জেলেনস্কির এখন ট্রাম্পের পেছনে ঘোরার সময় নয়
Published: 6th, March 2025 GMT
গত শুক্রবার ওভাল অফিসে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটল; যেখানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে প্রকাশ্যে অপমান ও আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জে ডি ভ্যান্সের হাতে। এই জেলেনস্কি তিন বছর ধরে রাশিয়ার নৃশংস আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ঘটনার পর ইউরোপের কিছু নেতা দ্রুতই তাঁকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের পরামর্শ দিতে ছুটে যান। তাঁদের মধ্যে কিয়ার স্টারমার ও ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটও রয়েছেন। কিন্তু এটি ছিল ভুল পরামর্শ। জেলেনস্কির উচিত এটিকে উপেক্ষা করা। আসলে তাঁর সামনে বিকল্পও খুব কম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা মস্কোর সঙ্গে দ্রুত একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে চায়। এর ফলে ইউক্রেন বিভক্ত হয়ে পড়বে। দেশটি মার্কিন বা ন্যাটোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত হবে। আর মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানে ঢুকে কৌশলগত খনিজ সম্পদ লুটে নেবে।
ট্রাম্প তাঁর চিরচেনা মাফিয়া ধাঁচের কৌশল প্রয়োগ করে তাঁর অনুসারীদের জেলেনস্কির অপসারণ দাবি করতে উৎসাহিত করেছেন। বলেছেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমেরিকার সমর্থন তার সঙ্গে আছে, ততক্ষণ এই লোকটা শান্তি চাইবে না।’ এরপর তিনি ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেন। উদ্দেশ্য, কিয়েভ যেন নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং পুতিনের শর্ত মেনে যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে বাধ্য হয়।
এখন এটা একেবারেই পরিষ্কার যে ট্রাম্প প্রশাসনের আসলে জেলেনস্কির সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের কোনো ইচ্ছা নেই। তাই যদি জেলেনস্কি এখন ট্রাম্পের কাছে মাথা নত করেন, তাহলে কেবল আরও অপমানিতই হবেন। কিন্তু নতুন করে অস্ত্রসাহায্য বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা—কিছুই পাবেন না। যে ব্যক্তি পুতিনের আগ্রাসনের সামনে মাথা নত করেননি, তাঁরও উচিত নয় এখন ট্রাম্পের শর্তের কাছে আত্মসমর্পণ করা।
জেলেনস্কির জন্য বরং ভালো হবে যদি তিনি তাঁর ইউরোপীয় সমর্থকদের ওপর তাদের প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনের দুর্লভ খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা দেখিয়ে তাদের উৎসাহিত করতে পারেন। এটি কিয়েভের ইউরোপীয় ইউনিয়নে দ্রুত অন্তর্ভুক্তির একটি প্যাকেজের অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
তবু জেলেনস্কি ও ইউক্রেন এখনো এই যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারে। শর্ত একটাই, ইউরোপীয় দেশগুলোর পূর্ণ সমর্থন। ইউক্রেনের দখলকৃত প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে না পারলেও ইউক্রেনের উচিত ইউরোপের সহায়তায় জেলেনস্কির নেতৃত্বে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।এদিকে ট্রাম্পের আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন তিনি ইউক্রেনের জন্য মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করে দিতে পারেন। অথবা ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থায় ইউক্রেনের অ্যাকসেস বন্ধ করে দিতে পারেন। তাহলে ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত হবে দ্রুত এগিয়ে এসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে দিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা করা। যুক্তরাষ্ট্রেরও এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে সাবধান থাকা উচিত। কারণ, এটি বিশ্বের মার্কিন মিত্রদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেবে যে সংকটময় সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা কিংবা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর করা যায় না।
ওভাল অফিসে যা ঘটেছে, তা এত আকস্মিক যে অনেক ইউরোপীয় নেতা এখনো এর গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। এটা অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, এ ঘটনা তাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে ওলট–পালট করে দিয়েছে। এত দিন ইউরোপীয় নিরাপত্তার ভিত্তি ছিল ট্রান্সআটলান্টিক মৈত্রী। এই মৈত্রী দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাদের সমৃদ্ধি এনেছে। কারণ, প্রতিরক্ষা খাতে তাদের বেশি ব্যয় করতে হয়নি। তারা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাছাতার নিচে।
ওভাল অফিসের সেই তীব্র বাগ্বিতণ্ডার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুট বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির উচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ মার্কিন নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলা।’ তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। তিনি সেই জোটকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, যা তাঁর বেতন দেয় এবং যা ইউরোপে ৭৫ বছর ধরে শান্তি বজায় রেখেছে। কিন্তু রুট এখনো ওয়াশিংটনের নতুন বাস্তবতা মানতে পারছেন না। পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। হাতে তো সময় নেই।
একইভাবে কিয়ার স্টারমার মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও তিনি ইউক্রেনের প্রতি ব্রিটেনের পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছেন। এ মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এতটাই জড়িত যে কোনো ব্রিটিশ নেতাই ইউক্রেনের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের বিশেষ সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখতে চান না।
এখন দায়িত্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যও রয়েছে। তারা ইউক্রেনকে বাস্তবে সহায়তা করতে পারে ইউক্রেনকে গোলাবারুদ সরবরাহ করে। এর জন্য তাদের সামরিক উৎপাদন বাড়িয়ে ক্রমাগত অস্ত্র পাঠাতে হবে। তাদের উচিত অবিলম্বে রাশিয়ার ঘাঁটি ও সরবরাহ লাইন লক্ষ্য করে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে ইউক্রেনকে অনুমতি দেওয়া; পাশাপাশি যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা জরুরি। নিশ্চিত করতে হবে যেন তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর খুব বেশি নির্ভর করতে না হয়। যদিও স্টারমার যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
জেলেনস্কি এখন একদিকে বীর, অন্যদিকে ট্র্যাজিক এক চরিত্র। রাশিয়ার আক্রমণের মুখে তিনি ইউক্রেনের প্রতিরোধের প্রতীক হয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি যেন প্রতিশোধপরায়ণ পুতিন ও নির্লজ্জ ট্রাম্পের মাঝে আটকা পড়ে যাওয়া এক শহীদ।
তবু জেলেনস্কি ও ইউক্রেন এখনো এই যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারে। শর্ত একটাই, ইউরোপীয় দেশগুলোর পূর্ণ সমর্থন। ইউক্রেনের দখলকৃত প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে না পারলেও ইউক্রেনের উচিত ইউরোপের সহায়তায় জেলেনস্কির নেতৃত্বে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
পল টেলর ইউরোপীয় নীতিকেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ গবেষক
গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ইউক র ন র প র ও ইউক র ন র ইউর প ইউর প য ইউর প য় র জন য সহ য ত র করত
এছাড়াও পড়ুন:
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে: প্রধান বিচারপতি
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তিনি বলেন, পৃথক সচিবালয় বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
শনিবার দুপুরে রংপুর নগরীর গ্র্যান্ড প্যালেস মিলনায়তনে ইউএনডিপি আয়োজিত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্য দক্ষতা বৃদ্ধিতে আঞ্চলিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণসহ বিচারসেবা প্রদানে দক্ষতা বৃদ্ধিতে করণীয় সম্পর্কে আয়োজিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জাফর আহমেদ।
সেমিনারে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফান লিলার। এছাড়া, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে স্টিফান লেলার দেশের বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণে প্রধান বিচারপতির ঘোষিত বিচার বিভাগ সংস্কারের রোডম্যাপ একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন এবং উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশের বিভাগের জন্য ঐতিহাসিক এ মুহূর্তে বিচার বিভাগের আধুনিকায়নে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিতকরণে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং তার ঘোষিত বিচার বিভাগ সংস্কারের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগ সংস্কার সংক্রান্ত রোডম্যাপ এর পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ জুলাই ২০২৪ উত্তর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, বিচারিক সংস্কার শুধু বিভিন্ন খাতভিত্তিক সংস্কারের স্থায়িত্বের মূল চাবিকাঠিই নয়, বরং এটি এখন নিজেই ‘সংস্কার’ শব্দের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিচার বিভাগ হলো রাষ্ট্রের একমাত্র অঙ্গ, যা বহু দশক ধরে নিজের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের জন্য সক্রিয়ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।
এ দাবির কেন্দ্রে রয়েছে নিজেদের সংস্কার কর্মসূচি নিজেরাই নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। গত আট মাসে এই প্রচেষ্টা অভূতপূর্ব গতি অর্জন করেছে। এখন লক্ষ্য হলো সে উদ্দেশ্য পূরণ করা এবং তা যেন ভবিষ্যতেও টিকে থাকে তা নিশ্চিত করা। একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে, আমরা কখনও ক্ষমতার পূর্ণ পৃথকীকরণের লক্ষের এতটা কাছাকাছি আসিনি। যদি এ সুযোগ কোনোভাবে নষ্ট হয়, তবে তা বিচার বিভাগের মর্যাদা, অখণ্ডতা এবং প্রাসঙ্গিকতার জন্য চরম ক্ষতিকর হবে।
সেমিনারে রংপুর জেলার জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, শ্রম আদালতে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারাসহ রংপুরের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা এবং কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া সেমিনারে রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, সরকারি কৌশুলি, পাবলিক প্রসিকিউটরসহ অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথি অংশগ্রহণ করেন।