দেশে চলমান অপারেশন ডেভিল হান্টে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আজ শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ১১ হাজার ৩১৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় লোকজন। এ তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। প্রতিষ্ঠানটির ফেব্রুয়ারি মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ শুক্রবার এ প্রতিবেদনটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে এমএসএফ। প্রতিষ্ঠানটি পত্রিকার প্রতিবেদনে এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করে।

এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে সন্ত্রাসবাদ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গাজীপুরসহ সারা দেশে এই অভিযান শুরু করা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলার শিকার হন ১৫ থেকে ১৬ শিক্ষার্থী। এরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেওয়া তথ্য অনুসারে, অপারেশন ডেভিল হান্ট শুরু হওয়ার পর ৮ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে আজ এ অপারেশনের আওতায় পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৩১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া অপারেশন ডেভিল হান্টের পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন ও পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০ হাজার ৩৭২ জন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীরা ওই রাতে ডাকাতির খবর পেয়ে তা প্রতিহত করতে সেখানে গিয়েছিলেন। তখন তাঁদের ওপর আক্রমণ করা হয়। এ ঘটনায় আহত একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের গাজীপুরের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ মোহিত বাদী হয়ে গাজীপুর সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় ২৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি আমজাদ হোসেন মোল্লা নামের আওয়ামী লীগের এক কর্মী।

কারা হেফাজতে নিহত ১৪

ফেব্রুয়ারি (২০২৫) মাসে কারা হেফাজতে ১ নারী বন্দীসহ মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে এর সংখ্যা ছিল ৮ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৬ জন কয়েদি ও ১ জন নারীসহ ৮ জন হাজতির মৃত্যু হয়েছে।

এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৬ জন, কাশিমপুরে কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ জন, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ জন, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ জন, গাজীপুর জেলা কারাগারে ১ জন, নওগাঁ জেলা কারাগারে ১ জন, রাজবাড়ী জেলা কারাগারে ১ জন নারী, খুলনা জেলা কারাগারে ১ জন ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে রান্না করার সময় গরম পানিতে পড়ে এক বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।

এ ছাড়া যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তিনতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মেহেদী হাসান (১৭) নামে এক কিশোর গুরুতর আহত হয়।

এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, কারা অভ্যন্তরে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি বন্দীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হেফাজতে মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা।

রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহত

এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ও মামলার সংখ্যা কমে গেলেও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিশেষ করে নিজদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব অনেকাংশে বেড়েছে। বিএনপির দলীয় কর্মীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেই চলেছে, যা জনমনে নিরাপত্তহীনতা, ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক সহিংসতার ৩৯টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৩৯৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৩ জন নিহত এবং ৩৯০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহত ব্যক্তিরা ৩ জন বিএনপির কর্মী ও সমর্থক। এ ছাড়া নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজাদুল ইসলাম হাই পান্নু গত ৮ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন।

সহিংসতার ৩৯টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বের ৩৩টি, আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব ২টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ৪ টি ঘটনা ঘটেছে।

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ১২টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৪৩ জন।

এঁদের মধ্যে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত ৩ জন, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় লাশ উদ্ধার ২ জন এবং ১ জনের লাশ মাঠ থেকে পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ জন আওয়ামী লীগ ও ২ জন বিএনপির নেতা-কর্মী।

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: র দ বন দ ব র জন ত ক ব এনপ র হয় ছ ন আওয় ম

এছাড়াও পড়ুন:

৮৮১ শহীদের মধ্যে ৫৮১ জনের স্বজনেরাই মামলা করেননি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ৮৮১ জনের মধ্যে মাত্র ৩০০ শহীদের স্বজনেরা মামলা করেছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। যে ৫৮১ জন মামলা করেননি, তাঁদের স্বজনেরা জানিয়েছেন, অজানা ভয় ও হুমকির কারণে তাঁরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে এমএসএফ। গত বছরের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত ঘটনার বিষয়ে ‘হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস ইন জুলাই–আগস্ট ২০২৪ স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন জানায়, গত বছরের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন। দাবি আদায়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ সমাবেশসহ শান্তিপূর্ণ নানা কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনকারীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ–সংগঠনের সদস্যদের নির্মম ও বর্বরোচিত আচরণ ছড়িয়ে পড়ে। রংপুরে আবু সাঈদ এবং ঢাকায় মুগ্ধ নিহত হওয়ার ঘটনায় দ্রুতই সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতা ও পুলিশি হামলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত, আহত, নির্যাতন, হুমকি, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট, সনাতন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, নিখোঁজ, মন্দির ও মাজারে আক্রমণের শিকার হন ১১ হাজার ৩৪৮ জন। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে নিহত হয়েছেন ৮৮১ জন, আহত ৭ হাজার ৮৭৩, হুমকির শিকার ৯৩৩ জন, নির্যাতনের শিকার ৭৩১ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪ জন। যদিও কয়েকজন পরে ফিরে আসেন।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৮৮১ জন নিহতের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৫৬৮ জন, বিভিন্ন পেশাজীবী (পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, বিভিন্ন যানবাহনের চালক, দোকান ও রেস্তোরাঁর কর্মী ও যানবাহনের মেকানিকস) পেশার ১৬৪ জন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (রাস্তার বিক্রেতা) ৮৫ জন, বেসরকারি চাকরিজীবী ২৩ জন, কৃষক ৯ জন, শিক্ষক ৬ জন, ডাক্তার ৫ জন, সাংবাদিক ও ফ্রিল্যান্সার ১০ জন, ব্যাংকার ৪ জন, আইনজীবী ৩ জন, প্রবাসী ২ জন, সরকারি চাকরিজীবী ১ জন ও ফটোগ্রাফার আছেন ১ জন।

নিহত ৫৬৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৬ জন মাদ্রাসার, ১৩৬ জন প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয়ের, ২৬৫ জন কলেজের ও ৬১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাঁদের সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে অথবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে বনশ্রীতে শহীদ নাজমুলের মা নাজমা আক্তার, আজিমপুর এলাকার শহীদ খালিদ হাসান সাইফুল্লার বাবা খাইরুল হাসান এবং চানখাঁরপুলে গুলিবিদ্ধ আহত রকিবুল হাসান সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তাঁরা সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ার আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে সব ঘটনার বিচার দাবি করেন।

৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনাগুলোও তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন। গবেষণা প্রতিবেদনে এই সময়কার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এই সময়ে ৮৭৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে অগ্নিসংযোগ ৩৩৩টি, ভাঙচুর ও লুটপাট ৩০০টি, সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি আক্রমণ ২২৩টি এবং মন্দির ও মাজারে আক্রমণের ঘটনা রয়েছে ২০টি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সালমা আলী বলেন, গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা রাষ্ট্র ও আগামী প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে। জুলাই-আগস্টের ঘটনায় নারীদের ভূমিকা কোনোভাবেই খাটো করে দেখা যাবে না। যথাযথভাবে ভুক্তভোগীদের জন্য ‘সাপোর্ট সার্ভিসের’ ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশকে পুনর্বিন্যাস করে নারীবান্ধব করতে হবে।

প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন গবেষণা প্রকল্পের সমন্বয়ক নূরুননবী শান্ত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী আইনজীবী মো. সাইদুর রহমান।

মো. সাইদুর রহমান বলেন, আগের যেকোনো গণ–অভ্যুত্থান থেকে এবারের ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা। শহীদ ৮৮১ জনের মধ্যে মাত্র ৩০০ জনের স্বজনেরা মামলা করেছেন। স্বজনেরা জানিয়েছেন, আগের অসংগতি এবং সমস্যাগুলো এখনো বিরাজমান রয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • অপারেশন ডেভিল হান্টে ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার ১১ হাজারের বেশি: এমএসএফ
  • ৮৮১ শহীদের মধ্যে ৫৮১ জনের স্বজনেরাই মামলা করেননি
  • জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ৮৭ শতাংশই গুলিতে: এমএসএফ
  • জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ৮৭ শতাংশ গুলিতে: এমএসএফ
  • জুলাই আন্দোলনে গুলিতে নিহত ৮৭ শতাংশ মানুষ: এমএসএফ
  • জুলাই আন্দোলনে গুলিতে নিহত ৮৭ শতাংশ মানুষ: জরিপ
  • কামরাঙ্গীরচরে ৫৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার