শাহ আজিজুরের নামে হলের নামকরণ, বিভিন্ন মহলে প্রতিবাদ
Published: 5th, March 2025 GMT
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চারটি আবাসিক হল ও একটি একাডেমিক ভবনের নাম পরিবর্তন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শাহ আজিজুর রহমান হল’ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের আদেশ জারির পরপরই বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে শাহ আজিজুর রহমানের নামে হলের নামকরণ করায় সমালোচনা বেশি হচ্ছে। তাঁদের দাবি, শাহ আজিজুর রহমান একজন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী।
এদিকে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) সংসদ। বুধবার এক যৌথ সংবাদ বিবৃতিতে শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহমুদুল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক নূর আলম এ ব্যাপারে নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে মাওলানা ভাসানীর নামে হলের নামকরণ করার দাবি জানান।
বিবৃতিতে দুই নেতা বলেন, শাহ আজিজুর রহমানের মতো একজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীর নামে আবাসিক হলের নামকরণ জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাপরিপন্থী। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের হাতে লুট হয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বৈষম্যহীন দেশ গড়ার শপথই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শাহ আজিজুর রহমানের নামে আবাসিক হলের নামকরণের মধ্য দিয়ে ইবি প্রশাসন মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বলে তাঁরা মনে করেন।
ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা আরও বলেন, শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন একাত্তরে পাকিস্তান ন্যাশনাল ল
লিগের সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া তিনি ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আবদুল মোতালেব মালিকের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সদস্য হন এবং রাজস্বমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের জাতিসংঘে পাঠানো প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। তিনি জাতিসংঘে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে।
শাহ আজিজুর রহমান জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে অন্যায় কিছু করেনি। স্বাধীনতাসংগ্রামের নামে সেখানে যা চলছে, তা হলো ভারতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের উচিত সেটাকে পাকিস্তানের ঘরোয়া ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করা।’ এ ছাড়া তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছিলেন। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তির নামে আবাসিক হলের নামকরণের ঘটনায় ছাত্র ইউনিয়ন ক্ষুব্ধ। তাঁরা অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানান।
মুক্তিযুদ্ধ, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী ও মানুষের অধিকার আদায়ের অগ্রনায়ক মাওলানা ভাসানীর নামে আবাসিক হলের নামকরণের দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, চারটি আবাসিক হল ও একটি ভবনের নাম পরিবর্তন করা হলো। কিন্তু সেখানে মাওলানা ভাসানীর মতো জাতীয় নেতার নামে কোনো স্থাপনা রাখা হয়নি, যা দুঃখজনক। ইবি প্রশাসনের কাছে রাজাকারের নাম পরিবর্তন ও মাওলানা ভাসানীর নামে আবাসিক হলের নামকরণের আহ্বান জানান দুই নেতা।
ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী অনি আতিকুর রহমান লেখেন, ‘জনগণের টাকায় তৈরি রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নাম হবে স্ব-স্ব স্থানের নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ক্ষেত্রেও তাই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু একাধিক হল বা ছাত্রাবাস থাকে, সেগুলোর নামকরণ হবে রাষ্ট্রের জন্ম ও বিকাশের নানা পর্যায়ে ভূমিকা রাখা গুণীজনের নামে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্ম, সংস্কৃতির নানা অঙ্গনের গুণীজন স্থান পাবেন। রাজনৈতিক ক্যাটাগরি বিবেচনায় নিলে ভাসানী, শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ। এঁদের কাউকেই বাদ দিলে হিংসা জিইয়ে রাখা ছাড়া কিছুই হবে না। আজ শেখপাড়ার পাশের বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন যে কাজটা করেছে, এটা নিঃসন্দেহে ষড়যন্ত্র। এটা জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। ফ্যাসিস্ট শক্তিকে এনাবল করার ষড়যন্ত্র।’
আরেক শিক্ষার্থী জিকে সাদিক লিখেছেন, ‘শাহ আজিজুর রহমান একজন চিহ্নিত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী; বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ও পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যার পক্ষে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই লোক মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যার পক্ষে কাজ করে গেছে। তার নামে আবাসিক হল, জুলাই অভ্যুত্থানের যে চেতনা, সেটার বিরুদ্ধে যায়।.
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, আমরা বড়ই মুনাফেক।’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দেশের স্থপতিকে অসম্মান করে কোনো প্রতিষ্ঠান বড় হতে পারে না।’
যোগাযোগ করলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমন্বয়ক মুখলেসুর রহমান সুইট প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, এটা ঠিক হয়েছে। কেননা বিগত ১৬ বছর সেই পরিবারতন্ত্র করে গেছে। তবে প্রশাসন পরিবর্তিত নামের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে পারত।’
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: শ হ আজ জ র রহম ন শ হ আজ জ র র ইসল ম
এছাড়াও পড়ুন:
প্রকৌশলের পড়ালেখার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের মিল কতখানি
প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে যা পড়ানো হয়, শতভাগ দরকারি না হলেও কমবেশি সবই কাজে লাগে। কারণ, চাকরির ক্ষেত্রে প্রকৌশল স্নাতকদের বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করতে হয়। ফলে একজনের যা না জানলেও চলে, আরেকজনের কাছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে পড়ালেখা শেষ করে এখন সুইস বায়োহাইজিনিক ইক্যুইপমেন্টসে প্রকল্প কর্মকর্তা হিসেবে যুক্ত আছেন মো. তোজাম্মেল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে ফার্মাসিউটিক্যাল, ওয়াটার সিস্টেম ও ম্যানুফ্যাকচারিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করছি। স্নাতকে শেখা ফ্লুইড ডায়নামিকস, হিট ট্রান্সফার, মেকানিকসের মতো বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত কাজে লাগছে। হয়তো তাত্ত্বিকবিদ্যার গভীর হিসাব করতে হচ্ছে না বা সব ধারণা আমার লাগছে না, কিন্তু সব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে কর্মক্ষেত্রে এসে এসব কাজ করা কঠিন।’ তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠিন কঠিন সমস্যা শেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে এই জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগতে পারে, সেই ধারণা তাঁদের সেভাবে দেওয়া হয় না।
কিছু দক্ষতা অর্জন জরুরিপ্রকৌশলের জ্ঞান তো বটেই, পাশাপাশি কিছু দক্ষতা শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগেই অর্জন করা উচিত। কারণ, একজন প্রকৌশলীকে সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দল পরিচালনা করতে হয়। সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হয়। পণ্য বাজারজাতসংক্রান্ত নানা বিষয়েও একজন প্রকৌশলী যুক্ত থাকেন।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে হারুন বলেন, ‘বিশ্লেষণ দক্ষতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সঠিক যোগাযোগ দক্ষতা, ক্লায়েন্টের সঙ্গে সমঝোতা, দলগত কাজ এবং নেটওয়ার্কিং—এসব দক্ষতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের অংশ নয়। কিন্তু চাকরিতে এসে এগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারছি।’
সুমাইয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে মো. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব ও নেটওয়ার্কিং প্রকৌশলীদের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা বা উৎপাদন—একজন প্রকৌশলীর কাজ যা-ই হোক, কাজ তো তিনি একা করেন না। তাঁকে টেকনিশিয়ানদের একটি দল চালাতে হয় বা বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। তাই এসব দক্ষতা না থাকলে কর্মক্ষেত্রে টেকা কঠিন।’
একাডেমি ও ইন্ডাস্ট্রির যোগাযোগদেশের বাইরে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা একটা কথা প্রায়ই বলেন, ভিনদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যাম্পাস ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সম্পর্ক বেশ ভালো। ফলে শিক্ষার্থীরা ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। সুগম হয় ইন্টার্নশিপ বা সরাসরি সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পথও। এমনকি অনেক সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আসে, গবেষকদলের সাহায্য নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে এমন অনুশীলন খুব একটা দেখা যায় না। অনেক সময় এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পুরোনো ধ্যানধারণাই থেকে যায়।
আরও পড়ুনপ্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি–ইচ্ছুকদের জন্য ৫ পরামর্শ১০ ডিসেম্বর ২০২৩সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান উল্কাসেমিতে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন আসিফ ইমরান খান। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, ‘কোম্পানিতে যত দ্রুত প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ঘটে না। সে ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞ বা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটা সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। তাহলে পাঠ্যসূচিতে কোনো অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন হলে সেই ধারণা তারা দ্রুত পাবে। শিক্ষার্থীরাও ইন্টার্নশিপ ও চাকরির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে।’
আসিফ মনে করেন, কর্মক্ষেত্রে পেশাদারি মনোভাব থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে সময় ব্যবস্থাপনা করতে হয়, আইডিয়া উপস্থাপন করতে হয়—এসব বিষয়ে স্বতন্ত্র কোর্স না থাকলেও নানা প্রতিযোগিতা বা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদের এসব শেখানো উচিত। এ ছাড়া নানা রকম সফটওয়্যার ব্যবহারের দক্ষতাও শিক্ষার্থীদের এগিয়ে রাখে। হাতে-কলমে এসব সফটওয়্যারের কাজ শেখানোর জন্য হয়তো কোর্সের প্রয়োজন নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যেন নিজ আগ্রহেই শিখে নেয়, সেই পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা উচিত। সিভি তৈরি, গুছিয়ে ই–মেইল লেখা, গবেষণা উপস্থাপন, এমন নানা ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের ঘাটতি থাকে। অনেকে জানেন না, কোন দক্ষতা এখন চাকরির বাজারের জন্য জরুরি। এসব ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন ক্লাব বা অ্যালামনাইরা ভূমিকা রাখতে পারেন।