সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় নদীয়া পাকিস্তানের ভাগেই ছিল। নদীয়ার সদর কৃষ্ণনগরে ১৫ আগস্টের আগের দিন ১৪ আগস্ট স্বাধীনতার জিলাপি বিতরণ হয়েছিল। উড়েছিল পাকিস্তানের মার্কা সবুজ চাঁদ–তারা পতাকা। দিন চারেক পরে ভ্রম সংশোধন হয়। বলা হয়, বাঁটোয়ারা ভুল হয়েছে। পাকিস্তান খুলনা পেলেও হারাতে হলো মুর্শিদাবাদ আর চিরতরে পদ্মার জান ফারাক্কা। নদীয়ার সবটা ভারতে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেকটা পাকিস্তান পেয়ে যায়। নদীয়ার তিনটি মহকুমা নিয়ে গঠিত হয় নতুন জেলা কুষ্টিয়া।

প্রস্তাব ছিল নাম হবে পূর্ব নদীয়া, যেমন হয়েছিল দিনাজপুরে। ভারতভাগে পাওয়া খণ্ডিত দিনাজপুরকে অনেক দিন পর্যন্ত পশ্চিম দিনাজপুর বলেই ডাকত। যাহোক, কুষ্টিয়া মহকুমার নামেই জেলার নামকরণ হলেও জেলা সদরের কোনো অবকাঠামো সেখানে ছিল না। মহকুমা শহরের সবচেয়ে প্রাচীন আর বড় হাইস্কুলটি সরকার কবজা করে পুলিশ লাইনস বানিয়ে ফেলে। ভারতভাগে চলে যাওয়া অংশ থেকে চলে আসে বাস্তুচ্যুত মানুষেরা। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থাহীন এক মহকুমা শহরের জনমিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। হাটবাজার, রাস্তা, স্টেশন, খেয়াঘাট, মসজিদ ও মহল্লায় চেনার চেয়ে অচেনা মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।

শহরের নাগরিক নেতৃত্বে নতুন বিভাজকরেখা তৈরি হয়। পৌর ও স্থানীয় নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। কিন্তু সবার অজান্তে মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে সবাই আবার এককাট্টা হয়ে যায়। নানা স্বাদের সবজি দিয়ে যেমন তৈরি হয় একটা সুস্বাদু তরকারি, অনেকটা সে রকম এক সামাজিক মূলধন তৈরি হয়ে যায় জান্তে–অজান্তে। কুষ্টিয়ার যুদ্ধে সেই সামাজিক মূলধন সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। গোলাবারুদ, রসদ, সংগঠিত–প্রশিক্ষিত লোকবল বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই ছিল না কুষ্টিয়াবাসীর পুঁজিতে। শুধু ছিল সামাজিক পুঁজি—একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকার।

তখনো মুক্তিবাহিনী, মুক্তিযুদ্ধ, সেক্টর, সেক্টর কমান্ডার—কোনো কিছুই গড়ে ওঠেনি। এসব শব্দ তখন শোনেনি কেউ। ঢাকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন নেতারা। মানুষ কিন্তু টের পাচ্ছিল, আলোচনার নামে ছলচাতুরী চলছে। বুঝে গিয়েছিল শত্রুদের সঙ্গে হবে না সমঝোতা। দেশটা আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। হাতে সময় নেই।

জনযুদ্ধের প্রথম অগ্নিপরীক্ষার নাম ‘দ্য ব্যাটল অব কুষ্টিয়া’। সেদিন কুষ্টিয়ার মতো একটি ছোট্ট শহর দেখিয়েছিল কীভাবে লড়াই করতে হয়। কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের মাঠে ৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে লাল–সবুজের ছয়টি তারাখচিত একটি পতাকা স্বাধীন বাংলার পতাকা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়। সেদিনই স্বাধীন বাংলার ইশতেহার পাঠ করেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হাদী (পরে রক্ষীবাহিনী তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে গড়াই নদে তাঁর লাশ ফেলে রাখে)। ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত হয় জয় বাংলা বাহিনী।

সেদিনই কুষ্টিয়ার প্রতিটি গ্রামে জয় বাংলা বাহিনী গড়ে ওঠে, পরে যা মুক্তিবাহিনী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন ইপিআর (পরবর্তীতে বিডিআর, এখন বিজিবি), পুলিশ, আনসার এই যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখলেও নেতৃত্ব আর ব্যবস্থাপনা ছিল ছাত্র–জনতার হাতে। ছাত্র–জনতা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয়। একদলের দায়িত্ব ছিল কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানি সেনার অবস্থান, সেনাসংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে সম্ভাব্য আক্রমণের একটি নকশা তৈরি করে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও দৌলতপুর ইপিআরের ক্যাম্পগুলোয় সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। এ কাজের নেতৃত্ব ছিল মূলত ছাত্রদের। তাঁরাই খুঁজে বের করেন ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় আধা সামরিক বাহিনী মুজাহিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে কে কে অস্ত্র (রাইফেল) চালানো শিখেছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ‘কুষ্টিয়ার যুদ্ধ’ পাকিস্তানি বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব ধুলায় লুটিয়ে দেওয়া তথা পরাজয়ের প্রথম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, যা নিয়ে সাংবাদিক ড্যান কগিন বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ১৯ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যায় প্রচ্ছদকাহিনি রচনা করেন। সে কারণে কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক নজিরবিহীন উদাহরণই শুধু নয়, রক্তাক্ষরে লেখা থাকবে এই বীরত্বগাথা। কুষ্টিয়ার যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রাথমিকভাবে একটি বড় ধরনের বিজয়। এই যুদ্ধ জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে সাহস জোগায়।

ইপিআর নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলা, তাদের রাজি করানো, প্রশিক্ষিত যোদ্ধা সংগ্রহ ইত্যাদির দায়িত্ব নেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

ছাত্র–জনতা আরেকটি বড় দায়িত্ব নেয়—যোদ্ধাদের জন্য খাবার আর পানীয় সংগ্রহ এবং সেগুলো বণ্টন। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রুটি, গুড় ও ডাব সংগ্রহ শুরু হয়ে যায় ২৮ মার্চ থেকে। সংগ্রহকারীরা গ্রামে গিয়ে দেখেছেন মায়েরা রুটি বানাচ্ছেন। কোথায় তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়নি। বলতে হয়নি রুটি ও ডাব দিন। সবকিছু প্রস্তুত ছিল। গাছিরা গাছি সলেমানের নেতৃত্বে তাঁদের মনের নির্দেশে শহরের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে গাছ থেকে ডাব নামিয়ে রাখার তাগিদ দেওয়া শুরু করেন ২৩ মার্চ থেকে। অনেকেই বুঝতে পারেননি সেই তাগিদের হেতু।

মেজর আবু ওসমান তাঁর বর্ণনায় বলেছেন, ‘সেনাবাহিনীর মতো খাদ্য সরবরাহের কোনো রকম নিয়মিত পদ্ধতি না থাকায় ভলান্টিয়ার গ্রুপের কিছু লোককে কুষ্টিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাহায্যে আমাদের সব বাহিনীর খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়। আরও ব্যবস্থা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে প্রয়োজনমতো যথাস্থানে ব্যবহার করার। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর হাতিয়ার বলতে ছিল বাঁশের লাঠি।’

স্বেচ্ছাসেবকেরা হয়ে ওঠেন যুদ্ধের প্রধান ভিত্তি বা চালিকা শক্তি। পাকিস্তানিদের সঙ্গে ছিল জিপে স্থাপিত ১০৬ এমএম রিকোয়েললেস রাইফেল (আরআর), পর্যাপ্তসংখ্যক চীনা এইচএমজি, এলএমজি, এসএমজি ও অটোমেটিক রাইফেল। তার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে গোলাবারুদ, গাড়ি ও বেতারযন্ত্র ছিল। তুলনামূলকভাবে রেকি ও সাপোর্ট কোম্পানির ফায়ার পাওয়ার একটা সাধারণ ইনফ্যানট্রি ব্যাটালিয়নের প্রায় সমপরিমাণ সাজসজ্জা।

অন্যদিকে সব কটি ইপিআর ক্যাম্প মিলিয়ে অস্ত্র বলতে ছিল ৩০৩ রাইফেল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৩০৩ এলএমজি, এমজি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মরচে পড়া চারটা ৩.

৫ রকেট লঞ্চার। যেকোনো বিবেচনায় এগুলো ছিল একটা নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। এ প্রসঙ্গে কুষ্টিয়া যুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বে থাকা মেজর আবু ওসমান বলেছিলেন, ‘তবে ভরসা ছিল এই যে আমার সঙ্গে ছিল সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।’

যুদ্ধ করে কুষ্টিয়া মুক্ত করার ইচ্ছাটা এত প্রবল ছিল যে একটা কনভেনশনাল যুদ্ধের জন্য যা যা সরঞ্জাম লাগে, বলতে গেলে তার কিছুই ছিল না। ছিল শুধু প্রতিজ্ঞা আর আর বিশ্বাস—‘আমরা পারব’। কোনো রকম ফিল্ড ওয়্যারলেস বা ফিল্ড টেলিফোন কমিউনিকেশনের ব্যবস্থা ইপিআরের ছিল না। তাই টেলিফোন বিভাগের সাহায্যে পোড়াদহের খোলা প্রান্তরে ফিল্ড এক্সচেঞ্জ লাগিয়ে দেওয়া হয়। কুষ্টিয়া টেলিফোন অফিসের কর্মীরাই সেটা করেন। তরুণ–প্রবীণ চিকিৎসকেরা গড়ে তোলেন ফিল্ড চিকিৎসাকেন্দ্র। ফার্মেসির মালিকেরা ওষুধের ব্যবস্থা করেন।

২৫ মার্চ রাতেই কুষ্টিয়াও দেশের অন্যান্য শহরের মতো পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়। ওই দিন রাত পৌনে ১২টায় যশোর সেনাছাউনি থেকে পাকিস্তানি মেজর শোয়েবের নেতৃত্বে এবং ক্যাপ্টেন শাকিল, ক্যাপ্টেন সামাদ ও লেফটেন্যান্ট আতাউল্লাহ শাহর উপ–অধিনায়কত্বে ২৭ বালুচ রেজিমেন্টের ডি-কোম্পানির ২১৬ জন সেনা এসে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন আক্রমণ করে।

কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা আগে থেকেই আঁচ করতে পারেন। তাঁরা তাঁদের অস্ত্র নিয়ে পাশের গড়াই নদ সাঁতরে পার হয়ে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নেন। বাকি পুলিশ সদস্যদের নিরস্ত্র করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এরপর পুলিশ লাইনস, জিলা স্কুল, টেলিগ্রাফ অফিস, থানা ও আড়ুয়াপাড়া ওয়্যারলেস অফিস দখল করে তাদের ঘাঁটি গড়ে তোলে।

কুষ্টিয়ার বেসামরিক প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রসাশক পরিবার নিয়ে তাদের ঘাঁটিতে যোগ দেয়। পরদিন ২৬ মার্চ সারা শহরে ৩০ ঘণ্টার লাগাতার কারফিউ জারি করে। শুরু হয় শহরময় সেনাটহল। সেনাটহল আর কারফিউয়ের মধ্যেই কুষ্টিয়ার ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদেনা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। প্রথম প্রতিরোধ আসে ছাত্রদের তরফ থেকে। তাঁরা টহলরত সেনাযানের ওপর পেট্রলবোমা নিক্ষেপের চেষ্টা করেন। পুলিশের তাড়া খেয়ে রংপুর থেকে কুষ্টিয়ায় বোনের আশ্রয়ে চলে আসা ছাত্র দেওয়ান মিজানুর রহমান (রনি) বা রনি রহমান এই প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কুষ্টিয়ার ছাত্র–জনতার পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে ২৮ মার্চ রাতে চুয়াডাঙ্গার ইপিআর সেক্টর কামন্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীর সঙ্গে কুষ্টিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা করে। কুষ্টিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি কোম্পানি ঝিনাইদহ এসে পৌঁছায় এবং যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক অবরোধ করে। যশোর সেনাছাউনি থেকে পাকিস্তানি বাহিনী আসতে চাইলে তা প্রতিহত করাই ছিল এই অবরোধের উদ্দেশ্য। ২৯ মার্চ ভোর চারটায় আক্রমণ করার কথা ছিল, কিন্তু গাড়ি দুর্ঘটনার জন্য সুবেদার মোজাফফর কোম্পানি যথাসময়ে পৌঁছাতে পারেনি, তারপর ৩০ মার্চ ভোর চারটায় তিন দিক থেকে পাকিস্তানি ঘাঁটিগুলো সংযুক্তভাবে আক্রমণ করা হয়।

কুষ্টিয়া জিলা স্কুল, পুলিশ লাইনস, আড়ুয়াপাড়ার ওয়্যারলেস স্টেশন—এগুলো ছিল পাকিস্তানিদের প্রধান ক্যাম্প। এ ছাড়া ছিল থানা ও টেলিফোন একচেঞ্জ। তিন দিক থেকে একই সময় তিনটি পাকিস্তানি ঘাঁটির ওপর প্রবলভাবে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করা হয়। ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীকে জিলা স্কুলে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করতে আদেশ দেওয়া হয়। নায়েব সুবেদার মনিরুজ্জামানকে (শহীদ) আড়ুয়াপাড়ার ওয়্যারলেস স্টেশন আক্রমণ করতে আদেশ দেওয়া হয়।

ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থান নেয় ছাত্র–জনতার লাঠি বা জয় বাংলা বাহিনী। পুলিশ লাইনস আক্রমণের নেতৃত্ব দেন সুবেদার মোজাফফর। এই গ্রুপে লাঠি বাহিনীসহ ছাত্র–জনতা পুলিশ লাইনস–সংলগ্ন জজ সাহেবের বাড়ি ও আশপাশে অবস্থান নেয়। কুষ্টিয়া থানা ও টেলিফোন একচেঞ্জ আক্রমণের প্রধান ভূমিকা পালন করে ২৫ মার্চ গড়াই নদ পার হয়ে হরিপুরে আশ্রয় নেন পুলিশ সদস্যরা।

সব প্রস্তুতি শেষ হলে ৩০ মার্চ ভোর চারটায় পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ভেড়ামারা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কুষ্টিয়া শহরকে বিচ্ছিন্ন করার পর একটি ওপেনিং ফায়ারের সঙ্গে সঙ্গে কুষ্টিয়ার চারদিক থেকে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সামান্য রাইফেল, কয়েকটি এলএমজি আর অফুরন্ত মনোবল, অদম্য সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে ছাত্র–জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে। অস্ত্রের ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় হাজার হাজার মানুষের গগনবিদারী চিৎকারে। পাকা ফসলের মাঠে পাখি তাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত বাঁশ ফাটানো আওয়াজ এই যুদ্ধে সফল অস্ত্র হয়ে ওঠে।

দূর থেকে এই শব্দ শুনলে মনে হয় যেন মেশিনগানের আওয়াজ। আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে থাকে। সারা দিন যুদ্ধের পর বিকাল পাঁচটায় কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনস মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। ভোর থেকে শুরু হয়ে বিকাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের অধিকাংশই নিহত হয়। কুষ্টিয়া শহরের তিনটি প্রধান ঘাঁটি পুলিশ লাইনস, জিলা স্কুল ও ওয়্যারলেসের মধ্যে শুধু জিলা স্কুল ছাড়া সব মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে।

বিজয়ের আনন্দে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল শক্তিতে জিলা স্কুল চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন এবং অবিরাম আঘাত হানতে থাকেন। রাতের অন্ধকারে জীবিত ৪০ থেকে ৪৫ জন পাকিস্তানি সেনা দুটি জিপ ও দুটি ডজ গাড়িতে করে ঝিনাইদহের পথে পালানোর চেষ্টা করে। পলায়নকালের আগেই শৈলকুপার (ঝিনাইদহ) সেতুর কাছে ছাত্র–জনতা আগে থেকেই অ্যাম্বুশ করে রাখে।

সেতুটি ভেঙে বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢেকে আলকাতরা দিয়ে রং করে পিচঢালা রাস্তার মতো করে রাখে। পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের গাড়ি দুটি গর্তের মধ্যে পড়ে গেলে ছাত্র–জনতা অতর্কিত আক্রমণ করে। এখানে মেজর শোয়েবসহ বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। অবশিষ্ট পাকিস্তানি সেনা আহত অবস্থায় আশপাশের গ্রামে পালিয়ে যায়। গ্রামবাসীর হাতে তারা নিহত হয়। ৩১ মার্চ আহত অবস্থায় লে. আতাউল্লআহ শাহ ধরা পড়ে। ১ এপ্রিল কুষ্টিয়া শত্রুমুক্ত হয়। এ যুদ্ধে মাত্র ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং কয়েকজন আহত হন।

শহীদ মুক্তিযযোদ্ধারা হলেন হামেদ আলী, পিতা: ওমোদ আলী, গ্রাম: দুধকুমড়া, কুমারখালী; দেলোয়ার হোসেন, পিতা: আলম হোসেন, মিরপুর; খন্দকার আবদুর রশিদ, পিতা: আবদুর রহমান, গ্রাম: বামনপাড়া, মেহেরপুর; ফজলুর রহমান, পিতা: নাসির উদ্দিন, গ্রাম: মেহেরপুর; আশরাফ আলী খান, পিতা: হাছেন আলী খান, বামনপাড়া, মেহেরপুর; গোলাম শেখ, পিতা: নজীর শেখ, গ্রাম: মশান, মিরপুর।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ‘কুষ্টিয়ার যুদ্ধ’ পাকিস্তানি বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব ধুলায় লুটিয়ে দেওয়া তথা পরাজয়ের প্রথম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, যা নিয়ে সাংবাদিক ড্যান কগিন বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ১৯ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যায় প্রচ্ছদকাহিনি রচনা করেন। সে কারণে কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক নজিরবিহীন উদাহরণই শুধু নয়, রক্তাক্ষরে লেখা থাকবে এই বীরত্বগাথা। কুষ্টিয়ার যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রাথমিকভাবে একটি বড় ধরনের বিজয়। এই যুদ্ধ জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে সাহস জোগায়।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক এবং ‘একাত্তরের সামাজিক ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক।

ই–মেইল: [email protected]

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: স ব চ ছ স বক প ল শ ল ইনস ছ ত র জনত র ব যবস থ এই য দ ধ অবস থ ন ঝ ন ইদহ র জন য র পর ক প রস ত শহর র র ওপর রহম ন প রথম

এছাড়াও পড়ুন:

ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয় মিয়ানমারে, সাতদিনের শোক ঘোষণা

শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে মিয়ানমারে। এই বিপর্যয়ের পর দেশটিতে এক সপ্তাহের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।

এদিকে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ২০০০ পেরিয়ে গেছে। সোমবার দেশটির সামরিক সরকার জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পে আহত হয়েছে আরও ৩ হাজার ৯০০। এখনও নিখোঁজ ২৭০ জন। দেশটিতে ভূমিকম্পের প্রায় ৬০ ঘণ্টার পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার সাগাইং অঞ্চলে ধসে পড়া একটি স্কুল ভবন থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে দেশটির ফায়ার সার্ভিস।  খবর- বিবিসি

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন তুনজানান, মান্দালয় অঞ্চলে ২৭০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেখানে ভূমিকম্পে মসজিদ, সেতু এবং বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে নিহত ও আহতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিকল হওয়ায় অনেক অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যাচ্ছে না। 

শুক্রবার মিয়ানমারে শক্তিশালী ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে দেশটির সরকারকে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে উদ্ধারকারীরা যখন জীবিতদের সন্ধান করছেন তখন জাতিসংঘ জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে, যা ত্রাণ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। 

সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের ঘটনায় মিয়ানমারের রাস্তাঘাটে লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের তহবিল সহায়তা চেয়ে আবেদন জানিয়েছে জাতিসংঘ। 

ভূমিকম্পে রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর সঙ্গে সামরিক সরকার, বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সশস্ত্র যোদ্ধাদের মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধের ফলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে কাজ করা সাহায্য সংস্থাগুলোর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিরোধী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট জোর দিয়ে বলছে, যেকোনো সহায়তা যেন স্বাধীনভাবে ও স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। মিয়ানমারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মান্দালয়ের ঐতিহাসিক অনেক ভবন এই ভূমিকম্পে মাটিতে মিশে গেছে। উদ্ধারকর্মীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তুূপ ঘেঁটে দেখছেন। 

২০২১ সাল থেকে মিয়ানমার শাসন করা সামরিক জান্তা দেশটির সাগাইং, মান্দালয়, মাগওয়ে, বাগো, ইস্টার শান রাজ্য এবং নেপিডো অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দেশটির দুই বড় শহর, মান্দালয় ও ইয়াংগুনের বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ