি ক্যাটাগরি বা শ্রেণির তৈরি পোশাকই বেশি রপ্তানি হয়। সেগুলো হচ্ছে ট্রাউজার, টি–শার্ট ও নিট শার্ট, সোয়েটার, শার্ট ও ব্লাউজ এবং অন্তর্বাস। মূলত ট্রাউজার, টি–শার্ট ও সোয়েটারই সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। গত দুই অর্থবছর (২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪) ধরে এই পাঁচ শ্রেণির পোশাকের রপ্তানি কমছে। 

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশই আসে ট্রাউজার, টি–শার্ট ও নিট শার্ট, সোয়েটার, শার্ট ও ব্লাউজ এবং অন্তর্বাস থেকে। 

শীর্ষ তিন পোশাক পণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়া নিয়ে রপ্তানিকারকেরা বলছেন, দুই বছর ধরে সামগ্রিকভাবে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমেছে। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হওয়া পোশাকের রপ্তানি কমেছে। এসব পণ্যের ক্রয়াদেশ পেতে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হয়। বিভিন্ন কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ট্রাউজার, টি–শার্ট ও সোয়েটারের মতো পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। যে কারণে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমে যায়। তার প্রভাবে গত দুই বছর সেসব দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ হাজার ৬১৫ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। তার আগের দুই অর্থবছরে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে যথাক্রমে ৪ হাজার ২৬১ ও ৩ হাজার ৮১৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। এমনটা জানা গেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে।

বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট পোশাক রপ্তানির ৩৩ শতাংশই হলো ট্রাউজার। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ট্রাউজারের রপ্তানি প্রায় ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ডলারে নেমে যায়। করোনার সময় ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের কম ট্রাউজার রপ্তানি হয়েছিল। তারপর ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৫১ এবং ১ হাজার ২৪১ কোটি ডলারের ট্রাউজার রপ্তানি হয়।

সস্তায় টি–শার্ট রপ্তানিতে বাংলাদেশের বেশ সুনাম রয়েছে। ওয়ার্ল্ড টপ এক্সপোর্ট ডট কমের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ৫১ বিলিয়ন ডলারের টি–শার্ট রপ্তানি হয়। সবচেয়ে বেশি টি–শার্ট রপ্তানি করে চীন, যা মোট রপ্তানির ১৭ শতাংশ। তারপরই বাংলাদেশের অবস্থান, যা মোট রপ্তানির ১৫ শতাংশ। তবে ওই বছর কটন টি–শার্ট রপ্তানিতে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ২১ শতাংশ হচ্ছে টি–শার্ট। গত ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৭৭৩ কোটি ডলারের টি–শার্ট রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের ২০২২–২৩ অর্থবছরের তুলনায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার কম। এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৯৮৬ কোটি ডলারের টি–শার্ট।

২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সোয়েটার রপ্তানি হয়। পরের দুই বছরই পণ্যটির রপ্তানি কমেছে। সর্বশেষ অর্থবছরে ৪৮২ কোটি ডলারের সোয়েটার রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বা ১২ কোটি ডলার বেশি।

বিজিএমইএর তথ্যানুযায়ী, শার্ট ও ব্লাউজের রপ্তানি ৮ শতাংশ কমেছে। সর্বশেষ অর্থবছরে ২৯৩ কোটি ডলারের শার্ট ও ব্লাউজ রপ্তানি হয়। তার আগের অর্থবছর রপ্তানি হয়েছিল ৩১৮ কোটি ডলারের শার্ট ও ব্লাউজ।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত সামগ্রিকভাবে রপ্তানি কমলে যেসব তৈরি পোশাক বেশি রপ্তানি হয়, সেগুলোর রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে টি–শার্ট, ট্রাউজার ও সোয়েটারের মতো তৈরি পোশাক খুবই মূল্য সংবেদনশীল। অর্থাৎ তীব্র প্রতিযোগিতা করে এসব পণ্যের ক্রয়াদেশ পেতে হয়। শ্রমিকের বেতন ও গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং নগদ সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে অনেক রপ্তানিকারক পণ্যগুলোর ক্রয়াদেশ নিতে পারছে না। 

ফজলুল হক আরও বলেন, ‘আমরা রপ্তানিমুখী শীর্ষস্থানীয় পোশাকের বিক্রয়াদেশ হারাচ্ছি কি না, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ, এসব পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে অনেক কারখানা ও লাখ লাখ শ্রমিক জড়িত। তৈরি পোশাক রপ্তানির এই মূল ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ, গ্যাস–বিদ্যুৎসহ যেকোনো মূল্যবৃদ্ধিতে রপ্তানিকারকদের সময় দিতে হবে। যাতে তাঁরা সেই বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ পান।’

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • শীর্ষ তিন পোশাকের রপ্তানি কমছে 
  • ‘টপ গান’ তারকা ভ্যাল কিলমার মারা গেছেন
  • ‘ব্যাটম্যান’ তারকা ভ্যাল কিলমার মারা গেছেন
  • চলে গেলেন পর্দার জিম মরিসন, ‘টপ গান’ তারকা ভ্যাল কিলমার