বৈশ্বিকভাবে একাডেমিয়ায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একত্রে এসটিইএম (স্টেম) এবং কলা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলো এইচএএসএস (হাস), আবার কোথাওবা এইচএসএস নামে পরিচিত। বিশ্বের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিবারেল আর্টস ও জেনারেল এডুকেশনের অংশ হিসেবে ‘হাস’-এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো ‘স্টেমের’ সঙ্গে একটি পরিপূরক সম্পর্ক তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এখন সরকার এই ব্যবস্থার প্রতি ‘চোখ রাঙাচ্ছে’।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবেই বিজ্ঞান বিষয়ের সঙ্গে কলা-মানবিক-সামাজিক বিজ্ঞান-বাণিজ্যের একটি ‘অপরায়ণ’ ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। আমলানিয়ন্ত্রিত এই উদ্যোগের আগুনে বাতাস দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র ও ‘বিশেষজ্ঞরা’। শিক্ষাস্বার্থের সংঘাত থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সরকারের বয়ানেই কথা বলে, বিগত রেজিমে আমরা তা দেখেছি। এ যাত্রায়ও তার ব্যত্যয় ঘটছে না!

গত ২১ মার্চ প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় ‘বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয় না পড়ানোর উদ্যোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ‘ব্রেক’ করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্বৎসমাজ, এমনকি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যেও তেমন কোনো শোরগোল নেই। খবরটি কিন্তু সন্দেহাতীতভাবেই ‘অ্যালার্মিং’!

প্রতিবেদনের সারাংশ

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত-সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত না করতে উপাচার্যদের চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশেষায়িত ছাড়া অন্য যেসব বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান, সেগুলো যুক্তিসংগত ন্যূনতম সময়ের মধ্যে সীমিত অথবা বন্ধ করতে বলেছে মন্ত্রণালয়।’ প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, গত ১৩ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব চিঠিটি স্বাক্ষর করে উপাচার্যদের পাঠিয়েছেন।

ইউজিসির তথ্য মোতাবেক, দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ১৮টি। এর সঙ্গে বুয়েট, চুয়েট, রুয়েট ও কুয়েটকে যোগ করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ২২। এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয় চিঠিটি না পেলেও সরকারের মনোভাব ভিন্ন ভাবার কোনো কারণ নেই। এগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চারটি বিশেষায়িত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কে জানে, হয়তো অচিরেই এগুলোতেও সরকারি প্রেস নোট নাজিল হয়ে যাবে!

কী বলেছে মন্ত্রণালয়

শিক্ষা মন্ত্রণালয় চারটি নির্দেশনা পাঠিয়েছে ১৮টি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে। চারটি নির্দেশনাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়।

১.

১০০ কিলোমিটারের ‘ক্যাচমেন্ট এলাকায়’ অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যথাসম্ভব একই বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা পরিহার করতে হবে এবং এমন বিষয়গুলো যুক্তিসংগতভাবে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে সীমিত বা বন্ধ করতে হবে।

২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে এসটিইএম (স্টেম) ও এই সংশ্লিষ্ট যুগোপযোগী বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং স্টেম (এসটিইএম) বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

‘বিশেষজ্ঞ’দের মতামত

প্রতিবেদনে নাম না থাকলেও বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিষয় পড়ানো হলে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য সফল হবে না। অথচ নিজেদের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কয়েকটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করছে, কিন্তু অন্যান্য অধিকাংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারছে না বলে অভিযোগ আছে।’

অনেকে এটাও বলেছেন, ‘যেনতেনভাবে বিভাগ খোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেরও (ইউজিসি) দায় আছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ খোলার অনুমোদন দেয় ইউজিসি। ফলে ইউজিসির হাত ধরেই এসব বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেতাইভাবে বিভাগ খোলা হচ্ছে।’

যে ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দের মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদন। সেই মন্তব্যে তিনি মন্ত্রণালয়ের চিঠিটির পক্ষে সাফাই দিয়ে ‘ব্যক্তিগতভাবে’ মনে করেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত বিষয়ের বাইরের অন্য বিষয় না রাখার বিষয়ে সরকারের ইচ্ছার কিছুটা যৌক্তিকতা আছে।’

ইউজিসি কোথায়

আশ্চর্যের বিষয়, মন্ত্রণালয়ের চিঠির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কোনো সংশ্লিষ্টতাই নেই। ইউজিসির কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও নেই এ বিষয়ে। বোঝা যাচ্ছে, ইউজিসিকে পাশ কাটিয়ে মন্ত্রণালয় একাডেমিক বিষয়ে নাক গলিয়েছে। অথচ ইউজিসি পরিচালিত হচ্ছে শিক্ষাবিদদের নেতৃত্বে। মন্ত্রণালয় শিক্ষাবিদদের মতামত নিয়ে এ চিঠি পাঠিয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়। উচ্চশিক্ষা নিয়ে আমলারা এত বড় সিদ্ধান্ত নেবেন, অথচ শিক্ষাবিদদের মতামত নেবেন না, এ বড় বিস্ময়কর ঘটনা!

বিশেষজ্ঞরা বিভাগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইউজিসিকে দায় দিয়েছেন। সত্য, এই দায় ইউজিসিকে নিতেই হবে। কেননা বিগত রেজিমে জেলায় জেলায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়বাজি’ করাই হয়েছিল দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ করার অভিপ্রায়ে। ইউজিসি সরকারের মনস্কামনা পূরণ করতে যেনতেনভাবে বিভাগ খোলার অনুমতি দিয়েছে। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই দুরবস্থা ঘটানোর জন্য বিগত সময়ের ইউজিসির দায় আছে। কিন্তু আমল বদলানোর পরও আমলাদের খবরদারি অবিমৃশ্যকর। যে কাজটি ইউজিসির এখতিয়ারভুক্ত, সেখানে মন্ত্রণালয় কেন নাক গলাবে?

আরেকটি সন্দেহের বিষয়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইউজিসির ২০ বছর মেয়াদি উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র। এ কৌশলপত্রের মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে, হয়তো মেয়াদ বৃদ্ধিও হবে। এই কৌশলপত্রের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন হলো বাজারে কাটতি কম এমন মানবিক ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোকে উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ দেওয়া এবং ব্যবহারিক জ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ব্যবসায় ও বাণিজ্যের বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। এই প্রেসক্রিপশন পাবলিক-প্রাইভেট-বিশেষায়িত সরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই প্রযোজ্য।

বিশ্বব্যাংকের এই প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নের দায় স্বভাবতই ইউজিসির। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের চিঠির উদ্দেশ্য বলে দিচ্ছে যে তারাই বিশ্বব্যাংকের আশা পূরণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে চিঠিটির সম্পর্ক প্রত্যক্ষ হয়তো নয়, কিন্তু পরোক্ষ কোনো সম্পর্ক যে এর থেকে উদ্ধার করা অসম্ভব, এমনও নয়।

বিগত রেজিমে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক ভালো ছিল না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সরকার বিশ্বব্যাংকের উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত প্রেসক্রিপশনের উল্টো কাজ করেছিল—লিবারেল আর্টস ও জেনারেল এডুকেশনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো পড়ানোর ব্যাপারে, এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও উদ্বুদ্ধ করেছিল, যে যাত্রা অব্যাহত আছে। কিন্তু এখন সরকারের সম্পর্ক বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এত ভালো যে মনে হচ্ছে, মন্ত্রণালয়ে তাদের এজেন্টরা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি নিয়ে বসে আছেন!

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ খোলার অনুমোদনদাতা ইউজিসি, তাদের এড়িয়ে নির্দেশনা জারির বিষয়টিকে তাই যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখার কারণ আছে।

বৈশ্বিক পটভূমি

বৈশ্বিক পটভূমি বিবেচনা করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই চিঠি এবং তার সুরে সুর মেলানো বিশেষজ্ঞদের বয়ান অত্যন্ত অসাড় প্রমাণিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) ‘স্কুল অব হিউমেনিটিস, আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস’ (এসএইচএসএস) নামে আলাদা একটি কেন্দ্রই আছে। স্কুলটি সম্বন্ধে বেশি কিছু বলার নেই, একাডেমিক মাত্রই জানেন জ্ঞানজগতে এর অবদানের কথা।

এই স্কুল সম্বন্ধে খোদ এমআইটির প্রেসিডেন্ট সেলি কর্নব্লুথ বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা সারা বিশ্বে নতুন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেবে এবং এগুলোর প্রভাব বিষয়ে ক্রিটিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে: এই প্রযুক্তিগুলো কি বৃহত্তর স্বার্থের পক্ষে লাভজনক? এগুলো কি ক্ষতিকারক? এসএইচএসএস শিক্ষার্থীদের যে শিক্ষা দেয়, তার মধ্য দিয়ে তারা সমাজ বিষয়ে একটি গভীর বোঝাপড়ায় মগ্ন হয়, যা তাঁদের আরও জ্ঞানী ও কর্মদক্ষ নেতা হতে সাহায্য করে।’

প্রতিবেশী দেশ ভারতের বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে নিয়মিত নাম লেখানো প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষায়িত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ তকমা নেয়নি, সেগুলো ইনস্টিটিউট হিসেবেই দুনিয়াব্যাপী পরিচিত। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় নাম ধারণের রোগটি এমনই ‘জলাতঙ্কে’ পরিণত হয়েছে যে বিশেষায়িত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে। আদতে এগুলো কলেজ ছাড়া অন্য কিছু তো নয়।

অথচ এমআইটির মতোই ভারতের নামী ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’(যেমন দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, খড়্গপুর, কানপুর প্রভৃতি) নামক প্রতিষ্ঠানগুলো এইচএএসএস (হাস) বা এইচএসএস বিষয়গুলোর গুরুত্ব স্বীকার করেই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে; কোথাও কোথাও লিবারেল আর্টস, জেনারেল এডুকেশন এবং এডুকেশনকে ‘কোর ভ্যালু’ হিসেবে বিজ্ঞান-প্রকৌশল-প্রযুক্তির শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধার্য করা হয়েছে। ইনস্টিটিউট নাম নিয়েই তারা মাল্টিডিসিপ্লিনারি জ্ঞান দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের, কোনো কোনোটি মাস্টার্স-পিএইচডি ডিগ্রিও দিচ্ছে। আর আমরা বিশ্ববিদ্যালয় নাম ধারণ করে শুধু ‘স্টেম’-এর দিকেই যাত্রা করতে চাইছি।

সমস্যা ‘স্টেম’ নাকি ‘হাস’-এর

বিস্ময়কর আমাদের চিন্তাভাবনা! অন্তত এমআইটির প্রেসিডেন্টের বাক্য কয়েকটি পড়লেই আমাদের বিশেষজ্ঞদের লজ্জা পাওয়া উচিত, যাঁরা বলছেন, ‘অধিকাংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারছে না।’ তাঁরা একবারও ভেবেছেন, এই যে দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়া, তার পেছনের কারণগুলো কী? রাষ্ট্রের দায় কতটা?

প্রথমত, প্রকৃত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দর্শনকে ধারণ না করা। দ্বিতীয়ত, যথাসম্ভব অর্থ বরাদ্দের বন্দোবস্ত না করেই যেখানে–সেখানে বিভাগ খোলা। তৃতীয়ত, মানসম্পন্ন শিক্ষক সঠিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ না দেওয়া। চতুর্থত, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের বৈশ্বিক অনুপাতের মানদণ্ডকে অগ্রাহ্য করা।

পঞ্চমত, বাজারে কেমন চাকরির ব্যবস্থা থাকবে, সেটা নির্ধারণ না করেই হরেদরে গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টি করা এবং বাজারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলা। ষষ্ঠত, বিশেষায়িত বিষয়ের পাঠদান করেও তাদের সেক্টরভুক্ত চাকরিতে উদ্বুদ্ধ করতে না পারা (বরং সবার প্রথম লক্ষ্য থাকে বিসিএস, বিশেষত প্রশাসন)।

এমন আরও বহু সমস্যা উল্লেখ করা যাবে। কিন্তু ‘বিশেষজ্ঞ’রা একতরফা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কলা-মানবিক-সামাজিক বিজ্ঞানের ওপর দোষারোপ করছেন। সমস্যার মূলে আসলে এইচএএসএস (হাস) বা এইচএসএস নয়, এসটিইএম’ও (স্টেম) নয়। মূল সমস্যা আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দর্শনগত, যারা প্রকৃত অর্থেই উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য থেকে কক্ষচ্যুত, সেটা সাধারণ কিংবা বিশেষায়িত—সব কটিই।

এ কথা সত্য, বিশেষায়িত ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে’এত এত ‘অবিশেষায়িত’ বিভাগ খোলার প্রয়োজন ছিল না। কেন খোলা হয়েছিল, সেটির কারণ আমরা ওপরে আলোচনা করেছি। উচিত ছিল একটি লিবারেল আর্টস কিংবা জেনারেল এডুকেশন স্কুল বা অনুষদের অধীনে এইচএএসএস (হাস) বা এইচএসএস বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের বিদ্যায়তনিক কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা।

এখন এই বিভাগগুলো ডিগ্রি প্রদানকারী স্ট্যাটাস নিয়ে আছে, আবার লিবারেল আর্টসের অংশ হিসেবে ‘মাইনর কোর্স’ বা ‘সাবসিডিয়ারি কোর্স’ হিসেবে অন্যান্য বিশেষায়িত বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাঠদানও করছে। এর সমন্বয় সাধন জরুরি। অথচ মন্ত্রণালয় পাইকারি দরে সরাসরি এগুলোকে উঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে এবং তার তালে তাল দিচ্ছেন কলা-মানবিক-সামাজিক বিজ্ঞানের গুরুত্ব বুঝতে না-পারা তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা।

অবজ্ঞা নাকি জুজুর ভয়

একটি কথা বলে নিতে হয় যে এই বিভাগগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বর্তমানে কর্মরতদের কী হবে, সেটা নিয়ে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়বেন। এটি সত্য, তবে একমাত্র সত্য নয়। এটি হলো সমস্যাকে উপরিতল থেকে দেখা। আমরা হয়তো ভাবছি, সরকার অবজ্ঞা করছে স্টেমের বাইরের বিষয়গুলোকে। কিন্তু একটু গভীর গেলে বোঝা যাবে, এটা অবজ্ঞা নয়, জুজুর ভয়।

এসব বিষয় পড়লে যেকোনো বিষয়ের, যেকোনো বিভাগের শিক্ষার্থীরা সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি সচেতন হবে, তর্ক করতে শিখবে, বিনা প্রশ্নে কোনো কিছু মেনে নেবে না, চিন্তাজগৎকে প্রথাগত মতাদর্শের বাইরে গিয়ে চিনতে শিখবে। আর বৈষয়িক দিক চিন্তা করলেও তো আজকের বিসিএসমুখী শিক্ষার্থীদের জন্য এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন অত্যন্ত ফলদায়ক।

‘দক্ষ জনবল’–এর নাম করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে আপনারা ‘স্ট্যাটিক’ বানাতে চান কেন?

ড. সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: উপ চ র য ব ষয়গ ল ইউজ স র সরক র র এই প র র জন য আম দ র অবজ ঞ সমস য ব যবস

এছাড়াও পড়ুন:

সাঁতারেও চলছে প্রবাসীর খোঁজ

এক ‘হামজা হাওয়ায়’ ফুটবলে যে আলোড়ন উঠেছে, মুখ ফিরিয়ে রাখা দর্শকদের মধ্যে যেভাবে আন্দোলিত করেছে, তা দেখে অনেকেই প্রভাবিত। শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে হামজা চৌধুরীর লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেকের পর একটি ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত পরীক্ষিত প্রবাসী অ্যাথলেটদের ফিজিক্যাল ফিটনেস বিশ্বমানের হয়ে থাকে। সেই তুলনায় স্থানীয়রা অনেকটাই পিছিয়ে। এই উপলব্ধি থেকেই সাঁতারেও এখন চলছে প্রবাসীদের খোঁজ। 

অতীতে লন্ডন প্রবাসী সাঁতারু জুনাইনা আহমেদ দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তবে টোকিও অলিম্পিকের পর পুল থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। সুইমিং ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটিও চাইছে প্রবাসী সাঁতারুকে দেশের পুলে আনতে। 

‘প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি আসে, আমাদের লেভেলটা আরও ওপরে নিয়ে যায়, সেটার জন্য আমি সব সময় উদ্বুদ্ধ করি। আমরা চেষ্টা করছি, কোথাও প্রবাসী সাঁতারু পাওয়া যায় কিনা। পর্যবেক্ষণ করছি। ফুটবলে যেমন হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়ার মতো প্রবাসীরা এসেছেন, তেমনি যদি সাঁতারে আসেন, আমরা মনে করি দেশের সাঁতারের জন্য ভালো হবে।’ সাবেক সাঁতারু ও বর্তমান সুইমিং ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটির সদস্য মাহফিজুর রহমান সাগর জানান, তাদের সন্ধান চলছে।

যদিও এই মুহূর্তে তেমন কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না ফেডারেশন। ‘সত্যি বলতে কী, সেভাবে প্রবাসী সাঁতারু পাওয়াই যাচ্ছে না। একজন অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসী বাঙালি পেয়েছিলাম, সেও কিছুদিন পর সাঁতার ছেড়ে দিয়েছে। এখন পাওয়াটা কঠিন। তার পরও সন্ধান চলছে।’ 

অতীতে লন্ডন প্রবাসী জুনাইনা আহমেদ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০১৭ সালে দেশের বয়সভিত্তিক সাঁতারে অংশগ্রহণ করে নজর কেড়েছিলেন জুনাইনা। ২০১৯ সালে জাতীয় সাঁতারে আটটিতে রেকর্ড গড়ে ৯টি স্বর্ণ জেতেন। দেশীয় সাঁতারে রীতিমতো ঝড় তুলে দেন তিনি। এরপর বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নেও প্রত্যাশা পূরণ করেন। কিন্তু টোকিও অলিম্পিকে সেই মান ধরে রাখতে পারেননি। সেটাই ছিল দেশের হয়ে তাঁর শেষবারের মতো পুলে নামা। বছর তিনেক আগে দন্ত চিকিৎসক জুনাইনা পড়ালেখার চাপের কথা বলে পুল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এরপর আর সেভাবে আলোচনায় আসেনি প্রবাসী সাঁতারুর আলোচনা। জুনাইনার বাবা জুবায়ের আহমেদ মাঝে ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তাঁর ছোট মেয়ে জামাইমার অংশগ্রহণ নিয়ে। কিন্তু কোনো অ্যামেচার সাঁতারু নয়, ফেডারেশন আগ্রহী পেশাদার সাঁতারু অন্তর্ভুক্তিতে। 

ফুটবলে যেমন এই মুহূর্তে ১৩ দেশের ৩২ জন প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলার লাল-সবুজের হয়ে খেলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ২৫ জুন ঢাকায় তাদের অনেককে নিয়ে ট্রায়াল করার চিন্তাভাবনা করছে ফুটবল ফেডারেশন। তারাও চাইছে যে কেউ এলেই আর দলে জায়গা মিলবে না, যদি কোনো প্রবাসী বিদেশি লিগে ভালো কোনো দল বা লিগে খেলে থাকেন, তাদেরকেই বিবেচনা করা হবে। এর পাশাপাশি কাউকে কাউকে বয়সভিত্তিক দলের জন্যও বিবেচনা করা হবে। 

সাঁতারেও তেমন মানের কাউকেই চাইছেন মাহফিজুর রহমান সাগর। জুনাইনার খোঁজও তিনিই এনেছিলেন। সাগর নিজে বিদেশে ট্রেনিং করেছেন, অংশগ্রহণ করেছেন অনেক আন্তর্জাতিক আসরে। প্রবাসীদের সঙ্গে স্থানীয়দের তফাতটা তিনি ভালোই জানেন। ‘বিদেশি পেশাদার সাঁতারুদের সঙ্গে আমাদের স্থানীয়দের পার্থক্য এ টু জেড। ওরা পুরো সায়েন্স নিয়ে থাকে। ওদের কোচ, নিউট্রিশন, অনুশীলন, অনুশীলনের পরিবেশ, ট্রেনিং প্রোগ্রাম– সব উচ্চ পর্যায়ের। যদি আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি, এ রকম উচ্চ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন প্রতিটি দেশই ট্রেনিং করে। তার পরও কিন্তু সবাই পারছে না। অলিম্পিকে ফাইনাল খেলবে কিংবা পদক পাবে। এখানে অনেকে ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু তারা সাফল্য পাওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে, সেই ট্র্যাকে আমরা নেই।’ 

জিমন্যাস্টিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাইক সিজার, বক্সিংয়ে জিনাত ফেরদৌস কিংবা ট্র্যাকে লন্ডন প্রবাসী ইমরানুর রহমান– দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক প্রবাসীরই আগমন ঘটেছে। বিদায়ও হয়েছে কারও ফর্মের কারণে, কারওবা ফেডারেশনের সঙ্গে মনকষাকষিতে। তবে জামাল, হামজার মতো এমন পেশাদার কাউকে সেভাবে দেখা যায়নি আগে, তাই তাদের মতোই কাউকে খুঁজছে সুইমিং ফেডারেশন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ