তরুণদের কেন ধরে রাখতে পারছে না তৈরি পোশাকশিল্প
Published: 5th, March 2025 GMT
বাংলাদেশের অর্থনীতি আগাগোড়া বদলে ফেলা জাদুর কাঠির নাম তৈরি পোশাকশিল্প।
গত শতাব্দীর আশির দশকে যাত্রা শুরু করা এই শিল্প ইতিমধ্যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করছে। ফলে কারখানাগুলোতে তৈরি পোশাক উৎপাদনের প্রায় সব প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও রোবটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।
দীর্ঘ সময় পোশাকশিল্প এমন কর্মী বাহিনী দিয়ে পরিচালিত হয়েছে, যাঁদের বড় অংশের ছিল না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, না ছিল প্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞান। তবে দিন বদলেছে। বিশ্বজুড়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে তৈরি পোশাক উৎপাদনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। অটোমেশনের কারণে মানুষের সংযোগ কমে আসছে। উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। সেখানে আমরাও যে খুব পিছিয়ে আছি, তা নয়। আমাদের দেশেও আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, যা একটু আগেই বলেছি।
আশার কথা হচ্ছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়া উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা পোশাকশিল্পে কাজ করছেন। তাঁরাই এখন সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের এ খাতকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তবে হতাশার কথাও আছে, তরুণদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে পোশাকশিল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তরুণেরা ঠিকই এ শিল্পে আসছেন। তবে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তাঁদের অনেকে আবার অন্য শিল্পের দিকে ঝুঁকছেন কিংবা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে শিল্পে মেধার বিকাশ হচ্ছে না।
কেন মেধাবী তরুণেরা দীর্ঘ সময় তৈরি পোশাকশিল্পে থাকছেন না, সেটি খুঁজে দেখতে হবে। সেই অনুসন্ধানের কাজটি সরকারের কোনো দপ্তর করতে পারে। সেটি সম্ভব না হলে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে পারে। আমরা এখানে শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ এবং তরুণদের নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণেরা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মোট রপ্তানির বড় অংশই ট্রাউজার, টি–শার্ট, সোয়েটার, শার্ট ও অন্তর্বাস। তবে স্যুট, জ্যাকেট, স্পোর্টসওয়্যারের মতো উচ্চমূল্যের পোশাকও বর্তমানে দেশে তৈরি হচ্ছে। আমাদের তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়াতে হলে সস্তা পোশাকের পাশাপাশি আরও বেশি উচ্চমূল্যের বা ভ্যালু অ্যাডেড পোশাক উৎপাদনে যেতে হবে। যদিও এসব পণ্য উৎপাদনে আমাদের দেশে দক্ষ কর্মীর অভাব আছে। সে জন্য উদ্যোক্তারা বেশি অর্থ খরচ করে হলেও বিদেশি বিশেজ্ঞদের আনছেন। শুধু তা–ই নয়, মার্চেন্ডাইজিং, মার্কেটিং, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশলী পদে কর্মরত আছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি কর্মী।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে কত বিদেশি নাগরিক কাজ করেন, তার কোনো হিসাব নেই। তবে বিজিএমইএর তথ্যানুযায়ী, দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া ও পাকিস্তানের নাগরিকেরা কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে ওপেন সিক্রেট হচ্ছে, দেশে বৈধভাবে আসা বিদেশি কর্মীদের পাশাপাশি অবৈধভাবেও প্রচুর বিদেশি নাগরিক তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করেন।
একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, চার দশকের বেশি বয়সী তৈরি পোশাকশিল্পে এখনো কেন বিপুল বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইনস্টিটিউট আছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বেরও হয়ে আসছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ তৈরি পোশাকশিল্পে আসছেন। তাঁরা সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্বও পালন করছেন। তারপরও বিদেশি কর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমানো যায়নি।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। যদিও পোশাক রপ্তানিতে এখনো আমাদের মূল্য সংযোজন কম। তার অন্যতম কারণ—দেশে তুলার উৎপাদন নেই। এখনো বাংলাদেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিযোগীদের তুলনায় কম। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে কারখানার উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানো, পণ্য উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ের তথ্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নতুন করে সামনে এসেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা তরুণদের নিয়ে এগোতে হবে। না হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে।
মেধা পাচার রোধ সম্ভব
শুধু তৈরি পোশাক নয়, বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মেধা পাচার রোধ। প্রতিভাবান তরুণেরা আর্থিক নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের আশায় দেশ ত্যাগ করছেন। বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ তরুণ দেশ ছাড়ছেন, তার কয়েকটি তথ্য দেওয়া যাক।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৩ সালে কাজের প্রত্যাশায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় দেড় শ বাংলাদেশি দেশ ছাড়ছেন। প্রতিবছর বাংলাদেশিদের জন্য দেশ-বিদেশে যত নতুন কর্মসংস্থান হয়, তার এক-তৃতীয়াংশই হচ্ছে প্রবাসে।
যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রকাশিত ‘ওপেন ডোরস-২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া বিশ্বের ২৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। এ ছাড়া কানাডা সরকারের ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ (আইআরসিসি) বিভাগের তথ্যানুসারে, দেশটিতে অধ্যয়নে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন ২০১৬-১৯ সালের মধ্যে ২৭০ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষাকে উৎসাহিত করা হলেও বিদেশে ডিগ্রিপ্রাপ্ত কাউকে ফিরিয়ে আনার জন্য সে রকম উদ্যোগ বা প্রণোদনা দেখা যায় না। অথচ সঠিক নীতি প্রণয়ন ও প্রণোদনা দিয়ে এই প্রবণতা বিপরীতমুখী করা যেতে পারে। উদ্ভাবনের সংস্কৃতি গড়ে তুলে এবং প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে এই মেধাবী তরুণদের দেশে রাখা যেতে পারে। তার আগে তরুণ পেশাজীবীদের এ দেশে থাকার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে জাতীয় অগ্রাধিকার থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন বা তার বেশি করতে হলে তরুণদের শক্তি ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে হবে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এই জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ পেতে শিল্পকে অবশ্যই প্রযুক্তি ও টেকসই ব্যবস্থাসহ তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে একসুতায় গাঁথতে হবে।
লেখক: মহিউদ্দিন রুবেল, সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: র ব যবহ র ক জ কর র জন য আম দ র
এছাড়াও পড়ুন:
ট্রাম্পের শুল্কে উদ্বেগে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা, যা বলছেন বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে আসা না গেলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবাসায়ীরা; আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে জট জলদি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে; একই সঙ্গে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছন, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, তাতে দেশটির নাগরিকদের ক্রয় ক্ষমতা কমে আসবে। এর প্রভাবে পোশাক রপ্তানি কমে আসবে।
তারা বলছেন, নতুন নতুন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে উঠতেও সময় লেগে যাবে।
আরো পড়ুন:
৯ দিনের ছুটি
ভোমরা স্থলবন্দরে ১৪ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে সরকার
বাংলাবান্ধায় আমদানি-রপ্তানি ৯ দিন বন্ধ
দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বাংলাদেশি পণ্যই নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক হার বাড়িয়েছে। উচ্চহারে শুল্ক আরোপ দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতা কমার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কিছুটা মন্দার কবলে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু তৈরি পোশাক রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, ফলে রপ্তানি কমে আসবে। যা পুরো রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমাতে পারলে রপ্তানি আয় কমার শঙ্কা কিছুটা কাটবে বলেও মনে করেন তারা।
তারা বলছেন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে একক দেশের প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করে রপ্তানি বাড়াতে হবে। পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। এফটিএ-এর মতো বাণিজ্য চুক্তির তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ বা বৃদ্ধি করেছে। প্রত্যেক দেশের ওপরই তার প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্রয় ক্ষমতা কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে, যা দেশটির জন্য ভালো কিছু হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ-বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে সারা বিশ্ব ধুম্রজালের মধ্যে পড়েছে। এটা নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন।”
“বাংলাদেশ সরকার এটা নিয়ে কাজ করলে শুল্ক কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে আলোচনা করে ন্যূনতম পর্যায়ে আনতে হবে; যাতে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে যেন শুল্ক না বাড়ে। তাহলে আমরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারব। তাছাড়া আমরা অনেকটা পিছিয়ে পড়ব,” বলেন মহিউদ্দিন রুবেল।
মুক্তবাজার অর্থনীতির এই সময়ে এসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কযুদ্ধ কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে রাইজিংবিডি ডটকম কথা বলে বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের সঙ্গে।
শামীম এহসান বলেন, “শুল্কযুদ্ধ কোনোভাবে আধুনিক বিশ্বে কাম্য নয়। এই শুল্ক আমেরিকার অর্থনীতিতে খুব বেশি সাফল্য বয়ে আনবে না। আমাদের রপ্তানি করা পণ্যে প্রফিট মার্জিন অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, এই পণ্যগুলো মেইড ইন ইউএসএ (যুক্তরাষ্ট্র) হবে। তা সম্ভব নয়। কারণ এই শিল্পগুলো শ্রমঘন ইন্ডাস্ট্রি। আমি মনে করি, শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কতটুকু স্থির থাকবে ইউএসএ প্রশাসন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।”
ট্রাম্পের চাপানো শুল্কের কারণে শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে উঠার ওপর জোর দিয়ে বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি বলছেন, “শুরুতে আমাদের উপর একটা ঝড় আসবে। কারণ বায়াররা সব সময় সুযোগ-সন্ধানী। বায়ররা আমাদের পণ্যের দাম কমানোর চেষ্টা করবে। এটা যদি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারি; সরকারের নীতিগত সাপোর্ট নিয়ে যদি টিকে থাকতে পারি, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আমরা পাব।”
“এই শুল্কারোপ শুধু আমাদের ক্ষতি করবে না, আমেরিকান নাগরিকদের ওপরও এর প্রভাব পড়বে। তাই আমাদের শঙ্কিত হওয়ার কারণ থাকলেও ভীত হওয়ার কারণ নেই,” বলেন শামীম এহসান।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই প্রভাব পড়বে আমেরিকার অর্থনীতিতে চাহিদা কমার কারণে।
বাংলাদেশের ওপর প্রভাবের পাশাপাশি ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করে জাহিদ হোসেন বলছেন, ধারণা করা হচ্ছে এই ট্যারিফ (শুল্ক) আরোপ করায় আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা আসবে। সবকিছুর দাম বাড়বে। এতে ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনা করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমানোর যুক্তি তুলে ধরতে হবে। সরকার এরই মধ্যে যে সংস্কারগুলো করেছে, সেগুলো আলোচনায় তুলে ধরা জরুরি।
বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, সাধারণত শুল্কের বাড়তি ব্যয় ক্রেতার ওপরেই যায়। নতুন শুল্ক আরোপের কারণে পণ্যের দাম বাড়বে, তখন ক্রেতারা ব্যয় কমানোর জন্য বিকল্প উৎস খুঁজবে।
“আমাদের চেয়ে যাদের শুল্ক কম তারা তখন সুফল পাবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে শুল্কনীতি পুনর্বিবেচনা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তাছাড়া দেশের পোশাক খাত সংকটে পড়বে,” মনে করেন রকিবুর আলম চৌধুরী।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারত, চীন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে শুল্কারোপের হার ঘোষণা করেন। এতে নড়ে যায় বিশ্ব অর্থনীতির ভিত। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘শতবর্ষে বিশ্ব বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন’ বলে মনে করছেন বিবিসির অর্থনীতি সম্পাদক ফয়সাল ইসলাম।
তিনি বলছেন, “আমদানি পণ্যে ট্রাম্পের চাপানো শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক রাজস্ব লাফিয়ে এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যা গত এক শতকে দেখা যায়নি; ছাড়িয়ে যেতে পারে ১৯৩০-এর দশকের কঠোর সুরক্ষামূলক বাণিজ্যনীতি যুগেকেও। কিংবা রাতারাতি শেয়ার বাজারের পতন দেখা যেতে পারে, বিশেষ করে এশিয়া।”
বিবিসির অর্থনীতি সম্পাদক মনে করেন, এসব কারণে যা যা ঘটবে, তা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈশ্বিক বাণিজ্যের অলিগলিতে বড় রদবদল নিয়ে আসবে।
ফয়সাল ইসলামের সাদামাটা চোখে ধরা পড়ছে, ট্রাম্প আদতে যুক্তরাষ্ট্রের সব আমদানি পণ্যে সার্বজনীন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যা এই শুক্রবার (৪ এপ্রিল) রাত থেকে কার্যকর হচ্ছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্ধৃত রয়েছে এমন কয়েক ডজন ‘বাজে অপরাধী’ দেশের ওপর পাল্টা আরও কিছু শুল্ক যুক্ত হয়েছে।
“বিশেষ করে এশীয় দেশগুলোর ওপর যে শুল্ক দেওয়া হয়েছে, তা চোখ ধাঁধা দেখার মতো বিষয়। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ হাজার হাজার কোম্পানি, কারখানা এবং হয়তো অনেক দেশেরই ব্যবসায়িক মডেল পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে পারে,” বলেন ফয়াসাল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, “ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়বে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অনেক কোম্পানির সাপ্লাইন চেইন। এর অনিবার্য প্রভাব কোম্পানিগুলোকে চীনের দিকে ঠেলে দেবে।”
ট্রাম্পের এই শুল্কের পাল্টায় বাকি বিশ্ব কী ধরেনের প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিই এখন ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
ঢাকা/এনএফ/রাসেল