সংসদের আগেই গণপরিষদ নির্বাচন যে কারণে দরকার
Published: 4th, April 2025 GMT
নতুন নির্বাচিত সংসদই সংবিধানের সংশোধন করবে বলে গণপরিষদ নির্বাচনের দরকার নেই– এই কথা বলে প্রথাগত রাজনীতিবিদরা প্রকারান্তরে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। সংসদই মাতৃপ্রতিষ্ঠান; গণপরিষদ নয়– এসব বলার কারণ দেশে ’৯১ সাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থার নামে সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র চালু ছিল। সংসদীয় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র আসলে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে। কারণ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনের জোরে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করে ফেলা যায়; সেখানে গণভোটের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌমত্বের বদলে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। বিরোধটা এখানেই।
সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনে গণভোটের ব্যবস্থা না রেখে এবং জনগণের সঙ্গে সংলাপ ছাড়াই একটা রাজনৈতিক কাঠামো চাপিয়ে দিয়ে তাকেই দেশের শাসনতন্ত্র বলা অগণতান্ত্রিক। সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্বের কথা বলে জনগণকে শোষণ করার জন্যই নানা আইন পাসের সংসদীয় কাঠামো বাস্তবে জনগণের মৌলিক অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় কাজ করে না। তাই দরকার গণসার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে জনগণ প্রতিনিধি (সংসদ সদস্য) নির্বাচনের পরও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোট দিয়ে সংসদকে জবাবদিহি রাখবে। আবার এখন যেহেতু ডিজিটাল পদ্ধতি, স্মার্ট ফোন আছে, জনগণ অনলাইন ভোটের মাধ্যমেও মতামত প্রকাশ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি অংশ নিতে পারে। রাষ্ট্রপতিও নির্বাচিত হবেন জনগণের সরাসরি ভোটে। এভাবেই জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই আমূল পরিবর্তনের জন্য দরকার গণপরিষদ নির্বাচন বা সংবিধান সভা নির্বাচন। এই পরিষদ বা সভার কাজ হবে দেশের সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে জনতার মতামত নিয়ে নতুন গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করা।
এ ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি যেমন রাজনৈতিক কাঠামো কীভাবে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক হবে; আবার জনগণের মর্যাদা, অধিকার, বিকাশ ত্বরান্বিত করবে; সরকার পদ্ধতি কেমন হবে; সব ধরনের বৈষম্য কীভাবে কমিয়ে আনা যাবে; রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মাঝে ক্ষমতার বণ্টন ও ভারসাম্য; রাজনৈতিক দল গঠন ও নিবন্ধন নীতিমালা কেমন হলে সবার রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে– এসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের ভিত্তিতেই গঠনতন্ত্র বা সংবিধানের খসড়া তৈরি হবে। তারপর গণভোটে এই খসড়া পাস হলেই তাকে নতুন সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে এর ভিত্তিতে সংসদীয় নির্বাচন দিতে হবে।
কারণ সংসদের ভিত্তিতে সরকার গঠনের নির্বাচন আর গণপরিষদ নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা। সংসদ গঠিত হয় সংবিধানের ভিত্তিতে এবং সংসদ সেই গঠনতন্ত্রকে রক্ষার শপথ নিয়েই কাজ শুরু করে। সংসদ নির্বাচনের আইন, আসনের সীমানা, সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি এসবও সংবিধানের ভিত্তিতেই ঠিক হয়। গণপরিষদ নির্বাচন হয় সেই সংবিধান প্রণয়নের জন্য। ফলে সংসদ নির্বাচনের আগে দরকার গণপরিষদ নির্বাচন।
অনেকেই মনে করেন, আমাদের নতুন সংবিধান দরকার নেই। বিদ্যমান সংবিধানে কিছু ঘষামাজা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। সরাসরি সংসদ নির্বাচন দিয়ে সরকার গঠন করলেই আমাদের এখনকার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটা আসলে রাজনীতি বিজ্ঞান এবং আধুনিক বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সম্পর্কে কম বোঝাপড়ার কারণে হতে পারে। সংসদ নির্বাচন হচ্ছে সরকার গঠনের মামলা; তারও আগে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন না করে সরকার গঠন করলে লাভ নেই। পুলিশ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানের আমূল সংস্কার দরকার। সে ক্ষেত্রে নতুন সংবিধানের বিকল্প নেই। আর নতুন সংবিধানের জন্য প্রয়োজন গণপরিষদ নির্বাচন।
বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মূল কথা গণমালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তির বিকাশকে কীভাবে আইনে, সংবিধানে, প্রশাসনিক কাঠামোতে এবং রাজনীতিতে রূপান্তর করা হবেম তা এই অন্তর্বর্তী সময়েই সুরাহা করতে হবে। ঔপনিবেশিক আইনসহ নানা নিবর্তনমূলক গণঅধিকার হরণকারী আইন ও সিস্টেম চালু রেখে সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামোতে অনন্তকালীন জরুরি অবস্থা জারি রাখার যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু আছে, তা নতুন গঠনতন্ত্র ছাড়া দূর করা সম্ভব নয়। এসব আইন ও ব্যবস্থাই বারবার বাকশাল, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র, সংসদীয় ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি বলেই রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় সামন্তবাদী কাঠামোতে ভরা। বুর্জোয়া রাষ্ট্র গঠনে যে নতুন সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রয়োজন, সে জন্যই প্রথমে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে। সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে গঠিত সংসদ সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করতে পারবে না; এটা আইনি ও রাষ্ট্রনৈতিকভাবে সম্ভবও নয়। ফলে সংসদ নির্বাচন করে সংবিধান সংশোধনের আলাপ আসলে নতুন ফাঁদ।
অনেকেই বলছেন, গণপরিষদ নির্বাচন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দরকার হয় রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ অথবা বিপ্লবী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অথবা স্বাধীনতা যুদ্ধের পর। তাদের মতে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর যে সংবিধান রচিত হয়েছে তাই যথেষ্ট। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সংবিধানের জন্য তাই গণপরিষদ নির্বাচনের উপযোগিতা নেই। কিন্তু ঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ভিত্তিতে রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে তো ‘রাষ্ট্র’ বলা যায় না! এই রাষ্ট্রে গণসার্বভৌমত্ব নেই। অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দাবিই হচ্ছে জননিপীড়নমূলক কাঠামোর খোলনলচে পাল্টে ফেলে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। এই কাজ গত ৫৩ বছরে হয়নি; এখন আমাদেরই করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর গণপরিষদ নির্বাচনের বিকল্প নেই।
বিশ্বজুড়ে দেখা গেছে, যে কোনো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরে নতুন সংবিধান প্রয়োজন হয়। ইতালিতে তাই ১৯৪৬ সালে গণপরিষদ নির্বাচন হয় এবং নির্বাচিত সংবিধান সভা গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের পরই সরকার গঠনের নির্বাচন দেয়। চিলিতে ২০১৮ সালের গণআন্দোলনের সব অংশীদার একমত হন– বিদ্যমান সংবিধান সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈষম্য ও অধিকার হরণ ঠেকাতে পারছে না; তা বাতিল করে নতুন সংবিধান তৈরি করতে হবে। ফলে ২০২১ সালে সেখানে গণপরিষদ নির্বাচন হয় এবং সংবিধান সভা নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরি করে। চিলি যদি নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে পারে, আমরা পারব না কেন?
ড.
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: র জন ত স ব ধ ন প রণয়ন নত ন স ব ধ ন র র ষ ট র গঠন গণত ন ত র ক গঠনতন ত র সরক র গঠন গণতন ত র জনগণ র স ন র জন য র জন ত ক ন র পর আম দ র গণভ ট দরক র
এছাড়াও পড়ুন:
দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: প্রধান উপদেষ্টা
যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের জনগণকে আশ্বস্ত করেছি যে, প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন হলে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করব।’
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) সম্মেলনে ভাষণদানকালে প্রধান উপদেষ্টা একথা বলেন।
বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “১৯৭১ সালে লাখ লাখ সাধারণ নারী-পুরুষ, শিশু ও যুবক একটি নৃশংস সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয় মাসব্যাপী গণহত্যায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিল।”
“আমাদের জনগণ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত ও স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল যেখানে প্রতিটি সাধারণ মানুষ তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।”
তিনি বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে, গত পনেরো বছরে আমাদের জনগণ বিশেষ করে যুবসমাজ, ক্রমাগত তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা সংকুচিত হতে দেখেছে। তারা রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয় ও নাগরিক অধিকারের অবমাননা প্রত্যক্ষ করেছে।”
সাধারণ জনগণ একটি নৃশংস স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রায় ২ হাজার নিরীহ মানুষ, যাদের বেশিরভাগই তরুণ এবং ১১৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
“বাংলাদেশের জনগণ তার ইতিহাসে এক নবজাগরণ প্রত্যক্ষ করেছে।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “যেসব ছাত্রনেতা এই গণজাগরণে নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনার দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করেছে, তারা তাকে অনুরোধ করেছিল এই সংকটময় মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে।”
তিনি বলেন, “আমি আমাদের জনগণের স্বার্থে এই দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হয়েছি।”
সরকারপ্রধান বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে তারা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বলিষ্ঠ ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার গ্রহণ করবে।”
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা সুশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বিষয়গুলোই আমাদের পরিকল্পিত সংস্কারের মূল লক্ষ্য।”
“সরকার ইতিমধ্যে বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংবিধান সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন গঠন করেছে, যাতে জনগণের মালিকানা, জবাবদিহিতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়।”
প্রধান উপদেষ্টা জানান, এই কমিশনগুলো ইতিমধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে, যা বর্তমানে সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করেছি। আমি নিজেই যার নেতৃত্ব দিচ্ছি এবং এতে ছয়টি কমিশনের প্রধানরা রয়েছেন। এই কমিশনগুলো যে সুপারিশগুলো জমা দিয়েছে, তা পর্যালোচনা এবং গ্রহণ করার জন্য এ কমিশন গঠন করা হয়েছে।”
সরকার প্রধান আরও জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি আরো চারটি কমিশন গঠন করেছে, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম এবং নারী অধিকার সংক্রান্ত নীতিগত সুপারিশ দেওয়ার লক্ষ্যে।
তিনি বলেন, “আমরা যখন বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করছি, তখন আমরা দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে অবিচলভাবে কাজ চালিয়ে যাব, তারা নারী হোক কিংবা জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হোক।”
অনুষ্ঠানে থাই প্রধানমন্ত্রী এবং সম্মেলনের চেয়ারপারসন পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রা, বিমসটেক মহাসচিব রাষ্ট্রদূত ইন্দ্র মনি পান্ডে এবং বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
তথ্যসূত্র: বাসস
ঢাকা/ইভা