‘আমি শুধু একটি বাড়ির মালিক হতে ও ঋণ শোধ করতে চেয়েছিলাম। আর সে কারণেই আমার কিডনি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিই।’ বিবিসিকে কথাগুলো বলছিলেন জেয়া (ছদ্মনাম)। তিনি মিয়ানমারের একটি খামারে কাজ করেন।

মিয়ানমারে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের জেরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর লড়াই শুরু হয়। এর পর থেকে দেশটিতে পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। এতে নিজের ছোট্ট পরিবারের খরচ চালাতেও হিমশিম অবস্থায় পড়েন জেয়া। পরিবারের সদস্যদের জন্য আবশ্যকীয় খাবারটুকুও ঠিকমতো জোগাড় করতে পারছিলেন না। তখন গ্রামে তাঁরা তাঁর শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। ইয়াঙ্গুন শহর থেকে গ্রামটিতে যেতে কয়েক ঘণ্টা লাগে।

অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে বেকারত্ব বেড়েছে। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরে গেছেন। ইউএনডিপির তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছিলেন। ২০২৩ সালের মধ্যে তা বেড়ে অর্ধেকে পৌঁছেছে।

জেয়া (ছদ্মনাম) স্থানীয় এমন কয়েকজনকে চিনতেন, যাঁরা তাঁদের একটি করে কিডনি বিক্রি করেছিলেন। তাঁদের দেখে জেয়ার কাছে সুস্থই মনে হতো। আর সে কারণে তিনিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন নিজের কিডনি বিক্রি করতে। পরে এ ব্যাপারে নেওয়া শুরু করেন খোঁজখবর।

বিবিসিকে জেয়া বলেন, তিনিসহ ওই গ্রামের আটজন ভারতে গিয়ে একটি করে কিডনি বিক্রি করেছেন।

অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবৈধ বাণিজ্য এশিয়াজুড়েই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে এ প্রক্রিয়া চলে, তা মিয়ানমারের নাগরিক জেয়া ও মিয়ো উয়িন নামের দুই ব্যক্তির গল্পে তুলে ধরেছে বিবিসি।

যেভাবে চুক্তি

মিয়ানমার ও ভারত দুই দেশেই মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচাকেনা করা অবৈধ। তবে জেয়া বলেছেন, কিডনি বিক্রির জন্য ‘দালালের’ খোঁজ পেতে তাঁর বেশি বেগ পেতে হয়নি। কথিত দালাল প্রথমে জেয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। কয়েক সপ্তাহ পর দালাল জানান, একজন সম্ভাব্য কিডনিগ্রহীতার খোঁজ পাওয়া গেছেন। তিনিও মিয়ানমারের নারী। অস্ত্রোপচারের জন্য দাতা ও গ্রহীতা দুজনকেই ভারতে যেতে হবে বলে জেয়াকে জানানো হয়।

ভারতে কিডনি দাতা-গ্রহীতা যদি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় না হন, তবে তাঁদের অবশ্যই ঘোষণা দিতে হয়, পরোপকারের অংশ হিসেবে এ দান করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক, তা-ও জানাতে হয়।

ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ২০১০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের হার ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার প্রতিস্থাপনের ঘটনা ঘটে। তবে প্রতিস্থাপনের জন্য বিশ্বব্যাপী অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে মিয়ানমারে অঙ্গ দান করার ক্ষেত্রে কোনো পরিবারকে তার সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নথিভুক্ত করাতে হয়। জেয়া জানান, ওই দালাল একটি জাল নথি তৈরি করেছিলেন। তাতে জেয়ার নাম কিডনিগ্রহীতার পরিবারের সদস্যদের তালিকায় উল্লেখ করা হয়।

জেয়া বলেন, দালাল বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যেন তিনি (জেয়া) শ্বশুরবাড়ির কোনো আত্মীয়কে কিডনি দান করছেন। কিডনিগ্রহীতা তাঁর রক্তের কেউ না হলেও দূরসম্পর্কের আত্মীয়।

এরপর জেয়াকে ইয়াঙ্গুনে সংশ্লিষ্ট কিডনিগ্রহীতার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক ব্যক্তি চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে আরও কিছু কাগজপত্রের কাজ শেষ করেন। ওই ব্যক্তি জেয়াকে সতর্ক করে দেন যে তিনি যদি সিদ্ধান্ত পাল্টান, তবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

পরবর্তী সময়ে বিবিসি চিকিৎসক পরিচয়দানকারী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তিনি বলেছেন, কোনো রোগী এ প্রক্রিয়ার উপযোগী কি না, তা যাচাই করাই তাঁর কাজ। দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার সম্পর্ক যাচাই করা তাঁর কাজ নয়।

জেয়া বলেন, কিডনি দান করলে তাঁকে ৭৫ লাখ কিয়াত (মিয়ানমারের মুদ্রা) দেওয়া হবে বলা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি উত্তর ভারতে গিয়েছিলেন। বড় একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয়।

ভারতে বিদেশি নাগরিকদের শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত একটি অনুমোদন কমিটির কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। জেয়া বলেন, একজন দোভাষীর সহায়তায় চারজন তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

‘তাঁরা আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমি স্বেচ্ছায় তাঁকে কিডনি দান করছি, নাকি জোরজবরদস্তি করে নেওয়া হচ্ছে’, বলেন জেয়া। তিনি তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হন, গ্রহীতা তাঁর আত্মীয়। পরে তাঁকে কিডনি দানের অনুমতি দেওয়া হয়।

অস্ত্রোপচারের জন্য অচেতন করার আগে চিকিৎসকদের কর্মকাণ্ডগুলো জেয়ার মনে আছে। তিনি বলেন, অস্ত্রোপচারের পর চলাফেরা করতে ব্যথা হচ্ছিল। এ ছাড়া বড় জটিলতা হয়নি। অস্ত্রোপচার শেষে এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয় তাঁকে।

আত্মীয় সেজে কিডনি দান করেছেন মিয়ো উয়িনও

জেয়ার মতোই গ্রহীতার আত্মীয় সেজে কিডনি দান করেছেন মিয়ো উয়িন (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘দালাল আমাকে এক টুকরা কাগজ দিয়েছিলেন। সেখানে যা লেখা ছিল, সেগুলো আমাকে মুখস্থ করতে হয়েছে।’

উয়িন বলেন, তাঁকে বলতে বলা হয়েছিল যে তাঁর এক আত্মীয়ের সঙ্গে গ্রহীতার বৈবাহিক সম্পর্ক আছে। তা ছাড়া একজনকে তাঁর মা সাজানো হয়েছিল। তথ্য যাচাইকারী ব্যক্তি তাঁর মা ভেবে ওই অন্য নারীকেই ফোন করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর সন্তান যে কিডনি দিচ্ছেন, তা তিনি জানেন কি না।

উয়িন জানান, কিডনি দেওয়ার জন্য জেয়ার সমপরিমাণ অর্থই তাঁকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ওই অর্থের ১০ শতাংশ দালালকে দিতে হয়েছে। জেয়া ও উয়িন দুজনই বলেছেন, তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল।

উয়িন বলেন, ‘আমি মনঃস্থির করেছিলাম, এটা আমাকে করতেই হবে। কারণ, আগেই আমি তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছি।’

কিডনি বিক্রি করার সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কেও জানিয়েছেন এই ব্যক্তি। বলেছেন, ঋণ পরিশোধ ও স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে না পেরে তিনি এমনটা করেছেন।

অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে বেকারত্ব বেড়েছে। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখান থেকে সরে গেছেন। জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছিলেন। তবে ২০২৩ সালের মধ্যে তা বেড়ে অর্ধেকে পৌঁছেছে।

উইন বলেন, কিডনি বিক্রি যে অবৈধ, তা দালাল তাঁকে বলেননি। জানলে তিনি তা করতেন না। এ জন্য জেলে যেতে হয় কি না, সেই ভয়ে আছেন তিনি।

সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য তথ্য প্রদানকারীর নাম গোপন রাখা এবং তাঁদের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেনি বিবিসি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিয়ানমারের আরেকজন বিবিসিকে বলেন, তিনি ভারতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রায় ১০ জনকে কিডনি বেচাকেনায় সাহায্য করেছেন। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলীয় মান্দালয়ের একটি সংস্থা এ বেচাকেনার ব্যবস্থা করেছে।

ভারতে গ্রেপ্তার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, ২০১০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের হার ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার প্রতিস্থাপনের ঘটনা ঘটে। তবে প্রতিস্থাপনের জন্য বিশ্বব্যাপী অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়।

মানব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবসা প্রায় সব দেশেই অবৈধ। ডব্লিউএইচওর এক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিস্থাপনকৃত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ৫ থেকে ১০ শতাংশই আসে কালোবাজারে। তবে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে।

দারিদ্র্যের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেপাল, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, বাংলাদেশসহ এশিয়ায় অবৈধভাবে কিডনি বিক্রি বেড়েছে।

চিকিৎসার জন্য বিদেশি পর্যটকদের কাছে ভারত একটি পছন্দের জায়গা। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও পুলিশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশটিতে কিডনি বিক্রির হার বেড়েছে। আর এ খবরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

গত জুলাইয়ে ভারতের পুলিশ বলেছিল, তারা কিডনি বেচাকেনা চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। যার মধ্যে একজন ভারতীয় চিকিৎসক ও তাঁর সহকারীও আছেন।

দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের চিকিৎসক বিজয়া রাজাকুমারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, (চক্রের সদস্য হিসেবে) তিনি কয়েক কিলোমিটার দূরে ইয়াথার্থ নামের একটি হাসপাতালে ভিজিটিং কনসালট্যান্ট হিসেবে অস্ত্রোপচার করেছিলেন।

বিজয়ার আইনজীবী বিবিসিকে বলেছেন, অভিযোগগুলো ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’। এগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তিনি শুধু অনুমোদন কমিটির কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার পর অস্ত্রোপচার করেছেন ও সব সময় আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে কাজ করেছেন। জামিন আদেশ অনুসারে, তাঁর বিরুদ্ধে জাল নথি তৈরির অভিযোগ নেই।

ইয়াথার্থ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিবিসিকে বলেছে, ভিজিটিং কনসালট্যান্টদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাসহ তাঁদের সব মামলা যেন আইনি ও নৈতিক মানদণ্ড মোতাবেক পরিচালিত হয়, তা তারা নিশ্চিত করবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।

চিকিৎসক রাজাকুমারী গ্রেপ্তার হওয়ার পর স্থানীয় অ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, তিনি একজন ফ্রিল্যান্স কনসালট্যান্ট ছিলেন, যিনি ফি-ফর-সার্ভিস (কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক) ভিত্তিতে নিযুক্ত ছিলেন। অভিযোগ ওঠার পর তাঁর সঙ্গে চিকিৎসাবিষয়ক যোগাযোগ ছিন্ন করা হয়েছে।

তবে চিকিৎসক রাজাকুমারীর বিরুদ্ধে আদালতে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।

অনুশোচনা নেই

গত এপ্রিলে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাজ্যগুলোকে চিঠি লিখে বিদেশিদের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের হার বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন সংস্থা এবং মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

জেয়ার অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পর বিবিসি তাঁর বক্তব্য শুনেছিল। সে সময় তিনি বলেন, ‘আমি আমার ঋণ পরিশোধ করতে পেরেছি এবং একটি জমি কিনেছি।’ তবে তিনি বাড়ি তৈরি করতে পারেননি।’ জেয়া বলেছিলেন, তিনি পিঠের ব্যথায় ভুগছেন। তবে তাঁর অনুশোচনা নেই।

জেয়া বলেন, ‘আমাকে শিগগির কাজ শুরু করতে হবে। যদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আবার দেখা দেয়, তবে আমাকে তা মোকাবিলা করতে হবে। এ নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।’

অস্ত্রোপচারের ছয় মাস পর মিয়ো উয়িন বিবিসিকে বলেছেন, তিনি তাঁর ঋণের একটা বড় অংশ শোধ করতে পেরেছেন। তবে পুরোটা পারেননি। অস্ত্রোপচারের পর পেটের কিছু সমস্যায় ভুগছেন বলেও জানালেন। বললেন, ‘আমার চাকরি নেই, একটা পয়সাও হাতে নেই।’

কিডনি বিক্রি করা নিয়ে তাঁর মধ্যেও নেই অনুশোচনা। তবে অন্যদের এটা না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘এটা ভালো নয়।’

আরও পড়ুনবাংলাদেশ-ভারত অবৈধ কিডনি প্রতিস্থাপন চক্র: দিল্লিতে অ্যাপোলোর চিকিৎসক গ্রেপ্তার০৯ জুলাই ২০২৪.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: কর ছ ল ন র র জন য র সদস য চ ক ৎসক পর ব র কর ছ ন র কর ছ হয় ছ ল বল ছ ন দ ন কর ন কর ছ র একট

এছাড়াও পড়ুন:

পুতিন পাঁচ বছরের মধ্যে পশ্চিমের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করবেন

আমার একজন আমেরিকান লেখক বন্ধু আছেন, যিনি যুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি করেন। গত কয়েক দশকে তিনি সংঘাতকবলিত দক্ষিণ সুদান, রুয়ান্ডা, কঙ্গো, আফগানিস্তান, ইরাক, গাজা এবং অন্য জায়গায় গিয়েছেন। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান হলো: এখানে কে আগ্রাসনকারী আর কে ভুক্তভোগী, সেটা নিশ্চিত ছিল। বসনিয়া ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ যুদ্ধ হলো দুটি ন্যায়সংগত যুদ্ধ।

পুতিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিন বছরের একটি ন্যায় যুদ্ধের পর, আমরা এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অন্যায্য শান্তি পরিকল্পনা মোকাবিলা করছি। ইউক্রেন তার ভূমি হারাবে, এই ক্ষতির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ পাবে না। যুদ্ধাপরাধীদের কোনো শাস্তি হবে না। রাশিয়ার ভবিষ্যৎ আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য ইউক্রেনীয়দের কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া হবে না।

এটাই এখন বাস্তব চিত্র। ২০০৮ সালের রাশিয়া-জর্জিয়া যুদ্ধের কথা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে। রাশিয়া তার প্রতিবেশী জর্জিয়ায় আক্রমণ করেছিল। সে সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিকোলা সারকোজি। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টও তিনি। রাশিয়াকে সন্তুষ্ট করার জন্য জর্জিয়ার ওপর জোর একটি অপমানজনক শান্তিচুক্তি চাপিয়ে দিয়েছিলেন।

রাশিয়ার সেই জর্জিয়া যুদ্ধের পরবর্তী ফলাফল নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়েছে। সেই যুদ্ধে বিজয়ের পর, ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিকল্পনা আঁটেন। জর্জিয়া যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমাদের যে লঘু প্রতিক্রিয়া, তাতে করে পুতিনের মধ্যে এই বিশ্বাস প্রবল হয় যে তিনি ইউক্রেনে হামলা করলেও তার প্রতিক্রিয়া খুব একটা হবে না।

পুতিন জর্জিয়াতে যে যুদ্ধ করেছিলেন, সেটা ছিল অনেকাংশে ২০০৩ সালের পশ্চিমাপন্থী বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া। ইউক্রেনকে তিনি ‘শাস্তি’ দিয়েছেন ২০০৪ সালের কমলা–বিপ্লবের প্রতিক্রিয়ায়। সেই বিপ্লবে রাশিয়ার কক্ষ থেকে ইউক্রেন বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি তৈরি হয়েছিল।

পুতিনের এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছিল এবং ২০০৯ সালে এর বিশদ বিবরণ ইউক্রেনের সংবাদপত্রে দুজন ইউক্রেনীয় শীর্ষ নিরাপত্তা বিশ্লেষক একটি নিবন্ধে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সে সময় এটাকে কাল্পনিক কাহিনি বলে বিবেচনা করা হয়েছিল এবং খুব কমসংখ্যক মানুষই তাতে বিশ্বাস করেছিলেন।

২০০৮ সালে পশ্চিমের অনেকে যেমন পুতিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করেছিলেন, পশ্চিমের অনেকে এখনো তাঁর দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করছে। কিন্তু ইতিহাস থেকে যদি আমাদের কিছু শেখার থাকে, তবে তার একটি শিক্ষা হলো: আপনি একজন আগ্রাসীকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না। ইউক্রেনের মানুষ কঠিন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এটা শিখেছেন।

যা–ই হোক না কেন, ২০১০ সালে রুশপন্থী ভিকতর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতায় এলে পুতিন ইউক্রেনকে রেহাই দিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে সবাইকে বিস্মিত করে ইয়ানুকোভিচ ইউক্রেনকে ইউরোপের সঙ্গে একত্রকরণের প্রচেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ভোল পাল্টান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একত্রকরণের ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তিনি সেই প্রচেষ্টা থেকে সরে আসেন।

এখানে একটি জল্পনা আছে যে পুতিন ইয়ানুকোভিচকে হুমকি দিয়েছিলেন যে ইউক্রেন যদি পশ্চিমা শিবিরে যুক্ত হয়, তাহলে তিনি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে একতরফাভাবে সরে আসার ঘটনায় ২০১৩ সালে কিয়েভে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, একসময় সেটাই ইউরো-ময়দান বিপ্লব বলে পরিচিত পায়।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা কয়েক মাস স্থায়ী হয়। ২০১৪ সালের প্রথম দিকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে রাশিয়ার আগ্রাসন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এটি আমি বলছি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। ইউরো–ময়দান বিপ্লবের সময় আমি একটি অ্যাডহকভিত্তিক থিঙ্কট্যাংকে কাজ করতাম, পুতিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে আমরা জেনেছিলাম। আমরা জেনেছিলাম, সোচিতে অনুষ্ঠেয় শীতকালীন অলিম্পিক শেষ হওয়া পর্যন্ত পুতিন অপেক্ষা করছিলেন। অলিম্পিক শেষ হলেই ক্রিমিয়া দখলের প্রক্রিয়া শুরু হবে। ক্রেমলিন ভেবেছিল, তারা রাশিয়ান বসন্ত সংঘটিত করবে। ইউক্রেনের রুশভাষীরা কিয়েভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করবে। এটা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যক ইউক্রেনীয়, তাঁরা যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেন, তাঁদের জন্মভূমিতে যুদ্ধ হতে দেননি।

ইউক্রেনে একটা গৃহযুদ্ধের বদলে পুতিন দনবাস অঞ্চলে কম তীব্রতার যুদ্ধ পান, যে যুদ্ধে তিনি কখনোই জিততে পারেননি। কিন্তু পুতিন জানেন কীভাবে অপেক্ষা করতে হয়। পুতিনকে যাঁরা ভালো করে জানেন, তাঁরা বলেন যে পুতিন জুডো খেলার দর্শন মেনে চলেন। পুতিন তাঁর তরুণ বয়স থেকে জুডো খেলার অনুশীলন করেছেন। জুডো খেলায় জেতার নিয়ম হলো, প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত লেগে থাকো, যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি হাল ছেড়ে দিচ্ছেন। ২০১৪ সালে ব্যর্থ হলেও পুতিন তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দেননি। ২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযানই সেটা প্রমাণ করেছে।

পুতিন ও তাঁর সঙ্গীরা বলেছেন যে ইউক্রেনের সঙ্গে তাঁরা যুদ্ধ করছেন না, বরং ইউক্রেনে পশ্চিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। পুতিন মনে করেন, ইউক্রেন একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র। রাশিয়ার ক্ষমতাকে প্রতিহত করতেই পশ্চিমারা এই রাষ্ট্রকে তৈরি করেছে। স্বাধীন ইউক্রেন পুতিনের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। রোম ও কার্থেজের মধ্যে যুদ্ধে যেমন শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, ঠিক একইভাবে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ অস্ত্রবিরতি সম্ভব নয়।

যাহোক, যুদ্ধবিরতি খুব সামান্য কিছুরই সমাধান করতে পারবে। ইউক্রেনের জন্য সেটা আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনীয়রা ন্যায্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চাইছে। এখন তার বদলে তারা পাচ্ছে নড়বড়ে ও অন্যায্য একটি যুদ্ধবিরতি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তিন দিনে কিয়েভ দখলে নেওয়ার। পুতিন তাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

এখন আগামী তিন বছরের মধ্যে কিংবা তার চেয়ে কম সময়ের মধ্যে পুতিনের লক্ষ্য অর্জনে ট্রাম্প তাঁকে সহায়তা করতে পারেন। এরপর পুতিনের সামনে থাকবে গোটা বিশ্ব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পুতিন পশ্চিমাদের আক্রমণ করবেন।

২০০৮ সালে পশ্চিমের অনেকে যেমন পুতিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করেছিলেন, পশ্চিমের অনেকে এখনো তাঁর দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করছে। কিন্তু ইতিহাস থেকে যদি আমাদের কিছু শেখার থাকে, তবে তার একটি শিক্ষা হলো: আপনি একজন আগ্রাসীকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না। ইউক্রেনের মানুষ কঠিন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এটা শিখেছেন।

ভুল প্রমাণিত হলে আমি খুশি হতাম, কিন্তু আমার ঐতিহাসিক শিক্ষা বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বযুদ্ধের এক দশকে প্রবেশ করেছে।

ইয়ারোস্লাভ রিস্টাক একজন ইতিহাসবিদ এবং লিভিভের ইউক্রেনীয় ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • বরেণ্য অভিনেতা উত্তম মারা গেছেন
  • ‘লেখক ছাড়া অন্য পেশার মানুষের সঙ্গ বেশি পছন্দ করি’
  • ভৈরব নদের স্রোতে ভেসে এল বস্তাবন্দী লাশ
  • বনানীতে ট্রেনের ধাক্কায় একজন নিহত
  • বরবাদের টিজারে ধুন্ধুমার অ্যাকশন: মন কেড়েছে শাকিব ভক্তদের
  • সস্ত্রীক অস্কারজয়ী অভিনেতার মরদেহ উদ্ধার
  • ঘুরে আসুন পল্লীকবির বাড়ি থেকে
  • স্যার রুমে ডেকে নিয়ে প্রভা আপুর ভিডিও দেখায়: মিষ্টি জান্নাত
  • পুতিন পাঁচ বছরের মধ্যে পশ্চিমের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করবেন