‘সৃজনে মননে আমরা সুহৃদ’ এ প্রতিপাদ্যে সমকাল সুহৃদ সমাবেশের আয়োজনে দেশের বিভিন্ন ইউনিটের সুহৃদদের অংশগ্রহণে চলছে ‘সুহৃদ আড্ডা’। বাঙালির জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাস ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু হয় আড্ডার। গান, আবৃত্তি, গল্প-আড্ডা আর কথামালায় সাজানো আড্ডার দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি। ৮ জেলার আট সুহৃদ প্রতিনিধির পাশাপাশি ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটির সুহৃদরা অংশ নেন এ পর্বে। সমকাল সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক আসাদুজ্জামানের সঞ্চালনায় দ্বিতীয় পর্বে অতিথি ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুহৃদ উপদেষ্টা, সহযোগী অধ্যাপক, সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান শারমিন আকতার। উদ্বোধনী পর্বে সুহৃদদের মধ্যে অংশ নেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব ফরিদুল ইসলাম নির্জন, ফেনীর ছাগলনাইয়ার সভাপতি কাজী সুলতানুল আরেফিন, গোপালগঞ্জ থেকে জোবায়দা আক্তার জবা, দিনাজপুরের পীরগঞ্জ থেকে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষক মাসুদুর রহমান মাসুদ, রাজবাড়ী থেকে সুহৃদ সমাবেশের সাবেক সহসভাপতি নাসির খান, ঢাকার সুহৃদ নূর আঁখি, টঙ্গী সুহৃদ সমাবেশের সভাপতি মুসা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুহৃদ স্বাধীন আরিফীন, ঢাকার সুহৃদ সাগর মল্লিক, শেখ ফাতিমা পাপিয়া, ঢাকার কেরানীগঞ্জের সুহৃদ সারমিন ইসলাম রত্না, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে যুক্ত হয়েছেন সুহৃদ ও আবৃত্তিশিল্পী নুসরাত জাহান জেরিন এবং ঢাকার বিভিন্ন ইউনিটের সুহৃদরা অংশ নেন।
শারমিন আকতার বলেন, ‘দেশজুড়ে সুহৃদদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এ আয়োজনে আমাকে যুক্ত করার জন্য আমি আনন্দিত। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পাশাপাশি সেবামূলক ও সামাজিক কাজে যুক্ত হতে আমরা সবসময় উৎসব প্রদান করি। দেশের অন্য ইউনিটের মতো ঢাকার অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়েও সুহৃদরা নানা ভালো কাজে যুক্ত হচ্ছেন। আমরা কয়েক বছর ধরে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একত্র করছি এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক মানবিক কাজ করার মধ্য দিয়ে তাদের উৎসাহ প্রদান করছি। ইতোমধ্যে ২০২৩-২৪ সালের সেরা সুহৃদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তার স্বীকৃতিও পেয়েছি। পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে অনলাইন আড্ডা অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ। এর মধ্য দিয়ে সুহৃদরা নিজের কাজ সম্পর্কে অন্যকে জানাতে ও অন্যের কাজ সম্পর্কে নিজেরা জানতে পারবে।’
কবি শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ থেকে অংশবিশেষ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে আড্ডায় সাংগঠনিক আলোচনা শুরু করেন সঞ্চালক আসাদুজ্জামান। সুহৃদদের মধ্যে পরিচয় পর্ব শেষে নুসরাত জাহান জেরিনের আবৃত্তি আর কাজী সুলতানুল আরেফিনের রম্যগল্প আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। লেখালেখি ও সাংগঠনিক চর্চার বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পায়।
সুহৃদ ঢাকা
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: স হ দর
এছাড়াও পড়ুন:
ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবিচল
পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী নেই। অথচ কোথায় ছিলেন না তিনি! ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে গিয়ে অভয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করতে এবং তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে ঐতিহাসিক ‘নেহরু-লিয়াকত’ চুক্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ষাটের দশকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক থাকাকালে রেড ক্রসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি তাঁর মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর মামা দু’জনেই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান-সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বাধা মোকাবিলা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে ছয় দফার চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে ছয় দফা আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত মওলানা ভাসানী ও তাঁর কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন।
আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোলটেবিল সম্মেলনে তিনি ‘এক মানুষ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এই নীতিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন আদায় করেছিলেন। এভাবেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ীদের জাতীয় সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয়ে তৎকালীন হাইকোর্ট বারকে নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা এত চরমে পৌঁছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করাতে কোনো বিচারকই রাজি হননি। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি থেমে যাননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। মুক্তিযুদ্ধের আগেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সার্ক গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে ছিলেন।
হাসনাত আরিয়ান খান: লেখক ও গবেষক