Risingbd:
2025-04-04@09:06:01 GMT

চাঁদপুরে জাটকা বিক্রির ধুম

Published: 3rd, April 2025 GMT

চাঁদপুরে জাটকা বিক্রির ধুম

সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চাঁদপুর জেলার নৌ সীমানার পদ্মা-মেঘনা নদীতে জাটকা মাছ ধরার মহোৎসব চলছে। এসব জাটকা আবার প্রকাশ্য গ্রামের হাট-বাজার বাড়ি বাড়ি এবং শহরের পাড়া-মহল্লায় বিক্রি হচ্ছে। 

বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) চাঁদপুর শহরের পুরানবাজার নতুন রাস্তা, হরিসভা, পশ্চিম শ্রীরামদী, মধ্যশ্রীরামদী, পূর্বশ্রীরামদী, রঘুনাথপুর, জাফরাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় জাটকার হাট এবং বিক্রির যেন ধুম পড়েছে।

মাঝে মধ্যে জেলা উপজেলা প্রশাসনের টাস্কফোর্স, কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ অভিযান চালালেও মৎস্য বিভাগের তেমন কোনো অভিযান নেই। জেলা পুলিশেরও জাটকার বিষয়ে কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে। অনেকটা ফ্রি স্টাইলে জাটকা নিধন ও ক্রয় বিক্রয় চলছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

জাটকা রক্ষায় মৎস্য বিভাগের এমন ভূমিকায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সচেতন মানুষেরা বলছেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশ সংকট দেখা দেবে। এতে জেলে পল্লীতেও অভাব দেখা দেবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এবং পার্শ্ববর্তী জেলা শরীয়তপুরের নদীতে জেলেরা প্রকাশ্যে কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকা ধরছেন। রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে একশ্রেণির দুর্বৃত্ত মৌসুমী জেলে ও ভাসমান আড়ৎদার সেজে ইলিশের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করতে ব্যক্তিগত লাভের আশায় জাটকা ধ্বংস করছে। 

মতলব উত্তর উপজেলা থেকে শুরু করে চাঁদপুর সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর, কানুদী, সফরমালী, আনন্দবাজার, কোড়ালিয়া চর, টিলাবাড়ি, যমুনা রোড, পুরাণবাজারের অটো স্ট্যান্ড, খাল রাস্তা বাজার, বউবাজার, লোহার পোল, এসব কোম্পানির মোড়, পালপাড়া, দাসপাড়া, পূর্ব সিরান্দী রঘুনাথপুর, মধ্যশ্রীরাদী, পূর্ব জাফরাবাদ, পশ্চিম রামদাসদী, বহরিয়া, দোকানঘর, লক্ষ্মীপুর, আপনার হাট চরসহ নদীর তীরবর্তী এলাকা দিয়ে ব্যাপক জাটকা নিধন এবং হাটবাজারে, পাড়া মহল্লায় বাসা বাড়িতে ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

এদিকে মেঘনার পশ্চিমপাড় হাইমচর চর এলাকাসহ চরভৈরবী, কাটাখালী ও চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর এবং ইব্রাহিমপুর মেঘনা নদীর চর এলাকা দিয়ে প্রচুর পরিমাণে জাটকা ধরা ও বিক্রি করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

অপরদিকে, ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাচিকাটা, দুলারচর নতুন বাজার, মনাই হাওলাদার বাজার, ছুরির চর, উত্তর তারাবুনিয়া, দক্ষিণ তারাবুনিয়া, মাল বাজার, কুবুদ্ধির ঘাট, বন্দুছি বাজার, নুরুদ্দি বাজার, চেয়ারম্যান বাজার, নড়ীয়া উপজেলার সুরেশ্বর বাংলা বাজার, চরআত্রা নওপাড়া, গোসাইরহাট উপজেলার খেজুর তলা, কোদালপুর লঞ্চঘাট, কুচাইপট্টি বটতলা, জালালপুর টেকপার, মেহেরজানের টেক, ঈশানবালা পদ্মা মেঘনায় নিধনকৃত জাটকা জাটকা কিনে চাঁদপুর, শরীয়তপুর শহরসহ জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন জাটকা কারবারিরা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এবার মা ইলিশ রক্ষা অভিযান অনেকটাই ফলপ্রসূ হওয়ায় নদীতে প্রচুর জাটকা বিচরণ করছে। এই সুযোগে একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত জাটকা নিধন ও ক্রয় বিক্রয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে জাতীয় মৎস্য সম্পদের বারোটা বাজাচ্ছে।

মার্চ ও এপ্রিল-এই দুই মাস নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ জালসহ বিভিন্ন ধরনের জাল ফেলে জাটকাসহ ইলিশ ও নদীর অন্যান্য মাছ শিকার করছে জেলেরা। এতে মদদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিছু আড়ৎদার ও রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

চাঁদপুর সদর উপজেলার মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জেলে নামধারী কতিপয় দুর্বৃত্ত নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করছে। এসব মাছ প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে হাটবাজার ও আড়তে। সংরক্ষণ করে পাঠানো হচ্ছে মাওয়া, মুন্সিগঞ্জ, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। 

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী বলেন, “নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। নিয়মিত অভিযানও চলছে। তবে কিছু অসাধু জেলে এখনো জাটকা শিকারের চেষ্টা করছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সাল থেকে জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল দুই মাস মেঘনার একটি নির্দিষ্ট অংশে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ষাটনল পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে।

ঢাকা/অমরেশ/এস

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর র উপজ ল উপজ ল র মৎস য

এছাড়াও পড়ুন:

মানিপ্লান্ট

লকডাউন শুরু হওয়ার দু’দিন পরেই হঠাৎ রান্নাঘরের সিঙ্কের কলটা ভেঙে গেল। মিশুর রাগ পরিণত হলো অসহায়ত্বে। কতদিন থাকবে এই লকডাউন? লকডাউন না থাকলেই কি এর সমাধান আছে? করোনা কি এত সহজে যাবে? নতুন কল পাবে কোথায়, সব দোকান বন্ধ। কল জোগাড় হলেও লাগাবে কে? মিস্ত্রি নিয়ে এলে সঙ্গে আসতে পারে করোনাও। আপাতত পানি বন্ধ করতে হবে। মিশু পলিথিন ঢুকিয়ে দড়ি-পলিথিনে মুখটা কোনোমতে বন্ধ করতে পারল। সিঙ্ক পরিষ্কার করে ফেলল।

সিঙ্কের নিচের কলটা সে কোনোদিন ব্যবহার করেনি। প্রয়োজনও পড়েনি কখনও। ওটা বানানোই হয়েছে নোংরা মতন করে। কাজ করার রুচিই হয় না। রান্নাঘরের পাশের বাথরুমই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল মিশু। কিছুদিন দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করলেও টুকটাক কাজের জন্য ওই নিচের কলটাই ভরসা। মিশু বাধ্য হয়ে নিচের কলটাই ব্যবহার করা শুরু করল। এতদিন সিঙ্কে দাঁড়িয়ে কাজ করার জন্য কাটাকাটিও দাঁড়িয়ে করত। এখন পানির জন্য বসে কাজ করতে হচ্ছে তাই কাটাকাটির কাজগুলোও বসেই করছে, বঁটিতে।

মিশু লক্ষ্য করে অবাক হলো, রান্নাঘরের প্রতি তার মায়া বাড়ছে। আগের থেকে পরিচ্ছন্নও দেখাচ্ছে ঘরটা। জিনিসপত্রের অবস্থানেরও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আরও কিছুদিন পর, সিঙ্কের নিচের মোজাইকের অংশটুকু বেশি সাদা মনে হচ্ছে, অন্যদিকের মোজাইকের অংশ থেকে। নেতিবাচক ব্যাপারও যে হচ্ছে না তা নয়, বসে কাজ করে অভ্যাস না থাকায় আর বারবার দাঁড়ানো– বসার কারণে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা এবং জ্বর-জ্বর ভাব হয়েছিল। মিশু ভেবেছিল, করোনা হয়েছে তার। কিছুদিন পরে আবার স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে ওপরের সিঙ্কটাও পরিষ্কার করে। মাঝে মাঝে ভুল করে সিঙ্কের কলে হাত চলে যায়, এত বছরের অভ্যাস ...
প্রায় দুই মাস হয়ে গেল এই অবস্থা চলছে। মিশু টের পায় না, সে ক্রমশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে।

২.
লকডাউনের ছুটি পেয়ে দীপু প্রথমে একটু খুশিই হয়েছিল। সে করোনা নিয়ে মোটেও চিন্তিত না। ছুটিতে বাড়ি থেকে ঘুরে আসাটা জরুরি– এই কথাটাই মাথায় এসেছিল। নিজেই ড্রাইভ করে চলে এলো তার নিজের বাড়িতে। তার সংসার, তার ঘরবাড়ি সব একই বিভাগে; তার আশ্রয়, তার ঠিকানা সবকিছু। ঢাকায় কিছুই নেই তার, শুধু চাকরিটা ছাড়া।

লকডাউন যখন কঠিন থেকে কঠিন হলো সে এক জেলা থেকে আরেক জেলাতেই যেতে পারছে না, ঢাকা তো দূরের কথা, তখন একটু মেজাজ খারাপ হলো তার। বাড়ছে করোনাও। বাচ্চাদের কথা মনে করে করোনাকে একটু ভয় লাগছে, এই রকম পরিস্থিতিতে সে যেন রোবট হয়ে যায়। যদিও সে অনেক আগে থেকেই রোবটের রোলই প্লে করে আসছিল তার পরিবারের কাছে। সবাই জানত তার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই, মেসেঞ্জার নেই, সে সম্পূর্ণ সোশ্যাল নেটওয়ার্কের বাইরের একজন মানুষ। ধীরে ধীরে অপ্রকাশিত নেটওয়ার্ক প্রকাশিত হতে লাগল। কারণ তার মনে হচ্ছে এই দুর্যোগে কারও ঠেকা পড়ে নাই যে অন্যের ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে!

করোনা নিয়ে ভাবতে আর ভালো লাগছে না তার। চাকরি, কাজবাজ আর নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করে সে আতঙ্কিত হয়। ঢাকায় থাকাটা অর্থহীন হয়ে যাবে দীপুর। তবু সে স্থির; নিয়মে, আদেশে বন্দি সে।

হাতে ফোনটা নিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল তার বারান্দায় রাখা গাছগুলোর কথা। সে অবাক হলো, কেন সে ভুলে গিয়েছিল গাছগুলোর কথা? কতদিন হলো সে এসেছে? কত মাস? 

চার ঘণ্টার পথ একাই ড্রাইভ করে আবারও সে চলে এলো ঢাকায় শুধু গাছগুলোর জন্য। কোনো লাভ হলো না, তার বিল্ডিং লক করে রাখা হয়েছে করোনার বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে। ‘প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়েই চলে যাবে’ বলেও লাভ হলো না। ফিরে যেতে হলো তাকে।
সপ্তাহ দুইয়ের মধ্যেই সব শিথিল হলো। সে চলে এলো ঢাকায়, তার ঘরে। এই ঘর, এই শহর কি তার? কিসের সম্পর্ক এই শহরের সাথে? কিসের টান? এখন ভাবার সময় নেই তার। বারান্দার দরজা খুলে শুকিয়ে যাওয়া মানিপ্লান্টের দিকে তাকাল সে। মুখ দিয়ে এক টুকরো শব্দই বেরোল, “আহা!”

মিশু যখন পুরোপুরি অভ্যস্ত তার সিঙ্কবিহীন কিচেনের সাথে ইথার ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল ভাঙা কল ঠিক করার জন্য। মিশুও একদিন ইথারকে ফাঁকা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। সিঙ্কের দিকে তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে। মিশু কঠোরভাবে নিষেধ করেছিল, কল ঠিক করার কোনো প্রয়োজন নেই, সবকিছু পুরোপুরি ঠিক হোক তারপর। পরদিন সকালেই কল কিনে হাজির। দোকানপাট খুলেছে, বাইরে অনেকটাই স্বাভাবিক। বাইরে স্বাভাবিক হোক কিন্তু মৃত্যুর হার দিনে দিনে বাড়ছেই, মেজাজ খারাপ হলো মিশুর। ইথার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো, মিশুও। এইবার আর শত চেষ্টাতেও ভাঙা কলের মুখ বন্ধ করা গেল না। মিস্ত্রিকে ফোন দিলে সাথে সাথেই চলে এলো, কর্মহীন মানুষদের অভাব এতদিন সে ফেসবুকেই দেখে আসছিল। আজ সামনাসামনি বুঝতে পারল। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ঠিক হয়ে গেল মিশুর কলখানি।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরে আনন্দিতই হলো সে কিন্তু বারবার ভুল করে নিচের কলে চলে যাচ্ছে। প্রথম কয়েকদিন বাজে রকমের ভুল হতে থাকল, নিজের বোকা হওয়া দেখে নিজেরই হাসি পাচ্ছে। সিঙ্কের কলে এমন কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো মিশুর কাছে অসুবিধার মনে হচ্ছে, সেগুলো এখন থেকে সে নিচের কলেই করবে। নিচের কলের জায়গাটার সে এখনও যত্ন নেয়, সিঙ্কের মতোই। রান্না বসিয়ে মিশুর রান্নাঘরে বসে থাকতে হলে চেয়ারে বসে সে সিঙ্কের ওপরে আর নিচের জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করে। মানুষের অভ্যাস, না-পাওয়া এইসব ব্যাপার তাকে ভাবায়, সে ভাবে আর তাকিয়ে থাকে। ইথারও কি বুঝতে পেরেছে এই ব্যাপারগুলো? একদিন ইথার মিশুকে বলছিল, “কিচেনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তোমাদের দেখলাম।”

“তোমাদের মানে, কাকে কাকে?” মিশু কিছুটা হাসির ছলেই জিজ্ঞেস করল।
“তোমাকে আর তোমাকে ... একজন ওপরের সিঙ্কে কাজ করে চুলার দিকে যাচ্ছে, আরেকজন নিচের কলে কাজ করছে।”
মিশু রসিকতায় বিরক্ত হলো কিন্তু হাসছিল, যেন মজার কোনো কৌতুক করছে ইথার।
“হতে পারে হ্যালুসিনেশন।” ইথারও যেন পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাইছে, “চা খাবো, হবে?”
মিশু চা বানাচ্ছে আপনমনে ...। ইশ! কী কষ্টটাই না সে করেছে, সামান্য চা বানাতেও আপ-ডাউন, আপ-ডাউন করতে হয়েছে। আজ মনে হচ্ছে জীবন যত সহজ তত সুন্দর! নাকি যত সুন্দর তত সহজ? একটা হলেই হলো, সহজ-সুন্দর।

“পটেটো!” এমন একটা শব্দে ঘোর কাটল মিশুর। রান্নাঘরে চার্জে দিয়ে রাখা ফোনটা। এই কয়েক মাসে এই ঘরেই বেশি সময় কাটিয়েছে সে। টিভির ঘরে টিভি ছেড়ে দিয়ে রান্নাঘরে বসেই গান শুনেছে। চুলায় কোনো না কোনো রান্না থাকছেই, বন্দিত্বের কারণে হয়তো; সাথে তো আছেই চা আর কফি। নিচের কলটাও কয়েকবার গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করেছে সে এই কয়েকদিন। তাই এখানেই ফোন, এখানেই চেয়ার, এখানেই টেবিল। ফোনে ‘পটেটোর’ মতো শব্দ করে মেসেঞ্জার নোটিফিকেশন এসেছে।

মিশু পেছনে তাকাল না, রান্নাবান্না নিয়ে ভাবতে ভাবতে জীবনটা আলু-বেগুনই হয়ে গেছে; হাসি পাচ্ছে তার। ফোনেও এখন পটেটো শুনতে পায়। সে চা নিয়ে চলে যাচ্ছে বেডরুমের দিকে।

সিঙ্কের নিচের কলে বাসন মেজে উঠে আসছে অন্য আরেক মিশু তার ফোনের কাছে। মেসেঞ্জার খুলল। একটা নেতানো মানিপ্লান্টের ছবি– নিচে লেখা, “গাছটা শুকিয়ে গেছে।”
মিশু উত্তর দিল, “পানি দিতে হবে।”
“পানি দিলে বাঁচবে?”
মিশু জানে না বাঁচবে কিনা তবু লিখল, “বাঁচবে।”
মিশুর হঠাৎ খেয়াল হলো, এখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে; রাতে গাছে পানি দিতে হয় না। আবার মনে হলো, মৃত্যুপথযাত্রীর রাতই কি আর দিনই কি!
“অনেক ফাইট করেছে ... দুই মাস। পানি ছাড়া।”

মেসেজের জবাব দিতে দিতে মিশু যে বারান্দায় চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি। ফোনটা ড্রয়িংরুমের বেডে রেখে তার মানিপ্লান্টগুলোর সামনে বসে পড়ল। বারান্দাটা ড্রয়িংরুমের। ফিসফিস করে মিশু তাদের বলছে, “তোদের মধ্যে কে যোগাযোগ করেছিস ওই গাছটার সাথে?” মিশু জানে তার এই মানিপ্লান্টগুলোর সাথে দীপুর মানিপ্লান্টের যোগাযোগ আছে।

প্রথম গাছটার দিকেই মিশুর সন্দেহ মেশানো চোখ, “তোদের মেসেঞ্জার নেই, হোয়াটসঅ্যাপ নেই, ফেসবুক নেই ... তবু কীভাবে এই যোগাযোগ তোদের?”

প্রশ্ন করে নিঃশব্দে ঝিরঝির করে হাসছে মিশু। সেও যেন সামনের গাছগুলোর মতোই লতানো একটা গাছ।

“আমাদের যোগাযোগের জন্য সবকিছুই আছে, কিন্তু আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা ইচ্ছে করলেই কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারি না। এক দেশ থেকে আরেক দেশে কিংবা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কাউকে ডেকে আনার সামর্থ্য আমরা রাখি না। কারণ আমাদের ইগো আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, পাপ আছে, পুণ্য আছে, বিভেদ আছে। তোদের এগুলো নেই?”

মিশু বারান্দায় বসেই সামনের বারান্দার দিকে তাকায়, ড্রয়িংরুমের বারান্দা থেকে বেডরুমের বারান্দার চমৎকার এক যোগাযোগ এই বাড়িটাতে, ঝুলন্ত বারান্দারা মুখোমুখি, দুটো বারান্দাই পড়েছে বাড়ির সামনের রাস্তার ওপর। এমন আরও দুটো বারান্দা আছে মিশুদের এই বাসাতে। সেই বারান্দার ঘর থেকে কাপ-পিরিচের শব্দ আসে। মিশু-ইথারের চায়ের আসর ভাঙল, মিশু ফোন খুঁজছে, “ফোন যে কোথায় রাখি নিজেই জানি না!” স্বভাবজাত বিরক্তি ফুটে উঠল মিশুর মুখে।

ড্রয়িংরুমের বারান্দার সামনে বেডের ওপর পেল ফোনটা। একটা সিনেমা ডাউনলোড করার কথা ছিল তার, ভুলেই গিয়েছিল। সার্চ দিয়ে রাখা ছিল, এখন কী সব এসেছে, বুঝতে পারছে না।

স্ক্রিনে লেখাটা পড়ে বিরক্তির মধ্যেও হাসি পেল তার, “আওয়ার সিস্টেম থিংকস ইউ মাইট বি এ রোবট।” 

মূল শিরোনামে বোল্ড করে লেখা। মিশুর ইচ্ছা হলো সেও মজা করবে। রোবট যদি মানুষের সাথে মজা করতে পারে, মানুষ কেন পারবে না? স্ক্রল করতেই নিচে ছোট ছোট করে লেখা আরেকটা বাক্য “উই আর রিয়েলি সরি অ্যাবাউট দিজ বাট ইটস গেটিং হার্ডার অ্যান্ড হার্ডার টু টেল দ্য ডিফারেন্স বিটুইন হিউম্যান অ্যান্ড বট্স দিজ ডেজ।”

মিশু অবাক হলো, সে ঠিক করল টিক চিহ্ন দিয়ে বলবে, ইয়েস আই অ্যাম এ রোবট। দেখলাম না সিনেমা, তোহ্‌!
মিশু ফোন চার্জে দিয়ে তার ঘরে চলে গেল। দুই রোবটেরই বিশ্রাম প্রয়োজন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ