ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তিন ঘণ্টা ছিল ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তি
Published: 26th, March 2025 GMT
ছবি: প্রথম আলো
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
শ্রমজীবী নারীর ঈদ
ঈদ মানে আনন্দ উদযাপন। বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। নতুন কাপড়, মুখরোচক খাবারের আয়োজন। তবে সবার জীবনের গল্পটা একই রকম নয়। এ সমাজে যেখানে আমরা সীমাহীন বৈভব দেখতে পাই, তেমনি অনেকে জীবনকে যাপন করতে পারেন না। প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রাম করে যান। সেই শ্রমজীবী মানুষের মুখে ঈদের সময়েও নেই হাসি, আছে শুধু হতাশা আর ভবিষ্যতের চিন্তা। শ্রমজীবী নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন। তাদের মাথায় থাকে কীভাবে দিন পার করবেন। ঈদের সময় কীভাবে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটাবেন– সেই গুরুদায়িত্বও থাকে তাদের কাঁধে। কয়েকজন কর্মজীবী নারীর কথা তুলে ধরা হলো–
পেশায় গৃহকর্মী সালমা আক্তার বলেন, ‘বাসাবাড়িতে তো কাম করি খুব ডর নিয়া। তিন কুল পড়ে তারপর সব বাসায় কামে ঢুকি। বাসার আপাগুলি ভালো হইলেও, কিছু কিছু পুরুষ মানুষের জ্বালায় বাসার কাম ছাড়তেও হয়। তবুও পেটের দায়ে কাম করতে হয়। ঘরে মায়ের শরীর খারাপ, আমি ছাড়া আর কেউ নাই। আমি পড়ালেহাও করি নাই। গ্রামে ব্র্যাক স্কুলে কয়েকদিন গেছিলাম। তারপর বাপ মরার পর মায় ঢাকায় নিয়া আসে। মায়ের শরীরও খারাপ এই বাসাবাড়িতে কাজ কইরা। আমাদের তো কোনো সংগঠনও নাই। একলগে অনেক লোক নাই, নিয়ম নাই কোনো কিছুর। বেতন দেয় যত, কাম করায়ে নেয় তার তিনগুণ। কয়েক বাসায় লিফট থাকে আবার কয়েক বাসায় সিঁড়ি ভাইঙ্গা ওঠার পর জান না চললেও কামে লাগতে হয়। খুব কান্দন আসে মাঝে মাঝে। কারণ কিছু বাসায় কুত্তার মতন আচরণ করে। আমরাও যে একটা মানুষ বুঝবার চায় না। আবার অনেক বাসার আপা, সাহেবরা ভালো– কিছুটা হইলেও বুঝে। ঈদের দিনেও বাসাবাড়ির কাজে মাফ নাই। সেইদিন কিছু বকশিশ দেয়। আবার ভালো খাবার দিবে। আশা আছে, মায়ের একটা কাপড় কিনমু।’
প্রায় প্রতি ঈদের সময় তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-বোনাসের দাবিতে আন্দোলনে নামতে দেখা যায়। বকেয়া বেতন-বোনাস ও অন্যান্য পাওনার দাবিতে শনিবার (২৯ মার্চ) ষষ্ঠ দিনের মতো শ্রম ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন টিএনজেড গ্রুপের অ্যাপারেল প্লাস ইকো, টি অ্যান্ড জেড অ্যাপারেলস ও অ্যাপারেল আর্ট কারখানার শ্রমিকরা। পাশাপাশি স্টাইল ক্রাফট ও ইয়াং ওয়ান্স কারখানার শ্রমিকরাও ক্ষতিপূরণের দাবিতে অবস্থান করেন। শ্রমিকরা জানান, পাওনা বেতন-বোনাস না পেলে তারা ঈদের দিনও ভুখা থেকে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। আন্দোলনরত শ্রমিকদের একজন ফাতেমা বলেন, ‘আমরা কী অপরাধ করসি; আমাদের পুলিশ গুতায় ক্যান? বাথরুমটা পর্যন্ত বন্ধ করে রাখসে। আমাদের কি পরিজন নাই; আমাদের ঈদ নাই? আমার বাচ্চাটা একটা জামা চাইসে; তারে কী জবাব দিমু?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো খয়রাত চাইতেসি না। আমরা আমাদের পাওনা চাইতেসি।’
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড়ে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সুরাইয়া। তিনি জানান, একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। গত মাসে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর স্বামী আমিনবাজারে অন্য একটি কারখানায় কাজ নিয়েছেন। সুরাইয়া কাজ খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের তিন মাসের বেতন বাকি রাইখ্যা কারখানা বন্ধ কইরা দিসে। এবার ঈদে দেশের বাড়িত যামু না। বাচ্চাডারেও একটা নতুন কাপড় দিতে পারুম না। এইটাই কষ্ট।’
আমেনা বেগমের বাড়ি লালমনিরহাটে। রংপুরে চাতাল শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘ঈদ আসলে মাথায় অনেক চিন্তা আসে। নতুন শাড়ি কবে থেইকা কিনি না, মনেও নাই। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের কিছু তো দেওন লাগবে। এই দিনটাত একটু ভালো-মন্দ খামু ছেলেপুলে লইয়া। তার জন্যে তো টাকার দরকার। এ জন্যই কষ্ট কইরা কাজ করতাছি।’
রোজিনা রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় ইটভাঙার কাজ করেন; আবার রাস্তার ধারে খুচরা সবজিও বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ‘আমার দুইডা পোলা। একটা ৪ বছরের, আরেকটা ৯ বছরের। জামাই গ্যাছে গা থুইয়া ছুডু পোলা হওনের পর। টেকা চাইতো, দিতাম না– হের লাইগ্যা। কেলাস ফাইভ তুরি পড়ছি আমি। আর পড়বার পারি নাই টেহার লাইগ্যা। কিন্তু ছুডুবেল্লাত্তেই পড়তে ভালা লাগত আমার। হেই ভালা লাগা পোলা দুইডারে দিয়া পূরণ করমু আমি। এহন শইল্লে শক্তি আছে, তাই ইট ভাঙি, রাইতে রুডি বানায়ে বেচি, এই কামগুলান না থাকলে শাক-পাতা বেচি। পোলাগুলিরে পড়ামু– এডা ভাবলে আর কষ্ট লাগে না শইল্লে। আমারে এক আপা মেডিকেলের লাই টেকা দিছিলো, ওডা দিয়া বড় পোলাডারে ইসকুলের জামা বানায়ে দিছি। ঈদে ভালা-মন্দ কিছু খামু। পোলা দুইডারে কিছু কিন্যা দিমু। চেরেস্টা করি, বেশি টেকা কামানোর। কিন্তু বেডা মানুষরা আমগোর বেডিগোর আগোইতে দিবার চায় না। পিছে রাখবার চায়। হের লাইগা বেশি টেকা আয় করবার পাবি না কুনুখানেই। এইডাই কষ্ট আমার। হেও গতর খাটায়া, ঘাম ফালায়া রুজগার করে, আমিও করি– তাইলে আমগোরে কম দিবো কেন?হেয় মানুষ, আমি মানুষ না?’
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙামাটিয়া গ্রামে হলুদ শ্রমিক পাঁচ সন্তানের জননী সুন্দরী বেগম। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা সুন্দরীর কম বয়সেই বিয়ে হয় পাশের গ্রামের দিনমজুর আব্বাসউদ্দীনের সঙ্গে। স্বামী এখন অসুস্থ। সন্তানদের ভরণপোষণের ভার এখন সুন্দরীর কাঁধে। তিনি জানান, ‘সারাদিন হলুদ উডায়া আড়াইশ টাকা পাই। ব্যাডারা পায় ৬০০ টাকা।’ শ্রমের হাটে মজুরির এই বৈষম্য শুধু সুন্দরী বেগমের নয়, তাঁর সঙ্গে কাজ করা হাজারো নারী শ্রমিকের।
নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য নিয়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন হক বলেন, ‘একটি সমাজে যখন নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান, তাকে একটি অসুস্থ সমাজব্যবস্থা বলা যায়। একটি সমাজে নারী-পুরুষের যে বৈষম্য, তার মূলে রয়েছে অশিক্ষা ও নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজে একজন পুরুষের আয়কে মুখ্য বলে ধরা হয়, নারীর আয় সবসময়ই সেখানে গৌণ বিবেচিত হয়। এ জন্য নারীর মজুরির ক্ষেত্রে আমরা বৈষম্য দেখতে পাই।’
এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘মজুরি বৈষম্য হলো, ওই নারী শ্রমিকদের সামগ্রিক যে বৈষম্য– সামাজিক, মতাদর্শিক, কাঠামোগত তারই বহিঃপ্রকাশ। এটিই প্রধান দিক নয়– সামাজিকভাবে মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, নিরাপত্তাহীনতা এত বেশি থাকে যে তাদের একটা নাজুক অবস্থায় থাকতে হয়। নারীর প্রতি পুরুষের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে যে পুরুষতান্ত্রিকতা আছে– এসব মিলেই চাপটা তৈরি হয়।’