যুদ্ধ জয়ের পর জুলিয়াস সিজার রোমান সিনেটকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, ‘ভেনি, ভিদি, ভিসি’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, আমি এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। হামজা চৌধুরী চাইলেই সিজারের এই বীরত্বসূচক শব্দগুলো ব্যবহার করতে পারেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলার উদ্দেশ্যে ১৭ মার্চ বাংলাদেশে এলেন, সবকিছু দেখলেন এবং ফুটবল দিয়েই সমর্থকদের মন জয় করলেন। বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে ফিরেও গেলেন হামজা। যাওয়ার আগে বলে গেলেন জুনে দেখা হচ্ছে আবার।
নব্বইয়ের দশক থেকে সংগঠকদের হঠকারিতায় ফুটবল ধীরে-ধীরে দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়েছিল। হামজার আগমন উপলক্ষে পুনরায় বিপুল উন্মাদনা তৈরি হয় ফুটবলে। সিলেট এবং ঢাকায় তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় ভক্তরা। সেই ভালবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেলেন শেফিল্ড ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ডার।
মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) শিলংয়ে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক হয় হামজার। ম্যাচে অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলেন এই ২৭ বছর বয়সী ফুটবলার। গতকাল দলের বাকি সদস্যদের সঙ্গে দেশে ফিরেন তিনি। গত রাতেই ইংল্যান্ডের ফ্লাইট ধরার কথা ছিল শেফিল্ড ফুটবলারের। তবে ফ্লাইটের সময়সূচী পরিবর্তনের কারণে ঢাকায় বাড়তি এক রাত থাকতে হয় তাকে। অবশেষের আজ সকালেই আবার ম্যানচেস্টারের ফ্লাইট ধরেন তিনি।
আরো পড়ুন:
‘মেসির সঙ্গে’ পরিচয় করিয়ে দিলেন জামাল, ছেত্রীর সঙ্গে তুলনায় দিলেন অন্যরকম উত্তর
কোচ বললেন ফাহামিদুল ‘রেডি না’, সুর মেলালেন জামালও
আজ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে হামজা বলে, “শুধু ধন্যবাদ বলতে চাই। এটা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। অনেক ধন্যবাদ, ইনশাআল্লাহ জুনে ফিরে আসব। আমার সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন।”
হামজা জাতীয় দলের জার্সিতে খেললেও এখনও বাংলাদেশের মাটিতে খেলেননি। এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের দ্বিতীয় ম্যাচেই সেই সুযোগ আসছে। আগামী ১০ জুন ঘরের মাঠেই সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে নামবে বাংলাদেশ। তখন হামজার খেলা সরাসরি দেখার সুযোগ মিলবে বাংলাদেশ ফুটবল সমর্থকদের।
ঢাকা/নাভিদ
.উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর ফ টবল ফ টবল
এছাড়াও পড়ুন:
মিয়ানমারে কেন এত বিধ্বংসী ভূমিকম্প
মিয়ানমারে গত কয়েক দশকের মধ্যে আঘাত হানা অন্যতম বিধ্বংসী ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলছে। রোববার দেশটির সামরিক জান্তা সরকার বলেছে, ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৭০০ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। আর আন্তর্জাতিক সংস্থা রেডক্রস বলেছে, সাত দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটিতে প্রতি ঘণ্টায় সহায়তার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মিয়ানমারে গত শুক্রবার দুপুরে আঘাত হানা ভয়াবহ এ ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছিল প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডেও। এছাড়া বাংলাদেশ, ভারত, কম্বোডিয়া ও চীন পর্যন্ত এর কম্পন অনুভূত হয়েছে।
তবে ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মিয়ানমারের প্রাচীন রাজধানী মান্দালয়ে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল সাগাইংয়ের কাছাকাছি ছিল বলেই মান্দালয়ে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে।
জাতিসংঘের ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন অনুসারে, ১৯৩০ সালে মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বাগো ভয়াবহ ভূমিকম্পের শিকার হয়েছিল। ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে ৫৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর পর থেকে দেশটিতে বেশ কয়েকবার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
যে কারণে ভূমিকম্পন হয়
পৃথিবী তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। এগুলো হলো কোর, ম্যান্টল ও ক্রাস্ট। পৃথিবীর কেন্দ্র হলো কোর। গলিত এই অংশের বেশিরভাগই ধাতব দিয়ে তৈরি। কোরের ওপরের উত্তপ্ত প্রায় কঠিন শিলার স্তর দিয়ে তৈরি ম্যান্টল। আর এর বাইরের বিশেষ আকৃতির ভূতত্ত্বকে বলা হয় ক্রাস্ট। এটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল টেকটনিক প্লেট দিয়ে গঠিত। পিচ্ছিল আবরণের ওপর বিভিন্ন গতিতে এবং বিভিন্ন দিকে এসব টেকটনিক প্লেটের চলাচলের কারণে শক্তি তৈরি করে। টেকটনিক প্লেটগুলো একটির ওপর থেকে আরেকটি সরে গেলে পুঞ্জীভূত শক্তি নির্গত হয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠে কম্পন অনুভূত হয়, যাকে আমরা ভূমিকম্প বলি। যখন এই শক্তি সমুদ্রের নিচে নির্গত হয়, তখন এটি একের পর এক দৈত্যাকার তরঙ্গ তৈরি করে, যাকে আমরা সুনামি বলে জানি।
ইউএসজিএসের ভূকম্পনবিদ উইল ইয়েকের মতে, ভূমিকম্পের মূল ধাক্কার কারণে পৃথিবীর চাপের যে পরিবর্তন হয়, তার কারণে আফটার শক বা পরাঘাত হয়।
কী আছে মিয়ানমারের ভূপৃষ্ঠের নিচে
দুটি টেকটোনিক প্লেট—ভারত ও ইউরেশিয়া প্লেটের মধ্যে মিয়ানমারের অবস্থান, যা দেশটিকে ভূমিকম্পের বিশেষ ঝুঁকিতে ফেলেছে।
এ দুটি প্লেটের মধ্যবর্তী সীমানাকে সাইগং ফল্ট বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা এটিকে মিয়ানমারের মান্দালয় ও ইয়াঙ্গুনের মতো শহরগুলোর মধ্য দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ একটি সরলরেখা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা লাখো মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
ইউএসজিএসের মতে, ভারত ও ইউরেশিয়া প্লেটের মধ্যে ঘর্ষণের কারণে মিয়ানমারে ভূমিকম্প হয়েছিল, যাকে ‘স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারের উদ্ধৃতি দিয়ে ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের টেকটোনিকস বিশেষজ্ঞ ড. রেবেকা বেল দুটি প্লেটের মধ্যবর্তী সীমানাকে ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত সান আন্দ্রেয়াস ফল্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই সান আন্দ্রেয়াস ফল্টের কারণে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের নর্থরিজে মারাত্মক ভূমিকম্প হয়েছিল।
ড. রেবেকা বেল বলেন, লম্বা ও সোজা প্রকৃতির ফল্টের অর্থ হলো ভূমিকম্প বৃহৎ এলাকাজুড়ে ফাটল তৈরি করতে পারে। আর ফল্টের ক্ষেত্র যত বড় হবে, ভূমিকম্পও তত বড় হবে।
ইউএসজিএস অনুমান করেছে, মিয়ানমারে প্রায় আট লাখ মানুষ ভয়াবহ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছেন। ফলে আগামী দিনগুলোতে মৃতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কতটা ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে
ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল তুলনামূলক কম, মাত্র ১০ কিলোমিটার (ছয় মাইল) গভীরতায়।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়্যাল হলোওয়ের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের ড. ইয়ান ওয়াটকিনসনকে উদ্ধৃত করে সায়েন্স মিডিয়া সেন্টার জানিয়েছে, অগভীর ভূমিকম্প অনেক বেশি ক্ষতি করতে পারে। কারণ, ‘গভীরতা থেকে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানো পর্যন্ত ভূমিকম্পের শক্তি খুব বেশি নষ্ট হয় না।’
ক্যালিফোর্নিয়া, জাপানসহ বিশ্বের সক্রিয় ফল্টলাইন বরাবর কিছু অঞ্চলে ভূমিকম্প সহনীয় বিল্ডিং কোড তৈরি করা হলেও শুক্রবারের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের অবকাঠামো অপেক্ষাকৃত কম ভূমিকম্প সহনীয় ছিল।
ওয়াটকিনসন বলেছেন, শুক্রবারের ভূমিকম্প ২০২৩ সালে দক্ষিণ তুরস্কে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো ক্ষয়ক্ষতি করতে পারত। বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের কারণে ওই ভূমিকম্পে অনেক ভবন ভেঙে পড়েছিল।
সূত্র: আল জাজিরা