‘সরকারের সঙ্গে ঘেঁষা মানেই একটা ছাপ পড়ে যাওয়া’
Published: 4th, April 2025 GMT
অলাত এহ্সান: ৯০তম জন্মদিনে আপনি ছায়ানট-এ গেয়েছিলেন।
সন্জীদা খাতুন: হ্যাঁ, খালি গলায় একটা দৃষ্টান্ত দিয়েছিলাম আরকি। ঘরে বসে গাই নিজের মতন করে, কারণ গানের স্কেলটা লো হয়ে গেছে। এই স্কেলে কেউ বাইরে গাইবে না। তবে গাইলে গাওয়া যায়।
দেখো, আমার সবচেয়ে ভালো সময় কাটে ছায়ানটের যারা রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষক, তারা আমার কাছে আসে সপ্তাহে চার দিন। ওদের আগেই আমি একটা গান দিয়ে রাখি, ওরা তুলে আসে। সঠিক স্কেলে সবাই তুলে আসতে পারে না সব সময়। সেগুলো বোঝাতে হয়। স্পর্শস্বরকে অর্ধস্বর করে ফেলে, অর্ধস্বরকে স্পর্শস্বর করে ফেলে। এগুলো বোঝাতে হয়। বোঝাই, তাদের গানের বিশ্লেষণ করি। গানে নিয়ে মোটিভেশনের কথা বলতে হয়। এসব বলে, করে আমার সময় কেটে যায়।
আব্বা অনেক গান শুনতেন। গুনগুন করতেন, তবে তাঁর সুর ঠিক থাকত না, তালও ভালো পরাতেন না। আমরা শুনে হাসতাম।অলাত: আপনার কি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে গান শেখার সুযোগ হয়েছিল?
সন্জীদা খাতুন: নজরুলকে আমি দেখিইনি। আমি তখন অনেক ছোট। নজরুলের জীবনের প্রেমের এক অধ্যায় বইটা যিনি লিখেছেন, আমাদের সৈয়দ আলী আশরাফ, বাবাকে লেখা নজরুলের চিঠিগুলো তিনি আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন, নিয়ে বইটা তিনি লিখেছিলেন। সেই বইতে আমাদের পরিবারের একটা ছবি আছে, সেখানে আমার ওপরের যে বোন, সে নজরুলের কোলে বসে আছে। আমার তখন জন্ম হয়নি। বড়দি নজরুলের কোলে বসে গান শিখেছেন, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই.
বর্ধমান হাউসের (বর্তমানে বাংলা একাডেমি) একটা পুকুর ছিল, এখনো আছে, প্রায় মজে গেছে, ওই পুকুরটার ধারে বসে নজরুল রাত ১২টায় বাঁশি বাজাতেন। বাবা তো নজরুল বলতে অজ্ঞান ছিলেন, বন্ধু, মতিহার। বাবাকে তিনি ডাকতেন ‘মতিহার’। বলতেন, তোমার নাম মোতাহার কে রেখেছেন? তুমি তো মতিহার।
বড়দি একবার ওই পুকুরে গোসল করতে গিয়ে তাঁর হাতের সোনার বালা পড়ে গিয়েছিল। নজরুল সেই রাত ১২টায় ঘাটে বসে বাঁশি বাজাতে বাজাতে দেখেন কি, তলায় কী চকচক করছে। ডুব দিয়ে তুলে নিয়ে এসেছেন বালাটা।
অলাত: পরিবারের ভেতর নারীদের, মানে আপনাদের বিকাশ কেমন ছিল?
সন্জীদা খাতুন: আব্বা আমার অনেক পরিচর্যা করেছেন। আমি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত উনার কোলে উঠে পড়েছি। তাঁর ধারণা হয়েছিল, আমার সাহিত্য বোধ আছে। আর আমার সেজদি ছিলেন, আব্বা মনে করতেন, তাঁরও সাহিত্য বোধ আছে। তাঁর যে বইটা সঞ্চরণ নামে, ওই বইটা আমাকে আর আমার সেই বোনকে উৎসর্গ করেছিলেন। ছোট থেকেই সেই বই পড়েছি।
যা কিছু লিখতাম, আব্বাকে দেখাতম। কবিতা লিখলে দেখাতাম। এমনি ছন্দে কবিতা লিখলে তাঁর আপত্তি ছিল না। একবার গদ্য কবিতা লিখেছি। দেখে বললেন, এটা কী হয়েছে, ঘোড়ার ডিম! আমাদের একটা বেলগাছ ছিল, তার পাতার ফাঁকে ফাঁকে জালের মতো তলায় ছায়া পড়েছিল। খুব ভালো লাগছিল। সেই অনুভূতি নিয়েই একটা কিছু লিখেছিলাম। আব্বা এমন বললেন যে জন্মেও আর গদ্য কবিতা লিখতে যাইনি। তিনি তো একটু সেকেলে।
অলাত: আপনার বাবা কাজী মোতাহার হোসেন কি অনেক গান শুনতেন?
সন্জীদা খাতুন: আব্বা অনেক গান শুনতেন। গুনগুন করতেন, তবে তাঁর সুর ঠিক থাকত না, তালও ভালো পরাতেন না। আমরা শুনে হাসতাম।
অলাত: কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, তিনি নাকি একাধিকবার ‘এই কাজীর’—কাজী মোতাহার হোসেন—সঙ্গে দাবা খেলার জন্যই ঢাকা এসেছেন?
সন্জীদা খাতুন: আব্বা নজরুলের সঙ্গে দাবা খেলেছেন খুব। তাঁকে একবার বোধ হয় ইন্টারন্যাশনাল একটা দাবা প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে ছিলেন। ভালোবাসতেন তো। নজরুল তো আব্বাকে নিয়ে একটা কবিতাও লিখেছিলেন।
রণজিৎ অধিকারী: মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন—কাজী আবদুল ওদুদ, মোতাহার হোসেন চৌধুরী। তাঁরা কি আসতেন আপনাদের বাসায়?
সন্জীদা খাতুন: কাজী আবদুল ওদুদকে আবার আব্বা ভীষণ ভালোবাসতেন। তাঁরা কিন্তু একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। আব্বা তাঁকে চাচা বলতেন, গ্রাম সম্পর্কে চাচা। কোনো আত্মীয়তার সম্পর্কও থাকতে পারে। আমার আব্বা কাজী আবদুল ওদুদকে পায়ে ধরে সালাম করতেন। খুবই সম্মান করতেন। আর কাজী আবদুল ওদুদ, আমার মনে আছে, কলকাতায় একবার তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। আমার আব্বা তো ঢাকায়, আমি কলকাতায় থেকেছি তো, খোঁজখবর করে গেছি সেখানে।
রণজিৎ: ১৯৫২ সালে, ২১ ফেব্রুয়ারির পরের দিন সম্ভবত, আপনি একটা জায়গায় হেঁটে গিয়ে সভা করলেন, সেখানে আপনার মা বোধ হয় সভাপতি ছিলেন।
সন্জীদা খাতুন: হ্যাঁ। সভাপতি করেছিলেন মাকে, সবাই মিলে। সেই তো প্রথম গুলিবর্ষণ ঢাকায়, ভয়েই সবাই কাতর। আমি হেঁটে যাচ্ছি, আমার মা দেখছেন, মেয়েটা তো জেদি আছে! তখন চট করে আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলেন। পথে পুরানা পল্টনের ওখানটায়, তখন পুরানা পল্টনে মিটিং-সিটিং হতো—ওইখানে সব মিলিটারি ট্রাক থাকত। আর ট্রাকে সব অবাঙালি মিলিটারি ডিউটিতে। তারা আমাদের দুই মহিলাকে হেঁটে যেতে দেখে, আমাদের ভয় দেখানো জন্য মাটিতে খুব পা দাপাচ্ছে। আমার মা তা দেখে উল্টো দিকে দৌড় দিলেন। আমি ঘুরে মাকে দেখলাম, দেখে আবার চলতে থাকি। মা আবার ঘুরে দেখেন যে আমি হাঁটছি, আবার তিনি হাঁটলেন আমার সঙ্গে। এই করে গিয়েছিলেন। তাই বলে মা তো রাজনীতির কিছুই বোঝেন না। একেবারে গৃহিণী, আর মেয়ের জন্য সঙ্গে গেছেন। কিন্তু সেখানে বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন, বেগম দৌলতুন্নেছা ছিলেন, রোকাইয়া আনোয়ার বলে একজন ছিলেন। অনেক ভালো ভালো নাম করা লোকজন থাকতেও কেউ সভাপতি হতে চান নাই।
অলাত: সাংস্কৃতিক চর্চার কারণে বেগম সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম—তাঁদের পরিবারের সঙ্গে তো আপনাদের সখ্য ছিল।
সন্জীদা খাতুন: হুম। সুফিয়া কামাল আবার আমার বাবাকে ‘আব্বু’ বলতেন। আমরা সবাই তাঁকে খালাম্মা বলতাম। আর তাঁর মেয়েরা—লুলু, আমার কাছে আসতই। আর ছোটটা, সুলতানা কামাল, টুলু, ও তো শান্তিনিকেতনে গেল একবার, নয় মাসের কোর্স করতে গেল কলাভবনে। শান্তিনিকেতনে আমার একটা রুম ছিল, ও আমার রুমেই কাটিয়েছে সারা সময়, থেকে গেছে আমার কাছে।
একবার খালাম্মা গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে, বেড়াতে। আমরা গেলাম। সবাই মিলে পার্কে যাব আরকি। তখন আমি হাঁটতে পারছিলাম না, খালাম্মাও হাঁটতে পারেন না। একটা চৌবাচ্চা দেখে, চৌবাচ্চার ধারে বসেছিলাম। আমার খারাপ লাগছে, খালাম্মা হরিণ দেখতে টিআর পার্কে যেতে পারলেন না। আমি তখন গান গাইছি। এমন সময় খালাম্মা আমার গায়ে হাত দিয়েছেন। তাকিয়ে দেখি হরিণ এসে চৌবাচ্চায় পানি খাচ্ছে। খালাম্মার হরিণ দেখা হয়ে গেল। হরিণ এ রকমই, গান শুনে যে ওরা কত কাছে আসে, এ অভিজ্ঞতাও হলো।
অলাত: আর জাহানারা ইমাম?
সন্জীদা খাতুন: জাহানারা ইমাম থাকতেন বোধ হয় আজিমপুরের ১৫ নম্বর বিল্ডিংয়ে। আর আমার বড়দি থাকতেন তার নিচতলায়, ওটা কলোনি। দাওয়াতে-টাওয়াতে বড়দি তাঁর বাসায় যেতেন। তিনি আবার ভীষণ সোশ্যাল ছিলেন। তিনি রেডিওতে প্রোগ্রাম করতেন, রেডিওর লোকদের সব দাওয়াত করতেন। বড়দি সেখানে খুব ইজি ফিল করতেন না।
জাহানারা ইমামকে আমি খুব খুব শ্রদ্ধা করতাম। তাঁর যে একাত্তরের দিনগুলি, সেটা তো বটেই, তার আরেকটা বই আছে অসাধারণ, অন্য জীবন।
অলাত: রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেনের সঙ্গে আপনার ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু একই সময়ে আপনারা ছায়ানট করছেন, আর তাঁরা রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী করছেন।
সন্জীদা খাতুন: উদীচীর অনেক অনুষ্ঠানে অনেক বক্তৃতা করেছি, অনেক উপদেশ দিয়েছি ওদের। অনেক দিন উপদেষ্টা ছিলাম। কিন্তু এরপরে, কিছু দিন আগে, উদীচীর ভেতর এত নোংরামি দেখে, অনেক গোলমাল, আমি বলেছি, আমাকে তোমরা কোনো কিছুতে ডাকবে না, কোনো কিছুতে রাখবে না। ওরাও আমার ওপর চটা।
সত্যেনদা এখান থেকে শান্তিনিকেতনে চলে গিয়েছিলেন কেন? কারণ, রাজনীতিতে তিনি কোনো পরিষ্কার রাস্তা দেখছিলেন না, তিনি যেখানে রাজনীতি করতেন। সারা জীবন তো কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, রণেশদাও করেছেন, তিনিও করেছেন। আসলে সত্যেন সেন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ওখানে, শান্তিনিকেতনে। কারণ, এখানে আর থাকা যাচ্ছিল না। রণেশদাও তা–ই। রণেশদা কলকাতার যেখানে ছিলেন, সেই জায়গাটা আমি চিনি। কারণ, ওখানে আমরা রিহার্সাল করতাম, মুক্তিযুদ্ধের গানের।
অলাত: রণেশ দাশগুপ্ত সম্ভবত আত্মীয়ের কাছে থাকতেন!
সন্জীদা খাতুন: না, বোনের কাছে থাকতেন সত্যেনদা। আর রণেশদা একটা খালি পোড়োবাড়ির মতো বাড়িতে থাকতেন, পরে। আগে হয়তো বোনের বাড়ি বা কারও কাছে থাকতেন, জানি না। ওই বাড়িটার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সিঁড়িটা কাঁপত। আর মেঝেগুলো ছিল সব ফাটা। ওই বাড়িতে থাকতেন রণেশদা। আর কী যে দুর্দশা ছিল ওখানকার টয়লেটের। ওখানে তাঁদের পক্ষেই থাকা সম্ভব।
অলাত: এখন সেভাবে শিল্পী হচ্ছে না, সবাই পারফমার হয়ে যাচ্ছে—ছায়ানটে এই ধরনের সমস্যা আছে?
সন্জীদা খাতুন: না, শিল্পীও হচ্ছে কিছু। ছায়ানট থেকে ইফ্ফাতারা দেওয়ান, সেলিনা মালেক চৌধুরীর গলা ছিল, নষ্ট হয়ে গেছে। বেনু যাকে বললাম সেই মাহমুদুর রহমান, তারপরে শাহীন মাহমুদ—তখন মাহমুদ ছিল, এখন অন্য রকমের নাম নিয়েছে—এ রকম অনেকে আছে। এই যে শাকিল (খায়রুল আনাম), নজরুলগীতি গায় এখন, ছায়ানটে শিখেছে। ছায়ানট থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিদেশে ছিল প্রায় আঠারো বছর, ফিরে এসে আবার ছায়ানট। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক ছিল পঁচিশ বছর।
অলাত: ছায়ানটের শুরুর দিকে সন্তোষ গুপ্ত, কলিম শরাফী কি যুক্ত ছিলেন?
সন্জীদা খাতুন: সন্তোষ গুপ্তের সঙ্গে আমার ততটা যোগাযোগ ছিল না। যদিও তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে একটা বই বের হয়েছে। তাতে রেকর্ড করা আমার একটা গান আছে। সন্তোষ গুপ্ত করতেন কি, আমার গান পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, কলিম শরাফীর গান শোনো, যেন কথা বলছে, এত সুন্দর। কলিম শরাফীর তো তুলনা নেই। ভরাট গলা। গলার আলাদা একটা ব্যাপার ছিল—অর্থ বুঝে বুঝে হয়।
আমার বয়স তো তখন অনেক কম। আমি গান করি একটা মিনমিনে গলা, সমু গলা, তাঁর পছন্দ ছিল না। সেটা আমি জানতাম। বলেছিলেন একবার। তাঁর সঙ্গে আমার সে রকম ঘনিষ্ঠতা কখনো হয়নি।
অলাত: কলিম শরাফীর সঙ্গে আপনার হৃার্দিক সম্পর্ক ছিল নিশ্চয়?
সন্জীদা খাতুন: কলিম শরাফী আমাকে গান শিখিয়েছিলেন। সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল ১৯৫৪ সালে, সাহিত্য সংসদ থেকে। সেই অনুষ্ঠানে গাওয়ার জন্য আমাকে অনেক কথা বলেছিলেন। তিনি অনেক কথা বলতেন, যেগুলো আমার ভালো লাগত। তাঁর আছে বেশি করে গান শিখেছিল আমার ছোট বোন ফাহমিদা। আমি ততটা সুযোগ পাইনি। আসলে আমি অর্গানাইজেশন নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত থাকতাম সব সময়।
অলাত: সাংস্কৃতিক চর্চার বলি আর আন্দোলনের ঝান্ডা বলি, ছায়ানট তো নিজেই বড় একটা কেন্দ্র।
সন্জীদা খাতুন: হ্যাঁ। বড় একটা প্রতিষ্ঠান। ওটা হচ্ছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলে, ওই যে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন, তিনি আমাকে খবর পাঠিয়েছিলেন, বলেছিলেন, কি সুফিয়া কামাল আর সন্জীদা খাতুন ছায়ানট করবে? ওটা (ছায়ানট) আমার হাতে দিক, দেখিয়ে দেব। এ কথাটা আমাকে চা খেতে ডেকে বলেছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। লায়লা আঞ্জুমান আরার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল তখন। আমরা শুনলেই দিগ্বিদিক তাকাতাম। কারণ, সরকারের সঙ্গে ঘেঁষা মানেই একটা ছাপ পড়ে যাওয়া। আমরা কখনোই কোনো সরকারের সঙ্গে ঘেঁষিনি।
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: বল ছ ল ন নজর ল র আম র স অন ক গ ছ য় নট থ কত ন র আম র র জন ত হয় ছ ল আম দ র র একট বলত ন একব র করত ন আপন র
এছাড়াও পড়ুন:
শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইল ঢাকা, দিল্লি চুপ
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া, সেখানে থেকে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার, গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়ন, তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি এবং সীমান্তে হত্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বাংলাদেশ।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে সাংরিলা হোটেলে গতকাল শুক্রবার দুপুরে বৈঠক করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রথম বৈঠক। দু’দেশের সম্পর্কের অস্বস্তির বিষয়গুলো নিজ নিজ পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয় এই বৈঠকে।
বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে উদ্বেগ জানানো হয়। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চায়, যেখানে নির্বাচনের একটা ভূমিকা আছে।
বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের জনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা উভয় দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুবিধা বয়ে এনেছে। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে শীতলতা আসে। এই বৈঠক সেই শীতলতা কমাতে সহায়তা করবে বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকটি ২০ মিনিট হওয়ার কথা থাকলেও ৪০ মিনিট স্থায়ী হয়।
বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালকে বলেন, বৈঠকে ঢাকা ভারতের উদ্বেগগুলোতে সুনির্দিষ্ট জবাব দিয়েছে। তিস্তা প্রকল্পে চীনের উপস্থিতি নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারত চীনের নাম উচ্চারণ করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, আমরা আমাদের সুখ-দুঃখ বুঝব। তৃতীয় পক্ষ যদি এখানে আসে, তা সবার ভেবে দেখা উচিত।
নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চায় ভারত নরেন্দ্র মোদির থাইল্যান্ড সফর নিয়ে গতকাল ঢাকা-দিল্লির বৈঠকের পর বিশেষ সংবাদ ব্রিফিং করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চায় বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, যে কোনো গণতন্ত্রে নিয়মিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ড. ইউনূসের কাছে নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে নিজের দর্শন তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে সামনের দিনে একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা আগেও বলেছি তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে অনুরোধ এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখন আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘু নির্যাতনের তদন্ত করবে এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সফল হবে।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন, পরিবেশকে খারাপ করে এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলাই সর্বোত্তম।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জানান, সীমান্তে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধ, বিশেষ করে রাতে সীমান্ত অতিক্রম ঠেকানো সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা এবং এগিয়ে নেওয়ার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠক করতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের সভাপতিত্ব গ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ফোরামের নেতৃত্বে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ফোরামের সদস্য দেশগুলোর নেতারা বিমসটেক কাঠামোর আওতায় আঞ্চলিক একত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পরামর্শ করা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সম্মত হয়েছেন।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন যে, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থের সব বিষয় গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান অব্যাহত থাকবে।
বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন তখন ড. ইউনূস জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইচ্ছা তাঁর আছে। যদি আরও কিছু সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে সে ক্ষেত্রে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ভারতের আতিথেয়তার অপব্যবহার করছে শেখ হাসিনা
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় তুলেলও ভারতের পক্ষ থেকে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। তবে ভারত বিষয়টির নোট নিয়েছে। ড. ইউনূস বলেছেন, ভারতের আতিথেয়তার অপব্যবহার করছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিপরীতে নরেন্দ্র মোদি এর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করেন।
এতে আরও জানানো হয়, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে গভীরভাবে মূল্য দেয়। দুই দেশের গভীর বন্ধুত্ব পরস্পর সম্পর্কিত ইতিহাস, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং সাংস্কৃতিক সখ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালে আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ভারতের সরকার ও জনগণের অটল সমর্থনের জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ।
দুই দেশের সম্পর্কের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে ড. ইউনূস বলেন, আমাদের উভয় দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য সম্পর্ককে সঠিক পথে নিয়ে যেতে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে কাজ করতে চায়।
বিমসটেকের সভাপতি হওয়ায় ড. ইউনূসকে অভিনন্দন জানান নরেন্দ্র মোদি। এ ছাড়া এই সময় ঈদের শুভেচ্ছাও জানান তিনি।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে দিল্লি সবসময় অগ্রাধিকার দেয়। দুই প্রতিবেশীর ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে জড়িত, আর এর শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশের জন্মের সময় থেকে। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না। আমাদের সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে জনগণের।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে মিথ্যা ও উস্কানিমূলক অভিযোগ করে চলেছেন। আমরা ভারতকে অনুরোধ করছি, আপনার দেশে অবস্থানকালে তাঁকে এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত রাখার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।’
অধ্যাপক ইউনূস জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী লীগ কর্মীদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ তুলে ধরা হয়। প্রধান উপদেষ্টা জানান, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের সময় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশই শিশু। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের হত্যা ও ‘নেতাদের গ্রেপ্তার করে লাশ গুম করার’ নির্দেশ দেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির উদ্বেগের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা অনেকটাই অতিরঞ্জিত এবং ‘এর বেশির ভাগই ভুয়া খবর’। যেসব হামলার অভিযোগ এসেছে, তা স্বচক্ষে যাচাই করার জন্য তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সাংবাদিক পাঠানোর অনুরোধ জানান। সরকার এমন যে কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ও হত্যা কমাতে বৈঠকে দুই দেশ সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার (সিবিএম) প্রয়োজনের বিষয়ে জোর দিয়েছে দুই পক্ষ।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা সার্বভৌম, সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গঠনের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া, তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক যোগাযোগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। জঙ্গিবাদ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ আলোচনায় ড. ইউনূস জানান, বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সবার সুরক্ষা নিশ্চিতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নরেন্দ্র মোদিকে ছবি উপহার
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি ছবি (ফটোগ্রাফ) উপহার দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অধ্যাপক ইউনূসকে স্বর্ণপদক প্রদান করেন। সেই মুহূর্তটির ধারণ করা ছবি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা।
বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। গতকাল তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।