আমি যখন সেই গ্রামে গিয়ে পৌঁছাই, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। কোথাও কোনো সাইনবোর্ড নেই যদিও, তবু জানি, এই গ্রামের নাম ‘ভীমপলাশি’। প্রথমবার শুনেই অবাক হয়েছিলাম। যে গ্রামে পৌঁছাতে আপনাকে হাঁটতে হবে সাড়ে তিন কিলোমিটার, তার এমন কেতাদুরস্ত নাম! কেউ বলেন, ভীম নামের এক প্রাচীন বাসিন্দার কথা। কেউ আবার এখানকার বিস্তীর্ণ পলাশ বাগানের কথা বলেন। কিন্তু লোকে বললে কী হবে, আমি তো আর পলাশ খুঁজতে আসিনি! ভীমদর্শন কোনো ভীমের সপ্তম প্রজন্মের ঠিকুজি বের করতেও আসিনি। আমি এসেছি মান্দার খুঁজতে; কাঁটা মান্দার। মুশকিল হলো ভাষা। এদের ভাষা আমি জানি না। এ ভাষা গুগলে নেই। কোনো অনলাইন অনুবাদকের সেবা পাওয়া সম্ভব নয়। এই গ্রামের বাসিন্দা ছাড়া আর কেউ এই বুলিতে কথা বলে না। এরা বাইরে কোথাও যায় না। বাইরে থেকে আসা কোনো সুযোগ-সুবিধা বা সংস্কৃতি এরা নেয় না।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনাদের মনের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, আমিই-বা মরতে এই গ্রামে এলাম কেন? বাংলাদেশের আর কোথাও কি মান্দার নেই? নিশ্চয়ই আছে। সংখ্যায় কমে যাচ্ছে বটে। কিন্তু খুঁজলে পাওয়া যায় না তেমন তো নয়। তবে? এই তবেটাই হলো যত নষ্টের গোড়া। হাসানকে পই পই করে বললাম, ঢাকা শহরের আশেপাশে কোথাও গাছটা লাগাও। মাঝেমধ্যে গিয়ে দুজনে মিলে দেখে আসা যাবে। হাসানের সেই এক কথা, ‘না’। আর তার একবার ‘না’ মানে হলো এক্কেবারে ‘না’। বলে কী জানেন?
–আমি তো চাইছিই না মাঝেমধ্যে দেখা হোক।
–এ আবার কেমন কথা? দুজন মিলে একসাথে দেখব বলেই না গাছটা বুনতে চাইলাম। তুমি-আমি বড় হতে থাকব। গাছটাও আমাদের সম্পর্কের সমান বড় হবে …
ওরে বাপ রে! বেশি বেশি মেলোড্রামাটিক হয়ে যাচ্ছে নাকি আমার কথাবার্তা? এইসব আধো আধো, আলতো, আহ্লাদী, অতি মিষ্টি কণ্ঠ– কোনোটাই পোষায় না আমাকে। যত জায়গায় বক্তৃতা দিই, সবাই জানে কী খটখট করে কথা বলি। আমি তাকালে নাকি বেড়ালের ভাগনের কথা মনে পড়ে। এই বিশ্বসংসারে একমাত্র হাসানই জানে, মাঝে মাঝে মিষ্টি করেও কথা বলি আমি। মনমর্জি বেশি অনুকূল থাকলে, হাসান আমাকে ‘দূর্বাঘাস’ বলে ডাকে।
–কেন এ নামে ডাকি তোমাকে, জানো?
আমি গলা তুলে প্রশ্ন করি, ‘কেন’?
–ভালো করে তাকিয়ে দূর্বাঘাসের পাতাগুলো দেখবে। তীক্ষ্ণ, সুচালো। যে চেনে না সে ভাববে, পা ফেলবে কি ফেলবে না! যদি ব্যথা পায়! আমি চোখ পাকিয়ে হাসি।
–আর তোমার বুঝি ব্যথার ভয় নাই? হাসানের চোখেমুখে কৌতুক।
–আমার হলো জহুরির চোখ। দুনিয়াসুদ্ধ লোক তোমার ভয়ে ‘থরহরি কম্প’ থাকতেই পারে। কিন্তু আমি তো জানি—
আমার দূর্বাঘাস;/নতুন পাখির ছানার মতো/শিমুল ভাঙা তুলার মতো/সুস্মিত নিঃশ্বাস।
নিজেকে কবি বলে দাবি করে না হাসান। তবে এ রকমই চার বা আট লাইনের লেখা ওর বিস্তর আছে। অবশ্য যতটা না লিখিত, তার চেয়ে ঢের বেশি আছে মুখে মুখে। হয়তো দুইজনে কুটুর কুটুর গল্প করছি, আর ভাজা বাদাম, বেলের শরবত, ডাবের জল দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছি গলা। হঠাৎ কথা নাই বার্তা নাই, একদম শ্মশানের মতো চুপ হয়ে যায় হাসান। তারপর ওর মিষ্টি অথচ ভরাট কণ্ঠে আওড়ে যায় সদ্যোজাত চৌপদী। একদম নতুন, আনকোরা প্রেমের কবিতা। আর তার পরেই তীব্র আলিঙ্গনে, সারা সপ্তাহের জমিয়ে রাখা তৃষ্ণায়, আমিও মোমের মতো গলে যাই। এ রকমই একদিন, গলে যেতে যেতে, হাসানের আঙুলগুলো হাতে তুলে নিই।
–তোমার আঙুলগুলো মান্দার ফুলের পাপড়ির মতো।
–সে তুমি আমায় ভালোবাসো বলে…
একটু লজ্জা পেয়ে হাসে হাসান। আমার দিকে এমন ঘোরলাগা চোখে তাকায় যে, বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়েই থাকতে পারি না আমি। সেদিনই দুইজনে মিলে ঠিক করি, একটা মান্দার গাছ বুনে দেব। ডাল বুনলেই তো হয়। বসন্ত এলে, হাসানের আঙুলের মতো মখমলি ফুল ছড়িয়ে থাকবে থোকায় থাকায়। মহাশূন্যের পাখিরাও লোভাতুর তাকিয়ে থাকবে সরু দৃপ্ত আঙুলের দিকে। আর আমি, ওদের সব্বাইকে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে হাসানের সমস্ত আঙুল শুধু আমার হাতের মধ্যেই রেখে দেব।
সেই বর্ষায় বেরিয়ে পড়ে হাসান। বলে, গাছ লাগাতে চাইলে এর চেয়ে ভালো সময় আর হয় না। ফোন ল্যাপটপ তথা তাবৎ যোগাযোগের যন্ত্রপাতি বাসায় রেখে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একা।
প্রথম দুই দিন কোনো দুশ্চিন্তা করিনি আমি। কিন্তু তার পরই আমার ভয় শুরু হয়। আগে যে কখনও হাসান এমন বেরিয়ে পড়েনি তা নয়। প্রতিবারই অবশ্য আমি দুশ্চিন্তাই করি। আর ফিরে এসে হাসান, আমার দুশ্চিন্তা নিয়েই এক দফা হাসাহাসি করে। চতুর্থ দিন সকাল। সেদিন শুক্রবার। একটু গা এলিয়ে ঘুমাব বলে আমি অ্যালার্ম দেইনি। সহকারী মেয়েটিকেও একটু দেরি করে আসতে বলেছি। কিন্তু ছটা বাজতে না বাজতেই আমার ফোন বেজে ওঠে। ফোন করেছে হাসানের বন্ধু শুভ্রা। সে থাকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়। একটু বিরক্ত হই। বুঝলাম ভাই, তোমার ওদিকে রাত মানে এইদিকে দিন। তাই বলে, আমার দিকটা ভাববে না? ফোন সাইলেন্ট করে আবার ঘুমিয়ে পড়ব ভাবতে ভাবতেই, কী মনে করে ফোনটা ধরি।
–হ্যালো .
–হ্যালো মেঘ, ঘুমাচ্ছিলে?
ও, আমার ডাকনাম মেঘ। পুরো নাম মেঘমালা শর্বরী হাসান। কোনো পদবির বালাই ছিল না আমার। বিয়ের পর একদম নিজে ইচ্ছে করেই জুড়ে নিয়েছি আমি। হাসান হেসেছিল। প্রশ্রয়ের হাসি। যেমন ছোটদের কর্মকাণ্ড দেখলে বড়রা হাসে, সেইরকম হাসি। কিন্তু আমার যে কী ভালো লাগে, সেটা ঠিক কোনো ‘সাইকোসোশ্যাল’ তত্ত্ব দিয়ে বোঝানো সম্ভব না। যেন সারাক্ষণ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তাই তো ইচ্ছে করে মানুষের! যাকে সে ভালোবাসে, তাকে সবকিছুতেই রাখতে চায়। তাকে চায় সর্বব্যাপী, সর্বগামী। “দেখা না দেখায় আমি তোমাকে চাই, না বলা কথায় আমি তোমাকে চাই”– সুমনের সেই গানটা! দেখেন, একজন মানুষ, আরেকজনের সঙ্গে অষ্টপ্রহর থাকবে, এটা তো আসলেই সম্ভব না। কিন্তু, কোনো সংকেতের ভেতর দিয়ে তাকে বহন করা, সেটা তো খুবই সম্ভব। সে থাকলে সম্ভব, না থাকলেও সম্ভব। অবশ্য চাইলে হাসানও আমার নাম জুড়ে নিতে পারত। তখন ওর নাম হতো মেঘ সারিন হাসান।
যাক এসব কাল্পনিক কথা। ফিরে আসি শুভ্রার সাথে ফোনালাপে;
–হ্যালো মেঘ, ঘুমাচ্ছিলে?
–অসুবিধা নাই, বলো। কী অবস্থা তোমাদের?
–আমরা তো আছি ভালোই ...
শুভ্রা থামে দুই সেকেন্ড। আমার চোখ বন্ধ। হঠাৎ ঘুম ভেঙেছে বলে, চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে। তবে সম্ভবত চোখ বন্ধ বলেই, শুভ্রার থেমে থাকা দুই সেকেন্ড, এক-একটা মাইক্রোসেকেন্ডে ভাগ হয়ে আমার সামনে দৃশ্যায়িত হতে থাকে। আমি দেখতে পাই, শুভ্রা ঢোক গেলে, যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না আমাকে বলবে কি বলবে না। ‘আন্ধাধুন’ নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে একজন শিল্পী তার সর্বোচ্চ মনোযোগ সংগীতে দেওয়ার জন্য অন্ধ সেজে থাকে। দুই সেকেন্ড শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি চোখ মেলে তাকাই। আমার কপালে ভাঁজ পড়ে।
–কী হয়েছে শুভ্রা? সব ঠিক আছে তো?
–তুমি একটা পোস্ট দেখেছ মেঘ?
–সোশ্যাল মিডিয়ায়? কী পোস্ট বলো তো?
–আমি তোমাকে লিংক পাঠাচ্ছি। একটু চেক করে জানাও আমাকে …
আমি উঠে বসি। ঘুম কেটে গেছে এবার। কপালের ভাঁজও নিশ্চয়ই বেড়েছে। আয়না দেখে বললে পারলে ভালো হতো। শুভ্রা লিংক পাঠিয়েছে। একটা রক্তমাখা, আহত পুরুষের মিড-ক্লোজ ছবি। এখনও পর্যন্ত ১৫৭টা শেয়ার করা হয়েছে এই পোস্টের। পুলিশের পক্ষ থেকে ছেলেটির পরিচয় খোঁজা হচ্ছে। এই মুখটা আমার চেনা! এই মুখের প্রতিটি রেখা, শিরা-উপশিরা, কপালের কাছের কাটা দাগ সবকিছু মুখস্থ আমার!
আর এই জামা? এই জামা আমি চিনি। গত বছর পহেলা বৈশাখে উপহার দিয়েছিলাম। খুব পছন্দ করেছিল হাসান। বলেছিল, কী আরাম আরাম মেঘ? আচ্ছা, ঠিক এই ফেব্রিকের মধ্যে আরও রং আছে? আমি হেসেছিলাম। “তোমাকে আমি এই পৃথিবীর সমস্ত রং এনে দেব।”
“পাগলি!”–হাসান ঘাড়টা কাত করে হাসে। আর অঞ্জলিতে মুখটা তুলে ধরে আমার। আমার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। চোখ বন্ধ করে ফেলি আমি …
চোখ বন্ধ করে ফেলেছি আমি। আমার ঠোঁট কেঁপে উঠছে। সারা শরীর কেঁপে উঠছে আমার। হাসান! এটা হাসান? কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে না তো?
আবার ফোন করি শুভ্রাকে।
–শুভ্রা! হাসান …
–মেঘ শোনো, মেঘ! দ্যাখো, আমরা তো এখনও নিশ্চিত না তাই না? এটা তো একটা ছবি!
–তাই তো। এটা তো একটা ছবিই!
পোস্টের সাথে একটা নাম্বার দেওয়া আছে; দ্রুত ফোন করি ওই নাম্বারে। ওরা একটা লোকেশন জানায়। এখান থেকে ঘণ্টা দেড়েকের পথ; মানিকগঞ্জের কাছাকাছি। কোনো উপযুক্ত প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে যেতে বলে ওরা, যদি প্রয়োজন পড়ে। মনের ভেতর অনেক অন্ধকার আর সামান্য আলোর ছিটেফোঁটা নিয়ে আমি, পার্থকে ফোন করি। পার্থ; আমার সহকর্মী। মিডিয়া স্টাডিজের শিক্ষক। জলের মতো শান্ত স্বভাব পার্থের; এমন পরিস্থিতিতে ওকেই তাই মনে পড়ল সবার আগে। এই শহরে, এই মুহূর্তে আমার একমাত্র বন্ধু। নিঃশব্দে সব শোনে পার্থ। তেমনই নিঃশব্দে আমরা দুজন বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু আমার যৎসামান্য আশার আলো সত্যিই কোনো পথ দেখাতে পারে না। মানুষটা হাসান, যে এই মুহূর্তে অন্য সবার কাছে কেবলই একটা ‘বডি’। একটা চায়ের দোকানে নাকি শেষ দেখা গিয়েছিল হাসানকে, স্থানীয়রা তাই বলছে। রাস্তা পার হতে গিয়ে... ট্রাকটা দ্রুতগামী ছিল, পালিয়ে যেতে পেরেছে। এতটা অন্যমনস্ক তো নয় হাসান! কী ভাবছিল সে? কিন্তু যারা ওকে দেখেছে, তারা নাকি খুশিই দেখেছে। কথা হয়তো মিথ্যেও নয়; কেননা, প্রবল বেদনা আর প্রবল আনন্দ– দুই-ই মানুষকে অস্থির করে। অথচ এও তো আমার জানা হলো না, খুশিরই-বা কী ঘটনা ঘটেছিল?
শরীর আর মনের যুগপৎ এই যুদ্ধে ছায়ার মতো পাশে রইল পার্থ। কাগজপত্রের ঝামেলা শেষ করে হাসানকে নিয়ে শহরের দিকে রওনা দেওয়ার মুহূর্তে, এগিয়ে এলেন পুলিশের এসআই। সঙ্গে একটা সিগারেট কেইস।
–ম্যাম, লাশের পাশে পেয়েছি। দেখুন তো উনার কিনা?
চিনতে সময় লাগে না আমার। কালো আর কমলার মিশেল এই কেইসটা গত মাসেই এনেছিলাম বার্লিন থেকে ফেরার সময়। হাতব্যাগে রেখে দেই।
–জি, উনারই এটা। থ্যাংক ইউ ...
আমরা চলে আসি। গ্রামের বাড়ি যাই না। ঢাকাতেই রাখি হাসানকে। আমার খুব কাছে।
ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে না আমার। তবু ফিরি। ঘুম ঘুমও পাচ্ছে। ফোন বাজছে নাকি আমার? তাড়াতাড়ি গিয়ে ধরি।
–হ্যালো শর্বরী ...
–হ্যাঁ পার্থ, বল ...
জানি না কেন, পার্থ আমাকে ডাকনামে ডাকে না। শর্বরী বলে ডাকে। পেশাগত কারণেও হতে পারে।
–তোর ফেলোশিপের খবরটা পেয়েছিস? একটু মেইলটা চেক কর ...
মানুষের কত পরিস্থিতিতে কত কিছু মনে পড়ে তাই না? পার্থের ফোন পেয়ে আমার বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকের কথা মনে পড়ল। আমি ই-মেইল চেক করি। তাই তো! দশ মাসের ফেলোশিপ। খুব সময়ও তো নেই হাতে। পরের কয়দিন, পার্থকে সঙ্গে নিয়েই যাবতীয় অফিসিয়াল কাজ আর কেনাকাটাগুলো শেষ করি। আসলে পার্থই চাইছিল, আমি বেশিক্ষণ একা না থাকি।
পরের সপ্তাহেই চলে যাই দেশ ছেড়ে। একাডেমিক কাজ, ঘোরাঘুরিতে কখন আমার দশ মাস ফুরিয়ে গেল, টেরই পেলাম না। ঘোর বর্ষায় গিয়েছিলাম। যখন দেশে এলাম, তখন ফাল্গুন মাস। টানা দুই দিন ঠিকঠাক বিশ্রাম নিয়ে, একটু চোখ মেলে তাকাই বাসার দিকে। অর্ডার করা খাবারই খাচ্ছি দুই দিন ধরে। নাহ! শরীরের জন্য এটা ভালো হচ্ছে না একদম।
হাসানের সবচেয়ে প্রিয় ছোট লাল আলু কিনে আনি। খুব যত্ন করে আলুর দম রাঁধি আর সঙ্গে ফুলকো লুচি। হাসান লুচি খেতে ভালোবাসত। সবকিছু টেবিলে সাজিয়ে থালা আনতে গিয়ে দুইটা নিয়ে চলে এসেছি! বেশ করেছি। আমি কি সত্যিই জানি, হাসান আর নেই? যদি থাকে? যদি হঠাৎ বেজে ওঠে কলিংবেল? আর তখন যদি অভিমান করে বলে বসে, “আমায় একা রেখে, তুমি খেয়ে নিয়েছ মেঘমালা?” না। এমন কথা কোনোদিন বলেনি হাসান। তবু আমি ওর জন্য অপেক্ষা করেছি। আজও, হাসানের থালার মুখোমুখি বসি আমি। টুকটাক গল্প করি। কী হলো এই দশ মাস, এইসব গল্প। কিন্তু একটা লুচি খেয়েই উঠে পড়ি। গা গুলাচ্ছে। ভাজাভুজি খাওয়াটা ঠিক হলো না। হাত ধুতে গিয়ে সত্যি সত্যি বমি করে ফেলি। একটু ভালো লাগছে এখন। চোখেমুখে পানি দিয়ে বেসিনের সামনের আয়নার দিকে তাকাই। চোখ দুটো কেমন সাদাটে হয়ে আছে আমার। কাজল দেই না অনেক দিন। হাসান আমার কাজল দেওয়া চোখ ভালোবাসত। বিশেষ করে কাজল দিয়ে যেদিন ঘুমিয়ে পড়তাম, সেদিন ঘুম ভাঙলে কেমন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকত! ভাবতে ভাবতে, চোখে একটু কাজল দিতে ইচ্ছে করে আমার।
যাবার সময়, বলতে গেলে কোনো প্রসাধনীই সঙ্গে নিয়ে যাইনি। কাজল কোথায় রেখেছিলাম চট করে মনেই করতে পারি না। হঠাৎ আমার পুরোনো ছোট হ্যান্ডব্যাগটা চোখে পড়ে। হাসপাতাল আর মর্গে এই ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলাম বলে, একপাশে রেখে দিয়েছিলাম। হাতে নেই ব্যাগটা। যা ভেবেছি তাই। এই ব্যাগের পকেটেই একটা কাজল রাখতাম আমি।
এ কী? এ তো সিগারেট কেইস! আমি বের করিনি কেন এতদিন?
এটাই তো হাসানের স্পর্শ করা সর্বশেষ চিহ্ন আমার কাছে। কেইসটা খুলি। কোনো সিগারেট নেই। একটা ভাঁজ করা কাগজ আছে। আমার হৃৎকম্পন বাড়ছে। কাঁপা হাতেই কাগজটা খুলি। চার কোনা ঘর বানিয়ে বানিয়ে পুরোটা কাগজ জুড়ে ছোট ছোট নোট। পেন্সিলে লেখা।
মান্দার গাছটা বুনেছিল তো হাসান! গ্রামের নাম ভীমপলাশি! যাওয়ার পথটাও মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে! আজই বের হতে হবে আমাকে। খুব জরুরি কিছু জিনিস আর অল্প কাপড়চোপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। পার্থও আছে সঙ্গে। অচেনা জায়গা, কেউ সঙ্গে থাকলে একটু নিরাপদ লাগে। আগেই বলেছি, পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল হয়ে গেছে। এদিকে ভাষা জানি না এ অঞ্চলের। কিন্তু চলতে চলতে বুঝতে পারলাম, এই বহু ভাষার পৃথিবীর আগেও মানুষ যে আলাপ করতে পারত একে অন্যের সাথে, সেই ভাষাই বিশ্বজনীন। হাসানের বুনে যাওয়া মান্দার খুঁজে বের করতে, তাই খুব বেশি বেগ পেতে হয় না আমাদের। এক পুরোনো দিঘির পাশে, পাশাপাশি দুইটা মান্দার লাগিয়েছে হাসান। জোড়া মান্দার। আষাঢ়ে লাগানো ডালে, এই বসন্তেই কী চমৎকার ফুল এসেছে! হাসান চলে যাওয়ার পর থেকে আমি একফোঁটা কাঁদিনি। আজ, এই দিঘির জলের দিকে তাকিয়ে আমার কান্না পাচ্ছে।
কে বলেছে, এই পৃথিবীর কোথাও তুমি-আমি একসাথে নেই? এই দেখ, আমরা আছি! ওই যে মান্দার ফুলের মতো চমৎকার মখমলি আঙুল! মহাশূন্যের পাখিরাও এখন লোভাতুর তাকিয়ে থাকবে তোমার আঙুলের দিকে। আর আমি, ওদের সব্বাইকে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে শুধু আমার হাতের মধ্যেই রেখে দেব তোমার হাত। মান্দারের শরীর বেয়ে, দিঘির জলের ভেতর আমার দশ মাসের জমিয়ে রাখা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: চ খ বন ধ আম র ক দশ ম স ফ ন কর আম র দ আম র হ ল র মত
এছাড়াও পড়ুন:
মান্দার
আমি যখন সেই গ্রামে গিয়ে পৌঁছাই, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। কোথাও কোনো সাইনবোর্ড নেই যদিও, তবু জানি, এই গ্রামের নাম ‘ভীমপলাশি’। প্রথমবার শুনেই অবাক হয়েছিলাম। যে গ্রামে পৌঁছাতে আপনাকে হাঁটতে হবে সাড়ে তিন কিলোমিটার, তার এমন কেতাদুরস্ত নাম! কেউ বলেন, ভীম নামের এক প্রাচীন বাসিন্দার কথা। কেউ আবার এখানকার বিস্তীর্ণ পলাশ বাগানের কথা বলেন। কিন্তু লোকে বললে কী হবে, আমি তো আর পলাশ খুঁজতে আসিনি! ভীমদর্শন কোনো ভীমের সপ্তম প্রজন্মের ঠিকুজি বের করতেও আসিনি। আমি এসেছি মান্দার খুঁজতে; কাঁটা মান্দার। মুশকিল হলো ভাষা। এদের ভাষা আমি জানি না। এ ভাষা গুগলে নেই। কোনো অনলাইন অনুবাদকের সেবা পাওয়া সম্ভব নয়। এই গ্রামের বাসিন্দা ছাড়া আর কেউ এই বুলিতে কথা বলে না। এরা বাইরে কোথাও যায় না। বাইরে থেকে আসা কোনো সুযোগ-সুবিধা বা সংস্কৃতি এরা নেয় না।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনাদের মনের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, আমিই-বা মরতে এই গ্রামে এলাম কেন? বাংলাদেশের আর কোথাও কি মান্দার নেই? নিশ্চয়ই আছে। সংখ্যায় কমে যাচ্ছে বটে। কিন্তু খুঁজলে পাওয়া যায় না তেমন তো নয়। তবে? এই তবেটাই হলো যত নষ্টের গোড়া। হাসানকে পই পই করে বললাম, ঢাকা শহরের আশেপাশে কোথাও গাছটা লাগাও। মাঝেমধ্যে গিয়ে দুজনে মিলে দেখে আসা যাবে। হাসানের সেই এক কথা, ‘না’। আর তার একবার ‘না’ মানে হলো এক্কেবারে ‘না’। বলে কী জানেন?
–আমি তো চাইছিই না মাঝেমধ্যে দেখা হোক।
–এ আবার কেমন কথা? দুজন মিলে একসাথে দেখব বলেই না গাছটা বুনতে চাইলাম। তুমি-আমি বড় হতে থাকব। গাছটাও আমাদের সম্পর্কের সমান বড় হবে …
ওরে বাপ রে! বেশি বেশি মেলোড্রামাটিক হয়ে যাচ্ছে নাকি আমার কথাবার্তা? এইসব আধো আধো, আলতো, আহ্লাদী, অতি মিষ্টি কণ্ঠ– কোনোটাই পোষায় না আমাকে। যত জায়গায় বক্তৃতা দিই, সবাই জানে কী খটখট করে কথা বলি। আমি তাকালে নাকি বেড়ালের ভাগনের কথা মনে পড়ে। এই বিশ্বসংসারে একমাত্র হাসানই জানে, মাঝে মাঝে মিষ্টি করেও কথা বলি আমি। মনমর্জি বেশি অনুকূল থাকলে, হাসান আমাকে ‘দূর্বাঘাস’ বলে ডাকে।
–কেন এ নামে ডাকি তোমাকে, জানো?
আমি গলা তুলে প্রশ্ন করি, ‘কেন’?
–ভালো করে তাকিয়ে দূর্বাঘাসের পাতাগুলো দেখবে। তীক্ষ্ণ, সুচালো। যে চেনে না সে ভাববে, পা ফেলবে কি ফেলবে না! যদি ব্যথা পায়! আমি চোখ পাকিয়ে হাসি।
–আর তোমার বুঝি ব্যথার ভয় নাই? হাসানের চোখেমুখে কৌতুক।
–আমার হলো জহুরির চোখ। দুনিয়াসুদ্ধ লোক তোমার ভয়ে ‘থরহরি কম্প’ থাকতেই পারে। কিন্তু আমি তো জানি—
আমার দূর্বাঘাস;/নতুন পাখির ছানার মতো/শিমুল ভাঙা তুলার মতো/সুস্মিত নিঃশ্বাস।
নিজেকে কবি বলে দাবি করে না হাসান। তবে এ রকমই চার বা আট লাইনের লেখা ওর বিস্তর আছে। অবশ্য যতটা না লিখিত, তার চেয়ে ঢের বেশি আছে মুখে মুখে। হয়তো দুইজনে কুটুর কুটুর গল্প করছি, আর ভাজা বাদাম, বেলের শরবত, ডাবের জল দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছি গলা। হঠাৎ কথা নাই বার্তা নাই, একদম শ্মশানের মতো চুপ হয়ে যায় হাসান। তারপর ওর মিষ্টি অথচ ভরাট কণ্ঠে আওড়ে যায় সদ্যোজাত চৌপদী। একদম নতুন, আনকোরা প্রেমের কবিতা। আর তার পরেই তীব্র আলিঙ্গনে, সারা সপ্তাহের জমিয়ে রাখা তৃষ্ণায়, আমিও মোমের মতো গলে যাই। এ রকমই একদিন, গলে যেতে যেতে, হাসানের আঙুলগুলো হাতে তুলে নিই।
–তোমার আঙুলগুলো মান্দার ফুলের পাপড়ির মতো।
–সে তুমি আমায় ভালোবাসো বলে…
একটু লজ্জা পেয়ে হাসে হাসান। আমার দিকে এমন ঘোরলাগা চোখে তাকায় যে, বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়েই থাকতে পারি না আমি। সেদিনই দুইজনে মিলে ঠিক করি, একটা মান্দার গাছ বুনে দেব। ডাল বুনলেই তো হয়। বসন্ত এলে, হাসানের আঙুলের মতো মখমলি ফুল ছড়িয়ে থাকবে থোকায় থাকায়। মহাশূন্যের পাখিরাও লোভাতুর তাকিয়ে থাকবে সরু দৃপ্ত আঙুলের দিকে। আর আমি, ওদের সব্বাইকে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে হাসানের সমস্ত আঙুল শুধু আমার হাতের মধ্যেই রেখে দেব।
সেই বর্ষায় বেরিয়ে পড়ে হাসান। বলে, গাছ লাগাতে চাইলে এর চেয়ে ভালো সময় আর হয় না। ফোন ল্যাপটপ তথা তাবৎ যোগাযোগের যন্ত্রপাতি বাসায় রেখে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একা।
প্রথম দুই দিন কোনো দুশ্চিন্তা করিনি আমি। কিন্তু তার পরই আমার ভয় শুরু হয়। আগে যে কখনও হাসান এমন বেরিয়ে পড়েনি তা নয়। প্রতিবারই অবশ্য আমি দুশ্চিন্তাই করি। আর ফিরে এসে হাসান, আমার দুশ্চিন্তা নিয়েই এক দফা হাসাহাসি করে। চতুর্থ দিন সকাল। সেদিন শুক্রবার। একটু গা এলিয়ে ঘুমাব বলে আমি অ্যালার্ম দেইনি। সহকারী মেয়েটিকেও একটু দেরি করে আসতে বলেছি। কিন্তু ছটা বাজতে না বাজতেই আমার ফোন বেজে ওঠে। ফোন করেছে হাসানের বন্ধু শুভ্রা। সে থাকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়। একটু বিরক্ত হই। বুঝলাম ভাই, তোমার ওদিকে রাত মানে এইদিকে দিন। তাই বলে, আমার দিকটা ভাববে না? ফোন সাইলেন্ট করে আবার ঘুমিয়ে পড়ব ভাবতে ভাবতেই, কী মনে করে ফোনটা ধরি।
–হ্যালো ...
–হ্যালো মেঘ, ঘুমাচ্ছিলে?
ও, আমার ডাকনাম মেঘ। পুরো নাম মেঘমালা শর্বরী হাসান। কোনো পদবির বালাই ছিল না আমার। বিয়ের পর একদম নিজে ইচ্ছে করেই জুড়ে নিয়েছি আমি। হাসান হেসেছিল। প্রশ্রয়ের হাসি। যেমন ছোটদের কর্মকাণ্ড দেখলে বড়রা হাসে, সেইরকম হাসি। কিন্তু আমার যে কী ভালো লাগে, সেটা ঠিক কোনো ‘সাইকোসোশ্যাল’ তত্ত্ব দিয়ে বোঝানো সম্ভব না। যেন সারাক্ষণ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তাই তো ইচ্ছে করে মানুষের! যাকে সে ভালোবাসে, তাকে সবকিছুতেই রাখতে চায়। তাকে চায় সর্বব্যাপী, সর্বগামী। “দেখা না দেখায় আমি তোমাকে চাই, না বলা কথায় আমি তোমাকে চাই”– সুমনের সেই গানটা! দেখেন, একজন মানুষ, আরেকজনের সঙ্গে অষ্টপ্রহর থাকবে, এটা তো আসলেই সম্ভব না। কিন্তু, কোনো সংকেতের ভেতর দিয়ে তাকে বহন করা, সেটা তো খুবই সম্ভব। সে থাকলে সম্ভব, না থাকলেও সম্ভব। অবশ্য চাইলে হাসানও আমার নাম জুড়ে নিতে পারত। তখন ওর নাম হতো মেঘ সারিন হাসান।
যাক এসব কাল্পনিক কথা। ফিরে আসি শুভ্রার সাথে ফোনালাপে;
–হ্যালো মেঘ, ঘুমাচ্ছিলে?
–অসুবিধা নাই, বলো। কী অবস্থা তোমাদের?
–আমরা তো আছি ভালোই ...
শুভ্রা থামে দুই সেকেন্ড। আমার চোখ বন্ধ। হঠাৎ ঘুম ভেঙেছে বলে, চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে। তবে সম্ভবত চোখ বন্ধ বলেই, শুভ্রার থেমে থাকা দুই সেকেন্ড, এক-একটা মাইক্রোসেকেন্ডে ভাগ হয়ে আমার সামনে দৃশ্যায়িত হতে থাকে। আমি দেখতে পাই, শুভ্রা ঢোক গেলে, যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না আমাকে বলবে কি বলবে না। ‘আন্ধাধুন’ নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে একজন শিল্পী তার সর্বোচ্চ মনোযোগ সংগীতে দেওয়ার জন্য অন্ধ সেজে থাকে। দুই সেকেন্ড শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি চোখ মেলে তাকাই। আমার কপালে ভাঁজ পড়ে।
–কী হয়েছে শুভ্রা? সব ঠিক আছে তো?
–তুমি একটা পোস্ট দেখেছ মেঘ?
–সোশ্যাল মিডিয়ায়? কী পোস্ট বলো তো?
–আমি তোমাকে লিংক পাঠাচ্ছি। একটু চেক করে জানাও আমাকে …
আমি উঠে বসি। ঘুম কেটে গেছে এবার। কপালের ভাঁজও নিশ্চয়ই বেড়েছে। আয়না দেখে বললে পারলে ভালো হতো। শুভ্রা লিংক পাঠিয়েছে। একটা রক্তমাখা, আহত পুরুষের মিড-ক্লোজ ছবি। এখনও পর্যন্ত ১৫৭টা শেয়ার করা হয়েছে এই পোস্টের। পুলিশের পক্ষ থেকে ছেলেটির পরিচয় খোঁজা হচ্ছে। এই মুখটা আমার চেনা! এই মুখের প্রতিটি রেখা, শিরা-উপশিরা, কপালের কাছের কাটা দাগ সবকিছু মুখস্থ আমার!
আর এই জামা? এই জামা আমি চিনি। গত বছর পহেলা বৈশাখে উপহার দিয়েছিলাম। খুব পছন্দ করেছিল হাসান। বলেছিল, কী আরাম আরাম মেঘ? আচ্ছা, ঠিক এই ফেব্রিকের মধ্যে আরও রং আছে? আমি হেসেছিলাম। “তোমাকে আমি এই পৃথিবীর সমস্ত রং এনে দেব।”
“পাগলি!”–হাসান ঘাড়টা কাত করে হাসে। আর অঞ্জলিতে মুখটা তুলে ধরে আমার। আমার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। চোখ বন্ধ করে ফেলি আমি …
চোখ বন্ধ করে ফেলেছি আমি। আমার ঠোঁট কেঁপে উঠছে। সারা শরীর কেঁপে উঠছে আমার। হাসান! এটা হাসান? কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে না তো?
আবার ফোন করি শুভ্রাকে।
–শুভ্রা! হাসান …
–মেঘ শোনো, মেঘ! দ্যাখো, আমরা তো এখনও নিশ্চিত না তাই না? এটা তো একটা ছবি!
–তাই তো। এটা তো একটা ছবিই!
পোস্টের সাথে একটা নাম্বার দেওয়া আছে; দ্রুত ফোন করি ওই নাম্বারে। ওরা একটা লোকেশন জানায়। এখান থেকে ঘণ্টা দেড়েকের পথ; মানিকগঞ্জের কাছাকাছি। কোনো উপযুক্ত প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে যেতে বলে ওরা, যদি প্রয়োজন পড়ে। মনের ভেতর অনেক অন্ধকার আর সামান্য আলোর ছিটেফোঁটা নিয়ে আমি, পার্থকে ফোন করি। পার্থ; আমার সহকর্মী। মিডিয়া স্টাডিজের শিক্ষক। জলের মতো শান্ত স্বভাব পার্থের; এমন পরিস্থিতিতে ওকেই তাই মনে পড়ল সবার আগে। এই শহরে, এই মুহূর্তে আমার একমাত্র বন্ধু। নিঃশব্দে সব শোনে পার্থ। তেমনই নিঃশব্দে আমরা দুজন বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু আমার যৎসামান্য আশার আলো সত্যিই কোনো পথ দেখাতে পারে না। মানুষটা হাসান, যে এই মুহূর্তে অন্য সবার কাছে কেবলই একটা ‘বডি’। একটা চায়ের দোকানে নাকি শেষ দেখা গিয়েছিল হাসানকে, স্থানীয়রা তাই বলছে। রাস্তা পার হতে গিয়ে... ট্রাকটা দ্রুতগামী ছিল, পালিয়ে যেতে পেরেছে। এতটা অন্যমনস্ক তো নয় হাসান! কী ভাবছিল সে? কিন্তু যারা ওকে দেখেছে, তারা নাকি খুশিই দেখেছে। কথা হয়তো মিথ্যেও নয়; কেননা, প্রবল বেদনা আর প্রবল আনন্দ– দুই-ই মানুষকে অস্থির করে। অথচ এও তো আমার জানা হলো না, খুশিরই-বা কী ঘটনা ঘটেছিল?
শরীর আর মনের যুগপৎ এই যুদ্ধে ছায়ার মতো পাশে রইল পার্থ। কাগজপত্রের ঝামেলা শেষ করে হাসানকে নিয়ে শহরের দিকে রওনা দেওয়ার মুহূর্তে, এগিয়ে এলেন পুলিশের এসআই। সঙ্গে একটা সিগারেট কেইস।
–ম্যাম, লাশের পাশে পেয়েছি। দেখুন তো উনার কিনা?
চিনতে সময় লাগে না আমার। কালো আর কমলার মিশেল এই কেইসটা গত মাসেই এনেছিলাম বার্লিন থেকে ফেরার সময়। হাতব্যাগে রেখে দেই।
–জি, উনারই এটা। থ্যাংক ইউ ...
আমরা চলে আসি। গ্রামের বাড়ি যাই না। ঢাকাতেই রাখি হাসানকে। আমার খুব কাছে।
ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে না আমার। তবু ফিরি। ঘুম ঘুমও পাচ্ছে। ফোন বাজছে নাকি আমার? তাড়াতাড়ি গিয়ে ধরি।
–হ্যালো শর্বরী ...
–হ্যাঁ পার্থ, বল ...
জানি না কেন, পার্থ আমাকে ডাকনামে ডাকে না। শর্বরী বলে ডাকে। পেশাগত কারণেও হতে পারে।
–তোর ফেলোশিপের খবরটা পেয়েছিস? একটু মেইলটা চেক কর ...
মানুষের কত পরিস্থিতিতে কত কিছু মনে পড়ে তাই না? পার্থের ফোন পেয়ে আমার বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকের কথা মনে পড়ল। আমি ই-মেইল চেক করি। তাই তো! দশ মাসের ফেলোশিপ। খুব সময়ও তো নেই হাতে। পরের কয়দিন, পার্থকে সঙ্গে নিয়েই যাবতীয় অফিসিয়াল কাজ আর কেনাকাটাগুলো শেষ করি। আসলে পার্থই চাইছিল, আমি বেশিক্ষণ একা না থাকি।
পরের সপ্তাহেই চলে যাই দেশ ছেড়ে। একাডেমিক কাজ, ঘোরাঘুরিতে কখন আমার দশ মাস ফুরিয়ে গেল, টেরই পেলাম না। ঘোর বর্ষায় গিয়েছিলাম। যখন দেশে এলাম, তখন ফাল্গুন মাস। টানা দুই দিন ঠিকঠাক বিশ্রাম নিয়ে, একটু চোখ মেলে তাকাই বাসার দিকে। অর্ডার করা খাবারই খাচ্ছি দুই দিন ধরে। নাহ! শরীরের জন্য এটা ভালো হচ্ছে না একদম।
হাসানের সবচেয়ে প্রিয় ছোট লাল আলু কিনে আনি। খুব যত্ন করে আলুর দম রাঁধি আর সঙ্গে ফুলকো লুচি। হাসান লুচি খেতে ভালোবাসত। সবকিছু টেবিলে সাজিয়ে থালা আনতে গিয়ে দুইটা নিয়ে চলে এসেছি! বেশ করেছি। আমি কি সত্যিই জানি, হাসান আর নেই? যদি থাকে? যদি হঠাৎ বেজে ওঠে কলিংবেল? আর তখন যদি অভিমান করে বলে বসে, “আমায় একা রেখে, তুমি খেয়ে নিয়েছ মেঘমালা?” না। এমন কথা কোনোদিন বলেনি হাসান। তবু আমি ওর জন্য অপেক্ষা করেছি। আজও, হাসানের থালার মুখোমুখি বসি আমি। টুকটাক গল্প করি। কী হলো এই দশ মাস, এইসব গল্প। কিন্তু একটা লুচি খেয়েই উঠে পড়ি। গা গুলাচ্ছে। ভাজাভুজি খাওয়াটা ঠিক হলো না। হাত ধুতে গিয়ে সত্যি সত্যি বমি করে ফেলি। একটু ভালো লাগছে এখন। চোখেমুখে পানি দিয়ে বেসিনের সামনের আয়নার দিকে তাকাই। চোখ দুটো কেমন সাদাটে হয়ে আছে আমার। কাজল দেই না অনেক দিন। হাসান আমার কাজল দেওয়া চোখ ভালোবাসত। বিশেষ করে কাজল দিয়ে যেদিন ঘুমিয়ে পড়তাম, সেদিন ঘুম ভাঙলে কেমন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকত! ভাবতে ভাবতে, চোখে একটু কাজল দিতে ইচ্ছে করে আমার।
যাবার সময়, বলতে গেলে কোনো প্রসাধনীই সঙ্গে নিয়ে যাইনি। কাজল কোথায় রেখেছিলাম চট করে মনেই করতে পারি না। হঠাৎ আমার পুরোনো ছোট হ্যান্ডব্যাগটা চোখে পড়ে। হাসপাতাল আর মর্গে এই ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলাম বলে, একপাশে রেখে দিয়েছিলাম। হাতে নেই ব্যাগটা। যা ভেবেছি তাই। এই ব্যাগের পকেটেই একটা কাজল রাখতাম আমি।
এ কী? এ তো সিগারেট কেইস! আমি বের করিনি কেন এতদিন?
এটাই তো হাসানের স্পর্শ করা সর্বশেষ চিহ্ন আমার কাছে। কেইসটা খুলি। কোনো সিগারেট নেই। একটা ভাঁজ করা কাগজ আছে। আমার হৃৎকম্পন বাড়ছে। কাঁপা হাতেই কাগজটা খুলি। চার কোনা ঘর বানিয়ে বানিয়ে পুরোটা কাগজ জুড়ে ছোট ছোট নোট। পেন্সিলে লেখা।
মান্দার গাছটা বুনেছিল তো হাসান! গ্রামের নাম ভীমপলাশি! যাওয়ার পথটাও মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে! আজই বের হতে হবে আমাকে। খুব জরুরি কিছু জিনিস আর অল্প কাপড়চোপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। পার্থও আছে সঙ্গে। অচেনা জায়গা, কেউ সঙ্গে থাকলে একটু নিরাপদ লাগে। আগেই বলেছি, পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল হয়ে গেছে। এদিকে ভাষা জানি না এ অঞ্চলের। কিন্তু চলতে চলতে বুঝতে পারলাম, এই বহু ভাষার পৃথিবীর আগেও মানুষ যে আলাপ করতে পারত একে অন্যের সাথে, সেই ভাষাই বিশ্বজনীন। হাসানের বুনে যাওয়া মান্দার খুঁজে বের করতে, তাই খুব বেশি বেগ পেতে হয় না আমাদের। এক পুরোনো দিঘির পাশে, পাশাপাশি দুইটা মান্দার লাগিয়েছে হাসান। জোড়া মান্দার। আষাঢ়ে লাগানো ডালে, এই বসন্তেই কী চমৎকার ফুল এসেছে! হাসান চলে যাওয়ার পর থেকে আমি একফোঁটা কাঁদিনি। আজ, এই দিঘির জলের দিকে তাকিয়ে আমার কান্না পাচ্ছে।
কে বলেছে, এই পৃথিবীর কোথাও তুমি-আমি একসাথে নেই? এই দেখ, আমরা আছি! ওই যে মান্দার ফুলের মতো চমৎকার মখমলি আঙুল! মহাশূন্যের পাখিরাও এখন লোভাতুর তাকিয়ে থাকবে তোমার আঙুলের দিকে। আর আমি, ওদের সব্বাইকে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে শুধু আমার হাতের মধ্যেই রেখে দেব তোমার হাত। মান্দারের শরীর বেয়ে, দিঘির জলের ভেতর আমার দশ মাসের জমিয়ে রাখা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।