‘সাপের বিষ’ নামাতে আ’লীগকে যা করতে হবে
Published: 27th, March 2025 GMT
গত ৭ জানুয়ারি দেশের বাইরে থেকে প্রচারিত একটি অনলাইন পোর্টালের টকশোতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমানকে বলতে শোনা গেছে, যে সাপে দংশন করেছে সে সাপই বিষ নামাবে। তাঁর কাছে উপস্থাপকের প্রশ্ন ছিল– আপনারা বলছেন, আপনাদের সভানেত্রী ও অন্য নেতারা অচিরেই দেশে ফিরবেন। কিন্তু জনগণ আপনাদের প্রতি বিরূপ বলে মনে হচ্ছে। এ প্রত্যাবর্তন কীভাবে সম্ভব? প্রশ্নটির জবাব দিতে গিয়েই আবদুর রহমান রূপকধর্মী এ কথা বলেন।
কথাটি শোনার পর সত্যি সত্যিই ছোটবেলায় দেখা বহু বাংলা সিনেমার সেই কমন দৃশ্যটি মনে পড়ে যায়– যেখানে বিষধর কোনো সাপের দংশনে নায়ক বা নায়িকার মৃত্যুবরণের পর সাপুড়ে এসে বীণ বাজাতে শুরু করে, সেই বীণ শুনে সাপটি ছুটে এসে মৃতের শরীরের যে অংশে সে দংশন করেছে, সেখানে মুখ লাগিয়ে বিষ তুলে নেয়। মৃত ব্যক্তিটি তখন প্রাণ ফিরে পায়।
বাস্তবে বীণের তালে সাপ নাচলেও, সেটা সে করে থাকে বীণের শব্দে মাটির কম্পন অনুভব করে; কস্মিনকালেও শব্দ শুনে নয়। কারণ শব্দ শোনার জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গই নেই সাপের। কোনো সাপ বিষ শুষে নেওয়ারও ক্ষমতা রাখে না। তাই সিনেমার এমন দৃশ্য ডাহা কাল্পনিক। আবদুর রহমানের কথায় স্পষ্ট– দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং অন্যতম বৃহৎ দলটির সাধারণ সমর্থকদের মতো শীর্ষ নেতারাও তাদের ভাগ্য এক প্রকার দৈবের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানটি ছিল মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের আলোচনাগুলো দেখলেও তা বোঝা যায়। সদ্য গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যের বিচারের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত দলটির বিচার দাবি করলেও, বিএনপি ও বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত দলগুলো বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, অপরাধ করেছে সরকার; দল নয়। কিন্তু এটাও সত্য– অতীতের সব সরকারের মতো বিগত সরকারও দল ও সরকারকে একাকার করে ফেলেছিল। ফলে সরকারের দায় এসে পড়ছে দলের ওপর। বাস্তবেও প্রতিপক্ষের হামলা-মামলা থেকে দলের নিরীহ নেতাকর্মী রেহাই পাচ্ছেন না। প্রবল প্রতিকূল এ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তাই সরকার তো বটেই, দলেরও পরিচিত নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে গেছেন। আট মাস আগেও যেখানে হাটে-মাঠে-ঘাটে ছিল আওয়ামী লীগের জয়জয়কার, সেখানে বর্তমানে দলটির উপস্থিতি শুধু সামাজিক মাধ্যমেই টের পাওয়া যায়।
আক্ষরিক অর্থেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে আছেন নানা দিকে। একটা কিছু উপলক্ষ পেলেই তারা প্রচার করতে থাকেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ফর্মুলা বের করতেই এসব হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাতে গত দেড় দশকে প্রবাসী অনেক ইউটিউবার সক্রিয় ছিলেন। ইদানীং তাদেরই অনুকরণ করে আওয়ামী লীগের অসহায় নেতাকর্মী-সমর্থককে ‘ভোক্তা’ বানিয়ে দেশের বাইরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ইউটিউবার দল।
একসময় যাদেরকে দমনপীড়নের পাশাপাশি তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মাধ্যমে দিনের শুরু ও শেষ করতেন, সেই বিএনপির দিকেও তাকিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তৃণমূল কর্মী-সমর্থক। বিএনপি নেতারা যখন জামায়াতে ইসলামীর ’৭১-এর গণবিরোধী ভূমিকা নিয়ে খোঁচা দেন; মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে দু-একটা ইতিবাচক কথা বলেন; আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক সামাজিক মাধ্যমে সেসব বক্তব্য ‘ভাইরাল’ করেন। এমনকি নাগরিক পার্টির সংবিধান বাতিল বা নতুন প্রজাতন্ত্র (দ্বিতীয় রিপাবলিক) ঘোষণা নিয়ে বিএনপি যখন আপত্তি তোলে, তখনও আওয়ামী লীগের লোকেরা এই বলে স্বস্তি প্রকাশ করেন– যাক, মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো রক্ষা পাচ্ছে।
অথচ ১৯৬২ সাল থেকে প্রায় একক ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে গোটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত করেছিল যে দলটি এবং তার মাধ্যমে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে জাতিকে এককভাবে প্রতিনিধিত্ব করার স্বীকৃতি অর্জন করেছিল যে দলটি, সেই আওয়ামী লীগের এত অসহায় হওয়ার কথা ছিল না। এমনকি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী চরম বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে দলটি যেভাবে প্রবল বিক্রমে রাজনীতির মাঠে ফিরে এসেছিল, তার সঙ্গেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর আজকের আচরণ মেলে না। ইতিহাস সাক্ষী, ’৭৫-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ নিজের শক্তিতেই চালিয়েছিল। তদুপরি সেই সংগ্রামে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আজকেও তিনি দলটির সর্বেসর্বা। তারপরও দলটি যেন সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিও হারিয়ে বসেছে।
আসলে আওয়ামী লীগ আজকে যে এক প্রকার পরের মুখে ঝাল খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে, তার পক্ষে অন্তত অদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত ভিন্ন কিছু করার সুযোগ নেই। যখন দলটি দেশ শাসনের নামে দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়েছে, তখনই ধীরে ধীরে এ রোগ তাকে আক্রমণ করছিল। বরাবর দেখা গেছে, একটি জনভিত্তির দল যখন ক্ষমতায় যায় তখন রাষ্ট্রীয় কাজেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ওপর পুরো নির্ভর করে না। অথচ বিগত সময়ে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব পর্যন্ত ঠিক করেছে! সরকার ও দলে সমালোচনা ঠেকাতেও তাদের প্রধান ভরসা হয়ে পড়েছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনী। বস্তুত যেদিন দলটি এই অরাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করে, সেদিন থেকেই সে বিরাজনীতিকীকরণের শিকারে পরিণত হয়। ২০১৩ সালে এবং পরবর্তী সময়ে গণজাগরণ মঞ্চের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতারা নিছক ক্ষমতায় টিকে থাকতে যত কাণ্ড করেছেন, সেগুলোই তো যথেষ্ট একটা জনপ্রিয় দলকে শুধু জনগণ নয়, তার নিবিড় সমর্থকগোষ্ঠী থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দিতে। আমরা দেখেছি, এ প্রক্রিয়ায় একদিকে দলের ত্যাগী ও আদর্শনিষ্ঠ নেতাকর্মী কোণঠাসা হয়েছেন, আরেকদিকে ঝাঁকে ঝাঁকে সুবিধাবাদী সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে।
খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটির দরকার নেই। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের একটি বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। গত ১৫ মার্চ শাহবাগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘ছাত্রলীগের বিদ্রোহী বা বিপ্লবী অংশটি বিদ্রোহ করেছে। তারা যদি না বের হতো, তাহলে আন্দোলন অনেক কঠিন হতো’ (বাংলা ট্রিবিউন, ১৬ মার্চ, ২০২৫)। এই ‘বিদ্রোহী বা বিপ্লবী’ ছাত্রনেতারা ছাত্রলীগে জায়গা পেল কীভাবে? তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে– এ কথাটা বহু চর্চিত হলেও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কাছে নিশ্চয় তার গুরুত্ব ছিল না।
নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ বটগাছ। মহিরুহের মতো তার শিকড় সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। এটাও সত্য, ৫ আগস্ট ঝড়ে দলের কাঠামো গুঁড়িয়ে গেলেও তার কোটি কোটি কর্মী-সমর্থক আছে। তাদেরই কেউ কেউ প্রবল প্রতিকূলতা ঠেলে মাঝে মাঝে এখানে-সেখানে মিছিল-মিটিং করেন। কিন্তু দলটিকে যদি সত্যিই সাপের বিষ নামাতে হয়, তাহলে তাকে প্রথমে বাস্তবতায় ফিরতে হবে। এ জন্য দরকার আত্মসমীক্ষা এবং তার ভিত্তিতে দলকে ঢেলে সাজানো।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
.উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: র জন ত ন ত কর ম সরক র র র রহম ন র জন ত দলট র ক ষমত ব এনপ আওয় ম
এছাড়াও পড়ুন:
কোন ভাষার মানুষ কীভাবে ‘ঈদের শুভেচ্ছা’ জানান
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর এসেছে ঈদুল ফিতর। পবিত্র রমজান মাস শেষে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে বিশ্বজুড়ে ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি এই ঈদ।
বিশ্বজুড়ে ১৯০ কোটি মুসলিম ঈদ উৎসব উদ্যাপন করেন, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ।
সৌদি আরবে আজ রোববার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশে রোববার শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হবে।
ঈদের দিন মুসলিমরা ঈদের নামাজ পড়েন এবং পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘ঈদ মোবারক’। আবার ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে ‘ঈদ সা’ইদ’ (খুশির ঈদ) শব্দযুগলও ব্যবহার করা হয়।
তবে দেশে দেশে বিভিন্ন ভাষায় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে আরও বেশ কিছু শব্দের ব্যবহার হয়।
নিচে ১৩টি ভিন্ন ভাষায় যেভাবে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়, তা তুলে ধরা হলো—
আরবি ভাষায় ‘ইঈদ মোবারক’
অসমিয়া ভাষায় ‘ঈদ মোবারক’
বাংলা ভাষায় ‘ঈদ মোবারক’
বসনীয় ভাষায় ‘বাইরাম শরিফ মোবারক অলসুন’
ইংরেজি ভাষায় ‘ঈদ মুবারাক’
ফারসি ভাষায় ‘ঈদে খোদাসেফেরৎ মোবারক বসারা’
ফরাসি ভাষায় ‘জে ভ্যু সুইত আঁ জইউস এইদ’
হিন্দি ভাষায় ‘ঈদ মুবারক’
বাহাসা মালয়েশিয়া ‘সালামত হারি রায়া আইদিল ফিতর’
মান্দারিন ভাষায় ‘কাই জা জেয়া কোয়া গোয়া’
পশতু ভাষায় ‘আখতারদে মোবারকশাহ’
তুর্কি ভাষায় ‘ই বারামোর’
উর্দু ভাষায় ‘ঈদ মোবারক’