দায়ীদের সুবিচার নিশ্চিতের তাগিদ ফলকার টুর্কের
Published: 5th, March 2025 GMT
জুলাই–আগষ্টের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময়ে আন্দোলনকারী ও এর সমর্থকদের ওপর গুরুতর অপরাধ করেছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলন দমন করে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এসব অপরাধ করেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সদস্য, সরকারের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনী সদস্যরা। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সুবিচার নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন।
বুধবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক আলোচনায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিক্ষোভ–সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের ওপর জাতিসংঘের মানবাধিকার তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদন নিয়ে এক আলোচনায় ফলকার টুর্ক এই তাগিদ দেন। তিনি এদিন ওই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। পরে তা নিয়ে আলোচনা হয়।
ওই আলোচনায় প্যানেল আলোচক স্বেচ্ছাসেবী ও স্থপতি ফারহানা শারমিন (ইনু) এবং গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ওপর জোর দেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের চ্যালেঞ্জটা বেশ কঠিন। তবে সব রাজনৈতিক দল ও সম্প্রদায়সহ সবার প্রত্যয় জোরালো থাকলে জটিল পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বকে বিরাট আশাবাদের গল্প শোনানোর সুযোগ রয়েছে। তাই বাংলাদেশের সামনে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা গ্রহণ করে সেটা কাজে লাগাতে সবার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা উচিত।
প্রসঙ্গত গত ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশে অভ্যুত্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদন জেনেভা থেকে প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগের সহিংস কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিগত সরকার এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পদ্ধতিগতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত ছিল। ক্ষমতায় থাকার জন্য শেখ হাসিনা সরকার ক্রমাগত নৃশংস পদক্ষেপ নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেছিল। বিক্ষোভ চলাকালে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই গুলিতে নিহত হন।
জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে আলোচনার শুরুতে ফলকার টুর্ক প্রতিবেদন নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন। এরপর বক্তব্য দেন বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। পরে আলোচনায় অংশ নেন ফারহানা শারমিন ও মীর মাহমুদুর রহমান (দীপ্ত)। নির্ধারিত আলোচকদের বক্তব্যের পর উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁদের প্রশ্ন করেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
আলোচনায় ফলকার টুর্ক ছাত্র–জনতার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকার ও দলটির সদস্যদের নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে বিগত ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদেরসহ পুলিশ ও সংখ্যালঘুদের ওপর গুরুতর প্রতিশোধমূলক সহিংসতার কথা উল্লেখ করেন।
পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে জবাবদিহি নিশ্চিতের বিষয়টি তুলে ধরেন ফলকার টুর্ক। তিনি বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিতে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ (আইসিটি) বাংলাদেশের আদালতে অনেক মামলা করা হয়েছে। তবে এসব মামলায় সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর জাতিসংঘ একাধিকবার মৃতু৵দণ্ডের বিধানটি বাংলাদেশ সরকারের কাছে তুলে ধরেছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ চাইছে মৃত্যুদণ্ড প্রথা যেন বাতিল হয়।
জবাবদিহি নিশ্চিতের বাইরেও ক্ষত নিরাময়, সত্য বলা, পুনর্মিলন, জুলাই–আগস্ট স্মরণ ও সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়ার জন্য বলেন হাইকমিশনার। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের জন্য অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি বড় সুযোগ এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ফলকার টুর্ক বলেন, ‘ধর্মীয় বা জাতিগত নিজেদের মধ্যে যে মতানৈক্যই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ একটি দেশ, সবারই নাগরিকত্ব বাংলাদেশি, আমার মনে হয়, সংস্কারচেষ্টার মাধ্যমে এখন এ চেষ্টাই চলছে। ফলে আমাদের সবাইকে সংস্কার কার্যক্রমকে সহযোগিতা করতে হবে।’
এ প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় মানবাধিকারকে সংযুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও আশা প্রকাশ করেন ফলকার টুর্ক। তিনি বলেন, ‘এটি সব বাংলাদেশির জন্য একটি বিরল সুযোগ, তাঁরা যে গ্রুপ বা কমিউনিটিরই হোক না কেন। এটাই মানবাধিকার দৃষ্টিকোণে একটি বড় আশা। অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে আলোচনায় তিনিও বলেছিলেন, ট্রানজিশন ও সংস্কার মানবাধিকারকে সামনে রেখে করা হচ্ছে।’
এটা কঠিন কাজ উল্লেখ করে ফলকার টুর্ক বলেন, ‘এটা সহজ নয়। এটাই সঠিক প্রচেষ্টা। এ সংস্কার প্রচেষ্টাকে আমাদের সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।’
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ফলক র ট র ক জ ল ই আগস ট র জন য অপর ধ আওয় ম ক ষমত সরক র র ওপর
এছাড়াও পড়ুন:
৩০ বছর পর পদ্মাপাড়ে মিলনমেলায় হাজারো বন্ধু
৩০ বছর আগে ১৯৯৫ সালে যাঁরা এসএসসি পাস করেছেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই দীর্ঘদিন দেখা-সাক্ষাৎ নেই। কে কেমন আছেন, কোথায় কাজ করছেন, তা–ও জানেন না অনেক বন্ধু। একসময়কার অতিপ্রিয় এই সহপাঠী, সহযাত্রীদের খোঁজ নিতে ৩০ বছর পর বন্ধুরা মিলিত হয়েছেন পদ্মা নদীর তীরে।
আজ শনিবার শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবায় পদ্মা সেতুর পাশে বৃহত্তর ফরিদপুরের ৫ জেলার বন্ধুদের পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছে। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচের বন্ধুরা এতে যোগ দেন।
সকালে পদ্মার ইলিশ ও নানা পদের ভর্তা দিয়ে বন্ধুদের আপ্যায়ন করা হয়। এরপর চলে পরিচিতি পর্ব ও আনন্দ আড্ডা। দীর্ঘ বছর পর বন্ধুদের কাছে পেয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্মৃতিচারণা করেন বন্ধুদের সঙ্গে। ফাঁকে ফাঁকে গ্রামীণ নানা ধরনের খাবারের আয়োজন রাখা হয়। মঞ্চে নাচ, গান ও কবিতা পরিবেশন করেন বন্ধুরা। বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
জাজিরা মোহর আলী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান ও ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। ৩০ বছর পর ওই দুই বন্ধুর দেখা হয়েছে। তাঁরা একে অপরকে আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরেন।
মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১০ বছর এলাকার প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি, খেলাধুলা করেছি। জীবনের মধুময় শৈশব ও কৈশোর একসঙ্গে পার করেছি। উন্নত জীবন গড়তে গিয়ে ও কর্মজীবনে প্রবেশ করে বাল্যবন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। এভাবে কখনো প্রাণের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে তা ভাবতে পারিনি।’
ঢাকার সাভারে ব্যবসা করেন আনোয়ার হোসেন। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সেখানে বসবাস করেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাল্য বন্ধুদের যে স্মৃতি, তা আমাদের সব সময় উজ্জীবিত করে রাখে। দীর্ঘ বছর ধরে সেই বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম, যা অনেক কষ্টের ও বেদনার। আজ প্রাণের বন্ধুদের পেয়ে সব দুঃখ–কষ্ট দূর হয়ে গেছে।’
বাংলাদেশ পুলিশে সহকারী উপপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন শাহিন সরদার ও শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসনের কর্মরত আছেন পলাশ দাস। তাঁরা দুজনেই ১৯৯৫ সালে নড়িয়ার বিঝারী উপসী তারাপ্রসন্ন উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন। পরীক্ষার পর আর দুই বন্ধুর দেখা হয়নি। ৩০ বছর পর দুই বন্ধু মিলিত হয়েছেন জাজিরার নাওডোবায় পদ্মার পাড়ে বন্ধুদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে।
শাহিন সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘৩০ বছর পর বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসা বিনিময় করেছি। বন্ধুকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত হয়েছি। দীর্ঘ বছর পর এমন একটি মুহূর্ত আমাদের আজীবন মনে থাকবে।’
পলাশ দাস বলেন, ‘আমাদের জীবনটি যান্ত্রিকতায় স্থবির হয়ে গিয়েছে। এমন একটি মুহূর্তে শৈশব ও কৈশোরের বন্ধুদের কাছে পেয়ে আত্মহারা হয়ে পড়েছি। ফেলে আসা নানা সুখ-দুঃখের ঘটনার স্মৃতিচারণা করতে পেরেছি। জীবনের এমন একটি পর্যায়ে এসে এমন অনুষ্ঠান স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।’
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৯৯৫ এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা দেশের নানা সেক্টরে কর্মরত। স্কুলজীবনের পরে অনেকের সঙ্গেই আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে উঠছিল না। সবাইকে একত্র করার জন্য বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচটি জেলার সব স্কুলের বন্ধুদের একত্র করার জন্যই এই আয়োজন করা হয়েছে। পদ্মা সেতু আমাদের যোগাযোগের বন্ধন সৃষ্টি করেছে। সে কারণে বন্ধুত্বের বন্ধনের মিলনমেলাটি সেতুর কাছে পদ্মার পাড়ে করেছি। আনন্দ-আড্ডা, স্মৃতিচারণা, খাবারদাবার ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি উৎসবে রূপ নিয়েছে।’