দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো এখন নিষ্ক্রিয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে এসব দলের কোনো তৎপরতাই চোখে পড়ছে না। রমজান ও ঈদেও অধিকাংশ দলের তৎপরতা ছিল না। কোনো কোনো দল অবশ্য বক্তৃতা-বিবৃতি আর রাজপথে ছিটেফোঁটা কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। 

আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা ‘কিংস পার্টি’র মূল তিনটি দল হচ্ছে তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে নিবন্ধন পায় এই তিনটি রাজনৈতিক দল। সে সময় আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনে আসন সমঝোতার জন্য দেনদরবারও করে তারা। যদিও কোনো দলকে আসন ছাড় দেয়নি আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক পালাবদলের পর কোনো কোনো মহল থেকে আওয়ামী লীগের ‘সহযোগী’ আখ্যা দেওয়ায় বেশ বেকায়দায় আছেন দল তিনটির নেতারা। আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া এসব দলের নেতারা অবশ্য নিজেদের ‘কিংস পার্টি’ মানতে নারাজ। তাদের দাবি, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে গিয়েছিলেন তারা। তবে তারা কখনোই আওয়ামী লীগের ‘সহযোগী’ হিসেবে কাজ করেননি। বরং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার পক্ষেই ছিলেন।

নেতারা আরও বলেন, দ্রুতই নিজ নিজ দলকে সক্রিয় করার পদক্ষেপ নেবেন। সময়-সুযোগমতো মাঠেও নামবেন। সেই সঙ্গে জনগণের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে। আগামী নির্বাচনে তারা ৩০০ আসনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

বিএনপিসহ প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের বর্জনের মুখে গত বছরের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে ও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে নিজ দলের প্রার্থীকে ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে দাঁড়ানোর অনুমতি দেয় তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যা ‘ডামি’ নির্বাচন হিসেবে দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়ে। একই সঙ্গে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে আরও কিছু রাজনৈতিক দলকে সামনে আনা হয়। যার কোনো কোনোটির প্রতিষ্ঠা বেশ আগে হলেও বেশির ভাগই নির্বাচনের আগে আগে আত্মপ্রকাশ করে।

সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে সক্রিয় হবে তৃণমূল বিএনপি
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর তৃণমূল বিএনপির আত্মপ্রকাশ। দলটি ইসির নিবন্ধন পায় ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর দলটির প্রথম কাউন্সিলে দলে যোগ দেন দুই বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমূর আলম খন্দকার। পরে শমসের মবিন চৌধুরীকে চেয়ারপারসন, তৈমূর আলম খন্দকারকে মহাসচিব এবং ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিম হুদাকে নির্বাহী চেয়ারপারসন করে দলের কমিটি গঠিত হয়। দলটির প্রতীক ‘সোনালি আঁশ’। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তারা ২৭০ আসনে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৩৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলটি। এই দলের কোনো প্রার্থীই জিততে পারেননি। উল্টো সিংহভাগ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

এদিকে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর দলটির চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। দলটির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকারসহ বেশির ভাগ নেতাকর্মীই দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখনও রাজধানীর পুরানা পল্টনের তোপখানা রোডের মেহেরবা প্লাজাতে রয়েছে।

তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার সমকালকে বলেন, ‘আমরা আপাতত দলীয় কার্যক্রম বন্ধ রেখেছি। এখন দেখছি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়।’

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ‘কিংস পার্টি’ হওয়া কিংবা আওয়ামী লীগের ‘সহযোগী’ হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কিংস পার্টি গড়ে ওঠে রাজার আনুকূল্যে কিংবা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। আমরা তো কোনো রাজার আনুকূল্য নিইনি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাইনি; বরং আমরা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও তার সরকারের বিরোধিতা করে এসেছি।’ তৈমূরের দাবি, তাঁর দল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিল।

নাম বদলের আবেদন বিএনএমের
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) মাস দুয়েক আগে ইসি বরাবর নিজেদের নাম বদলের আবেদন জমা দিয়েছে। ওই আবেদনে ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামে নতুন করে নিবন্ধন চেয়েছে দলটি। এর আগে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় রাজধানীর গুলশান থেকে সরিয়ে মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডে স্থানান্তর করা হয়ে। নাম বদলের এই আবেদনে সাড়া দিতে ইসি অনেকটাই ‘ইতিবাচক’– এমনটাই জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

২০২১ সালে বিএনপির সাবেক দুই নেতা সাবেক এমপি ড.

আবদুর রহমান ও মেজর (অব.) মুহা. হানিফের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা পায় বিএনএম। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায় দলটি। একই বছরের নভেম্বরে বিএনপি ছেড়ে দলটিতে যোগ দিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন সাবেক এমপি শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর।

গত নির্বাচনে নোঙর প্রতীকে ৮২ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। প্রার্থীর মধ্যে ছয়জন ছিলেন সাবেক এমপি। একজন বাদে সব প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। নির্বাচনের পর দলটির আর কার্যক্রম দেখা যায়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর একেবারেই নিষ্ক্রিয় দলটি। যদিও শাহ মোহাম্মদ আবু জাফরকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান ও ড. আবদুর রহমানকে মহাসচিব করে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। দ্রুতই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নতুন করে শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

বিএনএমের চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর সমকালকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার তো আমাদের কিছুতেই ডাকে না। আমরাও মনে করছি, এ পরিস্থিতিতে বেশি উথালপাথাল করাটা ঠিকও হবে না।’ তিনি বলেন, ‌‘আমাদের কিংস পার্টি বলাটা ঠিক নয়। নানা কারণে আমরা নির্বাচনে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো সহযোগিতা নিইনি। ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক আন্দোলনেও আমরা সমর্থন দিয়েছি, সহযোগিতা করেছি। কিংস পার্টি হলে তো আর এটি করতাম না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের ডেকেও তো জানতে পারত, কার কী অপরাধ, কতটুকু অপরাধ। তা না করে সরকার মাত্র কয়েকটি দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের কথা বলছে। এখন অনেক নিবন্ধিত দলকে বাদ দিয়ে যদি কোনো ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলে, সেটি হবে খণ্ডিত জাতীয় ঐক্য।’
 
সীমিত পরিসরে বিএসপির কার্যক্রম
বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) ২০২৩ সালের ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠা পায়। প্রতিষ্ঠার এক মাসের মাথায় ১০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেয়ে ‘চমক’ দেখায় তারা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর ভাতিজা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে দলটি গড়ে ওঠে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ‘সমঝোতার আসন’ পেতে বহুমুখী তৎপরতা ছিল বিএসপির। দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ তাঁর দল ও জোট নিয়ে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব তৎপরতার মাধ্যমে সাইফুদ্দিন তাঁর চাচা ও চারবারের এমপি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনটিতে নিজের পক্ষে ক্ষমতাসীনদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করলে রাজনৈতিক মহলে বেশ কৌতূহল দেখা দেয়।

শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রতীক একতারা নিয়ে ৭৯ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল বিএসপি। চট্টগ্রাম-২ আসনে সাইফুদ্দিন আহমদও নিজ দল থেকে প্রার্থী হন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় প্রার্থী থাকার পরও এ আসনে বিএসপির প্রার্থীর পক্ষে দলের নেতাকর্মীকে কাজ করার নির্দেশও দেন। এত কিছুর পরও দলটির সব প্রার্থীই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।

বর্তমানে দলটির কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত। রাজধানীর মিরপুর-১-এর শাহ আলীবাগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় খানকা শরিফে নেতাকর্মীর আনাগোনা নেই বললেই চলে। মাঝেমধ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে চেষ্টা করছেন নেতারা।

এ ব্যাপারে সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে নেই। রোজায় আমরা বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ইফতার ও দোয়া মাহফিল করেছি। দ্রুতই আমরা সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করব। দল গুছিয়ে আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেব।’ অন্য দুই দলের মতো নিজেদের ‘কিংস পার্টি’ বলতে নারাজ বিএসপির চেয়ারম্যানও। 

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ব এসপ র সরক র র আম দ র দ ব দশ দল র ক ত র জন ন বন ধ বদল র দলট র গঠন ক আওয় ম সহয গ আগস ট

এছাড়াও পড়ুন:

ঈদেও নিষ্ক্রিয় সেই সব ‘কিংস পার্টি’

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো এখন নিষ্ক্রিয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে এসব দলের কোনো তৎপরতাই চোখে পড়ছে না। রমজান ও ঈদেও অধিকাংশ দলের তৎপরতা ছিল না। কোনো কোনো দল অবশ্য বক্তৃতা-বিবৃতি আর রাজপথে ছিটেফোঁটা কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। 

আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা ‘কিংস পার্টি’র মূল তিনটি দল হচ্ছে তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে নিবন্ধন পায় এই তিনটি রাজনৈতিক দল। সে সময় আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনে আসন সমঝোতার জন্য দেনদরবারও করে তারা। যদিও কোনো দলকে আসন ছাড় দেয়নি আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক পালাবদলের পর কোনো কোনো মহল থেকে আওয়ামী লীগের ‘সহযোগী’ আখ্যা দেওয়ায় বেশ বেকায়দায় আছেন দল তিনটির নেতারা। আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া এসব দলের নেতারা অবশ্য নিজেদের ‘কিংস পার্টি’ মানতে নারাজ। তাদের দাবি, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে গিয়েছিলেন তারা। তবে তারা কখনোই আওয়ামী লীগের ‘সহযোগী’ হিসেবে কাজ করেননি। বরং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার পক্ষেই ছিলেন।

নেতারা আরও বলেন, দ্রুতই নিজ নিজ দলকে সক্রিয় করার পদক্ষেপ নেবেন। সময়-সুযোগমতো মাঠেও নামবেন। সেই সঙ্গে জনগণের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে। আগামী নির্বাচনে তারা ৩০০ আসনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

বিএনপিসহ প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের বর্জনের মুখে গত বছরের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে ও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে নিজ দলের প্রার্থীকে ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে দাঁড়ানোর অনুমতি দেয় তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যা ‘ডামি’ নির্বাচন হিসেবে দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়ে। একই সঙ্গে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে আরও কিছু রাজনৈতিক দলকে সামনে আনা হয়। যার কোনো কোনোটির প্রতিষ্ঠা বেশ আগে হলেও বেশির ভাগই নির্বাচনের আগে আগে আত্মপ্রকাশ করে।

সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে সক্রিয় হবে তৃণমূল বিএনপি
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর তৃণমূল বিএনপির আত্মপ্রকাশ। দলটি ইসির নিবন্ধন পায় ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর দলটির প্রথম কাউন্সিলে দলে যোগ দেন দুই বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমূর আলম খন্দকার। পরে শমসের মবিন চৌধুরীকে চেয়ারপারসন, তৈমূর আলম খন্দকারকে মহাসচিব এবং ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিম হুদাকে নির্বাহী চেয়ারপারসন করে দলের কমিটি গঠিত হয়। দলটির প্রতীক ‘সোনালি আঁশ’। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তারা ২৭০ আসনে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৩৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলটি। এই দলের কোনো প্রার্থীই জিততে পারেননি। উল্টো সিংহভাগ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

এদিকে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর দলটির চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। দলটির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকারসহ বেশির ভাগ নেতাকর্মীই দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখনও রাজধানীর পুরানা পল্টনের তোপখানা রোডের মেহেরবা প্লাজাতে রয়েছে।

তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার সমকালকে বলেন, ‘আমরা আপাতত দলীয় কার্যক্রম বন্ধ রেখেছি। এখন দেখছি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়।’

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ‘কিংস পার্টি’ হওয়া কিংবা আওয়ামী লীগের ‘সহযোগী’ হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কিংস পার্টি গড়ে ওঠে রাজার আনুকূল্যে কিংবা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। আমরা তো কোনো রাজার আনুকূল্য নিইনি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাইনি; বরং আমরা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও তার সরকারের বিরোধিতা করে এসেছি।’ তৈমূরের দাবি, তাঁর দল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিল।

নাম বদলের আবেদন বিএনএমের
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) মাস দুয়েক আগে ইসি বরাবর নিজেদের নাম বদলের আবেদন জমা দিয়েছে। ওই আবেদনে ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামে নতুন করে নিবন্ধন চেয়েছে দলটি। এর আগে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় রাজধানীর গুলশান থেকে সরিয়ে মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডে স্থানান্তর করা হয়ে। নাম বদলের এই আবেদনে সাড়া দিতে ইসি অনেকটাই ‘ইতিবাচক’– এমনটাই জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

২০২১ সালে বিএনপির সাবেক দুই নেতা সাবেক এমপি ড. আবদুর রহমান ও মেজর (অব.) মুহা. হানিফের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা পায় বিএনএম। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায় দলটি। একই বছরের নভেম্বরে বিএনপি ছেড়ে দলটিতে যোগ দিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন সাবেক এমপি শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর।

গত নির্বাচনে নোঙর প্রতীকে ৮২ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। প্রার্থীর মধ্যে ছয়জন ছিলেন সাবেক এমপি। একজন বাদে সব প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। নির্বাচনের পর দলটির আর কার্যক্রম দেখা যায়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর একেবারেই নিষ্ক্রিয় দলটি। যদিও শাহ মোহাম্মদ আবু জাফরকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান ও ড. আবদুর রহমানকে মহাসচিব করে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। দ্রুতই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নতুন করে শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

বিএনএমের চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর সমকালকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার তো আমাদের কিছুতেই ডাকে না। আমরাও মনে করছি, এ পরিস্থিতিতে বেশি উথালপাথাল করাটা ঠিকও হবে না।’ তিনি বলেন, ‌‘আমাদের কিংস পার্টি বলাটা ঠিক নয়। নানা কারণে আমরা নির্বাচনে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো সহযোগিতা নিইনি। ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক আন্দোলনেও আমরা সমর্থন দিয়েছি, সহযোগিতা করেছি। কিংস পার্টি হলে তো আর এটি করতাম না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের ডেকেও তো জানতে পারত, কার কী অপরাধ, কতটুকু অপরাধ। তা না করে সরকার মাত্র কয়েকটি দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের কথা বলছে। এখন অনেক নিবন্ধিত দলকে বাদ দিয়ে যদি কোনো ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলে, সেটি হবে খণ্ডিত জাতীয় ঐক্য।’
 
সীমিত পরিসরে বিএসপির কার্যক্রম
বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) ২০২৩ সালের ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠা পায়। প্রতিষ্ঠার এক মাসের মাথায় ১০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেয়ে ‘চমক’ দেখায় তারা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর ভাতিজা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে দলটি গড়ে ওঠে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ‘সমঝোতার আসন’ পেতে বহুমুখী তৎপরতা ছিল বিএসপির। দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ তাঁর দল ও জোট নিয়ে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব তৎপরতার মাধ্যমে সাইফুদ্দিন তাঁর চাচা ও চারবারের এমপি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনটিতে নিজের পক্ষে ক্ষমতাসীনদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করলে রাজনৈতিক মহলে বেশ কৌতূহল দেখা দেয়।

শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রতীক একতারা নিয়ে ৭৯ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল বিএসপি। চট্টগ্রাম-২ আসনে সাইফুদ্দিন আহমদও নিজ দল থেকে প্রার্থী হন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় প্রার্থী থাকার পরও এ আসনে বিএসপির প্রার্থীর পক্ষে দলের নেতাকর্মীকে কাজ করার নির্দেশও দেন। এত কিছুর পরও দলটির সব প্রার্থীই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।

বর্তমানে দলটির কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত। রাজধানীর মিরপুর-১-এর শাহ আলীবাগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় খানকা শরিফে নেতাকর্মীর আনাগোনা নেই বললেই চলে। মাঝেমধ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে চেষ্টা করছেন নেতারা।

এ ব্যাপারে সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে নেই। রোজায় আমরা বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ইফতার ও দোয়া মাহফিল করেছি। দ্রুতই আমরা সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করব। দল গুছিয়ে আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেব।’ অন্য দুই দলের মতো নিজেদের ‘কিংস পার্টি’ বলতে নারাজ বিএসপির চেয়ারম্যানও। 

সম্পর্কিত নিবন্ধ