প্রায় ৩ হাজার বছর আগে থেকেই বাংলায় পাটের চাষ শুরু হয়েছিল। তখন গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে পাট চাষ হত। উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়ায় এবং গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের দোআঁশ মাটিতে ভালো ফলন হয় এই আঁশ জাতীয় উদ্ভিদের। আর সে অনুযায়ী পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গেই পৃথিবীর সিংহভাগ পাট উৎপাদিত হয়ে থাকে। এছাড়াও চীন, ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডসহ বেশকিছু অঞ্চলে পাটের চাষ হয়।
চৈত্র-বৈশাখ মাসে পাট বোনা শুরু হয়। বীজ থেকে চারা আসতে সময় লাগে ৩-৫ দিন। শাক খাওয়ার উপযোগী হয় ১৫-১৬ দিনে। পাট গাছ পরিণত হতে সময় লাগে সাড়ে ৩ মাস থেকে ৪ মাস। কাটা পাট পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় ২২-২৫ দিন। পঁচানোর পর আঁশ পাটকাঠি থেকে আলাদা করে রোদে শুকাতে হয়। পাটের রঙ সাদাটে বা হালকা লালচে হলে ভালো দাম পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমিতে ৫-৭ মণ পাটের উৎপাদন হয়।
পাটকে বাগানের এক প্রকার উদ্ভিদ বলে গণ্য করা হত। যার পাতা সবজি এবং ঔষুধ রূপে ব্যবহৃত হতো। যদিও এখনো হয়। পাট পাতা বা শাক খুব সুস্বাদু খাবার। আর এর ঔষধি গুণ তো রয়েছেই। তবে বর্তমানে পাটের চাষ করা হয় মূলত এর তন্তুর জন্য।
পাট এক প্রকার দ্বিবীজপত্রী আঁশযুক্ত গাছ। এর ছাল বা বাকল থেকেই আসে সোনালি আঁশ এবং ভেতরের শক্ত অংশটি কাঠি। প্রাচীন কালে এই কাঠিকে বলা হতো নালিতা। কোন কোন অঞ্চলে একে নল, নলখাগড়া টাঙ্গি বা টাঙ্গা বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে পাটকাঠি রূপার কাঠিতে পরিণত হয়েছে।
উষ্ণ আবহাওয়া এবং মৌসুমী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে বাংলাদেশে পাটের ফলন সব থেকে বেশি হয়। এমনকি এই আবহাওয়ার কারণেই বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতের পাট উৎপন্ন হয়। মূলত বছরে একবার পাট চাষ হয়।
পাললিক বেলে দোআঁশ, এঁটেল দোআঁশ, নদীর অববাহিকার মাটিতে পাট ভালো জন্মে, যার পিএইচ পরিসীমা ৪.
পাট চাষের জন্য অনুকূল পরিবেশ হলো ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা। ৭০-৯০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং বপনের সময় পাটের জন্য বার্ষিক ১৬০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। খুব উঁচু নয় আবার নিচু নয়, অর্থাৎ বৃষ্টির পানি যেখানে খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না এমন জমিতে পাট চাষ করা ভালো।
বাংলাদেশে ময়মনসিংহ, রংপুর, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া অঞ্চলে পাটের চাষ ভালো হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায়ও পাট চাষ করা হয়।
পাটের ইংরেজি শব্দ ‘জুট’ (Jute)। কিন্তু জুট শব্দটি কোন ভাষা থেকে এসেছে তা সুনির্দিষ্ট ভাবে জানা যায়নি। তবে অনেকের মতে উরিয়্যা শব্দ ‘ঝুট’ বা সংস্কৃত শব্দ জট থেকে ইংরেজি জুট শব্দের উৎপত্তি।
বাংলাদেশে বিভিন্ন জাত মিলিয়ে শ’খানেক জাতের পাট পাওয়া যায়। আগেকার সময়ে পাটের আলাদা কোন শ্রেণি বিভাগ ছিল না, কিন্তু বিভিন্ন নামে ডাকা হত। তন্মধ্যে ধলসুন্দর, বাউ, বিদ্যাসুন্দর, কেউত্রা, পাইধা, কাজলা, কাটাইওবা উল্লেখযোগ্য। তবে বাণিজ্যের উদ্দ্যেশে দুই প্রকারের পাট বেশি ব্যবহৃত হয়। সেগুলো হলো- সাদা পাট বা তিতা পাট, যা বৈজ্ঞানিক নাম করকোরাস ক্যাপসালারিস এবং তোষা পাট বা মিঠা পাট, যার বৈজ্ঞানিক নাম করকোরাস ওলিটোরিয়াস। এছাড়া মেস্তা নামের পাটও জনপ্রিয়, যার বৈজ্ঞানিক নাম হিবিসকাস ক্যানাবিনাস।
তবে যেসব দেশে পাটের চাষ হয় না, সেখানে পাটের বিকল্প হিসেবে কেনাফ নামের এক প্রকার উদ্ভিদের আঁশ ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশেও কিছু এলাকার মাটিতে এই কেনাফ চাষ করা হয়। পাটের মানের ভিত্তিতে কেনাফকে নিম্ন মানের পাট ধরা হয়। বাংলাদেশে একটা সময় সবথেকে বেশি চাষ হতো সাদা পাট যদিও বর্তমানে তোষা পাট বেশি চাষ করা হয়।
সাদা পাটের আদি আবাস বা উৎপত্তি স্থল হলো চীন, তোষা পাটের আদি নিবাস মিসর, মেস্তার আদি নিবাস হলো ভারত এবং কেনাফ এর উৎপত্তি স্থল চীন ও থাইল্যান্ড। বিভিন্ন ধরনের পাটের উৎপত্তি বা আদি নিবাস যে দেশই হোক না কেন বাংলাদেশের থেকে ভালো ভালো মানের পাট আর কোন দেশে উৎপাদন হয় না। এ বছরও বাংলাদেশ ভালো মানের পাট উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার বা অঞ্চলের আবহাওয়া, মাটি, পানি একেক রকম। যার জন্য পাটের আঁশের গুণাগুণ ভিন্ন হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ার এই ভিন্নতার জন্য পাটের আঁশের মানের তারতম্যের ভিত্তিতে পাটকে অঞ্চলভিত্তিক পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
এর মধ্যে বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল জেলায় উৎপাদিত পাট কে জাত পাট বলা হয়। এ অঞ্চলে উৎপাদিত সাদা ও তোষা পাটের আঁশ খুবই শক্ত। জাত পাট অন্য সকল পাটের থেকে উজ্জ্বল হয়ে থাকে এবং এ অঞ্চলের পাটের তৈলাক্ততা বেশি।
বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় উৎপাদিত পাট মূলত হার্ড ডিস্ট্রিক্ট পাটের অন্তর্গত। হার্ড ডিস্ট্রিক্ট পাট জাত পাটের মতো একই শক্তি সম্পন্ন। তবে জাত পাটের তুলনায় কিছুটা কম সুক্ষ্ম। হার্ড ডিস্ট্রিক্ট অঞ্চলে তোষা পাট বেশি হয়। পাটের উজ্জ্বলতা ও তৈলাক্ততা অধিক হয়। এ অঞ্চলের তোষা পাটের রং উজ্জ্বল কাঁচা সোনা বর্ণের।
বৃহত্তর পাবনা জেলায় উৎপাদিত পাটকে ডিস্ট্রিক্ট পাট বলা হয়। তবে ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম পাড় অঞ্চলে উৎপাদিত পাট ডিস্ট্রিক্ট পাটের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও নোয়াখালী, সিলেট, পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত পাটকে ডিস্ট্রিক্ট পাট হিসেবেই ধরা হয়। এ অঞ্চলের পাটের আঁশ কিছুটা মোটা হয়। উজ্জ্বলতা এবং তৈলাক্ততাও কিছুটা কম। তবে পাটের আঁশের শক্তি জাত পাটের মতোই। এ জাতের সাদা পাটের রঙ সাদাটে এবং তোষা পাটের রঙ বাদামী বা ফ্যাকাশে লাল হয়।
এছাড়া বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, বরিশাল, খুলনা অঞ্চলে উৎপাদিত পাটকে বলা হয় সফট ডিস্ট্রিক্ট পাট। পাটের আঁশ অপেক্ষাকৃত মোটা, তবে নরম। পাটের আঁশের উজ্জ্বলতা ও তৈলাক্ততা তুলনামূলকভাবে কম। বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া অঞ্চলের পাটগুলো নর্দান পাটের অন্তর্গত। তবে একই এলাকার কিছু স্থানে ভিন্নধর্মী কিছু পাট উৎপাদন হয়। এ জাতের পাটও অপেক্ষাকৃত মোটা। উজ্জলতা ও তৈলাক্ততাও কম।
পাট বাংলাদেশের বহুমুখী পণ্য তৈরির প্রধান কাঁচামাল। প্যাকেজিং শিল্পে ব্যবহার্য অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ আঁশ হলো পাট। বাংলাদেশের ১৯টি পণ্যের প্যাকেজিং মোড়কের জন্য পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে পাট এখন প্যাকেজিংয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পাট থেকে নতুন নতুন ফেব্রিক্স তৈরি হচ্ছে এবং তা পরিধানের যোগ্যও।
পাট থেকে নতুন নতুন পণ্য তৈরির গবেষণা চলছে বহু আগে থেকেই। এরই ধারাবাহিকতায় পাট থেকে তৈরি হয়েছে রেসিং কার, শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক, বায়োপলি, ঢেউটিন এবং জুটেক্স নামক এক প্রকার ফেব্রিক্স, যা বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও গবেষণার ফলে নিত্য নতুন পণ্য পাচ্ছি আমরা।
২০২৩–২০২৪ অর্থবছরে বিজেএমএ ও বিজেএসএ এর তথ্য মতে (জুলাই/২০২৩- ফেব্রুয়ারি/২০২৪) বাংলাদেশে মোট উৎপাদিত পাটজাত পণ্যের পরিমাণ ৩.৪৪ লাখ মেট্রিক টন। মোট রপ্তানির পরিমাণ ১.০৩ লাখ মেট্রিক টন। মোট রপ্তানি আয় ৯৬.২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমাণ ১০৫৮.৯৮ কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে পাট উৎপাদন ১৮ শতাংশ কমে ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার বেলে নেমেছে।
পাটশিল্পের গবেষণা, ইনোভেশন তথা সার্বিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়, জেডিপিসি, বিজেএমসি একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতি বছর ৬ মার্চ জাতীয় পাটদিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় ও জেডিপিসির যৌথ উদ্যোগে পাট পণ্য প্রদর্শনী ও মেলার আয়োজন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছরও জাতীয় পাট মেলার আয়োজন করা হয়েছে জেডিপিসি প্রাঙ্গণে। আগামী ১০ মার্চ পর্যন্ত চলবে এ মেলা।
বাংলার পাটের অতীত সুনাম যেমন রয়েছে, তেমনি পাট শিল্পের ভবিষ্যতও উজ্জ্বল। মাঝে কয়েক দশক পাটের উত্থান-পতন দেখেছে বিশ্ববাসী। তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন নতুন ইনোভেশন, ফিউশনের মাধ্যমে পাটশিল্পে নতুনত্ব নিয়ে এসেছে, যা বিশ্ববাজারেও সমাদৃত হচ্ছে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, বাংলাদেশ আবারও সোনালী আঁশের ও রুপার কাঠি খ্যাত পাট নিয়ে বিশ্বে মাথাউঁচু করে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশে পাটশিল্পের সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাও রয়েছে। সব সমস্যাকে ছাপিয়ে পাট শিল্পের সোনালী সুদিন ফিরে আসবে, জাতীয় পাট দিবসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
(লেখক: উদ্যোক্তা, ওনার ও ডিজাইনার, জুট হ্যাভেন)
ঢাকা/মেহেদী
উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর উৎপ দ ত প ট প ট উৎপ দ ত ল ক তত ব যবহ র উৎপত ত চ ষ কর র জন য র উৎপ
এছাড়াও পড়ুন:
ঋণের দায় ও ঝুঁকি কমানোর কৌশল খুঁজছে সরকার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে সরকারের ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঝুঁকি কমানো এবং ব্যয় সাশ্রয়ে বিদ্যমান নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল নির্ধারণে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের প্রচ্ছন্ন দায় ও এর প্রভাব এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণে সুপারিশ করবে। এ ছাড়া এ সংক্রান্ত আরও একটি কমিটির আওতা ও কার্যপরিধি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সরকারের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় কারিগরি দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদানে সম্প্রতি ১৩ সদস্যের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কারিগরি কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগের ঋণ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিবকে এ কমিটির সভাপতি এবং একই শাখার উপসচিবকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, সরকারের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয়ী পদ্ধতি নির্ধারণ ও প্রবর্তনে প্রয়োজনীয় কারিগরি সুপারিশ প্রণয়ন করবে এ কমিটি। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঝুঁকি হ্রাস এবং ব্যয় সাশ্রয়ে বিদ্যমান নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঘাটতি অর্থায়ন সংক্রান্ত নীতি-পদ্ধতি প্রণয়ন করবে।
তা ছাড়া সরকারি সিকিউরিটিজের কার্যকর প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি বাজার উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যক্রম, কাঠামো ও পদ্ধতি সংক্রান্ত বিষয়ে কারিগরি সুপারিশ প্রণয়ন, নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের প্রচ্ছন্ন দায় এবং এর প্রভাব এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কারিগরি সুপারিশ প্রণয়ন, নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে ঋণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সরকারের ঘাটতি অর্থায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সুপারিশ প্রদান করবে কমিটি। এ কমিটি সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার নীতিগত সমন্বয় এবং এ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণে সুপারিশ পেশ করবে।
এদিকে সরকারের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় অধিকতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও উৎকর্ষ আনার লক্ষ্যে নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিডিএমসি) আওতা এবং কার্যপরিধি বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি পুনর্গঠিত ১৬ সদস্যের এ কমিটির সভাপতি আগের মতোই অর্থ সচিব। অর্থ বিভাগের ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে দেওয়া হয়েছে সদস্য সচিবের দায়িত্ব। এ ছাড়া কমিটিতে থাকছেন অর্থ বিভাগের আরও পাঁচ অতিরিক্ত সচিবসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন করে অতিরিক্ত সচিব। একই সঙ্গে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিও রয়েছেন সদস্য হিসেবে।
এ কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে, সরকারের অর্থায়ন (অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক) ঝুঁকি হ্রাস করার কৌশল অনুমোদন; সরকারের ঋণের উপকরণগুলোর প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি বাজার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কৌশল নির্ধারণ, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের উপকরণগুলোর নিলামের জন্য পঞ্জিকা চূড়ান্ত করা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের নতুন উপকরণ চালুর বিষয়ে সুপারিশ প্রদান, জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সার্টিফিকেট ও এর সুদহার সংক্রান্ত সুপারিশ, ঋণের নানাবিধ ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যে সরকারি ঋণের (অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক) পরিশোধ শিডিউল সুষমকরণের কৌশল নির্ধারণ এবং সরকারের অর্থায়ন ও ঋণসংক্রান্ত যে কোনো বিষয়।
অর্থ বিভাগের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে দেশি-বিদেশি ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে ১০ লাখ ২০ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। আর বিদেশি উৎস থেকে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে বাজেট বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অর্থ বিভাগের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৮১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধেই গেছে ৬২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। এর সঙ্গে আসল পরিশোধ যোগ করলে অঙ্কটা আরও বেড়ে যাবে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিচালন বাজেটের একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ ৩৪ শতাংশ গেছে সুদ পরিশোধে। এর মধ্যে দেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ৫৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ৯ হাজার ২২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছিল ৪৯ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে শুধু সুদ পরিশোধেই প্রয়োজন হবে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের চেয়ে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বাড়ে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে সেবার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঋণের সুদ পরিশোধ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়, যা সরকারের মোট ব্যয়ের ২৮ শতাংশ।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা সমকালকে জানান, পর্যাপ্ত রাজস্ব আয়ের সংস্থান করতে না পারলেও বিগত সরকারের দেড় দশকে প্রতিবছরই বড় হয়েছে বাজেটের আকার। এর সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়েছে বাজেটের ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণে স্থানীয় ও বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বেড়েছে ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয়ের পরিমাণও। এবার যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা অর্থ মন্ত্রণালয়ের। ইতোমধ্যে আর্থিক ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের গ্যারান্টি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এবার সার্বিক ঋণের দায় কমাতে আরও কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে তা নির্ধারণে কাজ চলছে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, সুদ পরিশোধে ব্যয় গতি ব্যাপক হারে বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কৌশল নির্ধারণের উদ্যোগ ইতিবাচক। বিশেষ করে অধিক সুদের ঋণ যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। তা ছাড়া সার্বিকভাবে সরকারকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ করের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অটোমেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে ত্রুটি-বিচ্যুতি কাটিয়ে কর ফাঁকি রোধ করতে হবে।