পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করেছেন সংস্থাটির কর্মকর্তা কর্মচারীরা। বুধবারের (৫ মার্চ) মধ্যে তারা পদত্যাগ না করলে কর্মবিরতি পালন করার ঘোষণা দিয়েছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। আগামী বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) থেকে বিএসইসির কর্মকর্তা কর্মচারীরা এ কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (৫ মার্চ) সিকিউরিটিজ কমিশন ভবনে বিএসইসি অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিক এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নির্বাহী পরিচালক মাহবুবুর রহমান।

এ সময় বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান কমিশন নিয়ে বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি আছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ— কমিশনারদের খারাপ আচরণ, বিভিন্ন কোম্পানির তদন্তের আলোকে কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক শোকজ করা এবং নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর আদেশ জারি করা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের কাছে ৫ দফা দাবি জানাই। তবে তারা এ দাবি মেনে নেয়নি। বরং আজ সেনাবাহিনীকে ভুল তথ্য দিয়ে ডেকে এনে তারা আমাদের কর্মকর্তাদের ওপর লাঠিচার্জ করিয়েছেন। এতে আমাদের ৬ জন কর্মী আহত হয়েছেন। 

এ পরিস্থিতিতে আমরা বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সঙ্গে কাজ করতে পারছি না। তাই, আমরা বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ দাবি করছি। তারা যদি বুধবারের মধ্যে পদত্যাগ না করেন তাহলে বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) থেকে পুরো কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করবেন। আমরা সরকারের কাছে গণমাধ্যমের মাধ্যমে এ বিষয়টি তুলে ধরছি। সরকারকে এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য বিএসইসির সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, এখানে (বিএসইসি) যোগ্য ও অভিজ্ঞ বসানো হোক। বাংলাদেশ ব্যাংকে যেমন অভিজ্ঞ অভিভাবক দেওয়া হয়েছে, আমরাও তেমন অভিভাবক চাই। যে অভিভাবক তাদের নিজেদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মান দিতে জানে না, তাদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করা সম্ভব। আমরা তাদের দুর্ব্যবহার অনেক সহ্য করেছি, আর নয়। আমরা যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, আর সেটা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে চাকরি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু সেটা না করে তারা এক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে আমরা জানিয়েছি। কিন্তু তারা সেটা শুনেননি। বরং তারা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন।

বিএসইসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দাবিগুলো হলো-

১.

জরুরি মিটিং কল করে নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের বাধ্যতামূলক অবসরের অবৈধ আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

২. বিতর্কিত তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে কমিশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের শোকজ বন্ধ করতে হবে এবং পূর্বে প্রদত্ত শোকজ সব প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে হবে।

৩. ১২৭ জনের নিয়োগের ব্যাপারে কমিশন কর্তৃক বিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ এবং ৩ দিনের মধ্যে আপিল করে কমিশনের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।

৪. কমিশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে অশোভন, অপেশাদারমূলক দুর্ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে।

৫. উপরিউক্ত ৪টি দাবি না মানলে এখনই পদত্যাগ করতে হবে।

এর আগে, বুধবার বেলা ১১টার দিকে বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের ফ্লোর (পঞ্চম তালা) ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিএসইসি ভবনের সামনে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিএসইসির ভেতরে ঢুকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিএসইসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর অনেক বাগবিতণ্ডা এবং উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে সাড়ে ৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থা থাকার পর চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, কমিশনার ফারজানা লালারুখ ও মো. আলী আকবর নিজ গাড়িতে করে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় কমিশন ত্যাগ করেন।

ঢাকা/এনটি/এনএইচ

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর পর স থ ত র রহম ন পদত য গ

এছাড়াও পড়ুন:

বিএসইসি লাভে ফিরলেও ভোগাচ্ছে বিপণন দুর্বলতা

টানা তিন বছর লোকসান দেওয়ার পর লাভে ফিরেছে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি)। বিএসইসি সূত্র বলছে, গত অর্থবছরে (২০২৩–২৪) তারা ৭৮ কোটি টাকা লাভ করেছে। তবে বিপণন দুর্বলতার কারণে করপোরেশনটির তিনটি কারখানা এখনো লোকসানে।

অর্থনৈতিক সমীক্ষার ২৮ বছরের (১৯৯৬–৯৭ থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়ের শুরুর দিকে বিএসইসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৯৯–২০০০ সালে করপোরেশনটি প্রথম লাভে আসে। তারপর টানা ২১ বছর তারা লাভে ছিল। ২০২০–২১ অর্থবছরে এসে এটি লোকসানে পড়ে। টানা তিন বছরে (২০২০–২১ থেকে ২০২২–২৩ অর্থবছর) ২৬ কোটি টাকা লোকসান দেয় তারা। অবশ্য সেই লোকসান কাটিয়ে এবার লাভে ফিরল করপোরেশনটি।

বিএসইসির চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে প্রথম আলোকে জানানো হয়েছে, বিপণন ব্যবস্থাপনায় পেশাদারি আনা, কারখানার জন্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা, ক্রয়–বিক্রয়সহ অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা ও তদবির ঠেকাতে পারায় লাভে ফেরা সম্ভব হয়েছে।

বিএসইসির অধীন বর্তমানে নয়টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। মূলত এসব কারখানার লাভ–লোকসানের ওপরই বিএসইসির সাফল্য–ব্যর্থতা নির্ভর করে।যেভাবে লাভে ফিরল

বিএসইসির অধীন বর্তমানে নয়টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। মূলত এসব কারখানার লাভ–লোকসানের ওপরই বিএসইসির সাফল্য–ব্যর্থতা নির্ভর করে। দীর্ঘ সময় লাভে থাকা অবস্থায় ২০২০–২১ অর্থবছরে বিএসইসি যখন লোকসানে পড়ে, তখন তাদের নয়টির মধ্যে চারটি কারখানা লোকসান দেয়। গত অর্থবছর যখন লাভে ফিরল, তখন তাদের লোকসানি কারখানার সংখ্যা কমে তিনটি হয়েছে। লোকসানে থাকা কারখানাগুলোর লোকসানের পরিমাণও কমেছে।

২০২০–২১ অর্থবছরে বিএসইসির যে পাঁচ কারখানা লাভ করেছিল, তাদের লাভের পরিমাণও ছিল সীমিত, যা টাকার অঙ্কে ছিল পাঁচ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে কারখানাগুলোর লাভও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি লাভ বেড়েছে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের, যারা গাড়ি উৎপাদন করে থাকে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের ২০২০–২১ অর্থবছরে লাভ ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা, সেখানে কারখানাটি গত অর্থবছরে লাভ করেছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। মূলত এই কারখানাই বিএসইসিকে বড় লাভে নিয়ে এসেছে।

যেকোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়তে পারে। তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে সেই লোকসান কাটিয়ে লাভে ফেরা সম্ভব। অধ্যাপক আলী আক্কাস, সাবেক চেয়ারম্যান, ব্যবসায় গবেষণা ব্যুরো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, করোনা ও রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে গাড়ি বিক্রি কমে যায়। মূলত এ কারণে তাদের লাভ ব্যাপকভাবে কমে যায়। লাভ বাড়ানোর জন্য তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয়, উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নেয় এবং বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছেও গাড়ি বিক্রির উদ্যোগ নেয়। এতেই তাদের লাভ অনেক বেড়েছে।

২০২২–২৩ অর্থবছরে ন্যাশনাল টিউবস প্রায় ২ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল। এটি গত অর্থবছর লাভ করেছে ৮ কোটি টাকার বেশি। এই কারখানায় এমএস, জিআই, এপিআই পাইপ তৈরি করা হয়। বিএসইসি চেয়ারম্যান দপ্তর জানায়, কাঁচামালের অভাবে এই কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। যে প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানির দায়িত্ব পেয়েছিল, তারা যোগ্য ছিল না এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। একপর্যায়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দেড় কোটি টাকার বেশি জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নতুন আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। ন্যাশনাল টিউবসের মতো বিএসইসির অন্য কোনো কারখানায় কাঁচামালের অভাবে যেন উৎপাদন বন্ধ না হয় বা দেরি না হয়, সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিএসইসি কর্মকর্তারা বলছেন, লোকসান কাটিয়ে ওঠার জন্য বিএসইসি ও বাইরের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দল গঠন করা হয়। তারা লোকসানের কারণ অনুসন্ধান করেছে এবং সমাধান সুপারিশ করেছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কাজ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্রয়–বিক্রয়, কারখানায় কী পরিমাণ পণ্য আছে ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ কাজ নিজস্ব সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা গেছে। তদবিরের ভিত্তিতে নয়, কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বোর্ডের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় বিএসইসিকে লাভে ফেরাতে সহযোগিতা করেছে।

সামগ্রিকভাবে বিএসইসি লাভে ফিরলেও গত অর্থবছরে তাদের তিনটি কারখানা লোকসান দিয়েছে। সেগুলো হলো গাজী ওয়্যারস, ইস্টার্ন টিউবস ও এটলাস বাংলাদেশ।বিপণন দুর্বলতায় তিন কারখানা লোকসানে

সামগ্রিকভাবে বিএসইসি লাভে ফিরলেও গত অর্থবছরে তাদের তিনটি কারখানা লোকসান দিয়েছে। সেগুলো হলো গাজী ওয়্যারস, ইস্টার্ন টিউবস ও এটলাস বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এসব কারখানা লোকসানে পড়েছে।

বিএসইসির উৎপাদনে থাকা নয়টি কারখানার বাইরে বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেড নামের আরও একটি কারখানা রয়েছে। যারা সোর্ড ব্র্যান্ডের ব্লেড উৎপাদন করে। তবে কারখানার আধুনিকায়ন কাজের জন্য ২০১৯ সাল থেকে এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু সাঈম প্রথম আলোকে বলেন, নভেম্বর নাগাদ তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনের আশা রয়েছে। উৎপাদনে গেলে তাদের লাভে ফেরা সম্ভব।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে লাভে ফেরা সম্ভব

বিএসইসির লোকসান থেকে লাভে ফেরার বিষয়টি ইতিবাচক উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় গবেষণা ব্যুরোর সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী আক্কাস প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়তে পারে। তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে সেই লোকসান কাটিয়ে লাভে ফেরা সম্ভব।

কোনো প্রতিষ্ঠান লাভে থাকলে কর্মসংস্থান হয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায় এবং আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমায়, যা একটি দেশের জন্য ভালো বলেও উল্লেখ করেন আলী আক্কাস।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • সাবিক-হিরুদের শেয়ার কারসাজি: ২ কোটি ২১ লাখ টাকা দণ্ড
  • বিএসইসি লাভে ফিরলেও ভোগাচ্ছে বিপণন দুর্বলতা
  • ওয়ার্কচার্জের ২৪ কর্মীর চাকরি স্থায়ী হয়নি ২৭ বছরেও
  • প্রধান প্রকৌশলী ছাড়াই চলছে বেবিচক