আমদানির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি চার গুণ বেশি
Published: 4th, April 2025 GMT
পাল্টা শুল্ক বা রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ হার ঘোষণা করে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য–ঘাটতি বেশি, সেসব দেশেই বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছেন তিনি। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থা ষষ্ঠ। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি শুল্ক করা হয়েছে পাঁচটি দেশে। বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে ট্রাম্প শুল্কহার ঘোষণা করেছেন ৩৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ৪৮ শতাংশ আরোপ হয়েছে পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসের ওপর।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্য এখন বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে যত পণ্য আমদানি হয়, এর চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি রপ্তানি হয় সে দেশে। যদিও রপ্তানির সিংহভাগই তৈরি পোশাক। তবে এখনো বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ রয়েছে। এই ১৫ শতাংশের সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক বাড়তি হিসেবে যুক্ত হবে।
ইউএস সেনসাস ব্যুরোর হিসাবে, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রায় আড়াই শ কোটি মার্কিন ডলার বেড়েছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি বেড়েছে সোয়া শ কোটি ডলারের মতো। যে গতিতে দেশের রপ্তানি বেড়েছে, সেই গতিতে আমদানি বাড়েনি।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। তাতে গত বছর বাণিজ্য–ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬১৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের পক্ষে আছে।
• ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য• যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে মোট ২২১ কোটি ডলারের পণ্য।
• শুল্ক আরোপের প্রভাব পর্যালোচনা করতে রোববার সভা ডেকেছে এনবিআর।
এক দশক আগে অর্থাৎ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৫৯৯ কোটি ডলারের পণ্য। তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এসেছে মাত্র ৯৪ কোটি ডলারের পণ্য। ওই বছর বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য–ঘাটতি হয়েছিল ৫০০ কোটি ডলারের মতো। এরপর বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি শুধু বেড়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য–ঘাটতি আরও বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে যা যায়
বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে যত পণ্য রপ্তানি হয়, তার মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি হলো তৈরি পোশাক। ২০২৪ সালে দেশটিতে ৭০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাতীয় পণ্য, ওষুধ, প্লাস্টিক, মনোহারি পণ্য বেশি রপ্তানি করেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর ৮-১০ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাতীয় পণ্য, ২-৩ কোটি ডলারের ওষুধ, ১-২ কোটি ডলারের প্লাস্টিক পণ্য ও মুদি পণ্য রপ্তানি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে যা আমদানি হয়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যভান্ডারে দেখা যায়, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৯১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল রয়েছে ২৯ কোটি ডলারের। অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পণ্য এসেছে ২৬২ কোটি ডলারের।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাংলাদেশের এনবিআরের হিসাবের পার্থক্যের কারণ সময়ের ব্যবধান। এনবিআর পণ্য খালাসের পর হিসাব করে, যুক্তরাষ্ট্র পণ্য রপ্তানির সময় হিসাব করে। হিসাবে পার্থক্যের আরেকটি কারণ হলো, তৃতীয় দেশ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আসছে বাংলাদেশে, যা যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে দেখানো হয় না।
এনবিআরের হিসাবে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য আমদানি হওয়া ২৬২ কোটি ডলারের পণ্যের মধ্যে ১৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর দিতে হয়নি। যেমন গম ও তুলার মতো পণ্যে শুল্ক-কর নেই। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে গড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে কাস্টমস শুল্ক-কর আদায় করেছে ১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ হাজার ৫১৫টি এইচএসকোডের (পণ্যের শ্রেণিবিভাজন) পণ্য আমদানি হয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে আট ধরনের পণ্যই আমদানি হয়েছে ৬৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রড তৈরির কাঁচামাল পুরোনো লোহার টুকরা বা স্ক্র্যাপ। গত ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এ পণ্য আমদানি হয় ৭৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের, যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ। গড়ে ৪ শতাংশ শুল্কহার রয়েছে পুরোনো লোহার টুকরা বা স্ক্র্যাপ পণ্য আমদানিতে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানি পণ্য হিসেবে এলপিজির উপাদান বিউটেন আমদানি হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের। এর ওপর গড় শুল্কহার হলো ৫ শতাংশ।
তৃতীয় সর্বোচ্চ আমদানি হয় সয়াবিন বীজ। এ পণ্য আমদানি হয়েছে ৩২ কোটি ডলারের। এটি আমদানিতে অবশ্য শুল্ক-কর নেই।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। এই পণ্য আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের। এটিতেও শুল্ক-কর প্রযোজ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির তালিকায় আরও রয়েছে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), হুইস্কি, গাড়ি, গম, উড পাল্প, পুরোনো জাহাজ, সয়াকেক, কাঠবাদাম ইত্যাদি।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেন
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শুল্ক-কর কমিয়ে কৃত্রিমভাবে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং দেশে মার্কিন বিনিয়োগ আনা হলে সহজভাবে আমদানি বাড়বে। কারণ, মার্কিন উদ্যোক্তারা নিজ দেশ থেকে বাংলাদেশে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানি করবেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শুল্ক আরোপের পর সব দেশই নানামুখী নীতি নিচ্ছে। আমাদের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বাইরে অন্য কোনো সুযোগ নেই। আমরা যেসব পণ্য রপ্তানি করি, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের জন্য। আবার তাদের তুলা ব্যবহার করছি। বিষয়টি যদি আমরা যুক্তি দিয়ে দাঁড় করাতে পারি এবং যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় নেয়, তাহলে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ প্রণোদনা দিতে পারে সরকার।’
বাংলাদেশের উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক আরোপের ফলে দুশ্চিন্তা বেড়েছে। ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এনবিআর ট্যারিফ লাইনে থাকা পণ্যগুলোর ওপর শুল্ক-কর হার পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের শুল্ক আরোপের পর করণীয় কী, তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে এনবিআর। পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের শুল্ক-কর কমানোর বিষয়ে এনবিআরের পক্ষ থেকে কী করা যেতে পারে, তা–ও চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি জানান, আগামী রোববার এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) বৈঠক হবে।
এদিকে ট্যারিফ কমিশন রপ্তানিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটি বিশ্লেষণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে। ছুটির পর অফিস খুললে এ নিয়ে কাজ শুরু করবে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক ঘোষণার রেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বাজারবিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই পাল্টা শুল্ক বিশ্বকে বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও মন্দা পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সে দেশের বিশেষজ্ঞরা।
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: শ ল ক আর প র ২০২৪ স ল শ ল ক কর আমদ ন ত র ওপর
এছাড়াও পড়ুন:
চীনের বিবাহসংকট কেন সবার মাথাব্যথার কারণ
চীনে নতুন বিয়ের সংখ্যা গত বছর এক-পঞ্চমাংশ কমেছে। এটি ইঙ্গিত করে, ২০২৪ সালে দেশটির সরকারিভাবে নিবন্ধিত ৯ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন জন্মের সংখ্যা ২০২৫ সালে কমে ৭ দশমিক ৩ থেকে ৭ দশমিক ৮ মিলিয়নের মধ্যে নেমে আসতে পারে। ফলে বিশ্ব জনসংখ্যার ১৭ দশমিক ২ শতাংশ চীন থেকে এলেও বৈশ্বিক জন্মহার অনুযায়ী দেশটির অংশীদারি ৬ শতাংশের কম হবে, যা নাইজেরিয়ার সমান।
চীনে জন্মহার কমতে থাকায় ২০২৫ সালে প্রত্যাশিতভাবে প্রতি নারীতে এটি মাত্র শূন্য দশমিক ৯-এ নেমে আসবে, অথচ একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রয়োজন কমপক্ষে ২ দশমিক ১ জন। অর্থাৎ চীনের জনসংখ্যা ভবিষ্যতে দ্রুত হ্রাস পেতে পারে। ২০১৬ সালে চীনা সরকার যে জন্মহার অনুমান করেছিল, এখনকার পরিস্থিতি তার অর্ধেকের কম। এই সংকট এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে গত মাসের শুরুতে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ঘোষণা করেছেন, সরকার জন্মহার বাড়ানোর জন্য নতুন নীতিমালা চালু করবে।
তবে বিয়েসংকট এ প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলবে। ২০১৩ সালে চীনে ১ দশমিক ৩৪ কোটি দম্পতি বিয়ে করেছিলেন। আর ২০২৪ সালে তা কমে ৬১ দশমিক ১০ লাখে নেমে এসেছে। ২০২০-২৪ সালে করোনার কঠোর বিধিনিষেধের কারণে কিছু ব্যতিক্রম দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে দেশটিতে বিয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০১৩ সালে প্রতি হাজারে বিয়ের হার ছিল ৯ দশমিক ৯। এটি ২০২৪ সালে কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। তুলনামূলকভাবে ২০২৩ সালে তাইওয়ানে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৪ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬ দশমিক ১।
চীনে জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ নেই, বরং একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে, যা দেশটির নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সন্তান জন্মদানে সক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া, মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে যাওয়া, দীর্ঘদিন এক সন্তান নীতি চালু থাকায় মানুষের মধ্যে কম সন্তান নেওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠা, দেশে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়া এবং তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া। এসব কারণ মিলেই চীনের জনসংখ্যা সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
যেসব অঞ্চলে কনফুসিয়াস মতাদর্শের প্রভাব বেশি, সেখানে বিশ্বে সবচেয়ে কম জন্মহার লক্ষ করা যায়। এর অন্যতম কারণ হলো, এসব সমাজে শিক্ষাকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়, ফলে বিয়ে ও সন্তান ধারণের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমে যায়। এর ফলে এসব অঞ্চলে অবিবাহিত মানুষের হার বেশি থাকে এবং অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, যদি প্রথমবার মা হওয়ার গড় বয়স ২৮ পেরিয়ে যায়, তাহলে সেখানে জন্মহার ১ দশমিক ৫-এ উন্নীত করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।চীনের ২০২০ সালের জনশুমারি অনুসারে, দেশের ৬১ শতাংশ নবজাতক ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী মায়েদের সন্তান। কিন্তু এই বয়সী নারীদের সংখ্যা ২০১২ সালে ১১১ মিলিয়ন থাকলেও ২০২৪ সালে কমে ৭৩ মিলিয়নে নেমে এসেছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা আরও কমে ৩৭ মিলিয়ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে জন্মহার কিছুটা বাড়লেও মোট জন্মসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকবে।
চীনে কয়েক দশক ধরে লিঙ্গ বাছাই করে গর্ভপাতের কারণে কনেসংকট তৈরি হয়েছে এবং ‘ব্রাইড প্রাইস’ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একজন পাত্রের পরিবারকে সাধারণত অন্তত একটি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে হয়। সাধারণত প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে ১০২ থেকে ১০৬ পুরুষ জন্ম নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু চীনের ২০০০ সালের জনগণনায় দেখা যায়, ০-৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি ১০০ কন্যাশিশুর বিপরীতে জাতীয় গড় ১২০টি ছেলেশিশু ছিল। জিয়াংসি প্রদেশে এটি ছিল ১৩৩ এবং হুবেই প্রদেশের উক্সু শহরে ছিল ১৯৭।
তবে এত পুরুষের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও দেশে ‘বেঁচে থাকা নারীদের’ সংখ্যা কম নয়। এর মূল কারণ, একমাত্র কন্যাসন্তানের অভিভাবকেরা সাধারণত তার শিক্ষার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চেয়েছেন। ফলে বিয়েকে কম গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁরা জামাতা হিসেবে উচ্চ চাহিদা নির্ধারণ করেছেন। চীনে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী অবিবাহিত নারীদের হার ২০০০ সালে ছিল ৯, যা ২০২০ সালে বেড়ে ৩৩ শতাংশ হয়েছে এবং ২০২৩ সালে তা আরও বেড়ে ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এ প্রবণতা এখনো বাড়ছে।
১৯৮০ সালে চীন এক সন্তান নীতি চালু করলে বিয়ের জন্য নতুন বাধা তৈরি হয় এবং একই সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ সহজ হয়ে যায়, যা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বিবাহবিচ্ছেদের হার ১৯৮০ সালে প্রতি হাজারে ছিল শূন্য দশমিক ৩। ২০১৯ সালে এই হার বেড়ে ৩ দশমিক ৪-এ পৌঁছায়। এরপর ২০২১ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উদাহরণ অনুসরণ করে চীন নতুন নাগরিক বিধি চালু করে। সেখানে বিবাহবিচ্ছেদের আগে ৩০ দিনের অপেক্ষার নিয়ম করা হয়। এতে বিচ্ছেদের হার ২-এ নেমে এলেও ২০২৩ সালের মধ্যে তা আবার বেড়ে ২ দশমিক ৬ হয়েছে। এটি জাপানের তুলনায় (১ দশমিক ৫) অনেক বেশি।
চীনে পুরুষ ও নারীদের সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত সময় খুবই সংক্ষিপ্ত। ৩০ বছর বয়সে একজন নারীর ডিম্বাণুর মাত্র ১২ শতাংশ অবশিষ্ট থাকে, আর ৪০ বছর বয়সে তা মাত্র ৩ শতাংশে নেমে আসে। ৩০ বছরের নিচে নারীদের গর্ভপাতের আশঙ্কা ১০ শতাংশ, যা ৩৫ বছরে বেড়ে ২০ শতাংশ, ৪০ বছরে ৩৩ থেকে ৪০ শতাংশ এবং ৪৫ বছরে ৫৭ থেকে ৮০ শতাংশ হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাউন সিনড্রোমসহ জন্মগত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে। ২০ বছর বয়সে যেখানে প্রতি দুই হাজার শিশুর মধ্যে একজন ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ৩৫ বছরে তা প্রতি ৩৫০ জনে ১ জন এবং ৪৫ বছরে তা প্রতি ৩০ জনে ১ জন হয়। বিয়ের বয়স যত দেরি হচ্ছে, সন্তান পালনের প্রতি আগ্রহও তত কমে যাচ্ছে।
এ কারণেই বিশ্বব্যাপী প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশু ৩০ বছর বা তার কম বয়সী মায়েদের গর্ভে জন্ম নেয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোয় প্রথমবার মা হওয়ার গড় বয়স ছিল ২৭ বছর। আর ভারতে ছিল মাত্র ২১ বছর। এর তুলনায় চীনে প্রথম সন্তান জন্মদানের গড় বয়স ২০০০ সালে ২৫ বছর থাকলেও ২০২০ সালে তা বেড়ে ২৮ বছরে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ হার দ্রুত বাড়ছে।
সাংহাইয়ে ২০১৯ সালে যেখানে প্রথম সন্তান জন্মদানের গড় বয়স ছিল ৩০ বছর, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৩২ বছরে দাঁড়িয়েছে। এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো, চীনে সামগ্রিক বন্ধ্যত্বের হার ১৯৭০-এর দশকে যেখানে ১ থেকে ২ শতাংশ ছিল, ২০২০ সালে তা বেড়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অনেকেই বিয়ের পর বা প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর বন্ধ্যত্বের শিকার হচ্ছেন।
যেসব অঞ্চলে কনফুসিয়াস মতাদর্শের প্রভাব বেশি, সেখানে বিশ্বে সবচেয়ে কম জন্মহার লক্ষ করা যায়। এর অন্যতম কারণ হলো, এসব সমাজে শিক্ষাকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়, ফলে বিয়ে ও সন্তান ধারণের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমে যায়। এর ফলে এসব অঞ্চলে অবিবাহিত মানুষের হার বেশি থাকে এবং অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, যদি প্রথমবার মা হওয়ার গড় বয়স ২৮ পেরিয়ে যায়, তাহলে সেখানে জন্মহার ১ দশমিক ৫-এ উন্নীত করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে বিয়ের ন্যূনতম আইনগত বয়স সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু চীনে ১৯৮০ সালে তা বাড়িয়ে পুরুষদের জন্য ২২ বছর এবং নারীদের জন্য ২০ বছর নির্ধারণ করা হয়। এখন মানুষ এতটাই দেরিতে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে বিয়ের বয়স কমিয়ে ১৮ করলেও জন্মহার বাড়ানো সম্ভব হবে না।
বিয়ের বয়স ও সন্তান ধারণের সময় পেছানোর অন্যতম প্রধান কারণ হলো সরকারের জনশক্তি উন্নয়ন ও ‘নতুন মানসম্পন্ন উৎপাদনশীল শক্তি’ নীতির প্রয়োগ। এর ফলে ২০০০ সালে যেখানে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২ দশমিক ২১ মিলিয়ন এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ছিল ১ দশমিক ২৯ লাখ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন (যা এই বছরের মোট জন্মসংখ্যার চেয়েও বেশি) এবং ১ দশমিক ৩৬ মিলিয়নে পৌঁছেছে।
ইতিমধ্যে চীনে উচ্চশিক্ষার হার জাপানের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে, যার অর্থ হলো চীনের জন্মহার জাপানের বর্তমান হার ১ দশমিক ১৫-তে স্থিতিশীল রাখাও কঠিন হবে।
চীনের সরকার কি তার অর্থনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতার মধ্যে সৃষ্ট এ সংকটের সমাধান করতে পারবে? অতীতের অভিজ্ঞতা বিচার করলে এতে আশা রাখার কোনো কারণ নেই।
● ই ফুশিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তিনি চীনের এক সন্তান নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ