এ বছর বাংলাদেশে তৃতীয়বারের মতো পালিত হচ্ছে আর্থিক সাক্ষরতা দিবস। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব‍্যাংকের একটি সার্কুলারের মাধ্যমে প্রতিবছর মার্চ মাসের প্রথম সোমবার আর্থিক সাক্ষরতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

সে অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৬ মার্চ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আর্থিক সাক্ষরতা দিবস পালন করা শুরু হয়।

আর্থিক সাক্ষরতা বলতে কোনো ব্যক্তির অর্থসংক্রান্ত সেই জ্ঞান, দক্ষতা ও মনোভাবকে বোঝানো হয়, যা ব্যক্তি তাঁর অর্থ সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবহার করে থাকেন।

এর মধ্যে আয় ও ব্যয়ের সঠিক পরিকল্পনা করা, সঞ্চয়ের অভ্যাস গঠন করা, বিনিয়োগের কৌশল বোঝা, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সুদের হার বোঝা এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিরূপণ করে তা মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জন করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সাধারণ জনগণের আর্থিক জ্ঞান বৃদ্ধি করা এবং আর্থিক বিষয়ে তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ক্রমেই আর্থিক সাক্ষরতা দিবসটির গুরুত্ব বেড়ে চলেছে।

এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুননতুন বছরে অর্থনীতির সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ০২ জানুয়ারি ২০২৫

পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশেও নানাবিধ কার্যক্রমের মাধ্যমে আর্থিক সাক্ষরতা দিবস কর্মসূচি পালন করা হয়ে থাকে।

কারণ, উচ্চতর আর্থিক সাক্ষরতা মানে, অধিকতর আর্থিক স্থিতিশীলতা যা একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বর্তমানে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিও সম্মিলিতভাবে আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে, যাতে মানুষ সঠিকভাবে তাদের আর্থিক সম্পদ পরিচালনা করতে পারে। তারপরও বাংলাদেশের তিন কোটি মানুষ এখনো পুরোপুরি ব‍্যাংকিং সুবিধার বাইরে।

একটি জরিপের ফলাফল অনুসারে, বিশ্বব্যাপী ৩৩ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আর্থিকভাবে শিক্ষিত।

এর অর্থ হলো, প্রায় ৩৫০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৌলিক আর্থিক ধারণা সম্পর্কে শিক্ষা নেই, যাঁদের বেশির ভাগই উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বসবাস করছে।

বিশ্বব্যাপী পরিচালিত আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচির ইতিহাস পর্যালোচনায় বরাবরের মতোই আমেরিকার ইতিহাস চলে আসে।

১৬০০ সালের পরে আমেরিকা মহাদেশের বেশির ভাগ উপনিবেশ গড়ে ওঠে। সে সময় অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনাগুলো মা–বাবা, বন্ধুবান্ধব বা পেশাদার পরামর্শদাতাদের কাছ থেকে আসত বলে মনে করা হয়।

আরও পড়ুনউচ্চ মূল্যস্ফীতি+নিম্ন প্রবৃদ্ধি+উচ্চ বেকারত্ব: কোন পথে অর্থনীতি?২৬ জানুয়ারি ২০২৫

আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জনকদের অন্যতম বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ১৭৩৭ সালে একটি বার্ষিক পঞ্জিকায় ‘যাঁরা ধনী হতে চান, তাঁদের জন্য কিছু পরামর্শ’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন।

সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘এক পয়সা বাঁচালে দুই পয়সা সঞ্চয় হয়। প্রতিদিন এক পিন (ছোট খরচ) করে বছরে এক গ্রোট (বড় খরচ) হয়। সঞ্চয় করুন এবং উপভোগ করুন।’

এই লেখা সে সময় অনেকের মধ‍্যে কৌতূহলের সৃষ্টি করেছিল। কারণ, সে সময় ব্যক্তিগত আর্থিক শিক্ষা বা সঞ্চয়ের ধারণা তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।

তখনকার স্কুলগুলোয় ব্যক্তিগত অর্থায়নের ক্লাসও দেওয়া হতো না এবং বর্তমানের মতো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক সাক্ষরতা শিক্ষা প্রদানের বিষয়টিও ছিল না।

যদিও তার অনেক আগেই ১৪০১ সাল থেকে ইতালীয় সরকারের উদ্যোগে ‘ব্যাংক অব বার্সেলোনা’ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ব‍্যাংকিং পদ্ধতিতে আধুনিকীকরণের যাত্রা শুরু হয়ে গেছে।

এরপর ১৮০০–এর দশকে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক সাক্ষরতারও ব্যাপক প্রসার ঘটে, যার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সঞ্চয় ও ঋণের ধারণা তৈরি হতে শুরু করে।

এই ধারণা বিকাশের ফলে পৃথিবীর বর্তমান মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে ৭৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছেন।

এটি প্রকারান্তরে আর্থিক সাক্ষরতা বিস্তারে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

আরও পড়ুনঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি পিছিয়েও পড়তে পারে১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রায় ২০০ বছর পর অর্থাৎ ২০০০ সালের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিষ্ঠা, বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং সেবা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হতে শুরু করে এবং স্কুল ও কলেজে আর্থিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ে।

এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ও ডেবিট কার্ড চালু হয়, ফলে ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

ব্যাংকিং সেবার ডিজিটাল রূপান্তরও শুরু হয়। ইন্টারনেট ব্যাংকিং চালু হয়, বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আর্থিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে, সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সাক্ষরতার জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে।

মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মোটাদাগে আর্থিক সাক্ষরতা বলতে, আমরা বর্তমানে যে কর্মসূচি পালন করে চলেছি, সেটির ইতিহাস মূলত বিংশ শতকের প্রথম দিকে শুরু হয়।

১৯৯০-এর দশক থেকে এই উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক গতি লাভ করে। এরপরের ইতিহাস পরিক্রমা সবার কাছেই পরিষ্কার।

বাংলাদেশ ডিজিটাল হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বব্যাপী নারী-পুরুষের আর্থিক সাক্ষরতার ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। আপাতদৃষ্টে প্রাপ্তবয়স্ক ৩৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩০ শতাংশ নারী আর্থিকভাবে শিক্ষিত হলেও বিশ্বব্যাপী এ ব্যবধান নেহাত কম নয়।

শিক্ষার এই বৈষম্য উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় অর্থনীতিতেই বিদ্যমান এবং শিগগিরই এটি দূর হবে বলে মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুনদারিদ্র্যই আমাদের শতভাগ সাক্ষরতার পথে বড় বাধা০৭ আগস্ট ২০২৪

বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আর্থিক সাক্ষরতার ব্যবধান বাংলাদেশের অগ্রগতিতেও একটি বড় বাধা।

এখানে প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ এখনো ব্যাংকিং সেবা, ব্যাংকিং প্রোডাক্ট বা সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা সম্পর্কে পরিচিত নন।

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিক আর্থিক পরিষেবা গ্রহণ করছেন, যেখানে ৬২ দশমিক ৮৬ শতাংশ পুরুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক পরিষেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।

ব্যক্তিজীবনে আর্থিক সাক্ষরতার গুরুত্ব অনুধাবন করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করে, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

একই বছর যুক্তরাষ্ট্রে ‘আর্থিক সাক্ষরতা ও শিক্ষা কমিশন’(এফএলইসি) গঠন করা হয় যা অর্থ ব্যবস্থাপনার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রচারের জন্য কাজ শুরু করে। তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও স্কুল পর্যায়ে আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়।

একইভাবে ভারতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ২০১৩ সালে আর্থিক সাক্ষরতা কেন্দ্র স্থাপন করে।

যদিও ২০০৫ সালে একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের মঙ্গলম গ্রামের সব পরিবারকে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সাক্ষরতার একটি উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়।

তারপরও ভারতের ক্ষেত্রে, সাধারণ সাক্ষরতার হার ৭৭ শতাংশ, কিন্তু আর্থিক সাক্ষরতার হার ৩৫ শতাংশ।

এ ছাড়া জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০–এর মধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান পেয়েছে।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে আর্থিক শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে যা আর্থিক সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তবে বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছে, যার মধ্যে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম, লিড ব্যাংক পদ্ধতিতে জেলা পর্যায়ে স্টুডেন্ট ব্যাংকিং কনফারেন্সের আয়োজন করা, ন্যানো লোন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন‍্য নো-ফ্রিল অ‍্যাকাউন্ট খোলা, মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা অন্যতম।

বৈশ্বিক গবেষণা বলছে ডেনমার্ক ও নরওয়েতে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের আর্থিকভাবে শিক্ষিত হওয়ার হার ৭১ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সাবসাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোয় ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনকভাবে বৈশ্বিক গড়ের নিচে রয়েছে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক শিক্ষা ও অন্তর্ভুক্তির জন্য ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল’ চালু করে, যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি চালু করা হয়।

ডিজিটাল লেনদেন, ই-ওয়ালেট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের প্রসারের ফলে মানুষের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা আরও বৃদ্ধি পায়।

আর্থিক সাক্ষরতার শিক্ষায় শিক্ষিত বর্তমান তরুণেরা পুঁজিবাজারে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করছেন। সেখানে ৭০ শতাংশ খুচরা বিনিয়োগকারীর বয়স ৪৫ বছরের কম। তবে, বিশ্বব্যাপী তরুণদের আর্থিক সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশের নিচে যেটি এখনো উদ্বেগের কারণ।

কিন্তু বৈশ্বিক গবেষণা বলছে ডেনমার্ক ও নরওয়েতে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের আর্থিকভাবে শিক্ষিত হওয়ার হার ৭১ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সাবসাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোয় ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনকভাবে বৈশ্বিক গড়ের নিচে রয়েছে।

কিন্তু আফগানিস্তান, আলবেনিয়া ও অ্যাঙ্গোলায় আর্থিকভাবে শিক্ষিত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে কম।

তবে অর্থনৈতিক বিভিন্ন মানদণ্ডে বাংলাদেশ এসব দেশের বেশ ওপরে জায়গা করে নিলেও আর্থিক সাক্ষরতায় ২৮ শতাংশ অর্জন নিয়ে সামনে কতটুকু এগোনো যাবে, সেটি সময়ই বলে দেবে।

এম এম মাহবুব হাসান, ব‍্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক
ই-মেইল: [email protected]

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: আর থ ক শ ক ষ দ র আর থ ক য় আর থ ক ক আর থ ক পর চ ল র জন য সরক র গ রহণ ইউর প

এছাড়াও পড়ুন:

নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই কুবির সাবেক রেজিস্ট্রারকে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাবেক রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদারের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, গত ৩ মার্চ মো. মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ এনে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনকে রেজিস্ট্রারের নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে, মো. মজিবুর রহমান মজুমদারের দাবি নির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকলেও তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগও দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সাবেক রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার বলেন, “গত ৩ মার্চ ১১টা পর্যন্ত আমি উপাচার্য স্যারের সঙ্গে নথিপত্র নিয়ে কাজ করেছি। তখনও আমি উপাচার্য স্যারের মধ্যে তেমন কিছু দেখতে পাইনি। দুপুর পৌনে ২টার দিকে হঠাৎ উপাচার্য স্যার, ‍উপ-উপাচার্য ম্যাম ও কোষাধ্যক্ষ স্যার এবং গনিত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আনোয়ার (যাকে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে) কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর উপাচার্য স্যার নিজ হাতে আমাকে চিঠি হস্তান্তর করে বলেন এখন থেকে অধ্যাপক আনোয়ার রেজিস্ট্রার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। আপনি কিছুদিন ছুটিতে থাকবেন। আমি ওই মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছিলাম।”

আরো পড়ুন:

কুবির ইনকিলাব মঞ্চের নেতৃত্বে হান্নান-ওসমান

২১ দিনের ছুটি চলাকলে কুবি প্রক্টরের ৫ নির্দেশনা

তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কোনো অভিযোগ কিংবা কোনো অভিযোগকারী নেই। কোনো কারণ দর্শনোও হয়নি বা আমাকে কিছুই বুঝতে দেওয়া হয়নি। এ জাতীয় অফিস আদেশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পূর্ণ পরিকল্পিত। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে শুধু রাজনৈতিক কারণে আমি ২০০৯ সাল থেকে ওএসডি পরবর্তীতে প্রায় ১২-১৩ বছর নানা বঞ্ছনার শিকার হয়েছি।”

তিনি আরো বলেন, “বর্তমান প্রশাসন ৩-৪ মাস হলো এসেছে। আমি জুলাই-২৪ বিল্পবের পর ১১ আগস্ট যোগদান করেছি। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে কি হলো, তা আমি বুঝতে পারছি না। আমাকে কেনো বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকতে হবে, আর কেনো আমি ক্যাম্পাসেও প্রবেশ করতে পারব না, তা জানি না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রতি ন্যূনতম সুবিচার করা হয়নি।”

একইদিন (৩ মার্চ) ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. দলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে মো. মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের তদন্ত করতে পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠিত করা হয়।

কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এম এম শরীফুল করিমকে। এছাড়া সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. দলিলুর রহমান।

কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. সোহরাব উদ্দিন, একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর মোহতাসিম বিল্লাহ এবং অর্থ ও হিসাব দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রধান অধ্যাপক এমএম শরীফুল করিম বলেন, “আমাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, উনার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করতে বলা হয়েছে। আমরা একটি মিটিং করে প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছি। তবে, এখনো আমরা ফিরতি চিঠি পাইনি। কোষাধ্যক্ষ অফিস থেকে চিঠি পেলে আমরা কাজ শুরু করবো।”

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. হায়দার আলী বলেন, “উনার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে। আপাতত ওএসডি করা হয়েছে। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি যদি প্রমাণ না পায়, তাহলে তিনি আবারো জয়েন করবেন।”

ঢাকা/রুবেল/মেহেদী

সম্পর্কিত নিবন্ধ