নতুন করে পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তিনি বেশ কয়েকটি দেশের ওপর সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছেন।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র কয়েকটি দেশের নামও আছে ওই তালিকায়। কিন্তু ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের তালিকায় নেই রাশিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, উত্তর কোরিয়া, কিউবাসহ আরও কয়েকটি দেশের নাম। কী কারণে ট্রাম্প এসব দেশকে বাদ দিলেন?

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার বিকেল চারটায় হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এবার ট্রাম্প যাদের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন, এর মধ্যে ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভিয়েতনামের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারেরাও রয়েছে। ভারতের ওপর ২৭ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

তবে কেন নেই রাশিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, উত্তর কোরিয়া কিংবা কিউবার নাম? দেশগুলো কি আসলেই ট্রাম্পের শুল্ক খাঁড়া থেকে বাঁচতে পেরেছে?

প্রতিবেশী দুই দেশ কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যের ওপর আগেই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কানাডার জ্বালানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির (ইউএসএমসিএ) আওতায় যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে, সেগুলো এখনো নতুন শুল্কের আওতামুক্ত রয়েছে। তবে গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের ওপর আজ বৃহস্পতিবার থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের তালিকায় কেন রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, কিউবা ও বেলারুশের নাম নেই, তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এসব দেশের ওপর আগে থেকেই বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। যে কারণে দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য খুবই সামান্য।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব দেশ আগে থেকেই অতি উচ্চ শুল্কের মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া দেশগুলোর ওপর আমরা আগেই যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছি, তাতে তাদের সঙ্গে কোনো অর্থপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।’

ভারতভিত্তিক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম জিরাফ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা সৌরভ ঘোষ রাশিয়ার ওপর শুল্ক আরোপ না করার আরেকটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেছেন। সেটা হলো ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে চলমান আলোচনা।

সৌরভ ঘোষ বলেন, রাশিয়ার ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য এমনিতেই তলানিতে। তার ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে পুতিনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চান, তবে তাঁকে রাশিয়ার প্রতি সমর্থনমূলক আচরণ করতে হবে।

যেসব দেশ রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কিনছে, সেসব দেশের ওপর ট্রাম্প নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব দেশের উচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তারাই মূলত এবার ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

সৌরভ ঘোষ ব্যাখ্যা দিয়ে আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্য ঘাটতি বেশি, তাই স্বাভাবিকভাবে তালিকায় তাদের নামই বেশি।

সৌরভ বলছেন, তার ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন কর এবং অন্যায্য মুদ্রা হারসহ অ-শুল্ক বাধাগুলো পারস্পরিক শুল্ক নির্ধারণে ভূমিকা পালন করেছে। মনে হচ্ছে, অন্যান্য অন্তর্নিহিত মানদণ্ডকে বিবেচনায় না এনে বাণিজ্যে ভারসাম্য আনাই শুল্ক আরোপে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

সৌরভের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের তালিকায় যেসব দেশের নাম সবচেয়ে অবাক করা তার অন্যতম দুটি হলো, জাপান (২৪ শতাংশ) ও ভিয়েতনাম (৪৬ শতাংশ)।

ট্রাম্পের এই শুল্ক এরই মধ্যে বিশ্ববাণিজ্যে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। কানাডা ও মেক্সিকো পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো শুল্কের প্রভাব মোকাবিলা ও তাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে।

আর রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া আপাতত ট্রাম্পের লক্ষ্যবস্তুর বাইরে রয়েছে। তবে আগামী কয়েক মাসে কূটনৈতিক সম্পর্ক কেমন থাকে তার ভিত্তিতে সবকিছু বদলে যেতে পারে।

আরও পড়ুনট্রাম্পের শুল্কের তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার জনশূন্য দ্বীপও!২ ঘণ্টা আগেআরও পড়ুনবাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭% শুল্ক আরোপ করল যুক্তরাষ্ট্র১২ ঘণ্টা আগে.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: শ ল ক আর প র ত ল ক য় র শ ল ক আর সব দ শ র র ওপর ইউর প

এছাড়াও পড়ুন:

বাংলাদেশের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানি ক্ষেত্রে যে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, সেটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের ‘সুনামি’। গত শত বছরের মধ্যে এই ধরনের ঘটনা ঘটেনি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওর কাঠামোর আওতায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের শুল্কারোপের কথা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেটি করা হয়েছে। তাই এটি আমাদের একেবারে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ধাক্কা।

প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার পণ্য আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বিবেচনায় বাণিজ্য–ঘাটতির ভিত্তিতে এই শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমরা প্রযুক্তি, ব্যাংকিং, বিমাসহ বিভিন্ন ধরনের যে সেবা আমদানি করি, সেটিকে এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যদি সেবা আমদানিকেও বিবেচনায় নেওয়া হতো, তাহলে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ওপর এত পরিমাণে পাল্টা শুল্কারোপ হতো না। পুরো বিষয়টি এখনো আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। অনেকগুলো বিষয় এখনো আমাদের কাছে অস্পষ্ট। তাই আমরা আগে পুরো বিষয়টি বুঝতে ও সব ব্যাখ্যা জানার চেষ্টা করছি। এরপর এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে কাজ শুরু করব।

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে ট্রাম্প পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের এই ঘটনা জানার পরপরই বৃহস্পতিবার বাণিজ্যসচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যানকে নিয়ে আমি তিন ঘণ্টা বৈঠক করেছি। সেখানে পুরো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে। যেসব বিষয় আমাদের কাছে অস্পষ্ট, সেগুলোর ব্যাখ্যা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী রোববার বিষয়টি নিয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছেন অর্থ উপদেষ্টা। সেখানেও করণীয় বিষয়ে আলোচনা হবে।

তবে আমি মনে করি, এটি যতটা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা, তার চেয়ে বেশি এটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি একটি ‘সুনামি’র মতো। তাই বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলো এই ঘটনায় কি ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে বা কি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে সেদিকেও আমরা গভীরভাবে নজর রাখছি। দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান কতটুকু সম্ভব হবে সেটি নিয়ে সন্দিহান। যদি এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় কোনো উদ্যোগ নিয়ে সমস্যার সমাধার করা যায় সরকারের পক্ষ থেকে সেটি করা হবে।

আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে, বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এই শুল্ক যতটা কমিয়ে আনা যায় সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ জন্য যদি আমদানি নীতি সংশোধন করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়িয়ে কিছুটা সুবিধা নেওয়া যায় সেই চেষ্টাও আমরা করব। যদিও ডব্লিউটিওর কাঠামোর আওতায় এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ খুবই কম।

ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি জানার পরপরই এটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমি বিষয়টি বোঝার ও জানার চেষ্টা করছি। বিশ্বজুড়ে এর প্রতিক্রিয়াও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমার মনে হয় পুরো বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে দু–এক সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। এরপরই আমরা সরকারের পক্ষ থেকে করণীয় ঠিক করতে পারব। বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে আমি এটুকু বলতে পারি, আমাদের রপ্তানি খাত যাতে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য সরকারের দিক থেকে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সবটাই নেওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমরা দুই বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করি। তার বিপরীতে দেশটিতে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ সাত থেকে আট বিলিয়ন ডলার। দুই দেশের এই বাণিজ্যে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। এখন যদি আমদানি বাড়িয়ে হলেও রপ্তানিতে শুল্কের চাপ কমানো যায়, সেই উদ্যোগও নেওয়া হবে। এ জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।

শেখ বশিরউদ্দীন, বাণিজ্য উপদেষ্টা

সম্পর্কিত নিবন্ধ