পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে তরুণদের ‘থ্রি-জিরো’ ব্যক্তি হিসেবে তৈরির আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বিশ্ব এখন আত্মবিধ্বংসী সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ কার্বন নিঃসরণ, বর্জ্য উৎপাদন ও সম্পদ পুঞ্জীভূত করার পুরোনো অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করে চলেছে। যদি আমরা টিকে থাকতে চাই, তাহলে আমাদের নতুন ‘থ্রি-জিরো’ সভ্যতা– শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য বর্জ্য ও শূন্য সম্পদ কেন্দ্রিকতার দিকে যেতে হবে। বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক ইয়ং জেনারেশন ফোরামে মূল বক্তার বক্তৃতায় এসব কথা বলেন ড.

ইউনূস। 

তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা বলেন, চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কেবল টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে। যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান প্রজন্মকে শক্তিশালী অভিহিত করে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনি এক দিনে পৃথিবী বদলে দিতে পারবেন না। যদি পরিবর্তন আনতে চান, তাহলে নিজের গ্রাম থেকে শুরু করুন। শুরুতে বড় পরিসরে ব্যবসা চালু করা ভুল পথ। তাই ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরুর মাধ্যমে পরিবর্তনের সূচনা করুন। সবার জন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে তরুণদের সামাজিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানান ড. ইউনূস।

প্রকৃতির সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্পদ ভাগাভাগি না করলে সমাজে টিকে থাকা সম্ভব নয়। জীবন সংরক্ষণ ও সুরক্ষার জন্য। তাই ‘থ্রি-জিরো’ সভ্যতা গড়ে তুলতে হবে। থ্রি-জিরো ক্লাবের গুরুত্ব সম্পর্কে সরকারপ্রধান বলেন, পাঁচজন একসঙ্গে হলে তারা একটি থ্রি-জিরো ক্লাব করতে পারে। এখানে তারা ব্যক্তি পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ, বর্জ্য উৎপাদন ও সম্পদ কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত থাকবে এবং নিজেরা থ্রি-জিরো ব্যক্তি হয়ে উঠবে।

ব্যাংককে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোটের (বিমসটেক) শীর্ষ সম্মেলন শেষ হচ্ছে আজ শুক্রবার। এ সম্মেলনে যোগ দিতে গতকাল দুপুরে ব্যাংককের সুবর্ণ ভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট। বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে অভ্যর্থনা জানান থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংযুক্ত মন্ত্রী জিরাপরন সিন্দোপারি। খবর- বাসস।

নৈশভোজে ইউনূস-মোদি পাশাপাশি: সন্ধ্যায় ব্যাংককের একটি হোটেলে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে অংশ নেন ড. ইউনূস। এ সময় তিনি থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার সঙ্গে ছবি তোলেন। নৈশভোজে ড. ইউনূসের পাশেই বসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় দু’জনকে বেশ কিছু সময় ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলতে দেখা যায়।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, শুক্রবার ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত– দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে শুক্রবার বৈঠক হবে।’

প্রেস সচিব আরও জানান, ব্যাংককে বৃহস্পতিবার বিমসটেক সম্মেলনের নৈশভোজে ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ হয় এবং তারা কুশল বিনিময় করেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এর পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ড. ইউনূস। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হচ্ছে। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে বর্তমানে দু’জনই ব্যাংককে অবস্থান করছেন।

থাইল্যান্ডের দুই মন্ত্রীর সাক্ষাৎ
থাইল্যান্ডের সামাজিক উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তামন্ত্রী বরাভুত সিল্পা-আর্চা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংযুক্ত মন্ত্রী জিরাপরন সিন্দোপারি সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে। বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে তারা এ সাক্ষাৎ করেন।
 

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ব মসট ক মন ত র ইউন স সরক র

এছাড়াও পড়ুন:

গৃহকর্মীকে মারধর, চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমণির এক বছরের মেয়ে সন্তানকে খাবার খাওয়ানোকে কেন্দ্র করে গৃহকর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে নায়িকা বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পিংকি আক্তার গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) রাজধানীর ভাটারা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

ভাটারা থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এরপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অভিযোগের বিষয়ে চিত্রনায়িকা পরীমনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।

ভুক্তভোগী গৃহকর্মী পিংকি আক্তারের অভিযোগ তদন্ত করছেন ভাটারা থানার এসআই আরিফুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি, তবে এখনও সেটি নথিভুক্ত করা হয়নি। প্রাথমিক তদন্তের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে এটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নাকি মামলা হিসেবে নেওয়া হবে। 

পুলিশের এই কর্মকর্তা  আরও  বলেন, প্রাথমিকভাবে পরীমণির তরফে বলা হয়েছে, তাঁর শিশুসন্তানকে ফেলে দিয়েছিলেন ওই গৃহকর্মী। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চিত্রনায়িকা তাকে বকুনি দেন। আমরা ধারণা করছি, এর জের ধরে হয়তো চড়–থাপ্পরের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।

নির্যাতনের কথা তুলে ধরে গৃহকর্মী পিংকি আক্তার জানান, এক মাস আগে আমি কাদের নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে চিত্রনায়িকা পরীমণি বাসায় কাজ পাই। আমার দায়িত্ব ছিল পরীমণির এক বছর বয়সী মেয়ের দেখাশোনা করা এবং তাকে খাবার খাওয়ানো। ওনার বাচ্চাকে প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর খাওয়ানোর নিয়ম। আমি সেটা মেনে প্রতিদিন বাচ্চাকে দুই ঘণ্টা পরপর খাবার খাওয়াই। তবে আমাকে বাচ্চার দেখাশোনার জন্য নিয়ে যাওয়া হলেও, বাসার অন্যান্য কাজও করানো হতো।

গত ২ এপ্রিল আমি পরীমণির বাসায় তার বাচ্চাটিকে বসিয়ে বাজারের লিস্ট করছিলাম— তার কি কি লাগবে। এ সময় বাচ্চাটা কান্না শুরু করে। এরমধ্যে কান্না শুনে সৌরভ নামে এক ব্যক্তি, যিনি পরীমণির পরিচিত এবং মাঝেমধ্যেই তার বাসায় আসেন, আমাকে বললেন, "বাচ্চাটাকে একটু সলিড খাবার দাও। তখন আমি সৌরভ ভাইকে বললাম, ভাই, বাচ্চাটা কিছুক্ষণ আগে সলিড খাবার খেয়েছে; দুই ঘণ্টা হয়নি এখনো। আমি একটু কাজ করি, তারপর তাকে দুধ খাওয়াই।

আমি এখানে এসে জেনেছি, আমার আগে যে গৃহকর্মী ছিলেন, তিনিও বাচ্চাটা কান্না করলে মাঝেমধ্যে দুধ দিতেন। এই কথা বলে আমি বাচ্চাটার জন্য দুধ রেডি করছিলাম। এরই মধ্যে চিত্রনায়িকা পরীমণি মেকআপ রুম থেকে বের হয়ে আমাকে তুই-তোকারি করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন—আমি কেন বাচ্চার জন্য দুধ নিয়েছি। আমি তখন তাকে বললাম, যেহেতু সলিড খাবার দেওয়ার সময় এখনো হয়নি, তাই আমি দুধ নিয়েছি।

তখন পরীমণি আমাকে গালি দিয়ে বলেন, বাচ্চাটা কি তোর না আমার? এরপরই তিনি আমাকে ক্রমাগত থাপ্পড় দিতে থাকেন এবং মাথায় জোরে জোরে আঘাত করতে থাকেন।

ভুক্তভোগী গৃহকর্মী আরও বলেন, তিনি যখন আমাকে থাপ্পড় দিতে শুরু করেন, তখন আমি হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো দুই-একটি থাপ্পড় দিয়ে থেমে যাবেন। কিন্তু তিনি থামলেন না—উল্টো আমার মাথায় আরও জোরে আঘাত করতে থাকলেন। তাঁর মারধরে আমি তিনবার ফ্লোরে পড়ে যাই। এরপর তিনি আমার বাম চোখে অনেক জোরে একটি থাপ্পড় মারেন। এই থাপ্পড়ের কারণে আমি এখনো বাম চোখে কিছু দেখতে পাই না।

ভয়ংকর এই মারধরের পর আমি জোরে জোরে কান্না করতে থাকি এবং তাকে বলি, আমি আর পারছি না, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তখন তিনি আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে বলেন, তুই এখান থেকে কোথাও যেতে পারবি না। তোকে এখানেই মারবো এবং এখানেই চিকিৎসা করবো। এই কথা বলে তিনি আবার আমাকে মারতে আসেন। তখন সৌরভ তাকে বাধা দেন।

সৌরভ কেন বাধা দিলেন, এই কারণে পরীমণি তাকেও গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাই।

পিংকি আক্তার অভিযোগ করে আরও বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফেরে। তখন বাসার আরেকজন গৃহকর্মী, বৃষ্টিকে আমি বলি, আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। তখন বৃষ্টি আমাকে বলেন, পরীমণি ঘুমিয়েছেন, তাকে এখন ডিস্টার্ব করা যাবে না।

তখন আমি কাদের ভাইকে লুকিয়ে বাথরুমে গিয়ে ফোন দিই, তাকে পুরো ঘটনা জানাই এবং সাহায্য চাই—সে যেন আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেও আমাকে বলেন, পরীমনি এখন যদি ঘুমিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে ডিস্টার্ব করা যাবে না।

আর কোনো উপায় না দেখে আমি বাধ্য হয়ে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করি এবং পুলিশকে জানাই যেন তারা আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে আমি আমার এক কাজিনকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানাই। তিনিও ঘটনা জানতে পেরে পরীমণির বাসার সামনে আসেন। একই সময় পুলিশও আসে পরীমণির বাসার সামনে।

এসব ঘটনা পরীমনি জানার পর তিনি বাসার আরেক গৃহকর্মী বৃষ্টিকে বলেন, আমাকে বাসার নিচে নামিয়ে দিতে। পরে বৃষ্টি আমাকে বাসার নিচে নামিয়ে দেন।

আমি তখন রিকশা নিয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিই। তার মারধরের কারণে আমি এখনো অসুস্থ। আমি প্রাথমিকভাবে থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছি, পরবর্তীতে আমি আরও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবো তার বিরুদ্ধে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ