রাজনীতির ‘নতুন বন্দোবস্ত’ দেখতে কেমন?
Published: 27th, March 2025 GMT
গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বহুল উচ্চারিত শব্দ– সংস্কার ও বন্দোবস্ত। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সংস্কার হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া। অর্থাৎ এটি সর্বদা গতিশীল। সময়ের পরিক্রমায় একই বিষয়ের সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজবোধ্য অবস্থা হচ্ছে সংস্কার। অপরদিকে, বন্দোবস্ত হচ্ছে ব্যবস্থা বা কাঠামো। দেশের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে যে নতুন বন্দোবস্তের আলাপ শোনা যাচ্ছে, সেটি আসলে দেখতে কেমন? এটি কি কেবলই শব্দ বিলাস? নাকি বিস্তারিত কাঠামো রয়েছে?
ইতিহাসে চোখ রাখলে স্মরণ করতে পারি, ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও বাংলার ভূস্বামীদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, যা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই ধারায় জমিদারদের হাতে ভূমির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল। এখন যদি রাজনৈতিক নতুন বন্দোবস্তের কথা বলি, সেটা কেমন হবে? নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এখন কার হাতে? সেটি কার হাতে আমরা দিতে চাই?
নবগঠিত রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ এনএসপি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা সামনে আনছে। তারা কি পরিষ্কার করেছে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কার হাতে দেওয়া হবে? নতুন দলের নেতারা কি ইতোমধ্যে তাদের রাজনৈতিক চর্চায় নতুন বন্দোবস্তের ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছেন? নাকি তারাও পুরোনো পথে হাঁটছেন?
সম্প্রতি এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে পঞ্চগড়ে নিজ এলাকায় প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর পর তিনি যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার সারকথা– পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং জেলার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহরের অর্ধেকের বেশি গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন, যেগুলোর ব্যয় তাঁর বহন করতে হয়নি। বাকি ৫০টির মতো গাড়ির ৬ হাজার টাকা করে যে ৩ লাখ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে, সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর পরিবারের আরও ৫০ বছর আগেও ছিল। শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হলে তাঁর খরচ নিয়েও আত্মবিশ্বাসী সারজিস আরও লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, অন্য কেউ না; শুধু আমার দাদা আমার জন্য যতটুকু রেখে গিয়েছেন, সেটা দিয়ে আমি আমার ইলেকশনও করে ফেলতে পারব ইনশাআল্লাহ।’
এই বক্তব্য সামনে আসার পরে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে বলছেন, সারজিসের দাদা কি তবে জমিদার ছিলেন? জমিদারের নাতি হয়ে থাকলে পৈতৃক সম্পত্তি খরচ করে ফেলা নিয়ে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সারজিস আলমের দাদা জমিদার ছিলেন না। আর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে গিয়ে সারজিসের ঘটনা সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
যে রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের মাস পেরোলো কেবল; এখনও দল হিসেবে নিবন্ধিত হয়নি, সেই দলের নেতার বিশাল শোডাউনের খরচ কীভাবে মেটানো হলো– তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমি বিষয়টিকে কিছুটা সহজ করে দেখতে চাই; নতুন দলের খরচের অর্থের উৎস নিয়ে আলাপ করার আগে আমরা কি পুরোনো রাজনৈতিক দলের অর্থের উৎস বিষয়ে সব উত্তর জেনে নিয়েছি? আবার যেমনটা হয়ে থাকে, নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয়। পুরোনো দলগুলো তখন একটা নিয়ম রক্ষার হিসাব দেখিয়ে থাকে। কিন্তু কথা হচ্ছে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা সামনে এনে রাজনীতিতে আসা নতুন দলের শীর্ষ নেতারা যদি বিসমিল্লাহতেই এমন করেন, তাহলে পুরোনোদের সঙ্গে তাদের তফাৎ রইল কই?
আওয়ামী লীগের পতনের পরে দেশের মানুষ আশা করে আছে, দীর্ঘদিন পর দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে যাবে। বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। সবাই আশা করে আছে, ভোটের মাধ্যমে সবাই নাগরিক অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু নতুন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা জনপ্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে গৌণ ইস্যুকে মুখ্য করে অকারণ সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করছেন। এমনটা যদি চলতে থাকে, তাহলে জনমনে ভুল বার্তা যাবে।
আগামী নির্বাচন হবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের; গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার; রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও জনগণের পক্ষের আইন তৈরির নির্বাচন। সেই লড়াইটি সবার চালিয়ে যেতে হবে। দেশের মানুষ দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রাম করেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আমাদের সংকট-সংঘাত ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। তার বিরুদ্ধেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। জনতার স্পষ্ট বার্তা– এই বন্দোবস্ত আর চলবে না। আমাদের নতুন বন্দোবস্ত লাগবে। তাই সবার আগে নির্ধারণ করতে হবে, নতুন বন্দোবস্ত বলতে আমরা কী বুঝব? কতটুকু অধিকার পাব?
নতুন বন্দোবস্ত মানে ক্ষমতা কীভাবে চলবে? ক্ষমতা চালানোর নিয়মটা কী? ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জমিদারি আচরণ করে কিনা? ক্ষমতা জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে কিনা? মোট কথা, নতুন বন্দোবস্ত হচ্ছে, জমিদারি নাকি জবাবদিহি? আগামী দিনের ক্ষমতা হবে জবাবদিহির; সেটাই নতুন বন্দোবস্ত।
মনে রাখতে হবে, নতুন বন্দোবস্তের কথা বলাই কেবল নতুন দিনের রাজনীতি নয়। রাজনীতির নতুন সময়ে নতুন দলকে নতুন কিছু দিতে হবে। সেই নতুন কিছু এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পেয়েছি কি? যদি উত্তর না হয়, তাহলে নতুন দল আর পুরোনো দলের মধ্যে পার্থক্য রইল কই?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গঠনের উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছিল। বিদ্যমান রাজনীতির ‘বিকল্প’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা এসেছিল, বেশির ভাগই টিকে থাকতে পারেনি। বিকল্পধারা বাংলাদেশ কিংবা গণফোরামের নাম উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। এই দলগুলোর ব্যর্থতা, নেতৃত্বের অভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং জনগণের আস্থার সংকট থেকে নতুন দল এনসিপিকে শিক্ষা নিতে হবে।
অতীতের ভুল থেকে নতুন দল শিক্ষা নিয়ে কামিয়াব হলে রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান আশা করা যায় বৈ কি! কিন্তু বিসমিল্লাতেই গলদ ঘটিয়ে ফেলা দল নিয়ে জনগণ কতটা আশাবাদী হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।
এহ্সান মাহমুদ: সহকারী সম্পাদক,
সমকাল; কথাসাহিত্যিক
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: র জন ত র র জন ত ক নত ন দ ক ষমত
এছাড়াও পড়ুন:
রাজনীতিতে উত্তাপ: নতুন দল, সুইং ভোটার ও মাইনাস ফর্মুলা
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরবর্তিত রাজনীতি জমে উঠেছে। নানা বাগ্বিতণ্ডা, পক্ষ–বিপক্ষে তর্ক–বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা সবই চলছে। ক্ষণে ক্ষণে দেখা যাচ্ছে উত্তপ্ত পরিস্থিতিও। ‘সংস্কার’ ‘নির্বাচন’ ‘নিষিদ্ধ’ ‘ফেসবুক পোস্ট’ ‘ভূরাজনীতি’ ‘বিভক্তি’ ‘কারও এজেন্ডা’ ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পরিণতি’ ‘বৈঠক’ ‘বিবৃতি’ ‘পাল্টা বিবৃতি’ নানা পক্ষের নানা রকম কথায় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশের পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে’ সব পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে নানা ভাষায় হুংকার দিচ্ছে। যদিও পাশাপাশি চলছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বৈঠক।
ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের প্রচণ্ডতায় ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন, পলায়নে ও পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার চমৎকার সুযোগ এসেছিল আমাদের সামনে। সেই প্রত্যয়ে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের বিষয়ে মতামত দিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এমন এক প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘নেতারা আমার সঙ্গে বৈঠকে আলাপ–আলোচনায় বিভিন্ন বিষয়ে একমত পোষণ করেন, বাইরে গিয়েই সাংবাদিকদের সামনে বলেন ভিন্নকথা।’ এমন দ্বিচারিতা যেন বাংলাদেশের রাজনীতিকদের নিত্যদিনের চর্চিত বিষয়।
যদিও জুলাই-আগস্ট ২০২৪–এর আন্দোলনে রাজপথে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাজপথে নেমে আসা দেশের সব শ্রেণি–পেশার মানষের মধ্যে গড়ে ওঠা ঐক্য বৃহৎ শক্তিতে রূপ নেবে, একটা শক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, পরিস্থিতি এখন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। বাংলাদেশের রাজনীতির চিরাচরিত চরিত্র এবং সেই চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। একেক পক্ষের চাওয়া-পাওয়া, দাবি, আকাঙ্ক্ষা একেক রকম। এঁদের কেউ বুঝেশুনে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির আলোকে নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী কথা বলছেন; কেউ আবার ভাবাবেগে আক্রান্ত কথাবার্তার আবরণে ইস্যু তুলে পরিস্থিতি ও জনমত নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু তারুণ্যনির্ভর নেতাদের চিন্তাচেতনায় যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁদের ইদানীংকার কর্মকাণ্ড তাঁদেরকে যে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষগুলোর সামনে ভুল বার্তাসহ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, তা উপলব্ধি করার সক্ষমতাও হয়তো এঁদের তৈরি হয়নি এখনো। দিন দিন এটা স্পষ্ট হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর আন্দোলনের তেজ এক কথা নয়।
আবার চর্চিত নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ কর্মী–সমর্থকদের মনোবলকে পুঁজি করে কোনো কোনো দল মধ্যপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে কুশলী খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
এর বাইরে নানা মোর্চা ধর্মভিত্তিক নানা প্ল্যাটফর্মের ছায়াতলে থেকে স্বনামে পরিচিত অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চলমান অস্থির এই সময়ে আগামীর রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন, পাশাপশি সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে সবাইকে সংযত থাকতে বলছেন।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সুবাদে পরিচিত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির দুই নেতা সেনানিবাসে গিয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পর পরবর্তী সময়ে তাঁদের ফেসবুক পোস্ট টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে যায়। তাঁদের বক্তব্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত তো হয়ই, নিজেরাও দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করেন। যাত্রার শুরুতেই দুই নেতার এমন বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের অনেক ‘খেয়ালি কাজ’ রাজনৈতিক মহলে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন তাঁদের দলের নেতা–কর্মীরাই। রাজনীতির মাঠে যাঁরা দীর্ঘদিন আছেন, তাঁদের সঙ্গে নবীন নেতৃত্বের চিন্তাচেতনায় বক্তব্য অভিব্যক্তিতে পার্থক্য হবে, এটা জানা কথা। তবে এটা দেশের জনগণ, তথা আগামী দিনে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ভোটারদের জন্য একটা বার্তা।
ভুলে গেলে চলবে না যে নানা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে বিভক্ত রাজনৈতিক বিশ্বাসের বাইরে ভোটারদের একটা বড় অংশ রয়েছে, যারা ‘সুইং ভোটার’ নামে পরিচিত। এঁরাই ’৯১–এর জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা শহরে শেখ হাসিনার মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর নৌকাও ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। সেবার আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী ঢাকায় জিততে পারেননি।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুষ্ঠু সেবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শেখ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হারতে হয়েছিল তেজগাঁও আসনে মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, কোতোয়ালি সূত্রাপুরে সাদেক হোসেন খোকার কাছে। সেই ভয়ে শেখ হাসিনা নিজের এলাকার বাইরে প্রার্থী হতে সাহস দেখিয়েছেন খুব কমই। আবার পাঁচ বছরের মাথায় ‘সুইং ভোটার’রা ’৯৬–এর নির্বাচনে কোতোয়ালি সূত্রাপুরে সাদেক হোসেন খোকা ছাড়া আর কোনো বিএনপি প্রার্থীকে ঢাকার কোনোর আসনে জিতে আসতে দেননি। সবাই চড়ে বসেছিল নৌকায়।
মনে রাখতে হবে, রাজপথে আন্দোলনের সময়কার আবেগ আর রাজনীতির বাস্তবতা আলাদা জিনিস। রাজনীতির বড় খেলোয়াড়রা সবাই এখন সম্ভাব্য লাভ–ক্ষতির হিসাব কষায় ব্যস্ত। ওদিকে নানা ঘাত–প্রতিঘাতে পোড় খাওয়া দেশের জনগণও এবার প্রস্তুত। ভোট দেবেন বুঝেশুনে। আগামী দিনের সংসদ সদস্য হিসেবে আইন প্রণয়ন ও দেশ পরিচালনার ভার কাকে দেবেন, সেটাও এবার নির্ধারণ হবে চিন্তার নিরিখে।
একটি বড় দল অনতিবিলম্বে জাতীয় নির্বাচন দাবি করে বলেছে, রাজনৈতিক সংস্কার নির্বাচনের পর সংসদে বসেই তারা করবে। ‘অনির্বাচিত’ সরকারের রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। যদিও ‘যে যায় লঙ্কায় সে–ই হয় রাবণ’ এমন আশঙ্কা নানা কারণেই এক্কেবারে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না দেশের জনগণের পক্ষে।
ওদিকে দেশের একটা বড় রাজনৈতিক দলের আশঙ্কা, রাজনীতি থেকে তাদের মাইনাস করা হতে পারে। বলতেই হচ্ছে, বিএনপিকে কোনো কৌশলে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা কোনোভাবেই দেশের রাজনীতির জন্য ভালো হবে না। আওয়ামী লীগ চেয়েছিল বিএনপিকে মাইনাস করতে, তাদের কোণঠাসা করে রাখতে; কিন্তু আমরা দেখলাম কী? আওয়ামী লীগকেই পালিয়ে যেতে হলো দেশ থেকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই মানুষ ও তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলী উপলব্ধি করতে পারছেন, তাঁদের শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক প্রস্থানের জন্যও একটা গ্রহণযোগ্য অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বিকল্প নেই। সেই অনুধাবন থেকেই তাঁরা দেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের কথা বলছেন গুরুত্বসহকারে। না হলে যে দীর্ঘ ‘স্বৈরাচারী’ শাসন অবসানের পর ভোটবাক্সে মতামত জানানোর অপেক্ষায় থাকা জনগণের প্রত্যাশা আবারও মাঠে মারা যাবে।
এ কথা মনে রাখতে হবে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিপ্লবপ্রসূত পরিস্থিতিতে দেশের ছাত্র- তরুণ-জনতার পছন্দের সরকার। যে কারণে অনেকে এমনটাও বিশ্বাস করেন যে রাজপথের আন্দোলন–সংগ্রামে জীবন দেওয়া, আহত হওয়া এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে অবিশ্বাস্য রকম কম সময়ের মধ্যে স্বৈরাচারী সরকারকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের প্ল্যাটফর্ম নানা কারণে সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
এখন দেখার বিষয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বৈঠক ও তাদের প্রস্তাবের আলোকে দেশের নিপীড়িত জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার জন্য চূড়ান্তভাবে কী রূপরেখা তৈরি হয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের মাথায় উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে উত্তরণের প্রাক্কালে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মুহাম্মদ লুৎফুল হায়দার ব্যাংকার