অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট প্রাপ্তিকে নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখেছে। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি জানিয়েছেন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর ২(ভ) ধারা অনুযায়ী নাগরিকদের সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট প্রাপ্তির অধিকার সাইবার সুরক্ষা আইনে অন্তর্ভুক্ত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে স্যাটেলাইটভিত্তিক দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক আনার উদ্যোগ দিয়েছে সরকার। বস্তুত এর মাধ্যমে তথ্য এবং যোগাযোগে বৈশ্বিক কানেক্টিভিটিতে একধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় গত ১৭ জুলাই পুরো বাংলাদেশজুড়ে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয় সাবেক হাসিনা সরকার। এরপরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও বন্ধ করে দিয়ে পুরো দেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট ঘটানো হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট পতনের মধ্য দিয়ে ইন্টারনেট সেবা পুনরায় সম্পূর্ণভাবে চালু হয়। সেসময় ব্ল্যাক আউটের কারণে মানবাধিকার তো লঙ্ঘিত হয়েছেই, অনলাইন নির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ভয়ানক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তবে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ এটিই প্রথম নয়। বিগত ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত শেখ হাসিনার রেজিমে অসংখ্যবার ভিন্নমত-বিরোধী দলকে দমনে ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছে। ইন্টারনেট সোসাইটি ‘পালস’ গত নভেম্বরে ‘শাটডাউন ওয়াচ: বিল্ডিং এ কমিউনিটি অ্যাগেইনস্ট ইন্টারনেট শাটডাউন ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে ২০০৯ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অন্তত ১৭ বার ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

২০২৩ সালে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১তম, তার আগের বছর ২০২২ সালে ছিল পঞ্চম অবস্থানে। দুই বছরে যথাক্রমে তিনবার এবং ছয়বার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিজিটাল পরিসরের অধিকারবিষয়ক অ্যাকসেস নাউ ও ইন্টারনেট বন্ধবিষয়ক মানবাধিকার প্ল্যাটফর্ম কিপইটঅন কোয়ালিশনের ‘সংকুচিত গণমাধ্যম, ক্রমবর্ধমান সহিংসতা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন ও বিরোধী দলগুলোর সমাবেশের সময় শেখ হাসিনা সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেছিল।

ইন্টারনেট প্রাপ্তির অধিকার গত দশক থেকে আলোচিত একটি বিষয়। ২০১১ সালের ৩ জুন জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের সভায় সর্বসম্মতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর আগে ২০১০ সালে বিবিসি বিশ্বের ২৬টি দেশে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলে উঠে আসে, বিশ্বের ৭৯ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটকে মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়ন ‘রাইট টু ইন্টারনেট’ ঘোষণার মাধ্যমে ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার ঘোষণার দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে।

অবশ্য জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেওয়ার আগেই বিশ্বের চারটি দেশ ইন্টারনেট ব্যবহারকে মৌলিক অধিকার ঘোষণা করে নিজেদের সংসদে আইনও পাস করে। ৪টি দেশের মধ্যে প্রথমে রয়েছে এস্তোনিয়া। ২০০০ সালে এস্তোনিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারকে মৌলিক অধিকার ঘোষণা করে আইন পাস করা হয়। ২০০৯ সালে ফ্রান্স ও ফিনল্যান্ড এবং ২০১০ সালে কোস্টারিকার সংসদে ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করা হয়। জাতিসংঘের স্বীকৃতি দেওয়ার পর আরও ৪২টি দেশ ইন্টারনেট ব্যবহারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০২০ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জম্মু-কাশ্মীরে প্রায় পাঁচমাস ইন্টারনেট বন্ধ রাখা নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার তথ্যের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত। রায়ে আদালত উল্লেখ করে, ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার মৌলিক অধিকার এবং এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা অসাংবিধানিক। বর্তমান সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে ইন্টারনেট প্রাপ্তির অধিকার স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী দেশের ১৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ ইন্টারনেটের গ্রাহক। ইন্টারনেট ব্যবহারের এই বৃদ্ধির পরেও, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেটের প্রবেশাধিকার ও ব্যবহারে বৈষম্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেট অবকাঠামো বেশ দুর্বল এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে প্রান্তিক জনগণ ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশব্যাপী স্বনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি সেবাসমূহ সহজলভ্য হয়েছে, যা সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ইন্টারনেট সেবা ব্যবস্থা সাবমেরিন কেবলনির্ভর। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে তারের মাধ্যমে ব্যান্ডউইডথ এনে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা (আইএসপি) মানুষকে ইন্টারনেট সেবা দেয়। 

অন্যদিকে স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা দেয় স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। স্টারলিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্টারলিংকের ৬ হাজার ৯৯৪টি স্যাটেলাইট স্থাপিত হয়েছে। স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা পেতে গ্রাহককে টেলিভিশনের অ্যানটেনার মতো একটি ডিভাইস বসাতে হবে, যা পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা স্টারলিংকের স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। অ্যানটেনার সঙ্গে একটি স্টারলিংকের রাউটার স্থাপন করে গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা পাবেন। এরফলে একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেমন শক্তিশালী ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছাবে তেমনি পরবর্তী কোনো সরকার চাইলেও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করতে পারবে না।

আশার বিষয় হলো, অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেমন নানা উদ্যোগ নিচ্ছে একই সঙ্গে সিভিল সোসাইটি থেকে নানা উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে এবং হচ্ছে। অ্যাক্টিভিস্ট রাইটস প্লাটফর্মটি ‘শাটডাউন ওয়াচ’ নামে বাংলাদেশের প্রথম লাইভ ইন্টারনেট শাটডাউন মনিটরিং ড্যাশবোর্ড তৈরি করেছে। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং অবাধ থাকবে।

প্লাটফর্মটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ডিজিটাল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট শোয়েব আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগে স্থানীয় সাংবাদিক, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি টেলিযোগাযোগ সংস্থা, টেলিকম প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে প্রাথমিক যাচাই বাছাই করি। এরপর অধিকতর যথার্থতা নিশ্চিতে ক্লাউডফ্লেয়ার রাডার, আইওডিএ (ইন্টারনেট বিভ্রাট শনাক্তকরণ এবং বিশ্লেষণ) এবং ইন্টারনেট সোসাইটি পালস শাটডাউন ট্র্যাকারসহ বহিরাগত উৎসগুলির সঙ্গে আমাদের ডেটা ক্রস-রেফারেন্স করি। সবগুলো সম্পন্ন করে শাটডাউন ওয়াচ ড্যাশবোর্ডে যাচাইকৃত তথ্য যুক্ত করা হয়।

এ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে আশা করা যায়- অচিরেই বাংলাদেশে সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। প্রতিষ্ঠিত হবে অবাধে তথ্য প্রাপ্তির অধিকার। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: স য ট ল ইট ত হয় ছ বন ধ র সরক র টফর ম

এছাড়াও পড়ুন:

মানিপ্লান্ট

লকডাউন শুরু হওয়ার দু’দিন পরেই হঠাৎ রান্নাঘরের সিঙ্কের কলটা ভেঙে গেল। মিশুর রাগ পরিণত হলো অসহায়ত্বে। কতদিন থাকবে এই লকডাউন? লকডাউন না থাকলেই কি এর সমাধান আছে? করোনা কি এত সহজে যাবে? নতুন কল পাবে কোথায়, সব দোকান বন্ধ। কল জোগাড় হলেও লাগাবে কে? মিস্ত্রি নিয়ে এলে সঙ্গে আসতে পারে করোনাও। আপাতত পানি বন্ধ করতে হবে। মিশু পলিথিন ঢুকিয়ে দড়ি-পলিথিনে মুখটা কোনোমতে বন্ধ করতে পারল। সিঙ্ক পরিষ্কার করে ফেলল।

সিঙ্কের নিচের কলটা সে কোনোদিন ব্যবহার করেনি। প্রয়োজনও পড়েনি কখনও। ওটা বানানোই হয়েছে নোংরা মতন করে। কাজ করার রুচিই হয় না। রান্নাঘরের পাশের বাথরুমই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল মিশু। কিছুদিন দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করলেও টুকটাক কাজের জন্য ওই নিচের কলটাই ভরসা। মিশু বাধ্য হয়ে নিচের কলটাই ব্যবহার করা শুরু করল। এতদিন সিঙ্কে দাঁড়িয়ে কাজ করার জন্য কাটাকাটিও দাঁড়িয়ে করত। এখন পানির জন্য বসে কাজ করতে হচ্ছে তাই কাটাকাটির কাজগুলোও বসেই করছে, বঁটিতে।

মিশু লক্ষ্য করে অবাক হলো, রান্নাঘরের প্রতি তার মায়া বাড়ছে। আগের থেকে পরিচ্ছন্নও দেখাচ্ছে ঘরটা। জিনিসপত্রের অবস্থানেরও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আরও কিছুদিন পর, সিঙ্কের নিচের মোজাইকের অংশটুকু বেশি সাদা মনে হচ্ছে, অন্যদিকের মোজাইকের অংশ থেকে। নেতিবাচক ব্যাপারও যে হচ্ছে না তা নয়, বসে কাজ করে অভ্যাস না থাকায় আর বারবার দাঁড়ানো– বসার কারণে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা এবং জ্বর-জ্বর ভাব হয়েছিল। মিশু ভেবেছিল, করোনা হয়েছে তার। কিছুদিন পরে আবার স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে ওপরের সিঙ্কটাও পরিষ্কার করে। মাঝে মাঝে ভুল করে সিঙ্কের কলে হাত চলে যায়, এত বছরের অভ্যাস ...
প্রায় দুই মাস হয়ে গেল এই অবস্থা চলছে। মিশু টের পায় না, সে ক্রমশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে।

২.
লকডাউনের ছুটি পেয়ে দীপু প্রথমে একটু খুশিই হয়েছিল। সে করোনা নিয়ে মোটেও চিন্তিত না। ছুটিতে বাড়ি থেকে ঘুরে আসাটা জরুরি– এই কথাটাই মাথায় এসেছিল। নিজেই ড্রাইভ করে চলে এলো তার নিজের বাড়িতে। তার সংসার, তার ঘরবাড়ি সব একই বিভাগে; তার আশ্রয়, তার ঠিকানা সবকিছু। ঢাকায় কিছুই নেই তার, শুধু চাকরিটা ছাড়া।

লকডাউন যখন কঠিন থেকে কঠিন হলো সে এক জেলা থেকে আরেক জেলাতেই যেতে পারছে না, ঢাকা তো দূরের কথা, তখন একটু মেজাজ খারাপ হলো তার। বাড়ছে করোনাও। বাচ্চাদের কথা মনে করে করোনাকে একটু ভয় লাগছে, এই রকম পরিস্থিতিতে সে যেন রোবট হয়ে যায়। যদিও সে অনেক আগে থেকেই রোবটের রোলই প্লে করে আসছিল তার পরিবারের কাছে। সবাই জানত তার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই, মেসেঞ্জার নেই, সে সম্পূর্ণ সোশ্যাল নেটওয়ার্কের বাইরের একজন মানুষ। ধীরে ধীরে অপ্রকাশিত নেটওয়ার্ক প্রকাশিত হতে লাগল। কারণ তার মনে হচ্ছে এই দুর্যোগে কারও ঠেকা পড়ে নাই যে অন্যের ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে!

করোনা নিয়ে ভাবতে আর ভালো লাগছে না তার। চাকরি, কাজবাজ আর নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করে সে আতঙ্কিত হয়। ঢাকায় থাকাটা অর্থহীন হয়ে যাবে দীপুর। তবু সে স্থির; নিয়মে, আদেশে বন্দি সে।

হাতে ফোনটা নিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল তার বারান্দায় রাখা গাছগুলোর কথা। সে অবাক হলো, কেন সে ভুলে গিয়েছিল গাছগুলোর কথা? কতদিন হলো সে এসেছে? কত মাস? 

চার ঘণ্টার পথ একাই ড্রাইভ করে আবারও সে চলে এলো ঢাকায় শুধু গাছগুলোর জন্য। কোনো লাভ হলো না, তার বিল্ডিং লক করে রাখা হয়েছে করোনার বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে। ‘প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়েই চলে যাবে’ বলেও লাভ হলো না। ফিরে যেতে হলো তাকে।
সপ্তাহ দুইয়ের মধ্যেই সব শিথিল হলো। সে চলে এলো ঢাকায়, তার ঘরে। এই ঘর, এই শহর কি তার? কিসের সম্পর্ক এই শহরের সাথে? কিসের টান? এখন ভাবার সময় নেই তার। বারান্দার দরজা খুলে শুকিয়ে যাওয়া মানিপ্লান্টের দিকে তাকাল সে। মুখ দিয়ে এক টুকরো শব্দই বেরোল, “আহা!”

মিশু যখন পুরোপুরি অভ্যস্ত তার সিঙ্কবিহীন কিচেনের সাথে ইথার ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল ভাঙা কল ঠিক করার জন্য। মিশুও একদিন ইথারকে ফাঁকা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। সিঙ্কের দিকে তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে। মিশু কঠোরভাবে নিষেধ করেছিল, কল ঠিক করার কোনো প্রয়োজন নেই, সবকিছু পুরোপুরি ঠিক হোক তারপর। পরদিন সকালেই কল কিনে হাজির। দোকানপাট খুলেছে, বাইরে অনেকটাই স্বাভাবিক। বাইরে স্বাভাবিক হোক কিন্তু মৃত্যুর হার দিনে দিনে বাড়ছেই, মেজাজ খারাপ হলো মিশুর। ইথার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো, মিশুও। এইবার আর শত চেষ্টাতেও ভাঙা কলের মুখ বন্ধ করা গেল না। মিস্ত্রিকে ফোন দিলে সাথে সাথেই চলে এলো, কর্মহীন মানুষদের অভাব এতদিন সে ফেসবুকেই দেখে আসছিল। আজ সামনাসামনি বুঝতে পারল। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ঠিক হয়ে গেল মিশুর কলখানি।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরে আনন্দিতই হলো সে কিন্তু বারবার ভুল করে নিচের কলে চলে যাচ্ছে। প্রথম কয়েকদিন বাজে রকমের ভুল হতে থাকল, নিজের বোকা হওয়া দেখে নিজেরই হাসি পাচ্ছে। সিঙ্কের কলে এমন কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো মিশুর কাছে অসুবিধার মনে হচ্ছে, সেগুলো এখন থেকে সে নিচের কলেই করবে। নিচের কলের জায়গাটার সে এখনও যত্ন নেয়, সিঙ্কের মতোই। রান্না বসিয়ে মিশুর রান্নাঘরে বসে থাকতে হলে চেয়ারে বসে সে সিঙ্কের ওপরে আর নিচের জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করে। মানুষের অভ্যাস, না-পাওয়া এইসব ব্যাপার তাকে ভাবায়, সে ভাবে আর তাকিয়ে থাকে। ইথারও কি বুঝতে পেরেছে এই ব্যাপারগুলো? একদিন ইথার মিশুকে বলছিল, “কিচেনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তোমাদের দেখলাম।”

“তোমাদের মানে, কাকে কাকে?” মিশু কিছুটা হাসির ছলেই জিজ্ঞেস করল।
“তোমাকে আর তোমাকে ... একজন ওপরের সিঙ্কে কাজ করে চুলার দিকে যাচ্ছে, আরেকজন নিচের কলে কাজ করছে।”
মিশু রসিকতায় বিরক্ত হলো কিন্তু হাসছিল, যেন মজার কোনো কৌতুক করছে ইথার।
“হতে পারে হ্যালুসিনেশন।” ইথারও যেন পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাইছে, “চা খাবো, হবে?”
মিশু চা বানাচ্ছে আপনমনে ...। ইশ! কী কষ্টটাই না সে করেছে, সামান্য চা বানাতেও আপ-ডাউন, আপ-ডাউন করতে হয়েছে। আজ মনে হচ্ছে জীবন যত সহজ তত সুন্দর! নাকি যত সুন্দর তত সহজ? একটা হলেই হলো, সহজ-সুন্দর।

“পটেটো!” এমন একটা শব্দে ঘোর কাটল মিশুর। রান্নাঘরে চার্জে দিয়ে রাখা ফোনটা। এই কয়েক মাসে এই ঘরেই বেশি সময় কাটিয়েছে সে। টিভির ঘরে টিভি ছেড়ে দিয়ে রান্নাঘরে বসেই গান শুনেছে। চুলায় কোনো না কোনো রান্না থাকছেই, বন্দিত্বের কারণে হয়তো; সাথে তো আছেই চা আর কফি। নিচের কলটাও কয়েকবার গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করেছে সে এই কয়েকদিন। তাই এখানেই ফোন, এখানেই চেয়ার, এখানেই টেবিল। ফোনে ‘পটেটোর’ মতো শব্দ করে মেসেঞ্জার নোটিফিকেশন এসেছে।

মিশু পেছনে তাকাল না, রান্নাবান্না নিয়ে ভাবতে ভাবতে জীবনটা আলু-বেগুনই হয়ে গেছে; হাসি পাচ্ছে তার। ফোনেও এখন পটেটো শুনতে পায়। সে চা নিয়ে চলে যাচ্ছে বেডরুমের দিকে।

সিঙ্কের নিচের কলে বাসন মেজে উঠে আসছে অন্য আরেক মিশু তার ফোনের কাছে। মেসেঞ্জার খুলল। একটা নেতানো মানিপ্লান্টের ছবি– নিচে লেখা, “গাছটা শুকিয়ে গেছে।”
মিশু উত্তর দিল, “পানি দিতে হবে।”
“পানি দিলে বাঁচবে?”
মিশু জানে না বাঁচবে কিনা তবু লিখল, “বাঁচবে।”
মিশুর হঠাৎ খেয়াল হলো, এখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে; রাতে গাছে পানি দিতে হয় না। আবার মনে হলো, মৃত্যুপথযাত্রীর রাতই কি আর দিনই কি!
“অনেক ফাইট করেছে ... দুই মাস। পানি ছাড়া।”

মেসেজের জবাব দিতে দিতে মিশু যে বারান্দায় চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি। ফোনটা ড্রয়িংরুমের বেডে রেখে তার মানিপ্লান্টগুলোর সামনে বসে পড়ল। বারান্দাটা ড্রয়িংরুমের। ফিসফিস করে মিশু তাদের বলছে, “তোদের মধ্যে কে যোগাযোগ করেছিস ওই গাছটার সাথে?” মিশু জানে তার এই মানিপ্লান্টগুলোর সাথে দীপুর মানিপ্লান্টের যোগাযোগ আছে।

প্রথম গাছটার দিকেই মিশুর সন্দেহ মেশানো চোখ, “তোদের মেসেঞ্জার নেই, হোয়াটসঅ্যাপ নেই, ফেসবুক নেই ... তবু কীভাবে এই যোগাযোগ তোদের?”

প্রশ্ন করে নিঃশব্দে ঝিরঝির করে হাসছে মিশু। সেও যেন সামনের গাছগুলোর মতোই লতানো একটা গাছ।

“আমাদের যোগাযোগের জন্য সবকিছুই আছে, কিন্তু আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা ইচ্ছে করলেই কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারি না। এক দেশ থেকে আরেক দেশে কিংবা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কাউকে ডেকে আনার সামর্থ্য আমরা রাখি না। কারণ আমাদের ইগো আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, পাপ আছে, পুণ্য আছে, বিভেদ আছে। তোদের এগুলো নেই?”

মিশু বারান্দায় বসেই সামনের বারান্দার দিকে তাকায়, ড্রয়িংরুমের বারান্দা থেকে বেডরুমের বারান্দার চমৎকার এক যোগাযোগ এই বাড়িটাতে, ঝুলন্ত বারান্দারা মুখোমুখি, দুটো বারান্দাই পড়েছে বাড়ির সামনের রাস্তার ওপর। এমন আরও দুটো বারান্দা আছে মিশুদের এই বাসাতে। সেই বারান্দার ঘর থেকে কাপ-পিরিচের শব্দ আসে। মিশু-ইথারের চায়ের আসর ভাঙল, মিশু ফোন খুঁজছে, “ফোন যে কোথায় রাখি নিজেই জানি না!” স্বভাবজাত বিরক্তি ফুটে উঠল মিশুর মুখে।

ড্রয়িংরুমের বারান্দার সামনে বেডের ওপর পেল ফোনটা। একটা সিনেমা ডাউনলোড করার কথা ছিল তার, ভুলেই গিয়েছিল। সার্চ দিয়ে রাখা ছিল, এখন কী সব এসেছে, বুঝতে পারছে না।

স্ক্রিনে লেখাটা পড়ে বিরক্তির মধ্যেও হাসি পেল তার, “আওয়ার সিস্টেম থিংকস ইউ মাইট বি এ রোবট।” 

মূল শিরোনামে বোল্ড করে লেখা। মিশুর ইচ্ছা হলো সেও মজা করবে। রোবট যদি মানুষের সাথে মজা করতে পারে, মানুষ কেন পারবে না? স্ক্রল করতেই নিচে ছোট ছোট করে লেখা আরেকটা বাক্য “উই আর রিয়েলি সরি অ্যাবাউট দিজ বাট ইটস গেটিং হার্ডার অ্যান্ড হার্ডার টু টেল দ্য ডিফারেন্স বিটুইন হিউম্যান অ্যান্ড বট্স দিজ ডেজ।”

মিশু অবাক হলো, সে ঠিক করল টিক চিহ্ন দিয়ে বলবে, ইয়েস আই অ্যাম এ রোবট। দেখলাম না সিনেমা, তোহ্‌!
মিশু ফোন চার্জে দিয়ে তার ঘরে চলে গেল। দুই রোবটেরই বিশ্রাম প্রয়োজন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ