কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে জাসদের নেতারা বলেছেন, ৫৪ বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানপন্থীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে। তারা স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের নাম-নিশানা-ইতিহাস-স্মারক চিহ্ন মুছে ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মীমাংসিত বিষয়গুলো বিতর্কিত ও অস্বীকার করছে।

বুধবার সকালে মহান স্বাধীনতা দিবসে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) নেতারা সাংবাদিকদের এ কথাগুলো বলেন। পরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটি, শ্রমিক জোট, জাতীয় যুব জোট ও ছাত্রলীগ নেতারা সাভারে শহীদবেদিতে ফুল দিয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এ সময় তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারী, পুরুষ, শিশুসহ ও স্বজনহারাদের সমবেদনা জানাতে ১ মিনিট নীরবতা পালন করেন।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জাসদের নেতারা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অর্থাৎ গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিতে পরিচালিত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ আরও বেশি অগ্রগতি-উন্নয়ন-সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারত। দেশের সাধারণ মানুষের মানবিক জীবনমান আরও বহুগুণ উন্নত হতো, কিন্তু আজ জাতির দুর্ভাগ্য। ৫৪ বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানপন্থীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত করার জন্য সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানান জাসদের নেতারা।

মুক্তিযুদ্ধের গণশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা কর্মসূচিতে জাসদের সহসভাপতি শফি উদ্দিন মোল্লা, জনসংযোগ সম্পাদক শরিফুল কবির, সহসম্পাদক আলী হাসান, দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, জাতীয় শ্রমিক জোটের সাংগঠনিক সম্পাদক কনক বর্মণ, ঢাকা জেলা জাসদের সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তম দাস, জাতীয় যুব জোটের সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

.

উৎস: Prothomalo

এছাড়াও পড়ুন:

রীত-রসমের আখাড়া

রাজধানী ঢাকার বিশেষ এক অংশ পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য এর বিশেষ রীতি-রেওয়াজ। দিনে দিনে এসবে কিছু পরিবর্তন হয়তো এসেছে। কিন্তু ঐতিহ্যকে এখনও আঁকড়ে ধরে আছে এখানকার মানুষ। পুরান ঢাকার রোজা পালন, চানরাত এবং ঈদ নিয়ে সমকালের পাঠকের জন্য ঢাকাইয়া ভাষায় বিশেষ লেখা

ঢাকাইয়া সমাজ নানান কিসিমের রীত-রেওয়াজের আখাড়া। ঐ রহম ঢাকাইয়া গো মাইয়া বিয়া দেওনের বাদে পয়লা ঈদে বহুত রীত-রেওয়াজের নহর ব‌এয়া যায়। রোজা থেকা লিয়া চান রাইত, জামাইয়ের আপনা এ্যাগানা সবতেরে ঈদের দাওয়াত দেওন লাগবোই। দুই দিক থেকাই চলতো রীত-রেওয়াজের নহর, মাগার বিয়ার বাদে করন-ধরন বেশির ভাগ একতরফা। দাঁড়িপাল্লার ভার বেশি মাইয়ার বাপের কান্ধে দিয়া যাইতো। এই রীত-রেওয়াজের খাই রহিস গরিব কার আওকাত কিমুন, ঐটা তলায়া দ্যাখনের জরুরত কেউ মনে করে না। মরো আর বাঁচো, রীত-রেওয়াজ নিভান লাগবো যেম্বেই পারো। নাইলে থাকে না নয়া সম্দিআনায়। নাইলে নয়া খেসি টিকবো কেম্বে। মাইয়ার বাপের বাড়ি বইলা কথা।
বিয়ার বাদে পয়লা রোজা বিয়ার বাদে মাইয়া পয়লা রোজা বাপের বাড়িতে করে।
রোজা আহনের লগে লগে মাইয়ার বাপের একদিকে নিগা থাকে, পয়লা জামাইরে ঘি-মুরগি পাঠান লাগবো, মাগার নামেই ঘি-মুরগি। ঐটার লগে তরে তরে কতো কিছু দেওন লাগবোযার, যার আওকাত মথন। ঘি এক কেজি থেকা লিয়া এক কাতি। মুরগি দুই হালি থেকা এক খাঁচি। ক্যালা দুই-চাইর ডরজন থেকা লিয়া এক ঘৌর। লগে আমের মোরব্বা, কুমড়ার মোরব্বা, দুধ, মলাই, চিনি, খোরমা খাজুর, পেস্তাবাদাম থেকা লিয়া তরে তরে হুকনা ফল। ঘি, মুরগির লগে জামাইয়ের ঈদের কাপড়লত্তা কিননের লেগা নগদ ট্যাকা পাঠায়া দিবো হৌড়ে জামাইবাড়িতে। আবার কেউ কেউ স্যুটের পাঁচ কাপড় বি পাঠায়, স্যুটের সিলাইয়ের ট্যাকা সুদ্দা। 

আবার পাঠাও রোজা খোলাই
ভাজাপোড়া কয়েক কেজি থেকা  মনে যায়া ঠেকবো। ফল ফলারি বেলাতি ফল পেটি পেটি, দেশি ফল চাঙ্গাড়ি ভরা। নানান পদের শরবত কয়েক গেলান। পোলাও-বিরানি, কাচ্চি, মোরগ-পোলাও পাঁচ-দশ কেজির বোল বা ছোট ড্যাগ  ভ‌ইরা। আধোনা যাইবো, যার আওকাত আছে ওই তিন-চাইর কিসিমের পোলাও বি পাঠাইবো আধোনা ভইরা। যার আওকাত নাই ওই বোল বা ছোট ড্যাগ ভ‌ইরা পাঠাইবো এক পদের বিরানি। পারাটা, রুটির থাক থাকবোই। মুরগির রোস্ট একশ থেকা পাঁচ পিস বি অইতে পারে আওকাত মথন। খাস্সি ভুনা থেকা খাস্সির রান ভুনা, লগে হাঁস-কোয়েল যতো কিসিমের ভুনা আছে, নানান কিসিমের কোয়াব গোশত থেকা লিয়া মাছের কোয়াব তক ঠেকবো। গরু, খাস্সি, মুরগির রেজালা, পিঠা-পুলি, পায়েস একশ থেকা লিয়া যতো যাইবার পারে। আন্ডাআলা মাছ, গোশতের কোর্মা। ভিগা রুটি, শাহি টুকরা– কী না থাকে ঐ রোজা খোলাইয়ে। চকবাজারের থেকা লিয়া বাড়িতে বাওরচি দিয়া এইসব রোজা খোলাই তৈয়ার অহে। ঢাকাইয়ার এই রোজা খোলাইয়ে যে ট্যাকা খরচা অহে, ঐ ট্যাকা দিয়া একটা বিয়ার খরচা চইলা যাইবো। এ্যরবাদে তো আছেই দুই পক্ষের বাড়িতে রোজা খালাইয়ের দাওয়াত।

ঈদি
বিশ রোজার বাদে নয়া ব‌উয়ের বাপের বাড়িতে পোলার বাড়ি থেকা ঈদি যাইবো। মাইয়ার কাপড়লত্তা বিলাসিতা তো আছেই, ঐটার লগে হালা-হালি, ময়-মুরব্বি সবতের লেগা ঈদের কাপড়লত্তা আর বিলাসিতা যাইবো মাইয়ার বাড়িতে। লগে ব‌উয়ের ঈদের সালামি বি পাঠায়া দিতো মুরব্বি গো তরফ থেকা। ঐসমে মাইয়ার কাপড়লত্তার লগে সেওই, ঘি, মুরগি পোলাওয়ের চাইল, চিনি, নাইরল– এইসব যাইবো যার যিমুন আওকাত মথন। মাইয়ার বাপের বাড়ি থেকা পোলার ভাই-ব‌ইন, মা-বাপ ময়-মুরুব্বি 
সবতের ঈদের কাপড়লত্তা যাইবো গা। ঈদের সালামি থেকা লিয়া কাপড়লত্তা সবকিছুই ঢাকাইয়ারা ঈদি কয়।

চান রাইত 
ঈদের চান উঠনের সাইরেন বাইজা কাইলকা ঈদের এলান অহনের লগে লগে নয়া জামাই হৌড় বাড়িতে যাইবো ঐ বাড়ির ময়-মুরব্বি গো সালাম করবার আর জামাই সালাম করনের লগে লগে হৌড় বাড়ির সব ময়-মুরব্বি জামাইরে নগদ ট্যাকা সালামি দিবো।

ঈদের দিন 
ঈদের জামাতের বাদে জামাই হৌড় বাড়িতে যাইবো খানাপিনা করবো। তামাম দিন ভর ঐখানে থাকবো। হালা-হালি ছোট গো সালামি দিবো। আর বিয়াল অইলে আপনা  হালা-হালি থেকা লিয়া চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফোবাতো সব হালা-হালি লিয়া চকবাজারের মেলায় যাইবো নয়া দুলাভাই। ঐসমে হালা-হালি নয়া দুলাভাইয়ের জেব খালি ক‌ইরা এক্কেরে ফতুর ক‌ইরা ফালায়। ঈদের দিন মাইয়া গো বাড়ি থেকা জামাই বাড়িতে বাওরচি দিয়া আবার পোলাও, কোর্মা, কালিয়া, রেজালা, রোস্ট, মুরগি মোসাল্লাম, কোপ্তাকারি, চাপ, কোয়াব নানান পদের সেওই, জর্দা যে যতো পারে নিজের আওকাত দ্যাখায়। ঈদের বাদে কয়েক দিন দাওয়াত পানি দেওন লাগে নয়া জামাইয়ের বাড়ির সবতেরে।
এইসব রীত-রসম নিবাইবার যায়া যার আওকাত আছে অর খালি ট্যাকা খোঁচায় আর ঐটার ঝনঝনানির ঠ্যালায় এইসব ডালা পরবিতে যতো পারে খরচা করে; মাগার যার আওকাত নাই, ওই করজ-ধার করে নাইলে হাত পাইতা অইলে বি রেওয়াজ পালন করে।
অহন এইসব বহুত ক‌ইমা গেছে। বহুত পোলা-মাইয়া অগো মুরব্বি গো বাধা দ্যায় এইসব রীত-রসম বাদ দিবার। অহন সবতে শিক্ষিত অইছে। বেফাজুল খরচাপাতি ক‌ইবার চায় না। মাগার ঢাকাইয়া রীত-রেওয়াজে সব সময় শাহি ভাব বজায় থাকে।
আখতার জাহান: ঢাকাইয়া ভাষার লেখক

সম্পর্কিত নিবন্ধ