সাঈদ-মুগ্ধ-রিয়ারা কিন্তু সব দেখছে...
Published: 31st, March 2025 GMT
আমার শৈশব আর কৈশোরের একটা বড় অংশজুড়ে ছিলেন বিদ্রোহী কবি নজরুল। ছোটবেলায় নজরুলের গান কেন জানি খুব একটা পাওয়া যেত না। ‘সঞ্চিতা’ ছিল, সেখান থেকে কবিতা পড়তাম কখনো কখনো। আর ছিল কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তির ক্যাসেট। বাবা আর আমি দুজনে মিলে সেই ক্যাসেট যে কতবার শুনেছি আর আবেগে ভেসেছি, তার ইয়ত্তা নেই। সেখানে নজরুলের কয়েকটি প্রবন্ধ আর অভিবাসনের অংশবিশেষ পাঠ ছিল। মনে খুব দাগ কেটে গিয়েছিল সেটি।
‘যেদিন আমি চলে যাব—সেদিন হয়তো বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা হয়তো বেরোবে আমার নামে। দেশ-প্রেমিক, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী বিশ্লেষণের পর বিশেষণ! টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পড় মেরে, বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে, বন্ধু তুমি যেন যেও না। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ করো। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশপাশে যদি একটি ঝরা-পায়ে পেষা ফুল পাও সেইটিকে বুকে চেপে বলো—বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি—’
মিথ্যা হয়নি তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী। হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই তা ‘অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদন’ হয়েই থেকে গেছে। কিন্তু গত বর্ষায় যেভাবে নজরুল ফিরে এসেছেন তারুণ্যের কণ্ঠের শক্তি হয়ে, তাতে মনে হয় সবার বাঁচার মাঝে বেঁচে থাকার নজরুলের আকুতি বৃথা যায়নি। নজরুলকে বুকে ধারণ করেই এ দেশের সন্তানেরা বুকের রক্ত ঝরিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে।
নজরুলের জীবন কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না মোটেই। কখনো কাফের, কখনো যবন, হেন অপবাদ নেই, যা তাঁকে সহ্য করতে হয়নি। সাপ্তাহিক সাহিত্য সাময়িকী ‘শনিবারের চিঠি’তে গালির দাপট এতটাই বেড়েছিল যে নজরুল নিজেকে বলেছিলেন সে ‘গালির গালিচায় শানেশাহ্’। কখনো আক্রমণ এসেছে খোদ রবীন্দ্রনাথের তরফ থেকে, আরবি–ফারসি শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে। তার উত্তর নজরুল দিয়েছেন ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে। কখনো আবার আক্রমণ এসেছে মুসলিম সমাজের তরফ থেকে, শ্যামাসংগীত লেখা কিংবা কবিতায় হিন্দু পুরানের ব্যবহারের কারণে। আশালতা সেনগুপ্ত বা প্রমীলা নজরুলের সঙ্গে বিয়ে ঘিরে হিন্দু-মুসলিম দুই সমাজেরই আক্রমণের শিকার হন তিনি। এই নানামুখী আক্রমণের জবাব তিনি দিয়েছেন ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায়। কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠে এর চমৎকার আবৃত্তি এখন দুর্লভ নয়।
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘মোল্-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম—কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি এ দেশের সব মানুষকে এক কাতারে আনা। হিন্দু-মুসলিম, পাহাড়ি-বাঙালি সবাইকে। সে কারণেই বোধ করি এই একতাবদ্ধ প্রজন্মের কাছে এতটা আবেদন রাখতে পেরেছেন নজরুল।
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
গত বর্ষায় আমরা তো দেখে–শুনে–খেপে গিয়েই রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলাম! সে সময় হয়তো দূরাগত কোনো স্বপ্নের কথা অনেকেরই মাথায় আসেনি। পরের দিন বেঁচে থাকব কি না, সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন। বেঁচে থাকতে হলে শেখ হাসিনাকে বিদায় করতে হবে। এ ছাড়া কোনো কিছু ভাবার অবসর সে সময় ছিল না।
৫ আগস্ট অসম্ভবকে সম্ভব করল এ দেশের কোটি জনতা। আমরা পেলাম নতুন দেশ গড়ার সুযোগ। সব বাধা-ব্যবধান ঘুচে গেল যেন। মাস পেরোনোর আগেই এল সর্বপ্লাবী বন্যা। বিপুল উদ্যমে নিবিড় ঐক্যের বন্ধনে প্রকৃতিকেও রুখে দিল এ দেশের মানুষ। গল্পটা এভাবেই চললে ভালো হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে নানা মত ও পথের মানুষ স্বৈরাচার খেদানোর আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন, তাদের স্বপ্নের দেশের রূপটা একরকম নয়।
তাই শুরু হলো নিরন্তর কাদা–ছোড়াছুড়ি। অভ্যুত্থানের চেনা মুখগুলোকে একে একে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চলতে লাগল নানা মিথ্যা প্রচারণা। স্বপ্নটা ছিল দেশের সব নাগরিকের জন্য ন্যূনতম কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠা করার, দেশের ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও দাঁড় করানোর। কিন্তু সময় গড়াতে বড় হয়ে দাঁড়াল ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-জাতিগত নানা প্রশ্ন। পাহাড়ে আদিবাসীদের ওপর হামলা হলো, বিভিন্ন মাজার ভাঙার ঘটনা এখনো থেমে নেই। যে নারীর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব ছাড়া কোনোভাবেই জুলাই অভ্যুত্থান সফল হতো না, তাদের অধিকারের প্রশ্নেও নানা বাধা দেওয়া হলো।
এ কথা সত্য যে এ সমস্যার কোনোটিই আমাদের সমাজে নতুন নয়। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা স্বৈরাচারের বিরামহীন নিষ্পেষণে এসব প্রশ্ন আর বিতর্ক হয়তো চাপা পড়ে গিয়েছিল। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন গোষ্ঠী যার যার অবস্থান থেকে এই বিতর্কগুলো সামনে আনছে। বিতর্ক সমাজে থাকবে, কিন্তু বিষয়গুলো তিক্ততা আর নোংরামিতে গড়াচ্ছে একজনের মতবাদ অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে।
নজরুল জীবনভর পরমত সহিষ্ণুতার, সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার চর্চা করে গেছেন। সে কারণেই তাঁর লেখায় সব আদের্শের উদার দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। ‘ক্ষমা কর হযরত’ কবিতাতে ইসলামের উদারতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন নজরুল:
তোমার ধর্মে অবিশ্বাসীরে তুমি ঘৃণা নাহি করে
আপনি তাদের করিয়াছো সেবা ঠাঁই দিয়ে নিজ ঘরে।
ভিন-ধর্মীয় পূজা মন্দির
ভাঙ্গিতে আদেশ দাওনি হে বীর,
আমরা আজিকে সহ্য করিতে পারিনাকো পর-মত।
ক্ষমা করো হযরত।।
একই মিলনের বাণী শোনা যায় হিন্দুধর্মের কাঠামোতে আধারিত এই গানটিতে:
এবার নবীন-মন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্বোধন।
নিত্যা হয়ে রইবি ঘরে, হবে না তোর বিসর্জন॥
সকল জাতির পুরুষ-নারীর প্রাণ
সেই হবে তোর পূজা-বেদী মা তোর পীঠস্থান;
সেথা শক্তি দিয়ে ভক্তি দিয়ে পাতবো মা তোর সিংহাসন॥
সেথা রইবে নাকো ছোঁয়াছুঁয়ি উচ্চ-নীচের ভেদ,
সবাই মিলে উচ্চারিব মাতৃ-নামের বেদ।
মোরা এক জননীর সন্তান সব জানি,
ভাঙব দেয়াল, ভুল্ব হানাহানি
দীন-দরিদ্র রইবে না কেউ সমান হবে সর্বজন,
বিশ্ব হবে মহাভারত, নিত্য-প্রেমের বৃন্দাবন॥
এই দেয়াল ভেঙে, হানাহানি ভুলে নতুন দেশ গড়ার স্বপ্নের কথা দেয়ালে আঁকা অপূর্ব গ্রাফিতিগুলো থেকে এখনো মুছে যায়নি। সেখানে এখনো লেখা আছে, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!’ এই কবিতারই শেষের অংশটা আজকে সবারই মনে রাখা প্রয়োজন:
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান—
আসি’ অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান!
আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ,
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কাণ্ডারি হুঁশিয়ার॥
সাঈদ-মুগ্ধ-রিয়ারা কিন্তু অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে দেখছে তাদের জীবনের বিনিময়ে মুক্ত হাওয়ায় দম নিতে পারা এ দেশের মানুষগুলোকে। আজকের পরীক্ষা, আমরা কোনটাকে বেছে নেব, শুধু নিজের জাত বা গোত্রের স্বার্থ, নাকি গোটা জাতির? ন্যূনতম কিছু প্রশ্নে আমরা এখনো এক হতে পারি, থাকতে পারি। আর আমাদের ‘হাতে হাত মেলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভন’ হয়ে ওঠে, তাহলে আখেরে লাভ আমাদের কারও হবে না, হবে সীমান্তপারে ওত পেতে বসে থাকা কারও।
এই বিভেদ আর হানাহানি আপনিই হচ্ছে এমনটা নয়। এর পেছনে আছে নানা রহম মদদ, বিপুল অর্থের লগ্নি। কিন্তু এই সব কিছুর চেয়ে কি প্রেম বড় নয়? যে প্রেম সবাইকে এক করেছিল গত বর্ষায়? বসন্ত ফুরিয়ে এল, তার মাঝেই বর্ষা বিপ্লবের পর প্রথম ঈদ। ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটির পাশাপাশি নজরুলের আরেকটি গানও হয়তো এবার প্রাসঙ্গিক:
এলো আবার ঈদ ফিরে এলো আবার ঈদ, চলো ঈদগাহে।
যাহার আশায় চোখে মোদের ছিল না রে নিদ, চলো ঈদ্গাহে।।
শিয়া সুন্নী, লা-মজহাবী একই জামাতে
এই ঈদ মোবারকে মিলিবে এক সাথে,
ভাই পাবে ভাইকে বুকে, হাত মিলাবে হাতে;
আজ এক আকাশের নীচে মোদের একই সে মসজিদ, চলো ঈদগাহে।।
ভাই যেন ভাইকে বুকে পায়, হাতে যেন হাত মেলে, সেই আশাতেই বুক বাঁধছি। ঈদ মোবারক!
মানজুর-আল-মতিন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: নজর ল র
এছাড়াও পড়ুন:
ছুটিতেও ঢাকার বাতাস অস্বাস্থ্যকর
প্রতিবছর ঈদের সময় রাজধানী ছাড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এবারও ছেড়েছে। এ সময় কলকারখানা বন্ধ থাকে। যানবাহন চলাচল একেবারেই কমে যায়। মোটকথা, রাজধানীর বায়ুদূষণের সব উৎসই মোটামুটি কমে যায়। তারপরও এবার ঈদুল ফিতরের লম্বা ছুটির সময় রাজধানীবাসী নির্মল বায়ু পায়নি। ঈদের দুই দিন আগে, ঈদের দিন এবং পরের দিনও রাজধানীর বায়ু ছিল অস্বাস্থ্যকর। তবে ২ এপ্রিল কিছুটা ভালো ছিল বায়ুর মান। কিন্তু গড়ে পাঁচ দিনের বায়ু ছিল অস্বাস্থ্যকর।
এ বছরের বায়ুর মান গত বছরের চেয়ে কিছুটা ভালো। তবে ৭–৮ বছর আগেও ঈদের ছুটিতে বায়ুর মান ভালো ছিল।যদিও চলতি বছর বায়ুর মান গত বছরের চেয়ে কিছুটা ভালো। কিন্তু সাত থেকে আট বছর আগেও বায়ুর মান ঈদের ছুটির মধ্যে এর চেয়ে ভালো অবস্থায় ছিল।
নগরবিদ ও দূষণ গবেষকেরা বলছেন, ছুটির মধ্যেও অস্বাস্থ্যকর বায়ু থাকার অর্থ হলো দূষণ রোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয়। ঈদের সময় বায়ু পরিস্থিতি তুলে ধরেছে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার ঈদের ছুটির পাঁচ দিনের গড় বায়ুর মান (একিউআই) ছিল ১৫১। এটি ২০২৪ সালের রেকর্ড ১৯০-এর তুলনায় ভালো। যদিও তা নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এয়ার নাওয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
দূষণের উৎসগুলো ছুটির সময় নিয়ন্ত্রিত থাকে। তারপরও এমন কেন হলো, সেটা খোঁজ করতে হবে। হয়তো উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণ যথাযথ হচ্ছে না। মো. জিয়াউল হক, পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তরক্যাপসের চেয়ারম্যান আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ঈদুল ফিতরের সময়ের চেয়ে এবার দূষণ কম হলেও অস্বাস্থ্যকর বায়ু থেকে সুরক্ষা পায়নি নগরবাসী। এতে প্রমাণিত হয়, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট টেকসই ও কার্যকর কিছু করা হয়নি।
পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি
বায়ুর মান শূন্য থেকে ৫১ হলে তাকে ভালো বলা হয়। ৫১ থেকে ১০০ হলে বায়ুর মান মাঝারি। ১০১ থেকে ১৫০ হলে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকারক বলে গণ্য হয়। অস্বাস্থ্যকর ধরা হয় যদি বায়ুর মান ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে থাকে। খুব অস্বাস্থ্যকর বায়ু বলা হয়, মান যখন ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকে। আর ৩০০-এর বেশি হলে তা হয় দুর্যোগপূর্ণ। দূষণের এই মানদণ্ড পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কমবেশি মেনে চলে।
ক্যাপসের গবেষণা অনুযায়ী, গত এক দশকে ঈদের ছুটিতে ঢাকার বায়ুর মান ওঠানামা করেছে। ১০ বছরের ঈদের আগে-পরের ৪৫ দিনের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৭ সালে ঈদুল ফিতরের পরের দুই দিন মান ছিল সর্বনিম্ন ৪২ ও ৩৬। ২০১৯ সালের ঈদুল ফিতরের পরের দিনের মান ছিল ৩৭। কোনো কোনো বছর মান ১৫০-এর ওপরে গিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। এবার ঈদুল ফিতরের দিন ৩১ মার্চ বায়ুর গড় মান ছিল ১৫১। এর দুই দিন আগে ২৯ মার্চ ছিল ১৫৫। আর ঈদের পরদিন মান ছিল ১৫০। তবে ২ এপ্রিল ১৪৪-এ নেমে আসে।
রাজধানীতে ঈদুল ফিতরের ছুটির সময় বিভিন্ন এলাকায় দূষণের তারতম্য দেখা গেছে। এর মধ্যে মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে বায়ুর মান ছিল সবচেয়ে খারাপ। এরপর আছে কল্যাণপুর, মগবাজার ও মহাখালী।
কেন দূষণ কমে না
ঢাকার দূষণে যেসব উৎসের কথা বেশি বলা হয়, এর মধ্যে কলকারখানা, যানবাহন ও ইটভাটার ধোঁয়া, বর্জ্য পোড়ানোর কথা বলা হয়। ঈদের সময় এসব উৎসের প্রায় সব কটি বন্ধ ছিল। তারপরও এমন কেন?
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মো. জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, দূষণের উৎসগুলো ছুটির সময় নিয়ন্ত্রিত থাকে। তারপরও এমন কেন হলো, সেটা খোঁজ করতে হবে। হয়তো উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণ যথাযথ হচ্ছে না। স্থানীয় উৎসগুলোর পাশাপাশি উপমহাদেশীয় আন্তসীমান্ত বায়ুপ্রবাহ বড় ভূমিকা রাখে।
নগরীর দূষণের কথা উঠলে সরকারের পক্ষ থেকে ভারত ও পাকিস্তান হয়ে আসা দূষিত এই বায়ুপ্রবাহের কথা সব সময়ই উচ্চারিত হয়। সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বাংলাদেশে দূষিত বায়ুর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসে।
নগরীর দূষণ বেশি হয় নভেম্বর থেকে মার্চ মাসে। এরপর এপ্রিলে দক্ষিণের বায়ু এবং এর সঙ্গে সৃষ্টি হওয়া কালবৈশাখী ও বৃষ্টিতে দূষণের পরিমাণ কমে আসে। দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক এই সমাধানের ওপরই এখন পর্যন্ত ভরসা।
নগরবিদ ইকবাল হাবীব প্রথম আলোকে বলেন, পুরো ঢাকা নগরী হলো আস্তরণহীন। নির্মাণকাজ হচ্ছে উন্মুক্তভাবে। সেখানে বালু ও ইট উন্মুক্ত থাকছে। নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা উন্মুক্ত পড়ে আছে। সেখানেও সবুজের কোনো আচ্ছাদন নেই। তাই নগর থেকে মানুষ চলে গেলে কিংবা কারখানা বন্ধ থাকলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। নগরীর দূষণ বাড়ছেই।