ভোট ও দলীয় ঐক্যের কথাই উঠে এল
Published: 27th, February 2025 GMT
বিএনপির বর্ধিত সভায় তিন শীর্ষ নেতাসহ মাঠপর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে মূলত ভোটের কথাই উঠে এল। পাশাপাশি ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুযোগ কাজে লাগাতে দলীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকে সারা দেশে দখল ও চাঁদাবাজির ব্যাপারে দলের ‘কঠোর’ অবস্থানে দৃঢ় থাকার পরামর্শ এসেছে। আগামী জাতীয় নির্বাচন ‘কঠিন’ হবে জানিয়ে অনেকে প্রার্থী মনোনয়নে এবার ‘হাইব্রিড’ নেতাদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। সভায় একসময়ের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গও ওঠে। দলটির সাম্প্রতিক তৎপরতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার মতও দিয়েছেন কোনো কোনো নেতা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির এই বর্ধিত সভায় দলের কেন্দ্রীয় এবং জেলা, উপজেলা ও পৌর কমিটির ১০০ জনের বেশি নেতা বক্তৃতা করেন। জাতীয় সংসদের এলডি হল-সংলগ্ন মাঠে এ সভা হয়। বেলা ১১টায় শুরু হয়। রাত ১১টায় সভা শেষ হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানামুখী আলোচনার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় বড় আয়োজনে এ বর্ধিত সভা হলো। বিএনপির প্রায় সাড়ে তিন হাজার নেতার মিলনমেলায় পরিণত হয় এ সভা। প্রায় ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত দুই পর্বে বর্ধিত সভার উদ্বোধন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাতে সমাপনী বক্তৃতাও দেন তিনি। লন্ডনে চিকিৎসাধীন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। তাঁরা দুজনই ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে প্রতিনিধিদের নিয়ে কর্ম–অধিবেশন হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ন্যূনতম সংস্কার সম্পন্ন করে দ্রুত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার। তারেক রহমান নির্বাচনের জন্য ‘বিএনপিকে প্রস্তুত’ করতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
‘ব্যক্তি নয়, দলকে প্রস্তুত করুন’জাতীয় নির্বাচনের জন্য ‘বিএনপিকে প্রস্তুত’ করতে নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘মাফিয়া প্রধানের পালানোর পর দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় হয়তো ঘনিয়ে আসছে। তাই দলকে কোনো ব্যক্তি নয়, বরং দলকে এ ব্যাপারে (নির্বাচন) ধীরে ধীরে প্রস্তুত করুন। সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থক-শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকুন, যেকোনো মূল্যে ঐক্যকে ধরে রাখুন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি গণতন্ত্রকামী দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়ে বলতে চাই, বিএনপি শুধু আপনাদের ভোটের অধিকার পুনরুদ্ধারই নয়, আপনাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। আপনাদের সমর্থন পেলে বিএনপি এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যে সরকার আপনাদের কাছে তথা দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে সকলের সহযোগিতা, সমর্থন চাই।’ তিনি বলেন, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কোনো বিকল্প নেই। এই ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হলো প্রত্যেক নাগরিকের ভোট প্রয়োগের অধিকার বাস্তবায়ন।
নির্বাচন নিয়ে কোনো কোনো উপদেষ্টার বক্তব্য নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিভিন্ন সময় নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য জনমনে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করলেও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো কোনো উপদেষ্টার বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য-মন্তব্য গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য হতাশার কারণ হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের নিঃশর্ত সমর্থন থাকলেও সরকার এখনো তাদের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারছে না।
‘স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন’তারেক রহমান বলেন, সারা দেশে খুন-হত্যা-ধর্ষণ-চুরি-ছিনতাই-রাহাজানি বেড়েই চলেছে। বাজার সিন্ডিকেটের কবলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন। সরকার এখনো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সরকার যেখানে বাজার পরিস্থিতি কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না, সেখানে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামে কেন দেশের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চাইছে—এটি জনগণের কাছে বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকামী জনগণ মনে করেন স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটি হবে সারা দেশে পলাতক স্বৈরাচারের দোসরদের পুনর্বাসনের একটি প্রক্রিয়া, যা সরাসরি গণ-অভ্যুত্থান আকাঙ্ক্ষার বিরোধী। গণহত্যাকারী, টাকা পাচারকারী, মাফিয়া চক্রকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার এই ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না। তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানান।
‘সব নতুন দলকে স্বাগত জানাই’তারেক রহমান বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিএনপি সব নতুন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে স্বাগত জানায়। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে গ্রহণ কিংবা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে জনগণ। সুতরাং প্রতিটি দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সবার আগে নির্বাচন কমিশনকে প্রস্তুত রাখতে হবে। তিনি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আরও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান।
ক্ষমতায় গেলে গণহত্যাকারীদের বিচার এবং ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার আশ্বাস দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফা হচ্ছে একটি বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সনদ। তবে এই ৩১ দফাই শেষ কথা নয়। সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কারের জন্য এই ৩১ দফাতে সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ রয়েছে। এই ৩১ দফার সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবে খুব বেশি ইস্যুতে মৌলিক বিরোধ নেই।
‘কিছু ব্যক্তি জনগণকে বিভ্রান্ত করছে’বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম গুম কমিশনের প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা বলি ৭৫০ জন, কিন্তু গুম হয়েছে প্রায় ১৭০০ জন, যেটা বাংলাদেশের মানুষ অতীতে কখনো দেখেনি। হত্যার শিকার হয়েছেন ২ হাজার ২৮৯ জন, বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ২ হাজারের ওপর। এই পরিসংখ্যান এ জন্যই উল্লেখ করছি যে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য কী পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে একটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিবাদকে তাড়িয়েছি, শেখ হাসিনাকে তাড়িয়েছি। আমরা এখন অপেক্ষা করছি, দেশকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশে রূপান্তর করার। কিন্তু সেই গণতন্ত্রকে বিঘ্নিত করার জন্য ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে চেষ্টা করছেন, বাইরে থেকেও চেষ্টা করা হচ্ছে, একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তর থেকেও কিছু কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠী ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘৫ আগস্টের পরিবর্তন ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর মানুষ আশা করেছিল দেশের অবস্থার পরিবর্তন হবে। অতি দ্রুত দেশের জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে, গণতন্ত্রের চর্চা হবে এবং জনগণ তার প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারবে। কিন্তু আমরা দুঃখের সঙ্গে দেখছি, এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাচ্ছি না।’
১৫ বছরের লড়াইকে বাস্তবে রূপ দিতে নেতা-কর্মীদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে বলেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চয়ই এমন কিছু কাজ করব না, যা দলের সুনামকে ক্ষুণ্ন করবে এবং আমাদের যাত্রাকে ব্যাহত করবে।’
‘সামনে কঠিন সময়’সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পৌর ও উপজেলার নেতারা বক্তব্য দেন। সন্ধ্যার পর থেকে জেলা ও মহানগর ও কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
বিভিন্ন দল বিএনপির বদনাম করছে উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস দলীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা সেই সুযোগ কেন দেব? অপকর্ম কিছু হচ্ছে। এখান থেকে গিয়ে দয়া করে সেখান (অপকর্ম) থেকে দূরে থাকবেন।’
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির জনপ্রিয়তা নষ্টের অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সামনে কঠিন সময় আসবে। যদিও প্রতিপক্ষ কেউ বিএনপির সমকক্ষ নয়। তবে পুরোনো ধাঁচে চললে বিএনপির জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যাবে না।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ষড়যন্ত্র চলমান, দৃশ্যমান নয়। দৃশ্যমান হলে মোকাবিলা সহজ হবে। এক–এগারো থেকে ষড়যন্ত্র শুরু। কারও পাতানো ফাঁদে পা না দিয়ে নিজেদের কৌশলে এগোতে হবে।
সদ্য কারামুক্ত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কেন অনৈক্য থাকবে? আমাদের মধ্যে চরিত্রের অনেক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। আমরা কেন চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হব? সব ভুল–ত্রুটি সংশোধন করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
যুগ্ম মহাসচিব হাবিব–উন–নবী খান বলেন, ‘মৌসুমি পাখি, বসন্তের কোকিল নিয়ে বেশি কথা হবে বলে আশা করেছিলাম। এই সুযোগ আমাদের মধ্য দিয়েই পাচ্ছে। আমাদের চরিত্র মজবুত করতে হবে।’ এ সময় তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘দখল এবং চাঁদাবাজি কি হচ্ছে না?’ তখন উপস্থিত অনেকে ‘হচ্ছে’ বলে জবাব দেন। এরপর তিনি বলেন, ‘আগামীতে বিপর্যয় হলে এই একটা কারণই যথেষ্ট।’
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্যসচিব সোহেল হোসাইন বলেন, বিএনপি নিয়ে বেশি অপপ্রচার করছে জামায়াত। তৃণমূলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে জামায়াতের অপপ্রচার রুখে দিতে হবে।
খুলনা মহানগর বিএনপির নেতা নুরুল ইসলাম বলেন, একটি গুপ্ত সংগঠন সারা দেশে মব সৃষ্টি করছে, অরাজকতা করছে, বিএনপিকে নিয়ে গুজব সৃষ্টি করছে। দলটি বিগত ১৬ বছর বিএনপির সঙ্গে থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করলেও এখন তারা সুবিধাজনক সময়ে আওয়ামী লীগের দোসরদের প্রতিষ্ঠা করছে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আঁতাত করছে।
জামালপুর জেলা বিএনপির নেতা জহিরুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর অনেকে নব্য বিএনপি হয়েছে। তাদের জন্যই বিএনপির এই বেহাল দশা। মসজিদ ও মাদ্রাসার কমিটি নিয়েও ঝগড়া হয়, এগুলো থেকে সরে আসতে হবে।
পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘দলে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে। সুতরাং আপনি (ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) নিজস্ব সেল ও জরিপের মাধ্যমে মনোনয়ন দেবেন।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, স্বৈরাচারের পতন হলেও দোসরেরা প্রশাসনে বসে আছে। বিএনপি ক্ষমতায় চলে এসেছে ভাবলে হবে না। বিএনপির বিরুদ্ধে সব দল মিলে ষড়যন্ত্র করছে। তাই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বর্ধিত সভা উপলক্ষে এলডি-সংলগ্ন মাঠে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন। সভার শুরুতে প্রয়াত নেতা এবং বরেণ্য ব্যক্তিদের স্মরণ করে শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
সভা সঞ্চালনা করেন যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন ও কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত। সভায় আমন্ত্রিতদের ফুল দিয়ে বরণ করেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ন ত র ক রহম ন ব এনপ র স র ল ইসল ম ব এনপ র ভ ষড়যন ত র গণতন ত র পর স থ ত র জন ত ক ক ষমত য় আপন দ র জনগণ র ন বল ন আম দ র অন ষ ঠ র র জন র জন য সদস য সরক র উপস থ ফখর ল
এছাড়াও পড়ুন:
এরদোয়ান এই দফায় আন্দোলন মোকাবিলা করে টিকতে পারবেন তো?
বারো বছর আগে যখন কর্তৃপক্ষ ইস্তাম্বুলের গেজি পার্ক ধ্বংস করে সেখানে শপিং মল বানাতে যাচ্ছিল, তখন পার্কটিকে বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষ ইস্তাম্বুলের রাস্তায় নেমেছিল। আমি সে সময় একটি লেখায় প্রশ্ন তুলেছিলাম: ‘তুরস্ক কেন বিদ্রোহ করছে?’
আর আজ মানুষ আবার রাস্তায় নেমেছে। তবে এবার কারণ ভিন্ন। তারা শুধু গাছ বা সবুজ জায়গার জন্য নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা আইনের অপব্যবহার ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। তখনকার মতো এখনো তুরস্কের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় মানুষের ক্ষোভ বেড়ে চলেছে।
স্থানীয় নির্বাচনে দু’বার ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (একেপি) পরাজিত করা নেতা ও ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে সেই দিন, যেদিন তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণার কথা ভাবছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগকে বিরোধীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অনেকের মতে, ইমামোগলু প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। এ কারণে তাঁর এই আকস্মিক গ্রেপ্তার কাকতালীয় নয়।
ইমামোগলুর গ্রেপ্তারে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা, ইজমির, কোনিয়া, দিয়ারবাকিরসহ সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। লাখো মানুষের জন্য এটি শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়; বরং এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা হারানোর বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
এখন তুরস্ক জুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন কি আর রোধ করা সম্ভব হবে?
যারা ২০১৩ সালের গেজি আন্দোলন দেখেছেন, তাঁদের কাছে বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র বেশ পরিচিত। রাস্তায় টিয়ার গ্যাস, শহরের কেন্দ্রে স্লোগান, আদালত ও বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে পুলিশ মোতায়েন—এগুলো আন্দোলনে সাধারণ দৃশ্য।
তবে এবার আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। ২০১৩ সালে তুরস্ককে তখনও একটি সম্ভাবনাময় উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে দেখা হতো। প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল, মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশের আশপাশে ছিল, এবং লিরার মান স্থিতিশীল ছিল।
একেপি সরকার তখনও ২০০০ সালের গোড়ার দিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সমর্থিত সংস্কারের সুফল ভোগ করছিল এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছিল।
কিন্তু সেই উজ্জ্বল চিত্র এখন ভেঙে পড়েছে। ২০২৫ সালে তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, আর মুদ্রাস্ফীতি এখনো দুই অঙ্কের ঘরে রয়ে গেছে; যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি প্রচলিত অর্থনৈতিক নীতিতে ফিরে এসেছে।
বছরের পর বছর অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে যে বৈদেশিক বিনিয়োগ হারিয়ে গিয়েছিল, তার কিছুটা গত বছর ফিরে আসতে শুরু করেছিল। কিন্তু ইমামোগলুর গ্রেপ্তারের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা আবার ধাক্কা খেয়েছে। লিরার মান ব্যাপকভাবে কমে গেছে, আর তুরস্কের ঝুঁকি সূচক বেড়ে গেছে।
২০১৩ সালের মতো, চলমান বিক্ষোভের গভীর বার্তাটি স্পষ্ট—অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আপনি যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ করেন, তবুও যদি বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়, গণমাধ্যম স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপে রাখা হয়, তাহলে শুধু এই "দক্ষ লোকজন" যথেষ্ট নয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক ঝুঁকিকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে, যা মূলধনের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
একটি গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন ও দক্ষ প্রযুক্তিবিদ যথেষ্ট নয়। টেকসই গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। যখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে যায়, ভিন্নমত দমন করা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যম স্বাধীনতা হারায়, তখন অর্থনীতিও ধসে পড়ে।
গণতন্ত্র খুব কম ক্ষেত্রেই এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিঃশেষের পথে এগিয়ে যায়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা, বিরোধীদের কারাবন্দী করা বা নির্বাচন থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা, প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ইত্যাদির মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়। তবে কবি ডিলান থমাসের কথা ধার করে বললে বলা যায়, তুরস্কের জনগণ দেখিয়ে দিচ্ছে, তারা এত সহজে স্বৈরাচারের অন্ধকারে তলিয়ে যাবে না।ইমামোগলুর কারাবাস হয়তো সেই শেষ ধাক্কা হতে পারে। এটি তুরস্কের মানুষকে আরও বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যকার সম্পর্ক তারা এখন ভালোভাবেই বুঝতে পারছে।
ইমামোগলু শুধু একজন জনপ্রিয় মেয়র নন, তিনি রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্রের সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচনে তার টানা বিজয় জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করেছিল। কিন্তু এখন তার অপসারণ দেখিয়ে দিচ্ছে যে এরদোয়ানের সরকার সেই পরিবর্তন গণতান্ত্রিক উপায়ে ঘটতে দিতে চায় না।
এই মুহূর্তটি গেজি আন্দোলনের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি আরও বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় প্রতিরোধের প্রতিফলন। ২০১৩ সালের আন্দোলন মূলত ধর্মনিরপেক্ষ, শহুরে তরুণদের দ্বারা চালিত ছিল। কিন্তু আজকের বিক্ষোভ সামাজিক, প্রজন্মগত এবং মতাদর্শগত বিভাজন অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠনের সদস্য, ছোট ব্যবসায়ীরা, রক্ষণশীল তরুণেরা, উদারপন্থীরা, বয়স্করা এবং কুর্দিরা সবাই একসঙ্গে রাজপথে নেমেছে। তাদের একমাত্র স্লোগান: ‘হক, হুকুক, আদালেত’—অর্থাৎ ‘অধিকার, আইন, ন্যায়বিচার’।
আরও পড়ুনএরদোয়ানবিরোধী লড়াইয়ে তরুণেরা যেভাবে পথ দেখাচ্ছেন ১৭ ঘণ্টা আগেতাদের ক্ষোভ কেবল ইমামোগলুকে ঘিরে নয়। তারা প্রতিবাদ করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ইচ্ছাকৃত অপব্যবহারের বিরুদ্ধে, যা ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরো দৃঢ় করছে।
যখন বিচার ব্যবস্থা রাজনৈতিক হয়ে যায়, তখন ভিন্নমতাবলম্বীরা দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হন, আর যারা সরকারের অনুগত, তারা সুবিধা ভোগ করেন, বিপরীতে স্বাধীন কণ্ঠস্বরগুলো শাস্তি পায় এবং সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়।
কাঠামোগত সমস্যা (যেমন নারী হত্যা, শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য, তরুণদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া) অবহেলিতই থেকে যায়, কারণ সরকারি সম্পদ ইতিহাস নতুনভাবে লেখার কাজে এবং সরকারের অনুগতদের পুরস্কৃত করতে ব্যয় করা হয়।
এটি শুধু তুরস্কের নাগরিকদের জন্য নয়, বরং দেশটির মিত্রদের জন্যও উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। আসলে, এটি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনের সঙ্গে কিছু মিল দেখিয়ে দেয়।
ইউরোপের অনেক গণতান্ত্রিক দেশ যেখানে ইমামোগলুর কারাবাসের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, সেখানে ৮ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধসে পড়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া অনেকটাই নীরব।
এর চেয়েও খারাপ হলো, গত এক দশকে তুরস্কে যা ঘটেছে, তার অনুরূপ ঘটনাগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন জ্ঞানের প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর বারবার আঘাত হেনেছে। কারণ, উচ্চশিক্ষিত ভোটাররা সাধারণত বিরোধী দল, অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করে, তাই একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সহজ টার্গেটে পরিণত করা হয়েছে।
একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ, বিজ্ঞানের অস্বীকৃতি এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারের যে ধারা তুরস্কে ২০১৩ সাল থেকে চলে আসছে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা যাচ্ছে।
তুরস্ক এখনো সম্পূর্ণরূপে গণতন্ত্র হারায়নি। কিন্তু এটি ভয়ানকভাবে স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে ফিরবে নাকি স্বৈরতন্ত্রের দিকে আরও গভীর হবে, তা আগামী দিনের সিদ্ধান্তগুলোর ওপর নির্ভর করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিস্থিতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। শুধু তুরস্কের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে নয়, বরং কারণ দেশটির রাস্তায় ছাত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর যে লড়াই চলছে, তা বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও তার শত্রুদের মধ্যকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
গণতন্ত্র খুব কম ক্ষেত্রেই এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিঃশেষের পথে এগিয়ে যায়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা, বিরোধীদের কারাবন্দী করা বা নির্বাচন থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা, প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ইত্যাদির মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়।
তবে কবি ডিলান থমাসের কথা ধার করে বললে বলা যায়, তুরস্কের জনগণ দেখিয়ে দিচ্ছে, তারা এত সহজে স্বৈরাচারের অন্ধকারে তলিয়ে যাবে না।
শেবনেম কালেমলি-ওজকান ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এবং গ্লোবাল লিঙ্কেজ ল্যাবের পরিচালক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ