আধুনিক যুগে বেতার যে কত শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রমাণ একাত্তরে পাওয়া গেছে। হানাদারদের আচমকা আক্রমণে মানুষ যখন দিশেহারা তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যে ভূমিকা নিয়েছিল, সেটা কোনো দিক দিয়েই সামান্য নয়। বোঝা গিয়েছিল, সবকিছু হারিয়ে যায়নি, প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বে খবর ছড়িয়ে পড়ল–স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। যুদ্ধ চলছে। প্রবাসী সরকারের নির্দেশ পৌঁছে যাওয়া শুরু করল মানুষের কাছে। পাকিস্তান সরকার তাদের বেতারে দিনরাত যেসব মিথ্যা কথার প্রচার চালাচ্ছিল, তার জবাবও আসছিল এই বেতার কেন্দ্র থেকে। কিন্তু যে বিপ্লবী সম্ভাবনা নিয়ে বেতার কেন্দ্রটি আত্মপ্রকাশ করেছিল, তা টেকেনি। নাম থেকে বিপ্লবী অভিধার প্রস্থান কোনো দুর্ঘটনা ছিল না; জাতীয়তাবাদী লড়াইটা সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ে পরিণত হোক– এমনটা প্রভাবশালী দুটি মহলের কোনোটিই চায়নি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক নেতৃত্ব, এই দুই মহলের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব ছিল, এটা ঠিক; সামরিক নেতৃত্বের কোনো কোনো অংশ এমনও চিন্তা করেছে যে, যুদ্ধের নেতৃত্ব একচ্ছত্ররূপে আওয়ামী লীগের হাতে থাকা উচিত নয়। কারও কারও এমনও ইচ্ছা ছিল যে, যুদ্ধ শেষ হলে ক্ষমতা চলে যাবে সামরিক বাহিনীর হাতে; তারা নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করে ক্ষমতা তুলে দেবে নির্বাচিতদের হাতে। কিন্তু সামরিক-বেসামরিক সব পক্ষই এক মত ছিল সামাজিক বিপ্লবের বিরোধিতার ব্যাপারে। যুদ্ধের সময়ে সামরিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বপরায়ণতা প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে তারা ভয়াবহ সব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। নিজেরাও নিহত হয়েছে। ওদিকে যে জাতীয়তাবাদী শক্তি যুদ্ধকালে নেতৃত্বে ছিল এবং পরে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করেছে, তাদের নিজেদের ভেতর বিরোধ ছিল অমীমাংসেয়। যে জন্য তারা পারস্পরিক শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু তাদের প্রধান শত্রু ছিল জনগণের বিপ্লবী চেতনা। 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে বিপ্লবী নাম দেওয়া কিন্তু কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। স্বাধীনতা মানুষ আগেও একবার পেয়েছিল, সে স্বাধীনতা ছিল শুধু নামেরই; দেশের বেশির ভাগ মানুষের জন্য তা কিছুই বহন করে আনতে পারেনি, দুর্ভোগ ভিন্ন। জনগণের উপলব্ধিতে একাত্তরের যুদ্ধ তাই শাসক বদল না, ছিল সমাজ বদল, অর্থাৎ বিপ্লবের। বেতারকর্মীর অগ্রসর অংশ সে উপলব্ধিকেই ধারণ করত। 
৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, সেদিন থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নামও বদলে যায়। নতুন নাম দাঁড়ায় বাংলাদেশ বেতার। অর্থাৎ সেদিন থেকেই এটি পুরোপুরি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো। বিপ্লবী তো নয়ই, বিদ্রোহী চরিত্রটাও আর অবশিষ্ট রইল না। বেতারের নিয়মিত কর্মীরা আগেই সরকারি কর্মচারী হয়ে গিয়েছিলেন, এখন পুরোপুরি বেতনভুক হয়ে পড়লেন। দেশে ফেরার পর পোস্টিং, প্রমোশন, ট্রান্সফার– এসব বিষয় সামনে চলে এলো। মুজিবনগরী হাজি এবং দেশীয় অ-হাজিদের ভেতর পার্থক্য দেখা দিল। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে তো বেতারের নামই বদল করে দেওয়া হয়েছিল। নতুন নাম হয়েছিল রেডিও বাংলাদেশ; পাকিস্তানি স্টাইলে। সেই নাম অবশ্য টেকেনি। তবে রাষ্ট্রীয় বেতার ক্রমশ তার গুরুত্ব হারিয়েছে। প্রাইভেট এফএম রেডিও চলে এসেছে, একের পর এক। রাষ্ট্রীয় বেতার জনগণের থাকেনি; মুখপাত্র হয়েছে সরকারের। 

যুদ্ধের সময় এটা অস্পষ্ট ছিল না যে, ভারতের রাজনৈতিক আগ্রহ কেবল শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোতে সীমাবদ্ধ ছিল না; ছিল ঘোষিত শত্রু পাকিস্তানকে ভাঙা পর্যন্ত। ভারতের জন্য যা ছিল শত্রুকে পর্যুদস্ত করা, আমাদের জন্য সেটাই দাঁড়িয়েছিল স্বাধীনতা। এক যাত্রায় পৃথক ফল। ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির অনুপস্থিতিটা লক্ষ্য করবার মতো ঘটনা বৈ কি; তার প্রতীকী মূল্যও কম নয়। 

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার যদি বিপ্লবী হতো তাহলে নেতাদের কাজটাও হতো ভিন্ন রকমের। বিপ্লবের সম্ভাবনার ভেতরে যেমন প্রতিশ্রুতি ছিল মৌলিক পরিবর্তনের, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মুনাফালোলুপতা তথা শোষণের পরিবর্তে মানবিক করা; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভেতরও তেমনি সম্ভাবনা ছিল বেতারকে কেবল পাকিস্তানিদের হটিয়ে দেওয়ার জন্য নয়; দেশপ্রেমকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে গিয়ে দেশবাসীর ভেতর সর্বক্ষেত্রে নতুন সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করার। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে তো খুব বড় রকমের পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করতে পারত ওই বেতার কেন্দ্র। পরে টেলিভিশন এসেছে। টেলিভিশনও পারত রেডিওর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে, রেডিও যদি দৃষ্টান্ত স্থাপন করত। কিন্তু রেডিওর বিপ্লবী সম্ভাবনা তো নিঃশেষ হয়ে গেছে সূচনাতেই। আড়াই দিনের মাথায়, মার্চ মাসের ২৮ তারিখেই, যেদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিপ্লবী শব্দটাকে নামিয়ে ফেলা হয়। ওটি তো কেবল একটি শব্দ ছিল না, ছিল একটি স্বপ্ন। সমষ্টিগত স্বপ্ন।
স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পার্থক্য বিস্তর। কিন্তু মিল নেই, এমনটা বলার উপায় নেই। হয়তো বলা যাবে, পাকিস্তানি শাসকরা ছিল অবৈধ, আর বাঙালি শাসকরা বৈধ। কিন্তু সকল বাঙালি শাসকই কি বৈধ? সামরিক শাসন কি আসেনি? প্রহসনমূলক বৈধ নির্বাচন কি ঘটেনি? এই প্রসঙ্গে বেলাল মোহাম্মদের বইতে উল্লিখিত একটি গল্পের কথা বলা যেতে পারে। গল্পটি তিনি মওলানা ভাসানীর মুখে শুনেছিলেন। সেটা এই রকমের: ‘একটা ছাগলকে তাড়া করেছিল একটা হিংস্র বাঘ। একজন মৌলভী তখন বাঘের হাত থেকে ছাগলটিকে রক্ষা করেছিলেন। মৌলভী ঘাস-পাতা খেতে দিয়ে ছাগলটিকে তাজা করে তুলেছিলেন। একদিন ছাগলটিকে জবাই করতে উদ্যত হলে ছাগলটি বলেছিল: আপনি সেদিন আমাকে বাঘের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। এখন নিজেই আমাকে খাবেন কেন? উত্তরে মৌলভী বলেছিলেন: বাঘ তোমাকে হারাম খেতে চেয়েছিল। আমি তো তোমাকে হালাল করেই খাব।’

গল্পটির কথা তাঁর মনে পড়েছে ১৬ ডিসেম্বরের পরে, বাংলাদেশে আসা ভারতীয় সেনাদের লুণ্ঠন তৎপরতা দেখে। কিন্তু এটি বাংলাদেশি লুটপাটকারীদের বেলাতেও পুরোপুরি প্রযোজ্য বৈ কি। 
বেলাল মোহাম্মদ স্মরণ করেছেন, ভারতীয় অফিসাররা তাদেরকে বলত, তোমাদের ওখানে তো দেখছি অনেক উন্নতি হয়েছে, তোমরা খামোখা গোলমালের মধ্যে গেলে কেন? তারা খেয়াল করেনি যে, উন্নতির রূপকথার ভেতর একটা দৈত্যও ছিল। রূপকথার ভেতর দৈত্যরা সাধারণত থাকেই। সেই দৈত্যটার নাম বৈষম্য। বাঙালিরা সেদিন ওই দৈত্যটার বিরুদ্ধেই লড়ছিল। সে সময়ে ওই দৈত্যটা ছিল আঞ্চলিক বৈষম্যের, এখন দাঁড়িয়েছে শ্রেণি বৈষম্যের। শ্রেণি বৈষম্য সেদিনও ছিল, কিন্তু সেটা চাপা পড়ে গিয়েছিল পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্যের নিচে; বাঙালি অর্থনীতিবিদরা যার সময়োপযোগী নাম দিয়েছিলেন দুই অর্থনীতি। এখন এক অর্থনীতির ভেতর পরিষ্কারভাবে দেখা দিয়েছে দুই শ্রেণি– ধনী ও দরিদ্র। এখনকার সংগ্রাম তার বিরুদ্ধেই। এই সংগ্রাম চলছে, চলবে। দেশপ্রেমিকরা লড়বে। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: র জন য সরক র

এছাড়াও পড়ুন:

জাতীয় নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু হচ্ছে বিএনপির

এ মুহূর্তে বিএনপির সব মনোযোগ জাতীয় নির্বাচনের ওপর। আগামীকাল বৃহস্পতিবার দলের যে বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে, কার্যত সেখান থেকেই বিএনপির নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু হবে।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন মহল থেকে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে দাবি উঠেছে, সেটাকে খুব গুরুত্ব দেবে না বিএনপি; বরং দলটি জাতীয় নির্বাচনকে মুখ্য করেই পরবর্তী সাংগঠনিক কর্মসূচি তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের পরপরই নির্বাচনকেন্দ্রিক এ কর্মসূচি ও তৎপরতা শুরু হবে। আগামীকালের দলের বর্ধিত সভার মধ্য দিয়ে নির্বাচনমুখী কার্যক্রম শুরু হবে।

আরও পড়ুনকতিপয় দল, কতিপয় লোক বিএনপিকে এক কোণে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে: মির্জা আব্বাস১২ ঘণ্টা আগে

আগামীকাল জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে বিএনপির বর্ধিত সভা হবে। সভায় দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং মহানগর ও জেলার সব থানা, উপজেলা, পৌর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবেরা অংশ নেবেন।

এর বাইরে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া এবং মনোনয়নের জন্য প্রাথমিক চিঠি পাওয়া নেতারাও সভায় উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির এ বর্ধিত সভাকে ‘খুবই সময়োপযোগী’ বলে মনে করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ।

বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় সাড়ে তিন হাজার নেতাকে বর্ধিত সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ সভাকে একটা ‘যাত্রাবিন্দু’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, অন্যদিকে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা প্রস্তাব—দুটি বিষয়কে গুছিয়ে বর্ধিত সভা থেকে একটি বার্তা দেওয়া হবে। বলতে পারেন, ওই সভা থেকে জাতীয় নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু করবে বিএনপি।’

আরও পড়ুনআমরা কি ১৭ বছর ধরে আন্দোলন করছি স্থানীয় নির্বাচনের জন্য, প্রশ্ন গয়েশ্বর রায়ের১৩ ঘণ্টা আগে

এর আগে বিএনপির সর্বশেষ বর্ধিত সভা হয়েছিল ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার হোটেল লো মেরিডিয়েনের মিলনায়তনে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি জেলে যাওয়ার চার দিন আগে অনুষ্ঠিত ওই সভায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সভাপতিত্ব করেন। সাত বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানামুখী আলোচনার মধ্যে বিএনপির এ বর্ধিত সভা হতে যাচ্ছে।

এ সভা আয়োজনের তদারক করছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের নেতারা কী ভাবছেন, বর্ধিত সভা থেকে তার একটি ধারণা পাওয়া যাবে। সেই নিরিখে তৃণমূলকে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নির্দেশনা দেওয়া হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত ১৬ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জাতীয় নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য সময়ের কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অল্প সংস্কার করে নির্বাচন চাইলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, আর আরেকটু বেশি সংস্কার করে নির্বাচন চাইলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব। বিএনপি ডিসেম্বরের ভোট ধরেই সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে।

আরও পড়ুননির্বাচন বিলম্বিত হলে কারা সুবিধাপ্রাপ্ত হবে, এটা দেখার বিষয়: তারেক রহমান১৩ ঘণ্টা আগে

বিএনপির নেতারা বলছেন, তাঁরা সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে ইতিমধ্যে দেশবাসীর সামনে দুটি বিষয় পরিষ্কার করেছেন। একটা হচ্ছে, জরুরি সংস্কারগুলো কী কী সেটা স্পষ্ট করা এবং এ ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করে দ্রুত নির্বাচন আদায় করা। এর বিনিময়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। এরপর নির্বাচিত সরকারই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় বাকি সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবে। এমন নীতিগত অবস্থান নিয়েই বিএনপি তার নির্বাচনী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনমুখী হয়ে গেছে, জনগণ নির্বাচনমুখী হয়ে গেছে। মানুষ অপেক্ষা করছে নির্বাচনের জন্য।’

বিএনপি শুরু থেকেই নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কিছু মৌলিক সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচনের দাবি করে আসছে। বিএনপি ছাড়া বাম গণতান্ত্রিক জোট, ১২–দলীয় জোট, সমমনা জাতীয়তাবাদী জোটের শরিক দলগুলোও চলতি বছরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। তবে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ কিছু দল আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার, তারপর নির্বাচন চায়। তারা আগে স্থানীয় নির্বাচন করারও পক্ষে। অন্যদিকে বিএনপিসহ স্বৈরাচারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিকেরা আগে জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে।

আরও পড়ুনদেশকে আর ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন না: মির্জা ফখরুল২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে। তারা একাধিকবার এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বক্তব্য দিয়েছে এবং সংস্কার করেই নির্বাচনের কথা বলেছে।

ফলে স্থানীয় নাকি জাতীয়—কোন নির্বাচন আগে হবে, ভোটের আগে সংস্কার কতটা হবে বা নির্বাচিত সরকার কী কী সংস্কার করবে—এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গত শনিবার চাঁদপুরে এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জনদুর্ভোগ নিরসনের জন্য স্থানীয় নির্বাচন দিতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন হলেই জনগণের এ দুর্ভোগ কাটবে। এরপর অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনও দিতে হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণ কিছু মৌলিক সংস্কার চায়।

যদিও আগে স্থানীয় নির্বাচনের চিন্তাকে নাকচ করে দিয়েছে বিএনপি। তারা মনে করে, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে গেলে সারা দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এটাকে চক্রান্ত হিসেবেও দেখছে তারা। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের চেষ্টা হলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী কোনো কোনো নেতা প্রতিহত করারও ঘোষণা দিয়েছেন।

আরও পড়ুনএই সরকার যদি পারত, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন হতে পারত না: খন্দকার মোশাররফ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের বাইরে অন্য কোনো নির্বাচন করার কোনো সুযোগ নেই তাদের (অন্তর্বর্তী সরকার)। পাঁচজন-সাতজন মিলে একটা চিন্তা করলাম, এটা তো হবে না। এই সরকারের প্রধান কাজই হচ্ছে সংস্কার করে ভোট দিয়ে নির্বাচিত সরকরের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এর বাইরে অন্য কোনো নির্বাচন করতে হলে ম্যান্ডেট নিতে হবে জনগণের কাছ থেকে।’

বিএনপির সূত্র থেকে জানা গেছে, নির্বাচনের সময় নিয়ে সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ বাড়াবাড়িতে গেলে বিএনপি মাঠের কর্মসূচি জোরদার করবে। একই সঙ্গে সংস্কারের নাম করে ভোটের তারিখ পেছানোর চেষ্টাও বিএনপি মেনে না।

এ বিষয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সংস্কার হবে না। আর কোনো পথও নেই। সংস্কারের ক্ষেত্রে যেটাতে ঐকমত্য হবে, সেটা হবে। বাকিগুলো (সংস্কারে) নিয়ে নির্বাচনে সব দল ম্যান্ডেট নিতে যাবে, বিএনপিও যাবে। আমরা ৩১ দফা দিয়েছি। যারা যে বিষয়ে যে সংস্কার চায়, তারা সেগুলো নিয়ে জনগণের কাছে যাবে। জনগণ তাদেরটা চাইলে করবে। ম্যান্ডেট নিতেই হবে জনগণের। ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সংস্কার হবে না।’

আরও পড়ুনকিছু ছাত্রনেতার কথাবার্তায় মনে হয়, তাঁরা পুরো আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছেন: আমীর খসরু২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • জাতীয় নাগরিক পার্টির লক্ষ্য ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠা
  • এমন রাজনীতি চাই যেখানে পারিবারিক আধিপত্য থাকবে না: তাসনিম জারা
  • যারা জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদেরকে মূল্যায়ন করবো : সজল
  • দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধের দাবিতে রাজশাহীতে জামায়াতের বিক্ষোভ
  • টাঙ্গাইলে বাড়ছে খুন-ডাকাতি-চুরি
  • বাংলাদেশের শত্রুরা এখনো গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে: খালেদা জিয়া
  • রাজনীতিতে নতুনত্বের ছাপ প্রত্যাশিত
  • সরকার টিকে আছে জনগণের সমর্থনে: আসিফ মাহমুদ
  • জাতীয় নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু হচ্ছে বিএনপির