ঈদের দিনের সকালটা সবসময়ই আবেগের। সুবাসিত আতরের গন্ধ, নতুন পোশাকের মোড়ক খুলে নিজেকে সাজানো, সবশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা– সবটাই অন্যরকম আনন্দের।
ঈদের দিন মেয়েদের নতুন পোশাকের তালিকায় শীর্ষে সালোয়ার-কামিজ। অন্যান্য পোশাক জায়গা করে নিলেও, এই পোশাকের আবেদন কখনও কমেনি। এটি এমন এক পোশাক, যা সব বয়সীর জন্যই মানানসই।
এই ঈদে কেমন সালোয়ার-কামিজ বা কুর্তি পরলে সবচেয়ে স্টাইলিশ এবং আরামদায়ক লাগবে? সেই উত্তর খুঁজতে চলুন জেনে নেওয়া যাক এবারের ফ্যাশন ট্রেন্ড।
ফ্যাশন ডিজাইনারদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সালোয়ার-কামিজের চাহিদার কোনো পরিবর্তন নেই, পরিবর্তন হয়েছে কেবল এর প্যাটার্ন এবং ডিজাইন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাহারি সব কুর্তি।
এবারের ঈদও গত কয়েক বছরের মতো গরমের মধ্যে হবে বলে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন হালকা ওজনের, আরামদায়ক কাপড়ের সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি। লিনেন, কটন, মসলিন বা সফট জর্জেটের কামিজ এখন জনপ্রিয়। কারণ, গরমের দিনে ভারী পোশাকের চেয়ে আরামই সবার প্রথম চাওয়া।
আয়রন-ফ্রি ও আরামদায়ক কাপড়: ঈদের দিনে দীর্ঘ সময় পরার জন্য আরামদায়ক কাপড় সবার পছন্দ। মসলিন, কটন, লিনেন, জর্জেট ও শিফন কাপড়ের সালোয়ার-কামিজ বেশি জনপ্রিয়। আয়রন-ফ্রি কাপড় থাকলে আরামের পাশাপাশি সময়ও বাঁচে।
মিরর ওয়ার্ক ও চিকনকারি কামিজ: ঈদে একটু গর্জিয়াস লুক পছন্দ করেন অনেকেই। সেটি যেন খুব বেশি ভারী না হয়, এই চিন্তা মাথায় রেখেই মিরর ওয়ার্ক আর চিকনকারি কাজ করা কামিজ জনপ্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে অফ-হোয়াইট, ল্যাভেন্ডার, মিন্ট গ্রিন বা রানী গোলাপির ওপর সিলভার ও গোল্ডেন থ্রেডওয়ার্ক চমৎকার দেখায়। এটি এমন এক ডিজাইন, যা দিনের বেলায়ও মানানসই, আবার রাতের পার্টিতেও সহজেই গ্ল্যামার যোগ করে।
কেপ ও কটআউট ডিজাইন: সাধারণ কামিজের বাইরে এবার অনেকেই কেপ স্টাইল বা কাটআউট ডিজাইনের কামিজ বেছে নিচ্ছেন। এগুলোয় সাধারণত হাতা বা গলার ডিজাইনে ভিন্নতা আনা হয়, যা পুরো লুককে নতুন মাত্রা দেয়। ঈদের আনন্দে যদি একটু ড্রামাটিক লুক আনতে চান, তবে এমন ডিজাইনের পোশাক কিনতে পারেন।
প্যাস্টেল ও উজ্জ্বল রঙের কম্বিনেশন: এ বছর ঈদ ফ্যাশনে প্যাস্টেল রঙের দারুণ চাহিদা রয়েছে। হালকা গোলাপি, পিচ, মিন্ট গ্রিন, ল্যাভেন্ডার, অফ-হোয়াইটের সঙ্গে সোনালি ও সিলভার এমব্রয়ডারি করা কামিজ বেশ ট্রেন্ডি। পাশাপাশি, উজ্জ্বল লাল, নীল, বেগুনি ও সবুজ রঙের গর্জিয়াস ডিজাইনের পোশাকও পাওয়া যাচ্ছে।
স্ট্রেইট কাট ও ফ্লেয়ারি ডিজাইন: এবারের ঈদে কামিজের কাটে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। স্ট্রেইট কাট কামিজের পাশাপাশি এ-লাইন, অ্যাংকর্ট কাট, ফ্রন্ট ওপেন ডিজাইন এবং লং ফ্লেয়ারি কামিজ এখন বেশ জনপ্রিয়। এগুলো স্টাইলিশ এবং শাড়ির মতো একটি গ্রেসফুল লুক দেয়।
হ্যান্ড এমব্রয়ডারি: ঈদের পোশাকে হ্যান্ড এমব্রয়ডারির কদর সবসময়ই থাকে। এই বছর ব্লক প্রিন্ট, হাতের কাজ, জারদৌসি ও চিকনকারি কারুকাজের সালোয়ার-কামিজের বেশ চল রয়েছে। পার্টি লুকের জন্য সিকুইন ও মুক্তার কাজের ডিজাইনও পাওয়া যাচ্ছে।
বাহারি ওড়না: সালোয়ার-কামিজের ক্ষেত্রে ওড়নার লুকটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মসলিন, হাফ সিল্ক, কেপ স্টাইলের ভিন্নধর্মী ওড়নাও কেনা যাবে । সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে মানানসই রেখে বিভিন্ন ধরনের কটন, স্লাব কটন, জ্যাকার্ড কটন, লিনেন, হাফসিল্ক, জর্জেট, ভিসকস, বারফি কাপড়ের ওড়না পরতে পারেন।
প্রতিবারের মতো এবারও ঈদকে ঘিরে ফ্যাশন হাউসগুলোর রয়েছে নানা আয়োজন। এ ঈদে ফ্যাশনসচেতন মানুষদের জন্য ট্রেন্ডি সালোয়ার-কামিজে নান্দনিকতার ছোঁয়া দিতে ফ্যাশন ডিজাইনাররা নজরকাড়া ডিজাইন আর প্যাটার্নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বৈচিত্র্যময় নকশার পাশাপাশি কাপড়ের বুনন ও রঙে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে আবহাওয়াকে। ফ্যাশন হাউসের পাশাপাশি বিভিন্ন মার্কেট এবং অনলাইনেও পাওয়া যাচ্ছে ঈদের বাহারি আয়োজন।
ফ্যাশন হাউস সেইলরের ডেপুটি ম্যানেজার রাজীব কুমার ভাওয়াল জানান, এবারের ঈদে সালোয়ার স্যুট তৈরিতে সেইলর ব্লেন্ডেড গ্লো, সেইলর শিফন, সেইলর গ্লো জ্যাকার্ডে তিন ধরনের ফ্যাব্রিক ব্যবহার করা হয়েছে। প্যাটার্নের ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। ঈদের পোশাকে স্ট্রেইট সালোয়ার স্যুট, শারারা সালোয়ার স্যুট, গাউন-স্টাইল স্যুট, রাউন্ড সালোয়ার স্যুট, ডাবল লেয়ারড সালোয়ার স্যুট প্রাধান্য পেয়েছে। রঙের ক্ষেত্রে ডিজাইনাররা বেছে নিয়েছেন অফ-হোয়াইট, পিচ, গোল্ডেন, মেরুন, কফি, ম্যাজেন্টা, টিল, পার্পল, কালো।
ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘লা-রিভ’-এর ডিজাইনার মারুফা শিল্পী জানান, “ঈদে এবার আমরা ‘মুভমেন্ট’ থিম নিয়ে কাজ করেছি, ‘মুভমেন্ট’ অর্থ ‘এগিয়ে চলা’। এই এগিয়ে চলার বিষয়টি আমরা কালার ও প্যাটার্নের মাধ্যমে পোশাকের মধ্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। রঙের মধ্যে আমরা এবার আর্দিটোন, প্যাস্টেল টোন, আর্দি জুয়েল প্যাস্টেল টোনগুলো নিয়েই কাজ করেছি। যেমন– পার্পল টনিক, ওয়াশ প্লাগ, কুল ব্লু, কনফ্লাওয়ার ব্লু, ডাজলিং রেইনবো। তাছাড়া এনার্জি দেয় এমন কিছু কালার যেমন– অর্কিড পিংক, সোলার ফ্ল্যাশ, হাইপার ব্লাশ, মুভ পিংক, ডাস্টি ব্লু এই কালারগুলো আমাদের সংগ্রহে বেশি থাকবে।
মারুফা আরও বলেন, এমন কিছু ফেব্রিক আমরা রেখেছি, যাতে একটু সিমারি, একটু শাইনি এবং ড্রেসগুলো পরলে যেন সে নিজেই একটা ফ্লেয়ার ক্রিয়েট করতে পারে।
‘বিশ্বরঙ’-এর স্বত্বাধিকারী এবং ডিজাইনার বিপ্লব সাহা জানান, এবারও ঈদ যেহেতু গরমে তাই ঋতুর দিকে খেয়াল করে ঈদের আনন্দকে আরামদায়ক করে তুলতে কাপড়, নকশা এবং রং নির্বাচন করা হয়েছে। ঈদে দিনের বেলায় হালকা গরমের জন্য কটন কাপড় এবং রাতের জন্য সিল্ক কাপড়ের সালোয়ার-কামিজ পরা যেতে পারে ।
ঈদের দিন সকাল, বিকেল এবং সন্ধ্যায় পরার জন্য ফ্যাশন হাউসগুলোয় পাওয়া যাবে আলাদা আলাদা থিমের পোশাক। তাই দেরি না করে নিজের পছন্দ ও আরামের কথা ভেবে এই ঈদে ট্রেন্ডি একটি সালোয়ার-কামিজ বেছে নিন এবং ঈদকে করে তুলুন আরও আকর্ষণীয়। v
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ঈদ র দ ন ড জ ইন র ন ড জ ইন জনপ র য় র জন য
এছাড়াও পড়ুন:
ইইউর বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রভাব পড়বে
পাল্টা শুল্ক আরোপের নামে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর বাড়তি যে শুল্ক আরোপ করেছে, তা এককথায় খামখেয়ালিপূর্ণ চর্চা। এ সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে বিপাকে ফেলবে। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা ছিল বৈশ্বিক মহামন্দার অন্যতম কারণ। পরে যুক্তরাষ্ট্র সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
বাংলাদেশ তার সব বাণিজ্যিক অংশীদারের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মোস্ট ফেভারড নেশন (এমএফএন) ভিত্তিতে বৈষম্যহীন শুল্ক আরোপ করে। কারও সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি হলে তখন সেই দেশের ক্ষেত্রে শুল্কহার কমায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ এমএফএন ভিত্তিতে কোনো পণ্য আমেরিকা থেকে আমদানি করলে যে শুল্কহার আরোপ করে, জার্মানি থেকে আমদানি করলেও একই হার থাকে। এ কথা ঠিক, প্রস্তুতকৃত পণ্যে বাংলাদেশে ট্যারিফ বা শুল্কহার অনেক দেশের তুলনায় বেশি।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে যে পরিমাণ আয় করে, সে দেশ থেকে আমদানি বাবদ ব্যয় তার চেয়ে কম। এর মানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তাদের পণ্যের ওপর বাংলাদেশ গড়ে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এখন এই হিসাব তারা কীভাবে করেছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। কোনো দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য ঘাটতি মিলিয়ে সেই দেশে তাদের পণ্যের ওপর শুল্কহার নির্ধারণ করা হলে তা অবশ্যই অযৌক্তিক। কিন্তু তাদের পদ্ধতি সম্পর্কে আমি এখনও নিশ্চিত নই।
এখন আসি যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব কী হতে পারে, সেই কথায়। এটি নিশ্চিত, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যাবে। তাদের বাজার সংকুচিত হবে। বাংলাদেশের ওপর প্রভাবের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে তৈরি পোশাক। বাড়তি শুল্ক আরোপে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের
দাম অনেক বাড়বে। ফলে তাদের পোশাক আমদানি কমবে। যুক্তরাষ্ট্র বছরে ৯০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। আমার ধারণা, এটি ৬০ থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলারে নেমে যাবে। বাংলাদেশ সে দেশে বছরে ছয় থেকে সাত বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। ফলে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ওপর প্রভাব পড়বে। এখন দেখতে হবে আমাদের প্রতিযোগীদের
ওপর কার ক্ষেত্রে নতুন শুল্কহার কতটুকু। চীনের ওপর আগেই শুল্ক বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন আরোপ করেছে ৩৪ শতাংশ। বাংলাদেশের ওপর তারা শুল্ক আরোপ করেছে ৩৭ শতাংশ। আবার ভারতের ওপর আরোপ করেছে ২৬ শতাংশ, যা আমাদের চেয়ে কম। কম্বোডিয়ার ওপর শুল্ক আরোপ করেছে ৪৯ শতাংশ, যা আমাদের চেয়ে বেশি। আমি মনে করি, সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এর মাত্রা বোঝা যাবে আরও পরে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ২৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। চীন এখন বিশ্বের অন্যান্য বাজার বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি পোশাক বাজারের ২১ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে। চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নে যদি তাদের পোশাকের দাম কমিয়ে দেয়, তাহলে বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত শুধু তাদের বাজার নয়, বিশ্বের অন্যান্য বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকে প্রভাবিত করবে। বাংলাদেশকে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং চেয়ারম্যান, র্যাপিড